Tuesday, March 31, 2020

আযর কি হযরত ইবরাহীমের (আঃ) জন্মদাতা পিতা ছিলেন ?

আযর কি হযরত ইবরাহীমের (আঃ) জন্মদাতা পিতা ছিলেন ?
সূরা তাওবার ১১৫ নং আয়াত এবং সূরা মুমতাহিনার ১৪ নং আয়াতের বাহ্যিক অর্থ হচ্ছে আযর হযরত ইবরাহীম (আঃ) এর পিতৃস্থানীয় ছিল এবং হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাকে পিতা বলে সম্বোধন করতেন ।

কিন্ত মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এবং সকল নবী-রাসূলগনের জন্মদাতা পিতা-মাতা এবং তাদের পূর্বপুরুষগণ তাওহীদবাদী ও এক খোদায় বিশ্বাসী ছিলেন ।
এতৎসংক্রান্ত সকল বার ইমামীয়া শীয়া আলেমের ঐকমত্যের (ইজমা) সাথে মূর্তিপূজক আযরের পক্ষে হযরত ইবরাহীমের (আঃ) পিতা হওয়া মোটেও খাপ খায় না ।

প্রসিদ্ধ আলেম শেখ মুফিদ (রহঃ) তাঁর ‘আওয়ায়েলুল মাকালাত’ নামক গ্রন্থে উপরিউক্ত বিষয়টিতে যে ইমামীয়া শিয়া আলেমদের ইজমা রয়েছে তা লিখেছেন ।
এমনকি অনেক সুন্নী আলেমও এ ব্যাপারে তাঁদের সাথে অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন ।

এমতাবস্থায় উপরিউক্ত আয়াতসমূহের বাহ্যিক অর্থের অবস্থাই বা কি হবে এবং কিভাবে এ সমস্যাটি সমাধান করতে হবে ?

সম্মানীয় পাঠক ,
আপনার গভীর মনযোগ আশা করছি ।

অনেক মুফাসসির বলেছেন যে , أب (আব) শব্দটি যদিও সাধারণত আরবী ভাষায় ‘পিতা’র ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয় , তবুও এ শব্দটির ব্যবহার কেবল ‘পিতা’র মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় এবং কখনও কখনও আরবী ভাষা ও পবিত্র কোরআনের পরিভাষায় ‘চাচা’ অর্থেও ব্যবহৃত হয় ।
যেমন নীচের আয়াতে أب শব্দটি ‘চাচা’ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে -
)إذ قال لبنيه ما تعبدون من بعدي قالوا نعبد إلهك و إله ءابائك إبراهيم و إسماعيل و إسحاق إلها واحدا و نحن له مسلمون(
“ --- যখন ইয়াকুব নিজ সন্তানদেরকে বললেন , আমার পরে তোমরা কার উপাসনা করবে ? তখন তারা বলেছিল , আমরা আপনার ও আপনার পূর্বপুরুষগণ ইবরাহীম , ইসমাঈল ও ইসহাকের এক-অদ্বিতীয় উপাস্যের উপাসনা করব । আর আমরা তাঁর প্রতি আত্মসমর্পণকারী ।”
সূরা - বাকারা / ১৩২ ।

নিঃসন্দেহে হযরত ইসমাঈল (আঃ) হযরত ইয়াকুব (আঃ)-এর চাচা ছিলেন । তাঁর পিতা ছিলেন না । কারণ হযরত ইয়াকুব (আঃ) হযরত ইসহাক (আঃ) এর সন্তান । আর হযরত ইসহাক (আঃ) হযরত ইসমাঈল (আঃ) এর ভাই ছিলেন ।
এতদসত্ত্বেও হযরত ইয়াকুব (আঃ) এর সন্তানগণ হযরত ইয়াকুব (আঃ) এর চাচা হযরত ইসমাঈল (আঃ) কে পিতা বলেছেন ।

অর্থাৎ তারা أب শব্দটি তাঁর (ইসমাঈল) ওপরও প্রয়োগ করেছেন ।
এ দু’ধরনের ব্যবহার সত্ত্বেও এ সম্ভাবনা থেকে যায় যে , আযরকে হেদায়েত করা সংক্রান্ত যে সব আয়াত রয়েছে সেগুলোতে উল্লিখিত أب শব্দটির কাঙ্ক্ষিত অর্থ হচ্ছে চাচা , বিশেষ করে শেখ মুফীদ যে ইজমার কথা বর্ণনা করেছেন তা থেকে ।
আর আযরকে হযরত ইবরাহীম (আঃ) পিতা বলেছিলেন তা সম্ভবত এ কারণে যে , হযরত ইবরাহীম (আঃ) এর অভিভাবকত্বের দায়িত্ব দীর্ঘদিন আযরের ওপর ছিল ।
এ কারণেই হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাকে পিতার ন্যায় সম্মান প্রদর্শন করতেন ।

সুপ্রিয় পাঠক ,
এবারে দেখুন --
কোরআন আযরকে হযরত ইবরাহীম (আঃ) এর জন্মদাতা পিতা বলে নাই ----
হযরত ইবরাহীম (আঃ) এর সাথে আযরের আত্মীয়তার সম্পর্ক সংক্রান্ত পবিত্র কোরআনের দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট করার জন্য নিম্নোক্ত দু’টি আয়াতের ব্যাখ্যার দিকে আমরা সম্মানীত পাঠকবর্গের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করব --
১) -
আরব উপদ্বীপের পরিবেশ মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর অপার আত্মত্যাগের কারণে ঈমান ও ইসলামের নির্মল আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে । অধিকাংশ অধিবাসীই আন্তরিকতার সাথে ঈমান আনয়ন করেছিল এবং বুঝতে পেরেছিল যে , শিরক ও মূর্তিপূজার চূড়ান্ত পরিণতি হচ্ছে দোযখ এবং শাস্তি ।
তারা যদিও ঈমান আনয়ন করার কারণে আনন্দিত ও প্রফুল্ল ছিল । কিন্ত তাদের পিতা-মাতাদের মূর্তিপূজারী হওয়ার তিক্ত স্মৃতি স্মরণ করে তারা কষ্ট পেত ।
যে সব আয়াতে কিয়ামত দিবসে মুশরিকদের জীবন সংক্রান্ত বিশদ বিবরণ ও ব্যাখ্যা এসেছে সেগুলো শ্রবণ করা তাদের জন্য ছিল খুবই কষ্টকর ও বেদনাদায়ক । নিজেদের এ আত্মিক যন্ত্রণা লাঘব ও দূর করার জন্য তারা মহানবী (সাঃ) এর কাছে অনুরোধ জানাত যেন তিনি তাদের প্রয়াত অতি নিকটাত্মীয় যারা কাফির ও মুশরিক অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছে তাদের জন্য মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন ।

আর ঠিক এভাবেই হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাঁর চাচা আযরের জন্যও এ কাজটিই করেছিলেন ।
নিম্নোক্ত আয়াতটি তাদের (আরবের নবদীক্ষিত মুসলমানগণ) অনুরোধের প্রতি উত্তরস্বরূপ অবতীর্ণ হয়েছিল --
)ما كان للنَّبِيِّ وَ الّذين آمنوا أنْ يَسْتَغْفِروا للمشرِكين و لو كانوا أولي قُربى مِن بعدِ ما تبيَّن لهم أنَّهم أصحابُ الجحيم و ما كان استغفارُ إبراهيمَ لأبيه إلّا عن موعدةٍ وعدها إيّاه فلمّا تبيَّن له إنَّه عدوٌّ للهِ تبرَّأ منه إنَّ إبراهيمَ لأوّاهٌ حليم(
“ -- নবী ও যারা ঈমান এনেছে তাদের জন্য শোভনীয় নয় যে , তারা মুশরিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবে যদি তারা অতি নিকটাত্মীয়ও হয় , যখন তাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে গেছে যে , ঐ সব মুশরিক জাহান্নামের অধিবাসী । আর নিজ পিতার জন্য ইবরাহীমের ক্ষমা প্রার্থনা ছিল ঐ প্রতিজ্ঞার কারণে যা তিনি তাকে (চাচা আযরকে) করেছিলেন । তবে যখন ইবরাহীমের কাছে স্পষ্ট হয়ে গেল যে , সে (আযর) আল্লাহর শত্রু তখন তিনি তার সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করলেন । নিশ্চয়ই ইবরাহীম অত্যন্ত দয়ালু ও ধৈর্যশীল ---।”
সূরা - তাওবা / ১১৩-১১৪ ।

অগণিত দলীল-প্রমাণ থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় যে , আযরের সাথে হযরত ইবরাহীম (আঃ) এর কথোপকথন এবং তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করার অঙ্গীকার হযরত ইবরাহীম (আঃ) এর যৌবনেই হয়েছিল ।
অবশেষে হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাঁর চাচা আযরের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করেছিলেন ।
অর্থাৎ এটি ঐ সময় হয়েছিল যখন হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাঁর জন্মভূমি বাবেল ত্যাগ করে ফিলিস্তিন , মিশর ও হিজাযে গমন করেন নাই ।
এ আয়াত থেকে এ ধরনের সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে , যখন আযর কুফর ও শিরকের মধ্যে দৃঢ়পদ থেকেছে তখন হযরত ইবরাহীম (আঃ) তার সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করেছেন এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাকে মোটেও স্মরণ করেন নাই ।

২) -
হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাঁর জীবনের শেষভাগে একটি মহান দায়িত্ব পালন (অর্থাৎ পবিত্র কাবার পুনঃনির্মাণ কার্য সমাপ্ত করার পর) এবং পবিত্র মক্কার শুষ্ক ও মরুপ্রান্তরে নিজ স্ত্রী ও সন্তানকে আনয়ণ করার পর এমন সব ব্যক্তি সম্পর্কে আন্তরিকভাবে প্রার্থনা করেন যার মধ্যে তাঁর জন্মদাতা পিতা-মাতাও ছিলেন ।
তিনি মহান আল্লাহর কাছে তাঁর প্রার্থনা কবুল হওয়ার জন্য এ ধরনের দোয়াও করেছিলেন ,
)ربَّنا اغْفِرْلي وَلِوالِدَيَّ و للمُؤْمنين يومَ يقومُ الحِساب(
“ -- হে আমার প্রভু ! আমাদেরকে , আমার পিতা-মাতা এবং মুমিনদেরকে যেদিন বিচার (হিসাব-নিকাশ) করা হবে সেদিন ক্ষমা করে দিন --।”
সূরা - ইবরাহীম / ৪১ ।

এ আয়াত থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় যে , পবিত্র কাবাগৃহ নির্মাণ করার পরই হযরত ইবরাহীম (আঃ) বৃদ্ধাবস্থায় এ প্রার্থনা করেছিলেন ।

যদি উক্ত আয়াতে বর্ণিত والديَّ (আমার পিতা-মাতা) যাঁরা ছিলেন হযরত ইবরাহীম (আঃ) এর দয়া , ভালবাসা এবং ভক্তিশ্রদ্ধার পাত্র এবং তাঁদের মঙ্গলের জন্য প্রার্থনা করেছেন তিনিই যদি আযর হন তাহলে স্পষ্ট হয়ে যায় যে , হযরত ইবরাহীম (আঃ) আমৃত্যু এবং তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলো পর্যন্ত আযরের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করেন নাই এবং কখনও কখনও তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনাও করেছেন !
অথচ যে আয়াতটি মুশরিকদের অনুরোধের উত্তরে বর্ণিত হয়েছে তা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে , হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাঁর যৌবনকালেই আযরের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করেছিলেন এবং তার থেকে পৃথক হয়ে গিয়েছিলেন । আর ক্ষমা প্রার্থনার সাথে সম্পর্কচ্ছেদ মোটেও সংগতিসম্পন্ন নয় ।

পাঠক ,
এই প্রসঙ্গে আরও কিছু দলীল দেখে নিন ।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের বিখ্যাত তাফসীর গ্রন্থ থেকে --

নিশ্চয়ই হযরত ইবরাহীমের (আঃ) পিতা মুশরিক ছিলেন না । বরং আযর (উনার চাচা) মুশরিক ছিল । কেননা অকাট্যভাবে প্রমানিত যে , নিশ্চয়ই হযরত ইবরাহীমের (আঃ) পিতা আযর নয। বরং অন্য একজন অর্থাৎ হযরত তারাখ (আঃ) ।
সূত্র - তাফসীরে কবীর , ১৩তম খন্ড , ৩৯ পৃষ্ঠা ।

আযর হযরত ইবরাহীমের (আঃ) পিতা নয়। বরং নিশ্চয়ই তিনি হলেন তারাখ (আঃ) এর সুযোগ্য সন্তান।"
সূত্র - তাফসীরে মাযহারী , ৩য় খন্ড , ২৫৬ পৃষ্ঠা ।

নিশ্চয়ই হযরত ইবরাহীমের (আঃ) পিতার নাম আযর নয় । বরং তাঁর পিতার নাম হল হযরত তারাখ (আঃ) ।'
সূত্র - তাফসীরু ইবনে কাছীর . ২য় খন্ড , ২৪০ পৃষ্ঠা ।
প্রকাশনা- দারুল ফিকর, বইরুত লেবানন ।

হযরত আবী হাতিম (রহঃ) তিনি বলেন , আমাদের কাছে হাদীস শরীফ বর্ননা করেছেন হযরত আবু যুরয়াহ (রহঃ) ।
তিনি বলেন, আমাদের কাছে হাদীস শরীফ বর্ননা করেছেন হযরত মিনজাব (রহঃ) । তিনি বলেন , আমাদের কাছে হযরত বিশর বিন আম্মারাহ (রহঃ) হযরত আবূ রাওক্ব (রহঃ) থেকে । তিনি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে খবর দিয়েছেন ।
তিনি বলেন, হযরত ইবরাহীমের (আঃ) পিতার নাম কখনই আযর ছিল না । নিশ্চয়ই তাঁর পিতার নাম ছিল হযরত তারাহ (আঃ) ।"
সূত্র - তাফসীরু ইবনে আবী হাতিম ৪র্থ খন্ড ১৩২৫ পৃষ্ঠা ।
প্রকাশনা - মাকতাবাহ নাযার মুছতফা বায, মক্কাতুল মুকাররামা, রিয়াদ, সৌদি আরব ।

হযরত ইবনে আবী শয়বা (রহঃ) , হযরত আব্দুল্লাহ বিন হুমাইদ (রহঃ) , হযরত ইবনু জারীর (রহঃ) , হযরত ইবনে মুনজির (রহঃ) ও ইবনে আবী হাতিম (রহঃ) ওনারা সকলেই হযরত মুজাহিদগন (রাঃ) থেকে বর্ননা করেছেন । তিনি বলেন , আযর হযরত ইবরাহীমের (আঃ) পিতা ছিল না। বরং আযর ছিল একটি মূর্তির ( বা মূর্তিপুজকের ) নাম ।"
সূত্র - আদ দুররুল মানছুর লিল জালাসুদ্দীন সূয়ুতি রহমাতুল্লাহি আলাইহি ৩য় খন্ড ২৩ পৃষ্ঠা ।

হযরত ফাররা ও জুজাজ (রহঃ) বলেন, হযরত ইবরাহীমের (আঃ) পিতার নাম ছিল হযরত তারাখ (আঃ) ।
এ বিষয়ে সকল বংশতত্ববিদ ঐতিহাসিকগণ ইজমা করেছেন।"
সূত্র - তাফসীরুল কুরআন লিস সাময়ানী ২য় খন্ড ১১৮ পৃষ্ঠা ।
প্রকাশনা- দারুল ওয়াতান, রিয়াদ , সৌদী আরব ।

এই প্রসঙ্গে মহানবী (সাঃ) বলেন যে , মহান আল্লাহ সমগ্র কিছু সৃষ্টি করে আমাকে সর্বোত্তম সৃষ্টির অন্তর্ভুক্ত করেছেন । এরপর তাদের দুই ভাগে বিভক্ত করে আমাকে উত্তম ভাগে রেখেছেন এবং আমাকে তাদের মধ্যে সর্বোত্তম গোত্রে পাঠিয়েছেন। এবং সে গোত্রকে বিভিন্ন পরিবারে বিভক্ত করেছেন এবং আমাকে সর্বোত্তম পরিবারে প্রেরন করেছেন । সূতরাং আমি ব্যক্তি ও বংশের দিক দিয়ে তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ।"
সূত্র - তিরমীযি শরীফ ২য় খন্ড ২০১ পৃষ্ঠা । হাদীস শরীফ ৩৬০৮ / মুসনাদে আহমদ ১ম খন্ড ২২০ পৃষ্ঠা । হাদীস শরীফ ১৭৯১ ।

এসকল হাদীস শরীফ ওনার ব্যাখায় বলা হয়েছে--

হযরত মুহাম্মাদের (সাঃ) পূর্ব-পুরুষদের সিলসিলার মধ্যে কেউই কাফির-মুশরিক হওয়া সম্ভব নয়। "
সূত্র - তাফসীরে মাজাহারি ৪/৩০৮ ।

সম্মানীয় পাঠক ,
যে ব্যক্তি যৌবনকালে হযরত ইবরাহীমের (আঃ) ঘৃণার পাত্র হয়েছিল এবং যার সাথে তিনি সম্পর্কচ্ছেদ করেছিলেন সেই ব্যক্তিটি ঐ ব্যক্তি থেকে ভিন্ন যাঁকে তিনি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সর্বদা স্মরণ করেছিলেন এবং যাঁর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেছিলেন ।

উপরে বর্নিত আলোচনা থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় যে , পৃথিবীতে আগত কোন নবী-রাসুলগনের সম্মানীয় জন্মদাতা পিতা-মাতা কখনই কাফির-মুশরিক বা মূর্তিপূজারী ছিলেন না ।

এই নীতিমালাটিই হচ্ছে বার ইমামীয়া শীয়াদের গুরুত্বপূর্ন একটি যৌক্তিক বিশ্বাস । সকলেই ভাল ও সুস্থ থাকুন ।

সালামুন আলাইকুম ইয়া সাহেবুজ্জামান (আঃ) ইবনে হাসান আসকারী (আঃ) ওয়া আজ্জিল ফারাজাহুম ,
আল্লাহুমা সাল্লে আলা মুহাম্মাদ ওয়া আলে মুহাম্মাদ ওয়া আজ্জিল ফারাজাহুম ,
আল্লাহুম্মাল আন কাতালাহ আমিরিল মুমিনিন (আঃ) ।

Saturday, December 22, 2018

কাফেরদেরকে রক্ত দেওয়া যাবে ?

কাফেরদেরকে রক্ত দেওয়া যাবে ?
ইসলামে রক্ত দেওয়ার বিধানঃ

রক্ত মানুষের শরীরের অংশ। সুস্থ শরীরের অন্যতম অনুষঙ্গ। শরীর থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর তা নাপাক। স্বাভাবিক অবস্থায় এক জনের রক্ত অন্যের শরীরে স্থানান্তর করা হারাম। দুই কারণে-

(১) মানুষের প্রত্যেক অঙ্গ সম্মানিত। যা অন্যান্য প্রাণী থেকে মানুষকে স্বতন্ত্র করে। এ সম্মানআল্লাহ্‌ প্রদত্ত। রক্ত মহান আল্লাহ কর্তৃক সংরক্ষিত। সুতরাং এ সম্মানিত ও সংরক্ষিত মানবীয় অংশ বিশেষ দেহ থেকে পৃথক করে অন্যত্র সংযোজন মানবীয় সম্মানের পরিপন্থি।

(২) রক্ত নাজাসাতে গালীজা (গভীর নাপাক)। আর নাপাক বস্তুর ব্যবহার বৈধ নয়। এবিধান স্বাভাবিক সময়ে অবশ্য পালনীয়। তবে ইসলামের বিশেষ সময়ের বিশেষ বিধান হিসেবে (অনন্যোপায় অবস্থায়) যে সব অনুমতি (জায়েয নীতি) প্রদান করা হয়েছে শর্ত সাপেক্ষে, সে প্রেক্ষাপটে বিশেষ জরুরতের ক্ষেত্রে বিদগ্ধ ফকীহগণ রক্ত ব্যবহারের যে সব পর্যালোচনা পেশ করেছেন তা হলো :

(ক) তা নারীর দুধের ন্যায়। যে দুধ কোনোরূপ বিকৃতি ও কাটা ছেঁড়া ছাড়াই একজনের শরীর থেকে বের হয়ে অন্যের শরীরের অংশে পরিণত হয়। রক্ত ও দুধের মতো কোনোরূপ কাটা-ছেঁড়া বা বিকৃতি ছাড়া একজনের শরীর থেকে বের করে অন্যের শরীরে স্থাপন করা হয়। ইসলামী শরীয়ত নারীর দুধকে শিশুর প্রধান খাবার নির্ধারণ করেছে। আর শিশুকে মায়ের দুধ পান করানো শুধু জায়েযই নয়, বরং মায়ের স্বাভাবিক ওয়াজিব (অপরিহার্য) করা হয়েছে।
ফুকাহায়ে কেরাম নারীর দুধ বড়দের ওষুধের জন্য জায়েয সাব্যস্ত করেছে। ফতওয়ায়ে আলমগীরীতে উল্লেখ রয়েছে, ওষুধ হিসাবে স্ত্রীলোকের দুধ পুরুষের নাকে প্রবেশ করানো কিংবা পান করায় কোন দোষ নেই।
উল্লেখ্য, রক্ত মানুষের শরীরের অংশ। আর দুধ ও মানুষের শরীরের অংশ। এ হিসাবে রক্তকে দুধের সঙ্গে তুলনা করা, দূরবর্তী তুলনা হবে না। ইসলামী শরীয়ত দুধ এক মানুষের শরীরের অংশ হওয়া সত্ত্বেও অপর মানুষের (শিশুর জন্য) প্রয়োজনের ভিত্তিতে তার গ্রহণ জায়েয সাব্যস্ত করেছে এই হুকুমের আলোকেই। সুতরাং প্রয়োজনের ভিত্তিতে একজনের রক্ত অপরের শরীরে পুশ করা বৈধ।

(খ) রক্ত যদিও নাজাসাতে গালীজা (গভীর নাপাক), তবে বিশেষ ক্ষেত্রে নাপাক জিনিস দ্বারা চিকিৎসার কাজ চালানো বৈধ। অনন্যোপায় অবস্থাকালে হারাম বা নাপাক জিনিস ব্যবহারের মূলনীতি কুরআন কারীমও সমর্থন করে। যে ব্যক্তি ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় মৃত্যুর মুখে পতিত হয়, শরীয়ত তার জন্য হারাম জিনিস ব্যবহার করে জীবন বাঁচানো শুধু জায়েয নয়, বরং অত্যাবশ্যক সাব্যস্ত করেছে। এমন সংকটাপন্ন অবস্থায় যথা পরিমান, রক্ত, শুকরের গোশত, মৃত প্রাণীর গোশত আহার করে হলেও জীবন বাঁচানোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
যেমন ইরশাদ হয়েছে," তিনি (আল্লাহ) তোমাদের উপর হারাম করেছেন, মৃত জীব, রক্ত, শূকরের গোশত, এবং সেসব জীব যা মহান আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো নামে উৎসর্গ করা হয়। অবশ্য যে ব্যক্তি অনন্যোপায় হয়ে পড়ে, এবং অপরাধপ্রবন ও সীমা লঙ্ঘনকারী না হয়, তার জন্য (উপযুক্ত নিষিদ্ধ দ্রবাদী আহারে) কোন পাপ নেই। নিঃসন্দেহে আল্লাহ মহান ক্ষমাশীল, অত্যন্ত দয়ালু।"
[সূরা বাকারা: ১৭৩]
পবিত্র কুরআনের উপযুক্ত আয়াতে অত্যাবশ্যকীয় প্রয়োজনে হারাম দ্রব্য ব্যবহারের অনুমতি দেয়া হয়েছে। তবে শর্ত হলো অত্যাবশ্যকীয় প্রয়োজন হতে হবে এবং প্রয়োজনীয় পরিমানের বেশি আহার করা যাবে না।
হারাম বস্তু ব্যবহারের ক্ষেত্রে ফতওয়ায়ে আলমগিরীতে বলা হয়েছে, অসুস্থ ব্যক্তির ওষুধের জন্য হারামের ব্যবহার জায়েয আছে। যখন অভিজ্ঞ ডাক্তার বলবে, নিশ্চয়ই এ রোগের চিকিৎসা ঐ হারাম দ্রব্য ছাড়া সম্ভব নয়, হ্যাঁ, যখন হালাল দ্রব্য দ্বারা চিকিৎসা না হওয়া চূড়ান্ত ভাবে সাব্যস্ত হয়, তখন হারাম দ্রব্য স্থলাভিষিক্ত হবে। [ফতওয়ায়ে আলমগিরী,৫/৩৫৫]

অপরের রক্ত গ্রহণ অত্যাবশ্যক এমন অসুস্থ ব্যক্তিকে রক্ত দেওয়ার ক্ষেত্রে নিচে লিখিত বিষয়গুলো মনে রাখতে হবেঃ
(১) যখন কোন অসুস্থ ব্যাক্তির জীবননাশের আশংকা দেখা দেয় এবং অভিজ্ঞ ডাক্তারের মতে তার শরীরে অন্যের রক্ত প্রবেশ করানো ব্যতীত বাঁচানোর কোন পন্থা না থাকে।
(২) যখন রক্ত দেওয়া প্রয়োজন হয়। অর্থাৎ, অসুস্থ ব্যক্তির মৃত্যুর আশংকা নেই বটে, কিন্তু রক্ত দেওয়া ছাড়া তার জীবনের ঝুকি বাড়ে অথবা রোগমুক্তি বিলম্বিত হয়, এসব অবস্থায় রক্ত দেওয়া জরুরী।
(৩) যখন রোগীর শরীরে রক্ত দেওয়ার খুব বেশি প্রয়োজন দেখা দেয় না, বরং রক্ত না দেওয়ার অবকাশ থাকে, তখন রক্ত দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।
(৪) যখন জীবননাশের এবং অসুস্থতা বিলম্বিত হওয়ার আশংকা না হয়, বরং শুধুমাত্র শক্তি বৃদ্ধি এবং সৌন্দর্য বর্ধনের উদ্দেশ্য হয়, সে অবস্থায় ইসলামী শরীয়তে রক্তদান জায়েয নয়।

রক্ত ক্রয়-বিক্রয়ের বিধান:

রক্ত বিক্রি জায়েয নয়। কিন্তু যে শর্তের ভিত্তিতে প্রথম সূরতে রক্ত দেয়া জায়েয সাব্যস্ত হয়েছে, ঐ অবস্থায় যদি যথা রক্ত বিনা মূল্যে না পাওয়া যায়, তখন তার জন্য মূল্যে দিয়ে রক্ত ক্রয় করা জায়েয। তবে যে রক্ত দিবে তার জন্য রক্তের মূল্য নেয়া জায়েয নয়।
[জাওয়াহেরুল ফিক্বহ : ২/৩৮]

অমুসলিমের রক্ত মুসলিমের শরীরে স্থানান্তরের বিধান: অমুসলিমের রক্ত মুসলিমের শরীরে স্থানান্তর জায়েয। মুসলিম আর অমুসলিমের রক্তে প্রভেদ নাই।
কিন্তু এ কথা স্পষ্ট যে, কাফের ও ফাসেকের স্বভাবে মন্দ ও নিন্দনীয় প্রভাব রয়েছে। অমুসলিমের মন্দ স্বভাব, মুসলিমের স্বভাব-চরিত্রে রক্তের মাধ্যমে স্থানান্তরিত হওয়ার সমূহ আশংকা আছে। এজন্য শিশুর জন্য পাপাচারী মহিলার দুধ পানকে অপছন্দ কার হয়েছে। সুতরাং এসব ক্ষতির দিকে লক্ষ্য করে, অমুসলিমের রক্ত গ্রহণ থেকে যথা সম্ভব বিরত থাকা উচিত। [জাওয়াহেরুল ফিক্বহ: ২/৪০]

স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে রক্ত দানের বিধান:

অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনদের মতো স্বামীর রক্ত স্ত্রীর শরীরে, স্ত্রীর রক্ত স্বামীর শরীরে প্রবেশ করানো জায়েয। এর মাধ্যমে বিয়ের ওপর কোন প্রভাব পড়বে না। বৈবাহিক সম্পর্ক যথারীতি বহাল থাকবে। কেননা, মাহরামের সম্পর্ক দুধ পানের মাধ্যমে সাব্যস্ত হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট বয়সের প্রয়োজন। আর দুধ পানের দ্বারা মাহরামের সম্পর্ক স্থাপনের বয়স আড়াই বছর। সুতরাং আড়াই বৎসর পর কোনো মহিলার দুধ পান করার দ্বারা যেমন মাহরাম সাব্যস্ত হয় না, তেমনি রক্ত গ্রহণ ও প্রদানের দ্বারাও স্বামী স্ত্রীর মাঝে মাহরামের সম্পর্ক কায়েম হয় না। [জাওয়াহেরুল ফিক্বহ: ২/৪০]

এসকল মাসয়ালা ও বিধান খেয়াল রেখে রক্ত প্রদান করা উত্তম কাজ। কেননা জাল্লা শানূহু বলেন-

‘একজন মানুষের জীবন রক্ষা করা সমগ্র মানবজাতির
জীবন রক্ষা করার মতো মহান কাজ।’-(সূরা মায়েদা : ৩২)

Tuesday, January 16, 2018

ইমামত পদ্বতির বারজন ইমামগন কারা

ইমামত পদ্ধতির যে ১২ জন ইমাম এর কথা বলা হয় এরা কারা? আসুন যেনে নিন বার ইমাম এর পরিচয়। সম্পুর্ণ লেখাটি মারেফাতে ইমামত ও বেলায়েত বই এর সংকলনে মুহাম্মাদ নাজির হোসাইন পৃষ্ঠা - ৪৯ অবলম্বনে ।
ইমামত পদ্বতির বারজন ইমামগন কারা

অনেক সুন্নি মুসলমান ভাই বলেন যে , রাসুল (সাঃ) তাঁর ইন্তেকাল পরবর্তী নেতা , খলীফা বা ইমামের নাম নির্দিষ্ট করে বলে যান নি । অর্থাৎ রাসুল (সাঃ) তাঁর পরবর্তী স্থলাভিষিক্ত উত্তরসূরী কে হবেন সেটা বলে যান নি । তাহলে রাসুল (সাঃ) তাঁর উম্মতকে এতিম বিহীন অবস্থায় রেখে গেলেন !

প্রতিজন নবী রাসুলগন তাঁদের পরবর্তী স্থলাভিষিক্ত উত্তরসূরী সুনির্ধারিত করে নাম পরিচয় করিয়ে দিয়ে গেছেন । এমনকি মহান আল্লাহর হুকুম মোতাবেক হযরত মূসা (আঃ) বারজন ইমাম নিয়োগ দিয়েছিলেন । মুসা আঃ এর ১২ ইমাম তথ্যসুত্র সুরা মায়িদা আয়াত ১২।

সর্বশক্তিমান আল্লাহর বিধান অনুযায়ী প্রতি নবী রাসুলগন তাঁদের পরবর্তী উত্তরসূরী নিযুক্ত করে গেছেন । আর আল্লাহর বিধানে কখনই কোন পরিবর্তন হয় না ।

আসুন , দেখে নেওয়া যাক - এই বিষয় সুন্নি রেফারেন্স কি বলে ---

প্রসিদ্ব আহলে সুন্নাত এর পন্ডিত শায়খ সুলাইমান কান্দুজী হানাফী তুর্কি কতৃক রচিত তার প্রসিদ্ব গ্রন্থ ইয়ানাবিউল মুয়াদ্দাত নামক গ্রন্থে বর্ননা করেছেন যে ,

নাছাল নামক একজন হিহুদী মহানবী (সাঃ) এর নিকট আরজ করলেন যে ,

ইয়া রাসুল (সাঃ) , আপনাকে কয়েকটি প্রশ্ন করতে চাই যা কিছুদিন ধরে আমার মনকে অশান্ত রাখছে। কথা দিচ্ছি , আপনার জবাব যদি সঠিক হয় তাহলে আমি ইসলাম ধর্ম গ্রহন করব ।

নবী (সাঃ) বললেন , হে আবু অাম্মারা , তুমি প্রশ্ন করে যাও , কোন সমস্যা নেই । অনুমতি পেয়ে ঐ ব্যক্তি প্রশ্ন শুরু করল ।

প্রতিটি প্রশ্নের উত্তরে সে খুবই সন্তষ্ট হল এবং বলল যে , আপনি খুবই সঠিক জবাব দিয়েছেন ।

প্রশ্নের এক পর্যায় সে জিজ্ঞাসা করল যে , আমাকে বলে দিন , আপনার পরে কে আপনার উত্তরাধিকারী হবে ? কেননা আজ পর্যন্ত কোন নবী বা রাসুল তাঁর পরবর্তী উত্তরসূরীর নাম পরিচয় না বলে এই পৃথিবী ত্যাগ করেন নি । যেমন আমাদের নবী হযরত মুসা (আঃ) বলে গেছেন যে , তাঁর অবর্তমানে হযরত ইউসা বিন নুন হলেন তাঁর উত্তরসূর বা স্থলাভিষিক্ত ।

মহানবী (সাঃ) বললেন যে , " আমার পরে আমার উত্তরসূরী বা স্থলাভিষিক্ত হচ্ছে আমার ভাই হযরত আলী ইবনে আবু তালিব এবং তাঁর পর আমার দুই সন্তান হাসান ও হোসাইন , অতঃপর কেয়ামত পর্যন্ত অবশিষ্ট নয়জন ইমাম হোসাইন এর বংশ থেকে আগমন করবেন ।

লোকটি বলল , " ইয়া মুহাম্মাদ (সাঃ) , দয়া করে অবশিষ্ট নয়জনের নাম বলে দিন " ।
নবীজী (সাঃ) বললেন যে ,
" হোসাইনের ইন্তেকালের পর তাঁর পুত্র জয়নুল আবেদীন হবে ,
জয়নুল আবেদীনের অন্তধানের পর তাঁর স্বীয় পুত্র মোহাম্মাদ বাকের হবে ,
মোহাম্মাদ বাকেরের ইন্তেকালের পর তাঁর পুত্র জাফর সাদিক হবে ,
জাফর সাদিকের তিরোধানের পর তাঁর পুত্র মুসা কাজেম হবে ,
মুসা কাজেমের ইহলোক ত্যাগের পর তাঁর পুত্র আলী রেজা হবে ,
আলী রেজার ইন্তেকালের পর তাঁর পূত্র মুহাম্মাদ তাক্বী হবে ,
মুহাম্মাদ তাক্বীর তিরোধানের পর তাঁর পূত্র আল নাক্বী হবে ,
আল নাক্বীর ইহলোক ত্যাগের পরে তাঁর পূত্র হাসান আসকারী হবে ,
হাসান আসকারীর ইন্তেকালের পর তাঁর পূত্র ইমাম মাহদী হবে সর্বশেষ বারতম ইমাম ।
তাঁরা আল্লাহর হুজ্জাত বা জমিনের বুকে অকাট্য দলিল । "

এই জবাব পেয়ে পরক্ষনেই ঐ ইহুদী লোকটি মহানবী (সাঃ) এর নিকট ইসলাম ধর্ম গ্রহন করলেন ।
সূত্র - ইয়া নাবিউল মুয়াদ্দাত ,পৃ-৪৪১ (বৌরুত) / ইয়া নাবিউল মুয়াদ্দাত , পৃ- ৬৯১-৬৯৪ ( লাহোর,উর্দু) / ফারায়েদ নি , খন্ড-২ , পৃ- ১৩৩ , ৩১২ / সিয়ারানীও আল ইয়াওয়াক্বিত ওয়াল জওয়াহীর , খন্ড- ৩ পৃ- ৩২৭ ।

সু্প্রিয় পাঠক ,
দয়া করে খেয়াল করুন যে , একজন ইহুদী হয়েও লোকটি এই বিষয় নিশ্চিত ছিল যে , আল্লাহর বিধানে কখনই সমগ্র সৃষ্টিজগত এক মুহূর্তের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে বিনা হুজ্জাতে থাকতে পারে না । অর্থাৎ রেসালতের সমাপ্তির পর আল্লাহ কতৃক মনোনীত ইমামত পদ্বতি কেয়ামত পর্যন্ত পৃথিবীতে বহাল আছে বা থাকবে । এবং সেই ইমামদের সংখ্যা হবে বারজন । এই বারজনের নাম পরিচয় সহ সকল কিছুই স্বয়ং মহানবী (সাঃ) বলে গেছেন ।

হজ্ব ফেরৎ সোয়ালক্ষ হাজী সাহাবাদের সম্মুখে গাদীর এ খুমের প্রান্তরে ইমামত ধারার প্রথম ইমাম ও নবীজী (সাঃ) এর পরবর্তী সর্বপ্রথম উত্তরাধিকার ও স্থলাভিষিক্ত হিসাবে হযরত আলী (আঃ) কে সুনির্দিষ্ট ভাবে বলে গেলেন ।

আরো পড়ুনঃ নবী বংশের লোকদের নামের সাথে কেন আঃ বলা হয়।

নবীজী (সাঃ) এর এই রকম প্রকাশ্য সুষ্পষ্ট ঘোষনার পরেও যে সকল মুসলমান বলেন যে , রাসুল (সাঃ) কাউকেই মনোনীত করে যান নি -- তারা দয়া করে ইতিহাস জানার চেষ্টা করুন ।

আজ এই পর্যন্ত,
সকলে সুস্থ ও হাসি খুশী থাকুন।
আল্লাহুমা সাল্লে আলা মুহাম্মাদ ওয়া আলে মুহাম্মাদ ।

Thursday, December 17, 2015

মুসলমানরা কেন সন্ত্রাস করে

মুসলমানরা কেন সন্ত্রাস করে

জার্মানির এক টিভি লাইভশোতে একজন জার্মান মুসলিম স্কলারকে যখন উপস্থাপক প্রশ্ন করেছিলেন, মুসলমানরা কেন সন্ত্রাস করে ? তখন তিনি উক্ত প্রশ্নের জবাব এভাবে উল্টো প্রশ্ন করে দেন :-
☑️ ১. যারা প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু করেছিল, তারা কি মুসলিম ছিল ? 
☑️ ২. যারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু করেছিল, তারা কি মুসলিম ছিল? ☑️ ৩.যারা অস্ট্রেলিয়া আবিষ্কারের পর নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের জন্য ২০ মিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান আদিবাসীকে হত্যা করেছিল, তারা কি মুসলিম ছিল? 
☑️ ৪.যারা হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পরমাণু বোমা নিক্ষেপ করেছিল, তারা কি মুসলিম ছিল ???
☑️ ৫.যারা আমেরিকা আবিষ্কারের পর নিজেদের প্রভাব বিস্তারের জন্য উত্তর আমেরিকা বর্তমান যুক্তরাষ্ট ১০০ মিলিয়ন এবং দক্ষিন আমেরিকাতে ৫০ মিলিয়ন রেড- ইন্ডিয়ানকে হত্যা করেছিল, তারা কি মুসলিম ছিল ? 
☑️ ৬. যারা ১৮০ মিলিয়ন আফ্রিকান কালো মানুষকে কৃতদাস বানিয়ে আমেরিকা নিয়ে গিয়েছিল। যাদের ৮৮ ভাগ সমুদ্রেই মারা গিয়েছিল এবং তাদের মৃতদেহকে আটলান্টিক মহাসাগরে নিক্ষেপ করা হয়েছিল, তারা কি মুসলিম ? উত্তর হবে, এসব মহাসন্ত্রাসী ও অমানবিক কার্যকলাপের সাথে মুসলিমরা কখনো জড়িত ছিলনা। 
☑️ ইরাক , আফগানিস্তানে শান্তি প্রতিষ্ঠার নাম তেল , গ্যাস লুন্ঠন কি মুসলমানরা করেছিল ? আপনাকে সন্ত্রাসের সংজ্ঞা সঠিকভাবে করতে হবে। যখন কোন অমুসলিম কোন খারাপ কাজ করে,খুন খারাপি করে তখন এটাকে বলা হয় আত্মরক্ষা আর যখন কোন মুসলিম আত্মরক্ষার্থে কিছু করে, তখন এটাকে বলা হয় জঙ্গীবাদ ???
☑️ ইসরাইলি ইহুদিরা অত্যাধুনিক অস্ত্র দিয়ে ফিলিস্তিনের নিরীহ নারী , পুরুষদের উপর হামলা করলে হয় আত্মরক্ষা এবং ফিলিস্তিনের জনগণ উহ: আহ : শব্দ করলে হয় মৌলবাদী বা জঙ্গি ???
 
মুসলমানের শত্রুরা এখন মুসলমানদের নাম ও চিহ্ন ব্যবহার করে সন্ত্রাস করছে , নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করছে , নিজেরা ( ইউরোপ-আমেরিকানরা ) নিজেদের দেশের জনগনের কাছে সাধু সেজে মুসলমানদের উপর তথাকথিত জঙ্গি - সন্ত্রাস দমনের নামে মূলত মুসলমানদের তেল, গ্যাস , ভূমি , দেশ লুটপাট করছে ... আল-কায়েদা , বোকো হারাম , ইসলামী এস্টেট বা ‪#‎ISI‬S শুনতে ইসলামী নাম হলেও এগুলোর কার্যক্রম থেকে পরিস্কার বোঝা যায় এগুলো ইউরোপ - আমেরিকানদের তৈরী , ঐসব কপাল-পোড়া সংগঠনের সাথে ইসলাম-মুসলমানদের দূরতম সম্পর্ক নেই ইনশা আল্লাহ, একটা সময় ছিল যখন ক্ষমতা লোভী , সাম্রাজ্যবাদীরা অন্য দেশ ,অন্য ধর্মের জনগনের উপর - সরাসরি আক্রমন ও তাদের সম্পদ লুট করত I এখন আধুনিক যুগ , যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে I কেউ কোনো অন্যায় করলে তা ছবি ও ভিডিও সহ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে , এছাড়া দেশে দেশে গনত্রান্তিক ব্যবস্থা বিরাজমান | 
 
কোনো দেশের প্রধানমন্ত্রী বা প্রেসিডেন্ট মারাত্মক ভুল করলে তাকে বা তাদেরকে অনেক বেগ পোহাতে হয় , এখন আর ‪কেউই জবাবদিহিতার উর্ধে নয়‬ , তাই কেউ রাস্ট ক্ষমতাকে ব্যবহার করে অন্য দেশের উপর সরাসরি আক্রমন করে না বরঞ্চ ‪অন্য নামে করে থাকে‬ | " তাতে সাপও মরে আর লাঠিও ভাঙ্গে না " আর এরা এ থেকে ফায়দা লুটার ফন্দি করে | 
 
"ইসলামী জঙ্গি " নামে কেউ সন্ত্রাস করলে বুঝতে হবে এসব ইসরাইলি - আমেরিকানদের ষড়যন্ত্রের পরিকল্পনা || 
আমাদের সকল মুসলমানদেরকে সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে ৷

Thursday, November 12, 2015

পৃথীবি সেরা শহীদ পরিবার

পৃথীবি সেরা শহীদ পরিবার
বলতে পারবেন পৃথিবির শ্রেষ্ঠ শহীদ পরিবার কোনটি ? ইমাম অালীর পরিবার । হায় ভাবতেও অবাক হয় রাসুলের মৃত্যুর মাত্র ছয় মাসের মধ্যে তার কন্যা মা ফাতিমা যাহরা আঃ কে শহীদ করা হলো, এরপর একে এক মুমিনদের নেতা ইমাম আলী আঃ কে মসজিদে নামাজরত অবস্হায় আঘাত হানা হলো তাকেও শহীদ করা হলো ইমাম আলীর দুই পুত্র মুমিনদের নেতা ইমাম হাসান ও ইমাম হুসাইন কেও শহীদ করা হলো এরপর ইমাম হুসাইনের বংশের প্রত্যেক ইমাম আঃ দের শহীদ করা হলো।

আজকে আমরা নবী বংশের ইমামদের হত্যাকারীদের কে চিনবো, জানার জন্য ইমামদের নামের নিচে তাদের নাম নিচে উল্লেখ করা হলো:

এগারজন ইমামের হত্যাকারী কারা ছিল ?

 ১- ইমাম হযরত আলী (আঃ)
>> হত্যাকারী আব্দুল রহমান ইবনে মুলজিম

 ২- ইমাম হযরত হাসান (আঃ)
>> হত্যাকারী জোদা বিনতে আসহাস

৩- ইমাম হযরত হোসেন (আঃ)
>> হত্যাকারী সিমরে লাইন

৪- ইমাম হযরত যায়নুল আবেদিন (আঃ)
>> হত্যাকারী ওয়ালিদ বিন আব্দুল মালেক

৫- ইমাম হযরত বাকের (আঃ)
>> হত্যাকারী হাসাম বিন আব্দুল মালেক

৬- ইমাম হযরত জাফর সাদিক (আঃ)
>> হত্যাকারী মানসুর দুয়ানকি

৭- ইমাম হযরত মূসা কাজিম (আঃ)
>> হত্যাকারী হারুন রাশিদ

৮- ইমাম হযরত আলী রেজা (আঃ)
>> হত্যাকারী মামুন রাশিদ

৯- ইমাম হযরত তাকী (আঃ)
>> হত্যাকারী মোতাসিম বিল্লাহ

১০- ইমাম হযরত নকী (আঃ)
>> হত্যাকারী মোতাজ বিল্লাহ

১১- ইমাম হযরত হাসান আসকারী (আঃ)
>> হত্যাকারী আহমেদ মোতমাদ বিল্লাহ

এইসব হত্যাকারীদের উপর লানাত বেসুমার ।

Sunday, October 25, 2015

ইহুদিদের হাতে বন্দী হযরত সালমান (রা.) যেভাবে বিশ্বনবী (সা.)-কে চিনেছিলেন

ইহুদিদের হাতে বন্দী হযরত সালমান (রা.) যেভাবে বিশ্বনবী (সা.)-কে চিনেছিলেন
বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)’র অতি প্রিয় ও অনুগত সাহাবি হযরত সালমান ফার্সি (রা.) ১৩৯৯ বছর আগে ৩৫ হিজরির ৮ ই সফর ইরাকের মাদায়েন শহরে ইন্তেকাল করেছিলেন। সেখানে আজও তাঁর মাজার জিয়ারত করেন উতসুক, ধর্মপ্রাণ, ঐতিহ্য-প্রিয় ও শেকড়-সন্ধানী মুসলমানরা। হযরত সালমান ফার্সি (রা.)’র অতি উচ্চ মর্যাদা তুলে ধরতে গিয়ে রাসূল (সা.) বলেছিলেন: “সালমান মিন্না আহলি বাইত” । এর অর্থ সালমান আমাদের আহলে বাইতের (পবিত্র নবী বংশের) অংশ। রক্ত-সম্পর্কিত আত্মীয় না হওয়া সত্ত্বেও তিনিই একমাত্র সাহাবি যাকে রাসূল (সা.) নিজ পবিত্র পরিবারের সদস্য বলে অভিহিত করেছেন।

হযরত সালমান (রা.) ছিলেন অনারব ও ইরানের শিরাজ অঞ্চলের অধিবাসী। তাঁর আরেকটি নাম ছিল রুজবেহ। জরথুস্ত ধর্মের অদ্ভুত প্রথায় বিতৃষ্ণ সালমান মাতৃভূমি শিরাজ ত্যাগ করে সত্য ধর্মের সন্ধানে বেরিয়ে পড়েন। নেস্তোরিয়ান খ্রিস্টানদের সঙ্গে পরিচয় ঘটার পর সত্য-সন্ধানের এই ভ্রমণ শুরু করেন তিনি। ব্যাপক ভ্রমণের পর তিনি সিরিয়ায় কয়েকজন সন্ন্যাসীর কাছে একত্ববাদের শিক্ষা পান। এই সন্ন্যাসীরা হযরত ঈসা (আ.)’র খাঁটি একত্ববাদী ধর্মের ওপর অটল থাকার জন্য লোকালয় ছেড়ে নির্জন মরুভূমিতে বসবাস করছিলেন। কারণ, খ্রিস্ট ধর্মের নেতা সেজে বসা পল ( মূলত ইহুদি ) একত্ববাদী খ্রিস্ট ধর্মগ্রন্থ ইঞ্জিলকে বিকৃত করে এতে অযৌক্তিক ত্রিত্ববাদ চালু করেন। খাঁটি খ্রিস্ট ধর্মে (একত্ববাদী) বিশ্বাসী ওই সন্ন্যাসীরা যখন একে একে মারা যাচ্ছিলেন তখন তাদের মধ্যে বেঁচে থাকা সর্বশেষ সদস্য মৃত্যু বরণের মুখে সালমান (রা.)-কে আরব দেশে যাওয়ার পরামর্শ দেন। সালমান (রা.) যেন শেষ নবী(সা.)’র আবির্ভাবের সময় পর্যন্ত আরব দেশে থেকে যান সেই পরামর্শ দিতেও ভুল করেননি সেই সন্ন্যাসী। সালমান (রা.) আরব দেশে আসলে ইহুদিরা তাঁকে অপহরণ করে এবং তাঁকে দাস হিসেবে বিক্রি করে।

বহু বছর ধরে তিনি ইহুদি মালিকের জন্য খেজুর বাগান গড়ে তুলতে ব্যাপক পরিশ্রম করেছিলেন। একদিন তিনি খেজুর বাগানে দেখলেন নুরানি চেহারার এক ব্যক্তি একত্ববাদ ও ঐশী ন্যায়বিচারের কথা বলছেন। সালমান (রা.)’র হৃদয়ে জ্বলে উঠলো আলোর স্ফুলিঙ্গ। আগন্তুক ব্যক্তিকে পরীক্ষার জন্য সদকা বা দান হিসেবে কিছু খেজুর দিতে চাইলেন তিনি। কারণ, তিনি ধর্মগ্রন্থে পড়েছিলেন যে শেষ নবী (সা.)’র অন্যতম নিদর্শন হল তিনি এবং তার বংশধরদের জন্য দান-খয়রাত ও সদকা নেয়া নিষিদ্ধ। রাসূল (সা.) দান করা খেজুরগুলো তাঁর সাহাবিদের দিয়ে দিলেন। কিন্তু তিনি নিজে এবং সঙ্গে থাকা চাচাতো ভাই ও জামাতা হযরত আলী বিনম্রভাবে জানান যে তাঁরা দানের খেজুর নেবেন না। সালমান (রা.)’র মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে বেহেশতী আনন্দে! আরে! একেই তো আমি খুঁজছি এতদিন! এবার তিনি কিছু খেজুর নিয়ে সেগুলো রাসূল (সা.) ও হযরত আলী-কে উপহার হিসেবে পেশ করলে তাঁরা তা গ্রহণ করলেন। সঙ্গে সঙ্গে হযরত সালমান (রা.) উচ্চারণ করলেন দুটি বাক্য- আল্লাহ ছাড়া কোনো প্রভু বা মাবুদ নেই এবং মুহাম্মাদ (সা.) আল্লাহর রাসূল।

মহানবী (সা.) ওই কৃপণ ও অর্থপিশাচ ইহুদিদের হাত থেকে নও-মুসলমান সালমান (রা.)-কে মুক্ত করার জন্য বিপুল অর্থ শোধ করেন এবং তাদের আরো কিছু কঠোর শর্ত পূরণ করলেন।

মক্কার দশ হাজারেরও বেশি মূর্তি পূজারী মুশরিক ও ইহুদিরা একজোট হয়ে যখন ইসলামকে নির্মূলের লক্ষ্যে মদীনা আক্রমণের উদ্যোগ নেয় তখন পবিত্র এই শহরের চারদিকে সবচেয়ে অরক্ষিত দিকগুলোয় খন্দক বা পরিখা খননের পরামর্শ দিয়েছিলেন এই বিখ্যাত সাহাবী। রাসূল (সা.) তাঁর ওই পরামর্শ গ্রহণ করেছিলেন। ইতিহাসে এই যুদ্ধ খন্দকের যুদ্ধ নামে খ্যাত। যুদ্ধক্ষেত্রে খন্দকের ব্যবহার আরব অঞ্চলে ছিল অপ্রচলিত। এমন অপ্রত্যাশিত প্রতিরক্ষা-ব্যব
স্থা দেখে শত্রুরা হতভম্ব হয়ে পড়েছিল।

বিশ্বনবী (সা.)’র ইন্তেকালের পর হযরত সালমান ফার্সি (রা.) সব সময় আমিরুল মু’মিনিন হযরত আলী’র অন্যতম প্রধান সহযোগী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন ইসলামের গৌরবময় ইতিহাসে। সালমান মাদায়েন প্রদেশের গভর্নর নিযুক্ত হয়েছিলেন। এই প্রদেশ ছিল ইসলাম-পূর্ব যুগে প্রাচীন ইরানের সাসানীয় সাম্রাজ্যের রাজধানী।

Sunday, October 18, 2015

এক খেয়ানতকারী ও ইমাম হোসাইন -এর বিচারকার্য

এক খেয়ানতকারী ও ইমাম হোসাইন -এর বিচারকার্য
কাফেলা রওনা হওয়ার জন্য প্রস্তত । উটের চিৎকার এরই জানান দিচ্ছিল। শহরের অধিবাসীরা এই শব্দের অর্থ জানে। মদিনার আশপাশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকেও অনেকে সফরের প্রয়োজনীয় জিনিস পত্র নিয়ে কাফেলার উদ্দেশ্য রওনা হল। কেউ ঘোড়ায় চড়ে, কেউ উটের পিঠে, আবার কেউ পায়ে হেটে। যার যেটা ছিল সেটা নিয়েই তারা বেরিয়ে পড়লো, উদ্দেশ্য একটাই; কাফেলার সাথী হওয়া। তাদের সবারই জানা যে, একটি লম্বা সফর তাদের সামনে রয়েছে।
নতুন যাত্রীরা সংযুক্ত হওয়ার সাথে সাথে কাফেলার রূপ বৃহদাকার ধারণ করতে লাগলো এবং মদিনাকে পিছনে ফেলে কাফেলা প্রাণহীন মরুর বুক চিরে গন্তব্যের দিকে এগুতে থাকলো।
হুসাইন (আঃ)ও উক্ত কাফেলায় যোগ দিয়েছিলেন।
তাঁর সাথে একটি ঘোড়া থাকা সত্ত্বেও তিনি ঘোড়ার লাগাম ধরে পায়ে হাঁটছিলেন।
কাফেলা আল্লাহর ঘর যেয়ারত করার উদ্দেশ্যে শহর ত্যাগ করেছিল। কয়েকদিন আরবের মরু রাস্তা অতিক্রম করার পর অবশেষে মক্কার নিকটাবর্তী হল। কোনরকম দুর্ঘটনা ছাড়াই এই দীর্ঘ পথ অতিক্রম করায় যাত্রীরা খুবই খুশি। কাফেলার যাত্রীরা কিছুক্ষণ বিশ্রামের পর যেয়ারাতের জন্য নিজেদেরকে প্রস্তত করলেন। তারা একই রঙ্গের “ইহরামের” পোশাক পরিধান করলেন যাতে করে সাতবার আল্লাহর ঘরের তাওয়াফ করতে পারেন।
কা’বা মাসজিদুল হারামের উঠানে অবস্থিত এবং মসজিদুল হারামের চতুর্দিক ছোট ছোট টিলা দ্বারা ঘেরা। বেশ কিছু আশ্চার্য জনক জিনিস সেখানে ছিল। “যমযম” কূপ যা ঐ লবনাক্ত মরুর মাঝেও বছর বছর ধরে যেয়ারতকারীদের মিষ্টি পানি দান করে আসছে এবং একটি পাথর যার উপর ইব্রাহীমের (আঃ) পায়ের ছাপ এখনো পরিলক্ষিত হয়। পুরুষেরা একদিকে এবং মহিলারা অপরদিকে, প্রজাপতির মত কা’বার চারপাশে তাওয়াফ করছিলেন। এমন সময় এক মহিলা অনুভব করলো যে, একজন অপরিচিত পুরুষ তার হাতে চাপ প্রয়োগ করছে। সে আল্লাহর ঘরের নিকট এই ধরনের নোংরা কাজে খুবই রাগান্বিত হল এবং সেই খেয়ানতকারী ব্যক্তিটিকে বললঃ কেন আল্লাহর ঘরের সম্মান নষ্ট করছো এবং একজন মুসলমানের সম্ভ্রমে খেয়ানত করছো। লোকটি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে চাইল নিজের হাতটি টেনে নিতে কিন্তু কোন লাভ হল না কেননা, লোকটির হাত মহিলার হাতের সাথে জোড়া লেগে গিয়েছিল। তারা উভয়েই হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করলো কিন্তু কোন লাভ হল না। যেসব যিয়ারতকারীদের তাওয়াফ শেষ হয়ে গিয়েছিল তারা এই ঘটনার সাক্ষী ছিলেন। ঐ খেয়ানতকারী লোকটিকে গ্রেফতার করে তৎকালীন শাসকের নিকট নিয়ে যাওয়া হল। কেউ কেউ বলছিল লোকটিকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া উচিত। আবার কেউ কেউ বলছিল তার হাত কেটে ফেলা হোক। সবাই কিছু না কিছু বলছিল। শাসক সকল বিচারকদেরকে রাজপ্রাসাদে সমবেত হওয়ার নির্দেশ দিলেন। ঘোষণাকারী সমস্ত অঞ্চলে শাসনকর্তার নির্দেশ ঘোষণা করে দিল। কিছুক্ষণ পরেই শাসনকর্তার প্রাসাদে সবাই প্রবেশ করল। শাসনকর্তা বিচারকদের উদ্দেশ্যে বললেন ঐ খেয়ানতকারী ব্যক্তিটির বিরুদ্ধে হুকুমজারী করতে। শহরের বিচারকগণ অনেক চিন্তা ভাবনা শলা পরামর্শের পর এই সিদ্ধান্তে উপনীত হল যে, খেয়ানতকারী লোকটির হাত কেটে ফেলা হোক। বিচারকদের রায়ে শাসনকর্তা তুষ্ট হলেন না এবং গভীর চিন্তায় মগ্ন হলেন। হঠাৎ কিছু একটা তার মাথায় আসল এবং রক্ষীদেরকে উদ্দেশ্য করে বললেনঃ হোসাইন কি এই শহরেই আছেন?
রক্ষীগণ বললঃ জ্বি! তিনি গতরাতে শহরে প্রবেশ করেছেন।
শাসনকর্তা বললেনঃ তিনিই সর্বোত্তম ব্যক্তি যিনি এই বিষয়ের বিচার করতে সমাধান দিতে পারবেন। সাথে সাথে এ বিষয়ে তাঁর মতামত জানার জন্য একজন লোককে প্রেরণ করা হল।
হোসাইন (আঃ) যখন ঘটনা সম্পর্কে অবগত হলেন, আল্লাহর ঘরে গেলেন এবং আল্লাহর নিকট দোয়া করলেন তারপর শাসকের প্রাসাদে গেলেন। তিনি কি বিচার করেন এটা দেখার জন্য তখনও সবাই অপেক্ষা করছিল
হোসাইন (আঃ) উক্ত পুরুষ এবং মহিলার দিকে একবার দৃষ্টি দিলেন এবং অতি নিম্নস্বরে ঠোঁটের কোণে কিছু একটা বললেন এবং হঠাৎ করে লোকটির হাত মহিলার হাত হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল।
শাসনকর্তা খুশী হয়ে হোসাইন (আঃ) কে ধন্যবাদ জানিয়ে বললেনঃ এখন যে শাস্তিই আপনি এই লোকটির জন্য ধার্য্য করবেন আমি নির্দেশ দেব সেটা পালন করার জন্য। তিনি বললেনঃ কোন শাস্তি দেবার প্রয়োজন নেই। তাকে ছেড়ে দাও সে যেখানে খুশি চলে যাক। তার জন্য শাস্তি এটাই যথেষ্ট যে তার সম্মান মানুষের সামনে নষ্ট হয়েছে। হ্যাঁ, যে ব্যক্তি পায়ে হেটে যিয়ারতে আসে আল্লাহও তার দোয়া এভাবেই কবুল করেন।

Thursday, October 15, 2015

রক্তাক্ত কারবালা

রক্তাক্ত কারবালা
আসসালাতু আসসালামু আলাইকা ইয়া ইমামে আকবর ইমাম হুসাইন (রা)
আসসালাতু আসসালামু আলাইকা ইয়া শুহাদায়ে কারবালা।

 খাজা গরীবে নেওয়াজ মঈনউদ্দিন চিশতি (রাঃ) বলেছেনঃ বোকারা বুঝতে পারেনি, ইমাম হোসাইন (রাঃ) পানির পিপাসায় অসহায়ের মত মারা যাননি বরং তিনি আসল ও নকলের ভাগটি পরিষ্কার করে দেখিয়ে গেছেন। ইমাম হোসাইন (রাঃ-) এর ঘোড়া ‘দুলদুল’ এর পদধুলা বলতেও নিজেকে লজ্জাবোধ করি। অথচ আমি মঈনউদ্দিন যদি সেদিন কারবালার মাঠে একটি আঙ্গুল দিয়েও খোঁচা দিতাম তাহলে আল্লাহর কসম, সঙ্গে সঙ্গে পানির নহর বয়ে যেত।’

পৃথ্বীরাজ যখন খাজা গরীবে নেওয়াজ (রাঃ)-এর পানি বন্ধ করে দিল, তখন গরীবে নেওয়াজ হুংকার ছেড়ে বলেছিলেনঃ
“ওহে ইয়াজিদের বাচ্ছা, তুই কি এটা কারবালা পেয়েছিস? ইবনে হুসাইনের পানি বন্ধ করার সাহস কার? তুই কি আমার পানি বন্ধ করবি কমবখত? তোর সমগ্র রাজস্থানের পানি আমি আমার বাটির(মসকের) মধ্যে তুলে নিলাম।"
আল্লাহু আকবর!!! সোবহান আল্লাহ! ---
(সূত্রঃ রক্তস্নাত শহীদে কারবালা)

এখন আসুন জেনে নেই কারবালার ময়দানে জান্নাতের যুবকদের সরদার, রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহী ওয়া সাল্লাম এর কলিজার টুকরা সাইয়্যুদুশ শোহাদা ইমাম হুসাইন (রাঃ) এর কারবালার মায়দানে নিজের স্বচক্ষু মোবারক দ্বারা একে একে সব শাহাদাত্ এর দৃশ্য দেখার পর পরিশেষে তিনি যখন একা দাড়িয়ে ছিলেন তার জবান মোবারক থেকে বের হওয়া কথার অংশের কিছু অনুবাদ :
"কেন আমাকে হত্যা করতে চাও?
আমি কি কোন পাপ অথবা অপরাধ করেছি?"
এজিদের সৈন্য বাহিনী বোবার মত দাড়িয়ে রইল। পুনরায় ইমাম হোসাইন (রাঃ) বললেন, "
আমাকে হত্যা করলে আল্লাহর কাছে কি জবাব দেবে?
কি জবাব দেবে আমার নানাজান রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহী ওয়া সাল্লাম এর কাছে বিচার দিবসে?"
এজিদের সৈন্য বাহিনী পাথরের মত দাঁড়িয়ে আছে। আবার ইমাম হোসাইন (রাঃ) বললেন,
'হাল্ মিন্ নাস্রিন ইয়ানসুরুনা?"
'আমাদের সাহায্য করার মত কি তোমাদের মাঝে একজনও নাই?'
তারপরের আহ্বানটি সাংঘাতিক মারাত্বক। ঐতিহাসিকদের মতে এটাই ইমাম হোসাইন(রাঃ) শেষ আহ্ববান।
"আলাম্ তাস্মাও? আলাইসা ফিকুম্ মুসলিমু?" 'আমার কথা কি শুনতে পাও না?
তোমাদের মাঝে কি একজনও মুসলমান নেই?!!!!!!!

আল্লাহু আকবার-" ইসলাম জিন্দা হোতাহে হার কারবালাকে বাদ"

ইসলাম সেই কারবালা থেকে ২টি ভাগে ভাগ হল:-
১) হুসাইনী ইসলাম (যারা ইসলামের হক আকিদাকে টিকিয়ে রাখতে শহীদ হলেন।)

২) ইয়াজিদি ইসলাম (ইসলামের নাম ব্যবহার করে যারা ক্ষমতার জন্য সব ধরনের নিকৃষ্ট কাজ করতে পারে)

‪ইয়াজীদকে জান্নাতি‬ [?] বলতে বুক কাপবেনা যার জাকির‬ নায়েক ইয়াজিদকে রহিমাহুল্লাহ বলে দোয়া করে। আহলে হাদিস সবাই এখন তাকেই কানার মত অনুসরণ করে। বাতিল দলগুলোর মধ্যে রয়েছে:-
* চরমোনাই
* তাবলীগ
* জামাত/ওহাবী/হেফাজত/কাওমী
* লা-মাযহাবী/সালাফী
মিডিয়া ব্যক্তিত্: Dr. Jakir naik (ইয়াজিদের বরাইকারী)
তারেক মনোয়ার
Tv: PEACE TV/NTV/ATN BANGLA/ Islamic tv/
এগুলা সব এজিদী ইসলামের ধারক ও বাহক।

Wednesday, October 14, 2015

অশ্রু বিজড়িত চোখে স্মরন করি রাসুল (সাঃ) ঘোষিত বেহেস্তের নেতা ইমাম হুসাইনের শাহদাতকে

অশ্রু বিজড়িত চোখে স্মরন করি রাসুল (সাঃ) ঘোষিত বেহেস্তের নেতা ইমাম হুসাইনের শাহদাতকে
মোহররম-আজ পহেলা মোহররম,অশ্রু বিজড়িত চোখে স্মরন করি রাসুল(সাঃ) ঘোষিত বেহেস্তের নেতা ইমাম হুসাইনের (আঃ) শাহদাতকে,

ইমাম হুসাইন (আ.)-এর হত্যায় ইয়াযীদের ভূমিকা 
উমাইয়্যা বংশীয় খলিফা ইয়াযীদ ইবনে মু‘আবিয়া তার তিন বছরের শাসনামলে তিনটি বড় ধরনের অপরাধে লিপ্ত হয়েছিল।

তার শাসনামলের

প্রথম বছরে তার নির্দেশে ইমাম হুসাইন (আ.) সহ সর্বশেষ নবী রাসুলে পাক (সা.)-এর পরিবারের পঞ্চাশজন শিশু, যুবক ও পৌঢ় ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়;

দ্বিতীয় বছরে তার সেনাদল মদীনায় আক্রমণ চালায় এবং আশিজন সাহাবীসহ দশ হাজার লোককে হত্যা করে এবং এক হাজার মুসলিম নারীর শ্লীলতাহানি ঘটায়;

তৃতীয় বছরে সে আবদুল্লাহ্ ইবনে যুবাইরকে দমনের উদ্দেশে মক্কায় আক্রমণের নির্দেশ দেয় ও তার সৈন্যরা পবিত্র কাবা গৃহে অগ্নিসংযোগ করে।

এ প্রবন্ধে আমরা খেলাফতের আসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে ইয়াযীদ ইমাম হুসাইন (আ.)-এর শাহাদাত পর্যন্ত তাঁকে হত্যার যে সকল প্রয়াস চালিয়েছিল, হত্যার নির্দেশ দিয়ে যে পত্রগুলো সে বিভিন্ন ব্যক্তির নিকট প্রেরণ করেছিল এবং তাঁকে হত্যার পেছনে তার ভূমিকা থাকার অন্যান্য দলিল নিয়ে কয়েকটি শিরোনামে আলোচনা করব।

১.
মদীনার গভর্নরের প্রতি ইয়াযীদের নির্দেশ : ‘হুসাইন বাইআত না করলে তাকে হত্যা কর’
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, ইয়াযীদ কেবল তার নেতৃত্বকে মেনে নেয়ার সাপেক্ষেই ইমাম হুসাইন (আ.)-কে হত্যা করা থেকে নিবৃত্ত হত। ঐতিহাসিক ইয়াকুবী লিখেছেন : ‘ইয়াযীদ মদীনার গভর্নর ওয়ালীদ ইবনে ওকবাকে এ মর্মে পত্র লিখে যে, যখন আমার পত্র তোমার হাতে পৌঁছবে তখন হুসাইন ইবনে আলী ও আবদুল্লাহ্ ইবনে যুবাইরকে ডেকে পাঠাও এবং তাদের থেকে বাইআত (আনুগত্যের শপথ) গ্রহণ কর। যদি তারা অস্বীকার করে, তবে তাদের মস্তক বিচ্ছিন্ন করে আমার নিকট প্রেরণ কর।’

এ নির্দেশের প্রেক্ষিতে ওয়ালীদ ইমাম হুসাইনকে স্বীয় প্রাসাদে ডেকে পাঠায়। ইমাম হুসাইন তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্র আঁচ করে বনি হাশিমের যুবকদের সঙ্গে নিয়ে সেখানে যান।

২.
ওয়ালীদ ইমাম হুসাইনকে বাইআতের প্রস্তাব দিলে তিনি তার জবাবে বলেন : ‘হে আমীর! আমরা নবীর আহলে বাইত, রেসালতের খনি; আমাদের গৃহে ফেরেশতাদের আনা-গোনা হত, (তা ছিল) রহমত অবতীর্ণের ক্ষেত্র, মহান আল্লাহ্্ সকল কল্যাণের শুরু করেছেন আমাদের থেকে এবং আমাদের মাধ্যমেই তার পরিসমাপ্তি ঘটিয়েছেন। কিন্তু ইয়াযীদ হল দুষ্কৃতিপরায়ণ, মদ্যপায়ী, সে সম্মানিত ব্যক্তিদের হত্যাকারী এবং প্রকাশ্য পাপাচারী। সুতরাং আমার মত কেউ তার মত কারও হাতে বাইআত করতে পারে না।’

৩.
এরূপ জবাব শুনে ওয়ালীদ নিশ্চুপ থাকলেও মারওয়ান ইবনুল হাকাম ইমাম হুসাইন (আ.)-কে হত্যার পরামর্শ দেয়। ওয়ালীদ ইসলামের বিধান মতে ইমাম হুসাইনকে হত্যা জায়েয নয় বলে তা করতে অস্বীকার করে।

৪.
এ খবর ইয়াযীদের নিকট পৌঁছলে সে ওয়ালীদকে লিখে পাঠায় : ‘যখন আমার পত্র তোমার হাতে পৌঁছবে তখন দ্বিতীয়বারের ন্যায় মদীনার জনগণের নিকট বাইআত নিবে এবং আবদুল্লাহ্্ ইবনে যুবাইরকে তার অবস্থায় ছেড়ে দাও। কারণ, সে আমাদের নিকট থেকে পালাতে পারবে না। কিন্তু হুসাইনকে হত্যা করে তার মাথা আমার নিকট পাঠিয়ে দাও। যদি তুমি তা কর, তবে তোমার জন্য উন্নত জাতের কিছু ঘোড়া ও আরো মূল্যবান অনেক উপহার পাঠাব।’

৫.
কিন্তু ইয়াযীদের পত্র ওয়ালীদের নিকট পৌঁছার পূর্বেই ইমাম হুসাইন মদীনা ত্যাগ করেছিলেন।
এর কিছুদিন পরই ইয়াযীদ ওয়ালীদকে দুর্বলতার অভিযোগে পদচ্যুত করে। এর কয়েক মাস পর ইয়াযীদ একইভাবে ইমাম হুসাইনের দূত মুসলিম ইবনে আকীলের তৎপরতার বিপক্ষে কঠোর পদক্ষেপ না নেয়ার অভিযোগে কুফার গভর্নর নোমান ইবনে বাশীরকেও পদচ্যুত করে।

৬.
ইমাম হুসাইনের উক্তি : ‘আমাকে তারা হত্যা করবেই’
তাবারী বর্ণনা করেছেন যে, ইমাম হুসাইন (আ.) মক্কায় এক জনসমাবেশে লোকদের উদ্দেশ করে বলেন : ‘তোমরা কি জান, ইবনে যুবাইর কি বলছে?’ লোকেরা বলল : ‘না, আমরা জানি না। আল্লাহ্ আমাদের আপনার জন্য উৎসর্গিত করুন।’ ইমাম হুসাইন বললেন : ‘ইবনে যুবাইর আমাকে এ মসজিদে অবস্থানের কথা বলেছে এবং দাবি করেছে যে, আমার জন্য সৈন্য সংগ্রহ করবে। কিন্তু আমি আল্লাহর শপথ করে তোমাদের বলছি, আমার জন্য মক্কার এক বিঘত দূরে নিহত হওয়া এর অভ্যন্তরে নিহত হওয়া অপেক্ষা শ্রেয়। আল্লাহ্্র শপথ, যদি আমি আত্মগোপন করি এবং কোন গুহায়ও আশ্রয় গ্রহণ করি, তবু তারা আমাকে খুঁজে বের করা পর্যন্ত বিশ্রাম গ্রহণ করবে না এবং তারা আমার সাথে তা-ই করবে যা তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’

৭.
এ বিষয়গুলো থেকে আমরা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে, ইমাম হুসাইন (আ.) বনি উমাইয়্যার বিদ্বেষের তীব্রতা ও তাঁকে হত্যার অসৎ উদ্দেশ্য সম্পর্কে সম্পূর্ণরূপে অবহিত ছিলেন।

ইয়াযীদ ইমাম হুসাইনকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিল

ইয়াকুবী বর্ণনা করেছেন : ‘হুসাইন (আ.) ইরাকের উদ্দেশে যাত্রা করেছেন জানতে পেরে ইয়াযীদ কুফার গভর্নর হিসেবে উবাইদুল্লাহ্্ ইবনে যিয়াদকে নিয়োগ দান করে এবং তাকে এ মর্মে পত্র লিখে পাঠায় : আমার নিকট খবর পৌঁছেছে যে, কুফার লোকেরা হুসাইনকে ইরাকে আসার আহ্বান জানিয়ে পত্র লিখেছে। আমি নিশ্চিত, সে কুফার দিকে যাত্রা করেছে... যদি তুমি তাকে হত্যা কর, তবে তুমি তোমার দায়িত্ব পালন করেছ। আর যদি তা না কর, তবে আমি তোমাকে তোমার মৃত পূর্ব-পুরুষদের নিকট পাঠিয়ে দেব। সুতরাং সাবধান! এ সুযোগকে হাতছাড়া কর না।’

৮.
ইবনে আসাম বর্ণনা করেছেন : ‘হুর ইবনে ইয়াযীদ রিয়াহি, উবাইদুল্লাহ্্ ইবনে যিয়াদকে লিখে পাঠায় যে, সে ইমাম হুসাইনকে কারবালায় অবরুদ্ধ করেছে। এখন তার করণীয় কী?’ ইবনে যিয়াদ জবাবে লিখে : ‘আমীরুল মুমিনীন ইয়াযীদ ইবনে মু‘আবিয়া পত্র মারফত আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, তিনি তার নির্দেশ পালন না করলে আমার সাথে যথেচ্ছ আচরণ, এমনকি আমাকে হত্যা করতেও কুণ্ঠাবোধ করবেন না।’

৯.
এ ঐতিহাসিক বর্ণনাগুলো এ সাক্ষ্য প্রদান করে যে, ইয়াযীদ স্বয়ং উবাইদুল্লাহ্্ ইবনে যিয়াদের প্রতি ইমাম হুসাইনকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিল, এমনকি তার এ নির্দেশ পালন না করলে তাকে হত্যার হুমকিও দিয়েছিল।  ইবনে যিয়াদ ইমাম হুসাইনের বিষয়ে নিজের থেকে কখনই কোন পদক্ষেপ নেয়নি ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, ইমাম হুসাইন (আ.)-এর শাহাদাত পর্যন্ত ইয়াযীদ ও ইবনে যিয়াদের মধ্যে অবিচ্ছিন্নভাবে যোগাযোগ ছিল। কারণ, ইয়াযীদ তাকে নির্দেশ দিয়েছিল সে যেন সবসময় তার সঙ্গে যোগাযোগ রাখে এবং ছোট-বড় সব বিষয়েই তাকে পত্র (দূত) মারফত অবহিত করে। তাবারী লিখেছেন : ‘মুসলিম ইবনে আকীল এবং হানীকে হত্যার পর ইবনে যিয়াদ তাঁদের উভয়ের মাথা কেটে সিরিয়ায় ইয়াযীদের নিকট প্রেরণ করে। ইয়াযীদ তাদের কর্তিত মাথা দেখার পর বেশ কিছু দিকনির্দেশনা দিয়ে ইবনে যিযাদকে একটি পত্র লিখে। তাতে সে উল্লেখ করে : ‘আমার কাছে সংবাদ পৌঁছেছে যে, হুসাইন কুফার দিকে যাত্রা করেছে। তার সঙ্গে যারা যোগাযোগ রাখে তাদের প্রতি কড়া নজরে রাখ এবং তাদের শনাক্ত করার জন্য কুফায় গুপ্তচরদের নিয়োগ কর ও তাদের গ্রেফতার কর। যে কোন অজুহাতে হোক তার অনুসারীদের বন্দি কর। আর কুফায় যা-ই ঘটে না কেন, আমাকে অবহিত কর। তোমার ওপর আল্লাহ্্র রহমত বর্ষিত হোক।’

১০.
ইবনে আসাকির বর্ণনা করেছেন : ‘যখন ইয়াযীদ জানতে পারে যে, ইমাম হুসাইন কুফার দিকে রওয়ানা হয়েছেন তখন সে ইবনে যিয়াদের নিকট দূত প্রেরণ করে নির্দেশ দেয় তাঁর সাথে যুদ্ধ করার ও তাঁকে (জীবিত অথবা মৃত) সিরিয়ায় পাঠানোর।’

১১.
ইবনে আসামের বর্ণনায় এসেছে : ইবনে যিয়াদ গভর্নর হিসেবে কুফায় প্রবেশের পরই কুফার জনগণের উদ্দেশে বক্তব্যে বলে : ‘ইয়াযীদ ইবনে মুআবিয়া আমার নিকট পত্র এবং চার হাজার দিনার (স্বর্ণমুদ্রা) ও দুই লক্ষ দিরহাম প্রেরণ করে এ অর্থ তোমাদের মধ্যে বিতরণ করার নির্দেশ দিয়েছে। সে আরও নির্দেশ দিয়েছে যে, আমি যেন তোমাদেরকে তার শত্রু হুসাইন ইবনে আলীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে পাঠাই এবং তোমাদের তার আনুগত্যের দাওয়াত দেই।’

১২.
আল্লামা সুয়ূতী লিখেছেন : ‘ইয়াযীদ এক পত্রে তার নিযুক্ত কুফার গভর্নর ইবনে যিয়াদকে হুসাইনের সঙ্গে যুদ্ধের ও তাঁকে হত্যার নির্দেশ দেয়।’

১৩.
এ বর্ণনাগুলো থেকে স্পষ্ট হয় যে, কুফায় যা কিছু ঘটত, ইয়াযীদ সে বিষয়ে শুধু অবহিতই ছিল না; বরং ইবনে যিয়াদ যা করত তা তার নির্দেশ অনুযায়ী ও তার অনুমতি সাপেক্ষেই করত। ফলে ইবনে যিয়াদের কর্মের দায় প্রথমত ইয়াযীদের ওপরই বর্তায়।

ইমাম হুসাইন (আ.)-এর হত্যায় ইয়াযীদ আনন্দ ও দম্ভ প্রকাশ করেছিল

ইবনে আসাম, আবুল ফারাজ ইসফাহানী এবং ইবনে কাসির বর্ণনা করেছেন যে, ইমাম হুসাইন (আ.)-এর কর্তিত পবিত্র মাথা ইয়াযীদের নিকট নেয়া হলে সে আনন্দিত হয়ে ইবনে যেবারার নিম্নোক্ত কবিতাটি আবৃত্তি করে তার মনোভাব প্রকাশ করে :
لعبت هاشم بالملک فلا خبر جاء و لا وحی نزل
لستُ مِن خندف ان لم انتقم مِن بنی احمد ما کان فعل
قد قتلنا قرم ساداتهم و عدلنا میل بدر فاعتدل
‘বনি হাশিম রাজত্ব নিয়ে খেলা করেছে। প্রকৃতপক্ষে কোন ঐশী বার্তাও আসেনি, আর কোন ওহীও অবতীর্ণ হয়নি। আমি যদি বনি আহমাদ অর্থাৎ মুহাম্মাদ (সা.)-এর বংশধরদের থেকে যা সে করেছিল তার প্রতিশোধ না নেই তবে আমি খিনদিফের (সন্তানদের) অন্তর্ভুক্ত নই। নিশ্চয় আমরা তাদের নেতাদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয়কে হত্যা করেছি এবং বদরের (নিহতের প্রতিশোধ গ্রহণ করে) সমান সমান হয়েছি।’

১৪.
এ কবিতায় ইয়াযীদ রাসূল (সা.)-এর নবুওয়াতকে অস্বীকার করেছে এবং ইমাম হুসাইনের হত্যাকে বদরের যুদ্ধের প্রতিশোধ বলে উল্লেখ করেছে। এভাবে সে তার অন্তরের বিশ্ব¦াসকেই ব্যক্ত করেছে।
ইবনে আসির বর্ণনা করেছেন : ‘হুসাইনের শাহাদাতের পর তাঁর পবিত্র মাথা ইয়াযীদের কাছে প্রেরিত হলে সে তার হাতের লাঠি দিয়ে তাঁর গলায় আঘাত করে কবিতা পাঠ করছিল।’

১৫.
যদি ইয়াযীদ ইমাম হুসাইনের হত্যায় সন্তুষ্ট না হয়ে থাকে তবে কেন তাঁর গলায়, কোন কোন বর্ণনা মতে পবিত্র ঠোঁট ও দাঁতে আঘাত করে দম্ভের সাথে কবিতা আবৃত্তি করছিল। এ ঘটনায় ইমাম হুসাইনের প্রতি তার বিদ্বেষ সুস্পষ্টরূপে প্রকাশিত হয়েছে।
আল্লামা সুয়ূতী লিখেছেন : ‘ইমাম হুসাইন ও তাঁর পিতার বংশের লোকদের হত্যার পর ইবনে যিয়াদ তাঁদের মস্তকগুলোকে সিরিয়ায় প্রেরণ করলে ইয়াযীদ প্রথমে আনন্দিত হয়, কিন্তু পরে যখন মুসলমানদের মধ্যে তার প্রতি অসন্তোষ ও ঘৃণার আশংকা করল তখন সে বাহ্যিকভাবে অনুশোচনা প্রকাশ করে। সুতরাং মানুষের ইয়াযীদের প্রতি ক্ষুব্ধ হওয়ার অধিকার রয়েছে।’

১৬.
ইমাম হুসাইনকে হত্যার পর ইয়াযীদ ইবনে যিয়াদকে পুরস্কৃত করেছিল
ইমাম হুসাইনকে হত্যার পর ইয়াযীদ, ইবনে যিয়াদকে তার পদে শুধু বহালই রাখেনি; বরং এ ঘটনার কয়েক মাস পর যখন সে তার সঙ্গে সিরিয়ায় দেখা করতে যায় তখন সে ইবনে যিয়াদকে আলিঙ্গন করে তার কপালে চুম্বন করে নিজ সিংহাসনের পাশে বসায় এবং এক গায়ককে তাকে সম্বর্ধনা দানের জন্য গান গাইতে বলে। সে তার সাকীকে মদ পরিবেশনের নির্দেশ দেয়। অতঃপর সে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে ইবনে যিয়াদ ও ওমর ইবনে সাদকে দশ লক্ষ দিরহাম (রৌপ্যমুদ্রা) দান করে। এমনকি সে এক বছরের জন্য ইবনে যিয়াদকে ইরাকের (কুফা ও বসরার) বার্ষিক খাজনার পুরোটাই গ্রহণের অনুমতি দেয়।

১৭.
ইবনে আসির লিখেছেন : ‘ইমাম হুসাইনকে হত্যা করার পর ইবনে যিয়াদ তাঁর পবিত্র মস্তক ইয়াযীদের নিকট প্রেরণ করলে সে তার প্রতি খুবই খুশী হয়। কিন্তু যখন সে বুঝতে পারে যে, জনগণ তার এ কর্মে সন্তুষ্ট নয় তখন কৃত্রিমভাবে শোক প্রকাশ শুরু করে। এ কারণেই ইয়াযীদ তার মৃত্যু পর্যন্ত তাকে কুফার গভর্নর হিসেবে বহাল রাখে। এমনকি ইবনে যিয়াদই কুফার মিম্বারে ইয়াযীদের মৃত্যুর ঘোষণা দেয়।’

১৮.
তাবারীও ইমাম হুসাইনকে হত্যা করার পর ইয়াযীদের নিকট ইবনে যিয়াদের মর্যাদা বৃদ্ধির বিষয় বর্ণনা করেছেন।

১৯.
আবদুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস ইয়াযীদকে ইমাম হুসাইনকে হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত করেছেন
ইমাম হুসাইন (আ.)-এর শাহাদাতের পর আবদুল্লাহ্্ ইবনে আব্বাস ইয়াযীদকে এক পত্রে লিখেন : ‘হে অবৈধ সন্তান! তুমিই হলে সেই ব্যক্তি যে তার পাপিষ্ঠ ও কলুষ হাত দিয়ে হুসাইনকে হত্যা করেছে। আমি কখনই এ কথা ভুলে যাইনি যে, তোমার হাত রক্তে রঞ্জিত। তুমি হুসাইনসহ বনি হাশিমের এমন ব্যক্তিদের হত্যা করেছ যাঁরা সকলেই উজ্জ্বল, দীপ্তিময় আলো এবং অন্ধকারে নিপতিতদের জন্য পথপ্রদর্শক তারকাস্বরূপ ছিলেন।’

২০.
ইবনে আব্বাস একজন প্রসিদ্ধ সাহাবী এবং মহানবীর চাচা হযরত আব্বাসের সন্তান। তিনি কারবালার ঘটনার সময় জীবিত ছিলেন এবং ঐ ঘটনা সংঘটনের (আশুরার) দিনে তিনি দ্বিপ্রহরে স্বপ্ন দেখেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা.) ক্রন্দনরত ও দুঃখভারাক্রান্ত অবস্থায় কারবালা ময়দান থেকে ইমাম হুসাইনের রক্ত সংগ্রহ করছেন। স্বপ্নেই রাসূল (সা.) তাঁকে ইমাম হুসাইনের শাহাদাতের সংবাদ দেন।

২১.
নিঃসন্দেহে তিনি ইয়াযীদকে মিথ্যা অভিযোগে অভিযুক্ত করেননি। কারবালার প্রত্যক্ষ সাক্ষী হযরত যায়নাব বিনতে আলী (আ.) ইয়াযীদের সামনেই তাকে ইমাম হুসাইন (আ.)-এর হত্যাকারী বলেছেন মহানবী (সা.)-এর বংশের বন্দি নারী, শিশুসহ তাঁর আহলে বাইতের মহান ব্যক্তিদের পবিত্র মস্তকগুলো নিয়ে যখন ইবনে যিয়াদের সৈন্যরা সিরিয়ায় পৌঁছে তখন ইয়াযীদ তাদেরকে তার সামনে উপস্থিত করার নির্দেশ দেয়। ইমাম হুসাইনের পবিত্র মস্তকের ওপর ইয়াযীদের দৃষ্টি পড়া মাত্রই সে তার হাতের লাঠি দিয়ে তাঁর পবিত্র গলা, ঠোঁট ও দাঁতে আঘাত করতে থাকে এবং ইবনে যেবারার কবিতাটি আওরাতে থাকে। এ দৃশ্য দেখে হযরত যায়নাব ইয়াযীদের উদ্দেশে অত্যন্ত বলিষ্ঠভাবে তার ইসলামের বাহ্যিক মুখোশ উন্মোচন করেন। তিনি ইয়াযীদের সকল কর্মকান্ড-কে অনৈসলামিক এবং ব্যক্তিগত বিদ্বেষ ও গোত্রীয় আক্রোশপ্রসূত প্রমাণ করে এক দীর্ঘ বাগ্মিতাপূর্ণ বক্তব্য দান করেন।

বক্তব্যের এক স্থানে তিনি বলেন :
‘হে ইয়াযীদ! তুই এ মহাঅপরাধ করার পর নিজেকে পাপী ও অপরাধী না ভেবে এবং এ অপরাধ কত বড় তা চিন্তা না করে বলছিস : ‘হায়! আমার পিতারা যদি এখানে উপস্থিত থাকত।’ তুই কি মনে করেছিস তারা এ কথা শুনে আনন্দে অভিভূত হয়ে তোকে বলত : ‘হে ইয়াযীদ! তোর হাত পঙ্গু না হোক।’ তুই এ ধরনের ঔদ্ধত্যমূলক কথা বলছিস এবং বেহেশতের যুবকদের সর্দারের দাঁতে আঘাত করছিস! তুই কতটা নির্লজ্জ! হ্যাঁ, এরূপ উদ্ভট ও অসংগত কথা তোর জন্যই সাজে। কারণ, তুই হচ্ছিস ঐ ব্যক্তি যে পূর্বের ক্ষতকে উন্মুক্ত করেছিস এবং যার হাত মুহাম্মাদ (সা.)-এর বংশধরদের রক্তে রঞ্জিত। তুই আবদুল মুত্তালিবের বংশের তারকাদের হত্যা করেছিস এবং আমাদের মূলকে কর্তন করেছিস। আর এখন আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে পূর্বপুরুষদের ডাকছিস, আর ভাবছিস ওরা তোর আহ্বান শুনতে পাচ্ছে। শীঘ্রই তুইও তাদের সাথে মিলিত হবি এবং এমন শাস্তির সম্মুখীন হবি যে, তখন আকাক্সক্ষা করবি, যদি পূর্বেই তোর হাতগুলো পঙ্গু, আর তোর জিহ্বা মূক হয়ে যেত।’

২২.
ইমাম যায়নুল আবেদীন (আ.) ইয়াযীদকে তাঁর পিতার হত্যাকারী বলে সম্বোধন করেছেন
ইমাম যায়নুল আবেদীনও সিরিয়ায় অবস্থানকালে ইয়াযীদের উপস্থিতিতে কয়েকবার তাকে তাঁর পিতার হত্যাকারী বলে অভিহিত করেছেন। ইয়াযীদ ইমাম সাজ্জাদকে উদ্দেশ করে যখন বলে : ‘তুমি কি ঐ ব্যক্তির সন্তান যাকে আল্লাহ্ হত্যা করেছেন?’ ইমাম জবাবে বলেন : ‘আমি হলাম আলী, যার পিতাকে তুমি হত্যা করেছ।’ অতঃপর তিনি পবিত্র কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতটি তেলাওয়াত করেন :

وَ مَن يَقْتُلْ مُؤْمِنًا مُّتَعَمِّدًا فَجَزَاؤُهُ جَهَنَّمُ خَلِدًا فِيهَا وَ غَضِبَ اللَّهُ عَلَيْهِ وَ لَعَنَهُ وَ أَعَدَّ لَهُ عَذَابًا عَظِيمًا

‘যে কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে কোন মুমিনকে হত্যা করে তার শাস্তি জাহান্নাম; সেখানে সে স্থায়ী হবে এবং আল্লাহ্ তার প্রতি ক্রোধান্বিত হবেন, তাকে লানত করবেন এবং তার জন্য মহাশাস্তি প্রস্তুত রেখেছেন।’

২৩ ও ২৪.
যখন ইয়াযীদ লক্ষ্য করল যে, হযরত যায়নাব (আ.) এবং ইমাম যায়নুল আবেদীন (আ.)-এর বক্তব্য তার দরবারে উপস্থিত ব্যক্তিদেরও প্রভাবিত করছে এবং পরিবেশ তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে তখন সে তার মুয়াজ্জিনকে আজান দিতে বলে। মুয়াজ্জিন আজানে রাসূল (সা.)-এর রিসালাতের সাক্ষ্য দান শুরু করলে ইমাম তাকে থামার নির্দেশ দিয়ে ইয়াযীদকে উদ্দেশ করে বলেন : ‘হে ইয়াযীদ! যে মুহাম্মাদ (সা.)-এর কথা তুমি বলছ; সে কি তোমার পূর্বপুরুষ, না আমার? যদি তুমি তাঁকে নিজের পূর্বপুরুষ বলে দাবি কর, তবে তুমি মিথ্যা বলছ। আর যদি তিনি আমার পূর্বপুরুষ হন তবে কেন তুমি তাঁর বংশধরদের হত্যা করেছ?’

২৫.
ইয়াযীদ সম্পর্কে আহলে সুন্নাতের বিশিষ্ট আলেমদের দৃষ্টিভঙ্গি
আহলে সুন্নাতের প্রসিদ্ধ কিছু সংখ্যক আলেম ইয়াযীদের কাফির হওয়াকে নিশ্চিত বলেছেন এবং তাকে লানত করা জায়েয বলেছেন এবং তারা নিজেরাও তাকে লানত করেছেন। তন্মধ্যে আহমাদ ইবনে হাম্বাল, ইবনে যাওযী, কাযী আবু ইয়ালী, জাহিয, আল্লামা তাফতাযানী এবং আল্লামা সুয়ূতীর নাম উল্লেখযোগ্য।

২৬.
আল্লামা তাফতাযানী বলেন : ‘ইমাম হুসাইনকে হত্যার পর ইয়াযীদের সন্তুষ্টি ও আনন্দ প্রকাশ এবং মহানবী (সা.)-এর আহলে বাইতের প্রতি তার নিকৃষ্ট আচরণ তার অসংখ্য মন্দ কর্মের কিছু নমুনা মাত্র যা বিভিন্ন গ্রন্থে ও সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। আমরা তার বংশের পরিচয় দেখব না; বরং তার ঈমানের প্রকৃত অবস্থা দেখব। মহান আল্লাহ্ তাকে ও তার পক্ষাবলম্বীদের লানত করুন।’

২৭.
ইয়াযীদের সকল গুরুতর অপরাধকে তুলে ধরে জাহিয বলেছেন : ‘এ বিষয়গুলো তার নিষ্ঠুরতা, কপটতা ও অধার্মিকতার প্রমাণ। নিঃসন্দেহে সে দুর্বৃত্ত ও অভিশপ্ত। যে কেউ তাকে সমর্থন করবে সে নিজেকেই অসম্মানিত করবে।’

২৮.
বারযানজী তাঁর ‘ইশাআ’ গ্রন্থে এবং হাইসামী তাঁর ‘সাওয়ায়েকুল মুহরিকা’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন :
‘আহমাদ ইবনে হাম্বলকে তাঁর পুত্র যখন বলেন যে, আল্লাহ্ কিতাবে আমি ইয়াযীদকে লানত করার সপক্ষে কোন দলিল পাই না। তখন তিনি পবিত্র কুরআনের সূরা মুহাম্মাদের ২২ ও ২৩ নং আয়াত দু’টি তেলাওয়াত করেন :

فَهَلْ عَسَيْتُمْ إِن تَوَلَّيْتُمْ أَن أَن تُفْسِدُواْ فىِ الْأَرْضِ وَ تُقَطِّعُواْ أَرْحَامَكُم أُوْلَئكَ الَّذِينَ لَعَنَهُمُ اللَّهُ فَأَصَمَّهُمْ وَ أَعْمَى أَبْصَرَهُمْ

‘তোমরা কি আশা কর যে, তোমরা কর্তৃত্বের অধিকারী হলে ভূপৃষ্ঠে বিপর্যয় সৃষ্টি করতে থাকবে এবং তোমাদের আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করবে? (যারা এরূপ করবে) তারাই হল সে সকল লোক যাদের আল্লাহ্ অভিসম্পাত (স্বীয় রহমত হতে দূর) করেন এবং তাদের কর্ণে বধিরতা ও তাদের চক্ষুতে অন্ধত্ব সৃষ্টি করেছেন।’
অতঃপর তিনি বলেন : ‘ইয়াযীদ যা করেছে তার থেকে বড় কোন বিপর্যয় ও আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করার নমুনা আছে কি?’

২৯.
আল্লামা আলুসী বলেন : ‘যদি কেউ বলে ইয়াযীদের কোন দোষ ছিল না এবং সে কোন অপরাধ করেনি, তাই তাকে লানত করা যাবে না; সেই ব্যাক্তি নিঃসন্দেহে ইয়াযীদের  দলের অন্তর্ভুক্ত।’

তথ্যসূত্র
১. তারিখে ইয়াকুবী, ২য় খ-, পৃ. ২৪১; ইবনে আসাম, আল ফুতুহ, ৩য় খ-, ৫ম অধ্যায়, পৃ. ১০-১১।
২. ইবনে আসাম, আল ফুতুহ, ৩য় খ-, ৫ম অধ্যায়, পৃ. ১৫-১৮।

রাসুলের প্রতি ভালোবাসা

রাসুলের প্রতি ভালোবাসা
সিহহা সিত্তার অন্যতম বোখারি শরিফের সংকলক ইমাম বোখারি (রহ) এর বক্তব্যের একটি উদ্ধৃতি দেওয়া যেতে পারে। তিনি বলেছেন, ‘ওরওয়া বিন মাসউদ’ নামে রাসূলে খোদা (সা) এর একজন সাহাবি বলেন “খোদার কসম! নবী করিম (সা) এর ওজুর পানি সাহাবাগণ কখনোই নিচে পড়তে দিতেন না, সব পানি পড়তো সাহাবিদের হাতে,তাঁরা ঐ পানি নিজেদের চেহারা ও শরীরে মাখতেন…যখনই নবীজীর ওজু করার সময় হতো সাহাবিরা তখনই ওজুর পানি হাতে নেওয়ার জন্যে প্রতিযোগিতায় নেমে যেতেন।”
হজ্বের সময় রাসূলে আকরাম (সা) যখন তাঁর চুল কাটতেন, সাহাবাগণ তখন নবীজীর কর্তিত চুলগুলো জমা করতেন পবিত্রতা ও বরকত হাসিলের উদ্দেশ্যে। একইভাবে নবীজী যখন কোনো পানির মশকের মুখ দিয়ে পানি খেতেন সাহাবিগণ ঐ মশকের মুখ কেটে নিতেন বরকতের উদ্দেশ্যে। এসব কাজ যদি শির্‌ক হতো তাহলে নবিয়্যে মুকাররামে ইসলাম মুসলমানদেরকে সেসব করতে কঠোরভাবে নিষেধ করতেন। কেননা নবীজীর সন্তানের মৃত্যুর জন্যে যখন চন্দ্রগহণকে কারণ হিসেবে মনে করা হচ্ছিলো, নবীজী তখন কঠোরভাবে ঐ ভ্রান্ত আকিদার বিরোধিতা করেছিলেন। নবীজীর কাছ থেকে ফযিলত ও বরকত হাসিলের উদ্দেশ্যে জনগণ যে চেষ্টা চালিয়েছেন সে সম্পর্কে বহু হাদিসে উল্লেখ রয়েছে, নবীজী এ কাজের বিরোধিতা করেছেন এরকম কোনো বর্ণনা নির্ভরযোগ্য কোনো গ্রন্থে পাওয়া যায় না।
আসলে আল্লাহর সাথে ঘনিষ্ট সম্পর্ক রয়েছে যেসব পুণ্যবান সালেহিন বান্দার, তাঁদেরকে পবিত্র জ্ঞান করার অর্থ শেরেকি করা নয়, বরং সবসময় এই বিশ্বাস থেকেই করা হয় যে, আল্লাহর অনুমতি ছাড়া তাঁদের কারো পক্ষেই সম্ভব নয় অপর কারো জন্যে মঙ্গল বয়ে আনা কিংবা কারো বিপদ দূর করা। রাসূলে খোদার মিম্বার, তাঁর কবর, কবর ছোঁয়া এবং তাতে চুমু খাওয়া ইত্যাদি কাজ নবীজীর ওফাতের পর মুসলমানরা করতেন।মদিনার বিখ্যাত ফকিহ সায়িদ বিন মুসাইয়্যেব এবং ইয়াহিয়া বিন সায়িদ এসব কাজ করতেন। ঐশী ব্যক্তিত্ববর্গের রেখে যাওয়া জিনিসপত্র কিংবা তাঁদের কবরকে পবিত্র জ্ঞান করার অর্থ হলো যেহেতু তাঁরা ছিলেন অনেক উন্নত পর্যায়ের এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভকারী মানুষ, সেজন্যে তাঁদের প্রতিটি জিনিসই পবিত্র এবং মর্যাদা ও সম্মানের যোগ্য।
পবিত্র কোরআনে বর্ণিত ইউসুফ (আ)র কাহিনীটি এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। বর্ণনায় এসেছে, হযরত ইয়াকুব (আ) ছিলেন ইউসুফ (আ) এর পিতা। বার্ধক্যে এসে তিনি অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। ইউসুফ (আ) তাঁর জামাটি পাঠালেন বাবার জন্যে। হযরত ইয়াকুব (আ) পুত্র ইউসুফের দেওয়া জামাটি চোখে লাগালেন আর তাঁর চোখ ভালো হয়ে গেল। এটাই হলো তাবাররোক,এটাই হলো পবিত্রতা জ্ঞান। এই তাবাররোক করাটা বা আল্লাহর অলিদের ব্যবহৃত জিনিসপত্রকে পবিত্র জ্ঞান করাটা যদি শেরক হতো তাহলে কোরআন কি ইয়াকুব (আ) এর এই কাজকে নেতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করতো না? নবীজীর কবর ছোঁয়া বা কবরে চুমু দেওয়াতেও কোনো সমস্যা নেই বলে আহমাদ ইবনে হাম্বল মনে করতেন। সাহাবায়ে কেরামগণ রাসূলে খোদার সাথে সবসময়ের জন্যেই থাকতেন,তাঁরাও তাবাররোক অন্বেষণ করেছেন। আমরা এ সময়ের মুসলমানরা যারা নবীজীকে দেখার সৌভাগ্য লাভ করি নি,তারা নবীজীর মাযার স্পর্শ করে, চুমু দিয়ে তাঁর প্রতি আমাদের অন্তরের ভালোবাসা ও প্রেমের পরিচয় দেব এতে দোষের কী আছে?

সোয়ালক্ষ হজ্ব ফেরৎ সাহাবী ও কাফের - মুনাফিক প্রসংগ

সোয়ালক্ষ হজ্ব ফেরৎ সাহাবী ও কাফের - মুনাফিক প্রসংগ
" --- হে রাসুল , পৌছে দাও যা তোমার কাছে অবতীর্ন হয়েছে , তোমার প্রভুর কাছ থেকে এবং যদি তুমি তা না কর , তূমি তাঁর রেসালতই পৌঁছে দাও নি এবং আল্লাহ তোমাকে জনতার হাত থেকে রক্ষা করবেন । নিশ্চয়ই আল্লাহ কাফেরদেরকে পথ দেখান না --- " ।
সুরা - মায়েদা / ৬৭ ।


পাঠক ,
অতি ক্ষুদ্র একজন মানুষ হিসাবে আমি উপরোক্ত আয়াতটির বিষয় ভিন্ন আঙ্গিকে দুটি কথা নিবেদন করতে চাই ।
দ্বিমত অবশ্যই আপনার থাকতেই পারে ।
বিনীত অনুরোধ , শালীন ভাষায় যে কোন সমালোচনা শিরধার্য ।
মূল কথায় আসি -

আয়াতটি নাজিলের প্রেক্ষাপট -
জীবনের প্রথম ও শেষ হজ্ব পালন শেষে মহানবী (সাঃ) পদব্রজে মক্কা থেকে মদীনায় ফিরছেন । সময়কাল দশম হিজরী । সংগে প্রায় সোয়ালক্ষ হাজী সাহাবাগন । স্বভাবতই হজ্ব ফেরৎ এই বিশাল কাফেলায় কোন অমুসলিম যেমন খ্রীষ্টান , হিহুদী , মূর্তিপূজারী মুশরিক থাকার কোন প্রশ্নই নেই ।
দিনের তাপমাত্রা প্রায় ৬০ ডিগ্রী । মরুভূমির প্রচন্ড গরম । বিশাল এই হজ্ব ফেরৎ কাফেলা তখন খুম নামক এক স্থানে অবস্থিত এক গাদীর বা জলাশয়ের পাশ দিয়ে অতিক্রম করছে । সদ্য হজ্ব ফেরৎ বিশাল এই হাজী সাহাবাগনের নেতৃত্বে আছেন স্বয়ং মোহাম্মাদ (সাঃ) । জোহর ওয়াক্ত তখন সমাগত । তখনই এই আয়াতটি নাজিল হয় ।

আয়াতটিকে বিশ্লেষন করলে নিমোক্ত পয়েন্টসগুলি দেখতে পাই যে --
১) - মহানবী (সাঃ) এর কাছে পূর্ব থেকেই এই বার্তাটি ছিল ,
২) - কোন কারনে হয়তোবা মহানবী (সাঃ) বার্তাটি জনসম্মুখে ঘোষনাটি দিতে ইতস্তত করছিলেন ,
৩) - মহান অাল্লাহ তাঁর রাসুলকে (সাঃ) বার্তাটি ঘোষনা দেয়ার জন্য কঠিনভাবে বললেন ,
৪) - মহান আল্লাহর কঠিনতা এমনই মারাত্মক পর্যায় ছিল যে , তিনি চুড়ান্ত হুমকি দিয়ে বললেন যে , যদি বার্তাটি যথাযথ ভাবে ঘোষনা না করা হয় তাহলে পুরো রেসালতই বাতিল ,
৫) - প্রচন্ড দয়ালু আল্লাহ এটাও জানতেন যে , তাঁর প্রিয় হাবিব , নবীজী (সাঃ) কেন ইতস্তত করছেন ,
৬) - মহান আল্লাহ নিজে তখন জামিনদার হলেন এই ভাবে যে , হে নবী , তুমি নির্ভয় বার্তাটি ঘোষনা কর , কোন ভয় পেও না , স্বয়ং আল্লাহ তোমাকে অবাধ্য উচ্ছৃখংল কাফের জনতার রোষানল থেকে রক্ষা করবেন ,
৭) - আয়াতটির শেষ লাইনে , মহান আল্লাহ " কাফের " - এই শব্দটি ব্যবহার করেছেন ।
উপরের আয়াতটির বিশ্লেষন থেকে এটা জলের মত পরিষ্কার যে , বার্তাটি সাংঘাতিক রকমের গুরুত্বপূর্ন । নইলে মহানবী (সাঃ) কেনইবা ইতস্তত করছিলেন । আর মহান আল্লাহ কেনইবা এতটা জোর তাগিদ বা হুমকি দিলেন । আবার পাশাপাশি মহান আল্লাহ তাঁকে অভয় দিলেন ।

অর্থাৎ মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসুল জানতেন যে , এই বার্তাটি অনেকেই মেনে নিতে পারবে না । আর আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের (সাঃ) আদেশ অস্বীকার বা প্রত্যাখ্যানকারীগনকে কাফের বলা হয় ।

এখন আমার মিলিয়ন ডলারের জিজ্ঞাস্য হল যে --
ঐ কাফেলা তো কোন যুদ্ব ফেরৎ কাফেলা নয় । সোয়ালক্ষ হজ্ব ফেরৎ সাহাবা , তাও আবার মহানবী (সাঃ) স্বয়ং নিজে নেতৃত্ব দি্চ্ছেন । ঐ কাফেলায় কোন অমুসলিম বা শত্রুপক্ষ কেউই ছিল না । সকলেই সম্মানীত সাহাবা ।
এই রকম মহা পবিত্র একটা কাফেলায় মহানবী (সাঃ) , যে কোন বার্তা ঘোষনা দিতে কেনইবা ভীত হবেন ?
কেনইবা আল্লাহকে নির্ভয়ের গ্যারান্টি দিতে হবে ?
কেনইবা আল্লাহ অবাধ্য জনতা ও কাফের এই শব্দ দুটি ব্যবহার করেছেন ?
তাহলে কি , সরিষার মধ্যেই ভূত !
অর্থাৎ হজ্ব ফেরৎ কাফেলার মধ্যে মুমিন সাহাবীদের সাথে সাথে মুনাফিক ভয়ংকর হিংস্র প্রকৃতির সাহাবাগনও ছিলেন ?

সুপ্রিয় পাঠক ,
মহান আল্লাহ কখনই অহেতুক কোন কথা বলেন না ।
আল্লাহর এই ধারনা যে অমূলক ছিল না , আসুন তা বাস্তবতার সাথে মিলিয়ে নিন --

গাদীর এ খুম প্রান্তরে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল কতৃক নির্বাচিত বেলায়েতে আলী তথা বার ইমামত ধারা ঘোষিত হবার প্রায় বছর খানেক পরে ২৮শে সফর ১১ হিজরিতে মহানবী (সাঃ) ওফাত বা ইন্তেকাল করেন ।

মহানবী (সাঃ) ওফাতের পূর্বে গাদীর এ খুমের ঘোষিত নির্দেশটাকে নিজ হাতে খাতায় লিখে দিতে চাইলেন । কিন্ত -
১) - ওঁনাকে খাতা কলম দেয়া হল না ,
২) - খাতা কলম ওঁনার সামনেই ছুঁড়ে ফেলে দেয়া হল ,
৩) - নবীজী (সাঃ) প্রচন্ড অসন্তষ্ট হয়ে ওদেরকে তৎক্ষনাত ঘর থেকে বের করে দিলেন ,
৪) - নবীজী (সাঃ) এর ওফাতের পরে নবীকন্যার পবিত্র গৃহে অগ্নিসংযোগ করা হল ,
৫) - জ্বলন্ত দরজাতে প্রচন্ড জোরে লাথি মেরে নবীকন্যাকে গর্ভস্থ সন্তানসহ হত্যা করা হল ,
৬) - ইমাম আলী (আঃ) এর গলায় দঁড়ি বেঁধে ১ম খলীফা বাহাদুরের দরবারে নিয়ে যাওয়া হল ,
৭) - নবীকন্যার বৈধ পৈত্রিক সম্পত্তি বাগে ফাদাক অবৈধভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে জোর করে ছিনিয়ে নেয়া হল ,
৮) - ইমাম আলী (আঃ) কে রমজান মাসে মসজিদে সেজদারত অবস্থায় বিষাক্ত তলোয়ার দিয়ে হত্যা করা হল ,
৯) - ইমাম হাসান (আঃ) কে বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হল ,
১০) - ইমাম হাসান (আঃ) এর কাফনে অজস্র তীর ছোঁড়া হল যাতে করে প্রিয় নানার পাশে দাফন না করতে পারে ,
১১) - ইমাম হোসেন (আঃ) কে কারবালা প্রান্তরে ৭২ জন সহ জবাই করে হত্যা করা হল ,
১২) - ইমাম জয়নুল আবেদীন (আঃ) কে বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হল ------------
ধারাবাহিক ভাবে সর্বমোট ১১ জন পবিত্র ইমাম (আঃ) গনকে তলোয়ার ,খাবার , ফল ও পানিতে বিষ দিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে ।

এঁনারা কিন্ত কোন সাধারন পর্যায়ের মুসলমান জনগন ছিলেন না ।
মহান আল্লাহ কতৃক নির্বাচিত পুতঃপবিত্রতার গ্যারান্টিযুক্ত ইমাম ও মহানবীর (সাঃ) আহলে বাইত ।
এই পবিত্র ১১ জন ইমামগন ওনাদের সময়কার ক্ষমতায় আসীন খলীফাগনের প্রত্যক্ষ মদদে খুন হয়েছেন ।
এই ১১ জন পবিত্র ইমামগনের হত্যার বিচার আজ পর্যন্ত কোন খলীফা বা কেউই করে নি ।

উল্টা কুখ্যাত কুলাঙ্গার হত্যাকারীকে ইদানীং রাঃআনহু বলা হচ্ছে ।

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হল যে , এই জঘন্য ভয়াবহ ক্ষমার অযোগ্য অপরাধগুলো অন্য কোন ননমুসলিম করার সাহস পায় নি । প্রত্যেক ঘটনাগুলি সংঘটিত হয়েছে নবীর উম্মত বলে দাবিদারগনের হাতে !

পাঠক ,
একবার ভাবুন , রোজ কেয়ামতের ময়দানে আমি বা আপনি কোন মুখ নিয়ে নবীজীর (সাঃ) সামনে দাঁড়াব ?

কারন আমরা জ্ঞানে হোক বা অজান্তে হোক - প্রত্যেকেই কিন্ত বনু সকীফার অনুসরনকারী গর্বিত মুসলমান ।

আপনি হয়তোবা জানেন না যে , উপরোক্ত প্রতিটা ঘটনা সংঘটিত হয়েছে বনু সকীফাওয়ালাদের হাতে । এবং আমি সহ আপনি - আমরা সবাই এই বনু সকীফার অনুসরনকৃত মুসলমান ।

পৃথিবীতে যারা গাদীর এ খুমের অনুসরনকৃত মুমিন মুসলমান তাদেরকে আমরা হরহামেশা কাফের , রাফেজী , বাতিল ইত্যাদি বলে গালিগালাজ ও ঘৃনা করি ।

পৃথিবীতে ইসলাম টোটাল দুই প্রকার -
১)- বনু সকীফা ইসলাম
২)- গাদীর এ খুম ইসলাম ।

দুঃখের বিষয় যে , আমরা একটি বারও খুজে দেখলাম না যে , জন্ম থেকেই বনু সকীফার নেতৃত্বে আছেন স্বয়ং ঈবলীশ মহোদয় ।
আর গাদীর এ খুম হচ্ছে মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সাঃ) কতৃক নির্বাচিত ও অনুমোদিত ইসলাম ।

হায় , বনু সকীফার মুসলমান ! আমরা আর কতকাল নিদ্রামগ্ন থাকিব ???

আল্লাহুমা সাল্লে আলা মুহাম্মাদ ওয়া আলে মুহাম্মাদ ওয়া আজ্জিল ফারাজহুম ।

Tuesday, October 13, 2015

রাসুল (সাঃ) মুয়াবিয়াকে লানত করেছেন।

রাসুল (সাঃ) মুয়াবিয়াকে লানত করেছেন।
ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত , রাসুল (সাঃ) তাকে মুয়াবিয়াকে ডাকতে পাঠালে তিনি দেখেন সে খানা খাচ্ছে, ফিরে আসলে পূনরায় রাসূল (সাঃ) তাকে ডাকতে পাঠালে তিনি দেখলেন সে খানা খাচ্ছে। রাসুল (সাঃ) এর ডাকে সে সাড়া না দেওয়ার জন্যে রাসুল (সাঃ) বল্ললেন, “ আল্লাহ যেন কখনোই তার উদর পূর্তি না করেন।” 
(মুসলিম ৮খন্ড, ২৭পৃষ্ঠা)

ইতিহাসবেত্তাগণ লিখেছেন যে, মুয়াবিয়ার উপর রাসুল (সাঃ) এর বদ-দোয়া কার্যকর হয়েছিল, আর সে কারণেই মুয়াবিয়া খেতে খেতে হাঁপিয়ে উঠতো তবুও তার পেট ভরতো না।

অপর একটি হাদীস হচ্ছে, 
ইবনে আব্বাস হতে বর্ণিত হয়েছে, আমরা একদা রাসুল (সাঃ) এর সফর সঙ্গী ছিলাম। দু’জন লোককে গান করতে দেখা গেল, গানের মধ্যেই তারা একে অপরের কথায় জবাব দিচ্ছিল। নবী (সাঃ) বল্লেন, “দেখ তো এরা কারা”। লোকেরা বললো, “এরা হল মুয়াবিয়া এবং আমর ইবনুল আস”। তখন রাসুল (সাঃ) হাত উত্তোলন করে বল্লেন, “হে পরোওয়ারদিগার! এদেরকে বরবাদ করে দাও এবং জাহান্নামে ফেলে দাও”। 
(মুসনাদে আহমদ ৪র্থ খন্ড, ৪২১পৃষ্ঠা)

উল্লেখ্য যে, পরবর্তীতে মুয়াবিয়ার উজির ছিলো আমর ইবনে আস। সে ইমাম আলীর অনুসারীদেরকে বিকৃতভাবে শাস্তি এবং হত্যা করতো। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, মুহাম্মদ ইবনে আবি বকর (রাঃ) এর হাত-পা কর্তন করে গাধার চামড়ায় পুরে সেটাকে সেলাই করে আগুনে নিপে করেছিলো। মুহাম্মদ ইবনে আবি বকর (রাঃ) ছিলেন, হযরত আবু বকর (রাঃ) এর পুত্র এবং ইমাম আলীর অনুসারী।

ইমাম হুসাইন (রা.) এর মাজারের মাটি রক্তবর্ণে রূপান্তরিত হওয়ার দৃশ্য

২০১৩ সালের ১০ই মোহররাম
আশুরার মর্মান্তিক ঘটনার প্রায় ১৪ শত বছর পার হওয়ার পরও এখনও যেন সদ্য ঘটে যাওয়া কোন ঘটনার ন্যায়; ইমাম হুসাইন (রা:) এর মর্মান্তিক শাহাদাতের ঘটনার শোকে আজও শোকার্ত জমিন এবং আসমান।

১০ই মহররম; পবিত্র আশুরা। হযরত ইমাম হুসাইন (রা.) এর মূল মাজারের মাটির কিছু অংশ –যা তাঁর সাথে সম্পৃক্ত যাদুঘরে রক্ষিত রয়েছে- রক্তবর্ণ ধারণ করেছে। এ ঘটনা উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শীরা দেখেছে এবং ইমাম হুসাইন (রা:) এর মাজার পরিচালনা কমিটি এ ঘটনা সত্যায়িত করেছে এবং হযরত আবুল ফাদ্বলিল আব্বাস (রা.) এর মাজারের ওয়েব সাইটে রক্তবর্ণ ধারণকারী ঐ পবিত্র মাটির ছবি প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া ইমাম হুসাইন (রা.) এর মাজার পরিচালনা পরিষদের প্রধান এবং আয়াতুল্লাহ সিস্তানী’র প্রতিনিধি ‘হুজ্জাতুল ইসলাম শেইখ আব্দুল মাহদী কারবালাঈ’ স্বয়ং নিজেই উক্ত যাদুঘরে উপস্থিত হয়ে এ ঘটনা অবলোকন করেছেন। এছাড়া হাজার হাজার যায়ের (যেয়ারতকারী) উক্ত ঘটনার সচক্ষে দেখার জন্য উক্ত যাদুঘরে ভীড় জমায়।

ইমাম হুসাইন (রা.) এর মাজারের মাটির রক্তবর্ণ ধারণের ছবি নিম্নে দেওয়া হল :
শিয়া ও সুন্নি মাযহাবের নির্ভরযোগ্য হাদীস গ্রন্থসমূহে বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত জীবরাইল (রা.) যখন ইমাম হুসাইন (রা.) এর শাহাদাতের সংবাদ মহানবী (স.) কে প্রদান করেছিলেন তখন তিনি কারবালা হতে কিছু মাটি সাথে এনে মহানবী (স.) কে দিয়েছিলেন। আর তিনি (স.) ঐ মাটিকে স্বীয় স্ত্রী উম্মু সালামাহ (রা.) কে দিয়ে বললেন : যখন এ মাটি রক্তবর্ণ ধারণ করবে তখন আমার সন্তান হুসাইন কারবাবাল নামক স্থানে নিহত হবে’।

মূল হাদীসটি :
متن حدیث: عن «عمر بن ثابت» عن «الاعمش» عن «شقيق» عن «امّ سلمة» قالت: كان الحسين والحسين(عليهما السلام) يلعبان بين يدي رسول اللّه (صلى الله عليه وآله) في بيتي; فنزل جبريل فقال: "يا محمّد إن امتك تقتل ابنك هذا من بعدك" و أومأ بيده إلى الحسين(ع). فبكى رسول اللّه (صلى الله عليه وآله) وضمّه إلى صدره ثم قال رسول اللّه(ص): "وضعت عندك هذه التربة" فشمّها رسول اللّه (ص) قال: ريح كرب و بلاء، و قال: "يا ام سلمة إذا تحولت هذه التربة دماً فاعلمي أن ابني قد قتل".
অনুবাদ : ‘উমার বিন সাবেত’, আ’মাশ হতে, তিনি শাকিক হতে বর্ণনা করেছেন যে, ‘হযরত উম্মুল মোমেনিন সালমা (রা:) বলেছেন : একদা হাসান ও হুসাইন (রা:)আমার গৃহে মহানবী (স.) এর সম্মুখে খেলা করছিলেন। এমতাবস্থায় হযরত জীবরাইল (আ.) অবতীর্ণ হয়ে মহানবী (স.) কে বললেন : ‘হে মুহাম্মাদ(দ:)আপনার উম্মত আপনার পর আপনার এ সন্তানকে হত্যা করবে’। এ সময় তিনি হাত দ্বারা হুসাইন [রা.] এর প্রতি ইশারা করলেন। মহানবী (স.) ক্রন্দন করলেন এবং হাসানাইন (ইমাম হাসান ও হুসাইন) কে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরলেন। অতঃপর মহানবী (স.), যে মাটি তাঁকে হযরত জীবরাইল (আ:) দিয়েছিলেন তা আমাকে দিয়ে বললেন : ‘হে উম্মে সালামাহ! এ মাটিকে তোমার নিকট রেখে দিলাম। যখন সেগুলো রক্তে পরিণত হবে বুঝবে যে, আমার পুত্র হুসাইন নিহত হয়েছে’।

সুন্নি মাযহাবের কিছু কিছু গ্রন্থেও এ হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে, তম্মধ্যে ‘ইবনে হাজার আসকালানী’ তার গ্রন্থ ‘তাহযীবুত তাহযীব’, ইবনে আবি বাকর হাইসামী তার মাজমাউয যাওয়ায়েদ, তাবরানী তার আল-মু’জামুল কাবীর গ্রন্থ.


Monday, October 12, 2015

দাবী করা হয় উমর রাঃ এর সাথে উম্মে কুলসুম বিনতে আলী এর বিবাহ হয় এবং তার থেকে নাকি সন্তানও জন্ম হয় আসলে কি তাই ?

দাবী করা হয় উমর রাঃ এর সাথে উম্মে কুলসুম বিনতে আলী এর বিবাহ হয় এবং তার থেকে নাকি সন্তানও জন্ম হয় আসলে কি তাই ?
এক ভাইজান জানতে চেয়েছেন তাই এটি পোস্ট করলাম, দাবী করা হয় উমরের সাথে উম্মে কুলসুম বিনতে আলী আঃ এর বিবাহ হয়এবং তার থেকে নাকি সন্তানও জন্ম হয়! যাদের নাম নাকি জায়েদ ও ফাতেমা !

ইতিহাস বলছে উমর ইসলাম গ্রহন করে ৪০ বছরে এবং তার মৃত্যু হয় ৬৩ বছরে !

হজরত আলী আঃ ইসলাম মানেন নয় বছর বয়সে যদিও তিনি এক মুহুর্তের জন্যও শিরক করেন নি! আর হজরত আলী আঃ বিবাহ করেন ২৫ বছর বয়সে অর্থাত ইসলাম আনার ১৬ বছর পরে!

আর হজরত আলীর বিবাহের সময় উমরের বয়স ছিলো ৫৬ বছর !

তাহলে উমরের বয়স কত বাকি থাকে যদি ইতিহাসের এই কথাটি মানা হয় যে তার মৃত্যু ৬৩ বছরে হয় ???

অর্থাৎ ৬৩-৫৬ বাদ গেলে, থাকে ৭ বছর মাত্র !

হজরত আলীর সর্ব প্রথম সন্তান হল ইমাম হাসান আঃ আর দ্বিতীয় হল ইমাম হোসায়েন আঃ আর তৃতীয় হল হজরত জ্যায়নাব আঃ আর চতুর্থ হল হজরত উম্মে কুলছূম আঃ!

এমতাবস্হায় যদি কমপক্ষে দুবছর বেশি করেও দেওয়া হয় উমরের বয়সের সাথে তাহলে উমরের মৃত্যুর সময় উম্মে কুলছুমের বয়স দাড়ায় মাত্র ৫ বছর!!!!

তাহলে বিবাহ হয়েছিলো কখন সন্তান তো দুরের কথা !!!!!
যখন উম্মে কুলছূমের বয়স ৩ বছর ছিলো তখন তার সাথে বিবাহ হয় উমরের ????????

মুল ঘটনাঃ
 সত্য ঘটনা হচ্ছে, যে উম্মে কুলছুমের বিবাহ হজরত উমরের সাথে হয় তিনি হলেন হযরত আবু বকরের মেয়ে। আবু বকরের মৃত্যুর পরে আসমা বিনতে উমাইস এর বিবাহ হজরত আলীর সাথে হয়, যিনি সঙ্গে করে নিয়ে আসেন মুহাম্মাদ বিন আবু বকর ও উম্মে কুলছুম বিনতে আবু বকর কে ।

বনু সাফিকা ও আবু বকরের খেলাফত লাভ সুন্নি সোর্স থেকে সংগ্রহীত

বনু সাফিকা ও আবু বকরের খেলাফত লাভ সুন্নি সোর্স থেকে সংগ্রহীত
বনু সাফিকা ও আবু বকরের খেলাফত লাভ -রাসুল সাঃ এর ওফাতের পর কিছু আনসার সাহাবী তাঁদের নিজেদের মধ্য থেকে খলীফা নির্বাচনে প্রবৃত্ত হন। বনী সাফিকার ঝোপ-ঝাড় আশ্রয়কেন্দ্রে তাঁরা সমবেত হন। সাদ ইবনে উবায়দা (রা:) যিনি খাযরাজ গোত্রের প্রধান ছিলেন, তিনি অসুস্থ অবস্থায় সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তিনি আনসার সাহাবাদের উদ্দেশ্যে বল্লেন:
“ওহে আনসার সম্প্রদায়! তোমরা যে গুণাবলীর অধিকারী তা অন্য কোনো গোত্র ধারণ করে না। মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম মক্কা নগরীতে তেরোটি বছর তাঁর গোত্রকে ইসলাম ধর্মের দিকে আহবান করেছিলেন। তাদের মধ্যে খুব কম সংখ্যকই তাঁকে বিশ্বাস করেছে। আর যারা তাঁকে বিশ্বাস করেছে, তারা জেহাদ করার মতো পর্যাপ্ত সংখ্যক ছিলেন না। আল্লাহ্ তা’লা যখন তোমাদেরকে মুসলমান হওয়ার সম্মান দান করেন, তখন তিনি তোমাদেরকে রাসূলুল্লাহ্ (দ:) ও তাঁর আসহাবকে রক্ষা করার এবং জেহাদ দ্বারা দ্বীন ইসলামকে প্রচার-প্রতিষ্ঠা করার সৌভাগ্যও দান করেন। তোমরাই শত্রুদেরকে পরাভূত করেছ। তোমাদের তরবারির ভয়েই আরবের কৃষকেরা মুসলমান হয়ে গিয়েছিল। রাসূলুল্লাহ্ (দ:) বেসালপ্রাপ্ত হওয়ার আগে তোমাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছিলেন। এখন নেতৃত্ব করার অধিকার তোমাদেরই রয়েছে। এই অধিকার তোমরা অন্য কাউকে দেবে না।”
অধিকাংশ আনসার সাহাবী সেখানে উপস্থিত ছিলেন; তাঁরা সবাই বল্লেন, “আপনি ঠিক বলেছেন। আমরা আপনাকে খলীফা নির্বাচন করলাম, আল্লাহ্ আপনাকে সাহায্য করুন!” কিন্তু আনসারদের মধ্যে আউস্ গোত্র একে পছন্দ করলেন না। তাঁরা তাঁদের নেতা উসাইয়াদ ইবনে হুদাইরের আশপাশে সমবেত হলেন।
অপর দিকে মুহাজির সাহাবীগণও আনসারের দুইটি গোত্র থেকে খলীফা নির্বাচনকে পছন্দ করেন নি। কেননা, সমগ্র আরব ভূ-খণ্ডে কোরাইশ গোত্র-ই ছিল সবচেয়ে অভিজাত ও মহাসম্মানিত। তাই মুসলমানদের মধ্যে বড় ধরনের একটা বিতর্ক অত্যাসন্ন হলো।
এমনি একটি সংকটময় মুহূর্তে জীবন রক্ষক হযরত খাজা খিজির (আ:)-এর মতো হযরত আবু বকর (রা:), হযরত উমর (রা:) এবং হযরত আবু উবায়দা (রা:) বিতর্ক স্থানে উপস্থিত হন। সেই সময় জনৈক আনসার উঠে দাঁড়িয়ে ভাষণ দান করছিলেন, “আমরা রাসূলুল্লাহ্ (দ:)-কে সাহায্য করেছি। মোহাজিরদেরকে আশ্রয় দিয়েছি। খলীফা আমাদের মধ্য থেকেই হওয়া বাঞ্ছনীয়।”
পক্ষান্তরে, রাসূলুল্লাহ্ (দ:) সব সময়ই তাঁর ডানে হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা:) ও বাম পাশে হযরত উমর ফারুক (রা:)-কে রাখতেন। হযরত আবু উবায়দা (রা:) সম্পর্কে তিনি বলতেন, “এই উম্মতের বিশ্বাসভাজন ব্যক্তি।” যখন এই তিনজন একত্রে দৃশ্যপটে আবির্ভূত হলেন, তখন মনে হলো যেন রাসূলুল্লাহ্ (দ:)-ই পুনরুত্থিত হয়ে আগমন করেছেন। সবাই নিশ্চুপ হয়ে তাঁদের বক্তব্য শ্রবণের অপেক্ষায় রইলেন। হযরত আবু বকর (রা:) বল্লেন:
“এই উম্মতের লোকেরা ইতিপূর্বে মূর্তি পূজা করতো। আল্লাহ্ তা’লা তাদের মাঝে একজন রাসূল (দ:) প্রেরণ করেন যাতে তারা আল্লাহর-ই এবাদত করেন। কাফেররা নিজেদের পিতৃপুরুষের ধর্ম পরিত্যাগ করাকে কষ্টকর মনে করেছিল। আল্লাহ্ তা’লা মোহাজিরদেরকে ঈমানদার তথা বিশ্বাসী হওয়ার সম্মান নসীব করেন। তাঁরা রাসূলুল্লাহ্ (দ:)-এর সাথী ও দুঃখের ভাগীদার হয়ে যান। দ্বীনের শত্রুদের অত্যাচার-নিপীড়ন তাঁরা তাঁর সাথে ভাগাভাগি করে সহ্য করেন। তাঁরাই হক্ক সোবহানাহু ওয়া তা’লার প্রাথমিক এবাদতকারী। এ কারণেই খলীফা তাঁদের মধ্য থেকেই হওয়া বাঞ্ছনীয়। এ ক্ষেত্রে তাঁদের অংশীদার কেউই হতে পারে না। তাদের এ অধিকার হরণ করা নিষ্ঠুর আচরণ হবে নিঃসন্দেহে। ওহে আনসার! দ্বীন ইসলামের প্রতি তোমাদের খেদমতকেও অস্বীকার করা যায় না। আল্লাহ্ তা’লা তাঁর নবী (দ:) এবং দ্বীনকে সাহায্য করার জন্যে তোমাদের পছন্দ করে নিয়েছেন। তিনি তাঁর রাসূল (দ:)-কে তোমাদের মাঝে প্রেরণ করেছেন। প্রাথমিক মোহাজির হওয়ার সম্মান লাভকারীদের পরে তোমাদের চেয়ে অধিক মূল্যবান আর কেউ নেই। তোমরা-ই রাসূলুল্লাহ্ (দ:)-কে অনুসরণ করেছ। তাঁকে সাহায্য করার গর্ব ও সম্মান তোমাদের-ই প্রাপ্য। কেউই এতে দ্বিমত পোষণ করতে পারবে না। তবুও সমস্ত আরববাসী কুরাইশ বংশীয় কাউকে খলীফা পদে অধিষ্ঠিত দেখতে চায়, আর কাউকেই তারা দেখতে চায় না। কেননা, সবাই জানে যে বংশ-মর্যাদা ও গুণাবলীতে কুরাইশ বংশই আরবীয়দের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। আর তাদের ভূমিও আরবের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত। আমাদেরকে আমীর তথা আদেশকর্তা হতে দাও, তোমরা হবে আমাদের উজির ও উপদেষ্টা। তোমাদের উপদেশ ও পরামর্শ ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত বা কাজ করা হবে না।”
অতঃপর হযরত উমর ফারুক (রা:) বল্লেন, ‘ওহে আনসার সম্প্রদায়! রাসূলে পাক (দ:) তাঁর অসুখের সময় তোমাদের জিম্মাদারী আমাদের কাছে ন্যস্ত করেছেন। যদি তোমরা হুকুম দেয়ার পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার অবস্থায় থাকতে, তাহলে আমাদেরকে তিনি তোমাদের জিম্মাদারীতে রেখে যেতেন।”
এ সব কথা শুনে সাহাবায়ে কেরাম কী বলবেন তা বুঝতে না পেরে গভীর চিন্তামগ্ন হলেন। তাঁদের মধ্যে হোবাব বিন মুনযির উঠে দাঁড়িয়ে প্রস্তাব করলেন, “আমাদের থেকে একজন এবং তোমাদের থেকে একজন আমীর নির্বাচন করা যেতে পারে।” এতে হযরত উমর ফারুক (রা:) জবাব দিলেন, “একই সময়ে দুইজন আমীর থাকতে পারে না। রাসূলুল্লাহ্ (দ:)-এর একই গোত্রভুক্ত না হলে আরবীয় সর্বসাধারণ খলীফাকে গ্রহণ কিংবা মান্য করবে না। হোবাব এর প্রতিবাদ জানিয়ে বল্লেন, “হে আনসার! আরবীয় সর্বসাধারণ তোমাদের তরবারির মাধ্যমে এই ধর্মকে গ্রহণ করেছে। তাই এ অধিকার থেকে কেউ যেন তোমাদেরকে বঞ্চিত না করতে পারে!”
উবায়দা ইবনে জাররাহ্ (রা:) হুঁশিয়ার করলেন এ কথা বলে, “হে আনসার সম্প্রদায়! তোমরা-ই এ দ্বীনের প্রারম্ভিক খেদমতগার। সতর্ক হও যাতে তোমরা এর প্রথম বিনষ্টকারী না হও!” এ ধরনের বাদানুবাদের মুহূর্তে বশীর ইবনে সা’দ বিন নু’মান বিন কা’ব বিন খাজরাজ (রা:) নামের খাজরাজ গোত্রভুক্ত জনৈক আনসার সাহাবী উঠে দাঁড়িয়ে বল্লেন, “ওহে মুসলমানবৃন্দ! হযরত রাসূলে খোদা (দ:) কুরাইশ গোত্রভুক্ত। তাই খলীফা তাদের মধ্য থেকে হওয়াই যথাযথ। এটাই সঠিক হবে। হ্যাঁ, আমরাই প্রাথামিক পর্যায়ে মুসলমান হয়েছিলাম। ইসলামের খেদমতে নিজেদের জান-মাল কোরবানি করার সম্মান আমরাই লাভ করেছি। অথচ আমরা তা করেছি এ কারণে যে, আমরা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল (দ:)-কে ভালোবাসি। আমরা এ খেদমতের বিনিময়ে কোনো বৈষয়িক প্রতিদান প্রত্যাশা করি না।” হোবাব জিজ্ঞেস করলেন, “হে বশীর! তুমি কি তোমার জেঠাত ভাইয়ের প্রতি ঈর্ষাপরায়ণ?” জবাবে বশীর বল্লেন, “আল্লাহর নামে শপথ, আমি মোটেই ঈর্ষাপরায়ণ নই। আমি শুধু কুরাইশদের হক্কের (অধিকারের) ওপর কারো পদদলন দেখতে চাই না।”
ওই সময় হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা:) বল্লেন, “আমি এই দুইজন ব্যক্তিকে মনোনীত করছি তোমাদের জন্যে, তাদের যে কাউকে তোমরা পছন্দ করতে পারো।” তিনি হযরত উমর (রা:) ও হযরত উবায়দা (রা:)-কে দেখিয়ে এ কথা বল্লেন। কিন্তু তাঁরা উভয়ই পিছু হটে গিয়ে বল্লেন, “রাসূলে খোদা (দ:) যাঁকে সর্বাগ্রে স্থান দিয়েছেন তাঁর মোকাবেলায় কে দাঁড়াতে পারে? এতে উচ্চস্বরে তর্ক-বিতর্ক আরম্ভ হলো এবং বিশৃংখলা দেখা দিলো।
এমতাবস্থায় হযরত উমর ফারুক (রা:) হযরত আবু বকর (দ:)-কে উদ্দেশ্য করে বল্লেন, ”রাসূলুল্লাহ (দ:) আপনাকে নামাযে তাঁর খলীফা নিয়োগ করেছিলেন যা ইসলামের ভিত্তিস্তম্ভ। তিনি আপনাকে আমাদের সামনে স্থান দিয়েছেন। আপনার হাত সামনে বাড়ান। আমি আপনাকে খলীফা হিসেবে পছন্দ করেছি। হযরত উবায়দা (রা:)-ও অনুরূপ করতে যখন প্রস্তুত হচ্ছিলেন, এমনি সময়ে বশীর (রা:) সামনে লাফিয়ে পড়ে হযরত আবু বকর (রা:)-এর হাত মোবারক ধরলেন এবং সবার আগে আনুগত্যের বায়াত হলেন। তিনি বল্লেন, “আপনি-ই আমাদের নতুন খলীফা।” হযরত উমর ফারুক (রা) এবং হযরত উবায়দা (রা:)-ও আনুগত্যের বায়াত হলেন। সমগ্র আউস গোত্র ও তার নেতা উসাইয়াদ ইবনে হুদাইর এসে নতুন খেলাফতকে মেনে নিলেন। তাঁদেরকে দেখে খাজরাজ গোত্র-ও আনুগত্যের বায়াত হলো।
যদি আবু বকর (রা:), উমর (রা:) এবং আবু উবায়দা (রা:) ওই সময় ঘটনাস্থলে না পৌঁছুতেন, তবে সা’দ ইবনে উবায়দা (রা:)-কে খলীফা হিসেবে মেনে নেয়া হতো, যা আউস্ ও খাজরাজ গোত্রের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাতের জন্ম দিতো। অপর দিকে কুরাইশ গোত্র-ও এর বিরোধিতা করতো যার দরুণ মুসলমান সম্প্রদায় বহুধা বিভক্ত হয়ে পড়তো। হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা:) এই বিপদ দূর করে দেন। তাঁর খলীফা হওয়ার ফলে ইসলাম একটা বড় ধরনের সংকট থেকে রক্ষা পায় এবং মুসলমান সম্প্রদায়ও দ্বিধা-বিভক্তি থেকে বেঁচে যায়।
সোমবার দিন খলীফা নির্বাচিত হওয়ার পরে হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা:) মঙ্গলবার দিন মসজিদে নববীতে গমন করেন এবং সেখানে সমস্ত সাহাবায়ে কেরামকে সমবেত করেন। মিম্বরে আরোহণ করে তিনি প্রথমে হামদ ও সানা পাঠ করেন এবং তার পরে এই ভাষণটি দেন: “ওহে মুসলমান সম্প্রদায়! আমি তোমাদের শাসনকর্তা ও রাষ্ট্রপতি হয়েছি। তবু আমি তোমাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ নই। যদি আমি ভাল কাজ করি, তাহলে আমাকে সাহায্য করো। আর যদি আমি ভুল করি, তবে আমাকে সঠিক পথ-প্রদর্শন করো। সংশোধন করাটা বিশ্বস্ততা। মিথ্যা বলাটা বিশ্বাসঘাতকতা। তোমাদের মধ্যে দুর্বল ব্যক্তি আমার কাছে অত্যন্ত মূল্যবান। আমি তার হক্ক বা অধিকার সংরক্ষণ করবো। আর যে ব্যক্তি নিজ ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে, সে আমার কাছে দুর্বল। কেননা, আমি তার দ্বারা হরণকৃত অন্যান্যদের অধিকার তারই কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে আসবো, ইনশা’আল্লাহ্ তা’লা। তোমাদের কেউই যেন জিহাদকে অবহেলা না করে। যারা জেহাদ পরিত্যাগ করবে, তারা ঘৃণিত হয়ে যাবে। আমি যতোক্ষণ আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল (দ:)-কে মান্য করবো, শুধু ততোক্ষণই তোমরা আমাকে মান্য করবে। যদি আমি আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল (দ:)-কে অমান্য করি এবং সত্য, সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হই, তবে আমাকে অনুসরণ করার আর কোনো দরকার-ই তোমাদের থাকবে না। উঠে দাঁড়াও, আমরা এক সাথে নামায আদায় করবো। আল্লাহ্ তা’লা তোমাদের সকলকে আশীর্বাদধন্য করুন।”
অতঃপর তাঁরা রাসূলে করীম (দ:)-এর শেষকৃত্য সংক্রান্ত সমস্ত আচার-অনুষ্ঠান সুসম্পন্ন করেন। সন্ধ্যা পর্যন্ত দলে দলে নারী, পুরুষ, শিশু ও গোলাম-বর্গ সকলে ওই ঘরে প্রবেশ করে জামাত ব্যতিরেকেই কেবল ব্যক্তিগতভাবে সালাত-সালাম পাঠ করে বেরিয়ে আসেন। বুধবার রাতের অন্ধকারে তাঁরা মহানবী (দ:)-কে ওই ঘরে সমাধিস্থ করেন।
’কাসাস-এ-আম্বিয়া’ গ্রন্থের ৪১০ পৃষ্ঠায় আরো লেখা আছে:
রাসূলে খোদা (দ:) যতোদিন তাঁর যাহেরী জিন্দেগীতে ছিলেন, ততোদিন ওহী (ঐশী প্রেরণা) তাঁর প্রতি অবতীর্ণ হয়েছিল এবং উম্মত তথা মুসলমান সম্প্রদায়ও আল্লাহ্ তা’লার বিধি-বিধান সম্পর্কে অবগত হতে পেরেছিলেন। তাঁর বেসালের পরে আর ওহী অবতীর্ণ হয় নি। তবু অধিকাংশ সাহাবা-ই কুরআন মজীদকে তাঁদের স্মৃতিতে গেঁথে ফেলেছিলেন। আর যে সব বিষয় কুরআন মজীদে প্রকাশ্যভাবে ব্যাখ্যা করা হয় নি তা সুন্নাতে সানিয়্যা তথা রাসুলুল্লাহ্ (দ:)-এর কথা, কাজ ও তাঁর সম্মতিতে অন্যদের কৃত কর্মের অনুসরণে সম্পাদিত হচ্ছিল। তবে সুন্নাতে সানিয়্যা ও হাদীস শরীফগুলো সাহাবায়ে কেরামের স্মৃতিপটে পুরোপুরিভাবে আঁকা ছিল না। কেননা, তাঁদের কেউ কেউ ব্যস্ত ছিলেন ব্যবসা-বাণিজ্যে; আর কেউ কেউ তদারকি করছিলেন তাঁদের খেজুর বাগান ও ক্ষেত-খামার। এমতাবস্থায় তাঁদের পক্ষে মহানবী (দ:)-এর সমস্ত সোহবত লাভ করা সম্ভব হয় নি। যাঁরা কোনো একটি সোহবত পেতেন, তাঁরা অন্যান্যদের সে সোহবতে শ্রুত বিষয়াদি সম্পর্কে অবহিত করতেন। ফলে হাদীস শ্রবণ করেন নি এমন ব্যক্তি ওগুলোর শ্রোতাদের কাছ থেকে জিজ্ঞেস করে জানতে সক্ষম হতেন। বস্তুতঃ রাসূলুল্লাহ্ (দ:)-কে সমাধিস্থ করতে সাহাবায়ে কেরামকে অনেক চিন্তাভাবনা করতে হয়েছে। হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা:) কর্তৃক বর্ণিত একটি হাদীস্ শরীফকে অনুসরণ করেই তাঁরা রাসূলুল্লাহ্ (দ:) যে ঘরে বেসালপ্রাপ্ত হন সেখানে তাঁকে সমাধিস্থ করেন। অনুরূপভাবে, তাঁর উত্তরাধিকারীদের মধ্যে তাঁরই রেখে যাওয়া সম্পত্তি বণ্টন করার ক্ষেত্রেও সাহাবায়ে কেরাম প্রচুর কষ্ট স্বীকার করেন। আবারো হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা:)-ই নিম্নোক্ত হাদীসটি উদ্ধৃত করেন: “আম্বিয়ায়ে কেরাম (আ:) কোনো উত্তরাধিকার রেখে যান না”। ফলে এই হাদীস অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
মুসলমান সম্প্রদায়ের মাতা হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা:) বলেন, ‘যখন রাসূলুল্লাহ্ (দ:) বেসালপ্রাপ্ত হন, তখন মোনাফেকরা বিদ্রোহ ঘোষণা করে। আরবীয়রাও ইসলামদ্রোহী হয়ে যায়। আনসারবৃন্দ এর থেকে দূরে সরে থাকেন। আমার পিতার ওপরে যে বোঝা বা মসিবত এসে পড়ে তা পাহাড়ের ওপরে পড়লে নিশ্চয় পাহাড় চুরমার হয়ে যেতো। এমনি ছিল অবস্থা, যেখানে বিভেদ-বিভক্তি দানা বাঁধতো সেখানেই আমার পিতাকে উপস্থিত হতে হতো এবং তা মিটমাট করে দিতে হতো।”
যখন সাহাবায়ে কেরাম এমন কোনো বিষয়ের সম্মুখীন হতেন যা তাঁদের অজ্ঞাত, তখন তাঁরা সুন্নাতে সানিয়্যাতে এর সমাধান খুঁজতেন। যদি সমাধান তাতে না পাওয়া যেতো, তবে তাঁরা রায় (গবেষণালব্ধ সিদ্ধান্ত) কিংবা কেয়াস্ (তুলনা দ্বারা অনুসন্ধান) পদ্ধতি ব্যবহার করতেন। অর্থাৎ, তাঁদের জ্ঞাত কোনো বিষয়ের সাথে কেয়াস বা তুলনা করে অজ্ঞাত বিষয়াটি সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতেন। এটাই এজতেহাদের দ্বার উম্মুক্ত করে। যদি আসহাবে কেরাম ও অন্যান্য মুজতাহিদদের এজতেহাদ কোনো বিষয়ে একমত হতো, তবে সে বিষয়ে আর কোনো সন্দেহ থাকতো না। এজতেহাদের এই ঐকমত্যকে এজমায়ে উম্মত বলে। এজতেহাদ প্রয়োগের জন্যে প্রয়োজন ছিল গভীর জ্ঞানী হওয়া। এই গভীর জ্ঞানী আলেমদেরকেই মুজতাহিদ বলে। যদি মুজতাহিদদের কৃত এজতেহাদ একে অপরের সাথে না মিলতো, তবে প্রত্যেক মুজতাহিদের জন্যে নিজ এজতেহাদ অনুসরণ করা ওয়াজিব হতো।
খেলাফতের নির্বাচনটিও এজতেহাদের বিষয় ছিল। এমন কিছু হাদীস্ শরীফ ছিল যেগুলোতে ঘোষিত হয়েছিল যে হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা:), হযরত উমর ফারুক (রা:) হযরত উসমান যিন্নুরাইন (রা:) এবং শেরে খোদা হযরত আলী মোরতজা (ক:) খলীফা হবেন। কিন্তু তাঁদের খেলাফতের সময়কাল স্পষ্টভাবে ঘোষিত হয় নি। রাসূলুল্লাহ্ (দ:) এ কথা বলেন নি, “আমার বেসালের পরে অমুককে খলীফা নিয়োগ করো।” তিনি এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্যে সাহাবায়ে কেরামের ওপর দায়িত্ব ন্যস্ত করেছিলেন। খেলাফতের নির্বাচনে আসহাবে কেরাম কর্তৃক কৃত এজতেহাদ একে অপরের সাথে মিলে নি। এ ক্ষেত্রে তিনটি ভিন্ন প্রকৃতির এজতেহাদ ছিল:
প্রথমটি ছিল আনসারদের রায়; তাঁরা বলেন যে, “ইসলামের সর্বাধিক খেদমতকারী ব্যক্তি-ই হবেন খলীফা। আরবীয় সম্প্রদায় আমাদের তরবারির ছায়ায় মুসলমান হয়েছিলেন। তাই খলীফা আমাদের মধ্য থেকেই হওয়া বাঞ্ছনীয়।”
দ্বিতীয় প্রকৃতির এজতেহাদ ছিল অধিকাংশ সাহাবায়ে কেরামের গৃহীত পদ্ধতি; তাঁরা বলেন যে, “খলীফাকে উম্মতের মাঝে বিধি-বিধান প্রয়োগ করার মতো পর্যাপ্ত ক্ষমতাসম্পন্ন হতে হবে। আরবীয়দের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সম্মানিত ও ক্ষমতাশালী গোত্র ছিলো কুরাইশ। তাই খলীফা কুরাইশ গোত্রভুক্ত হওয়াই উচিৎ।”
তৃতীয় প্রকার এজতেহাদ ছিল হাশেমীদের রায়; তাঁরা বলেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (দ:)-এর আত্মীয় স্বজনদের মধ্য থেকেই খলীফা নির্বাচন করতে হবে।
তিনটি এজতেহাদের মধ্যে সঠিক এজতেহাদটি ছিল দ্বিতীয়টি। হ্যাঁ, আনসার সাহাবাবৃন্দ দ্বীন ইসলামের ব্যাপক খেদমত আঞ্জাম দিয়েছিলেন সত্য। অপর দিকে রাসূলে আকরাম (দ:)-এর আত্মীয়-স্বজনের মর্যাদার ব্যাপারটিও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তবুও খেলাফত তো ছিল না কোনো আরাম কেদারা যা অতীতের খেদমতের জন্যে উপহারস্বরূপ দেয়া যেতো। এটা ওয়ারিশী সম্পত্তিও ছিল না যে ওয়ারিশ বা উত্তরাধিকারীদের মাঝে বণ্টন করে দেয়া যেতো। দ্বিতীয় এজতেহাদটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কুরাইশের হাতে খেলাফত ন্যস্ত করা হয় এ কারণে নয় যে রাসূলুল্লাহ্ (দ:) ওই গোত্রভুক্ত, বরং এ কারণেই যে সমগ্র আরব ভূ-খণ্ডে কুরাইশ গোত্র ছিল সম্মান, ক্ষমতা, প্রভাব ও মর্যাদার জন্যে সুপ্রসিদ্ধ। কেননা, মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য, বিশ্বস্ততা ও সামাজিক শৃংখলা বিধান করার জন্যেই খেলাফতের কার্যকারিতা ছিল। আর এ কাজ করতে কর্তৃত্বের প্রয়োজন ছিল। খলীফার কর্তব্য হলো ফিতনা-ফ্যাসাদ ও বিদ্রোহ দমন/প্রতিরোধ করা, শান্তি ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, জেহাদ পরিচালনা করা এবং শৃংখলা বজায় রাখা, যাতে মুসলমান সমাজ তাঁদের বিষয়াদি ও ব্যবসা-বাণিজ্য সহজে সুসম্পন্ন করতে সক্ষম হন। এগুলো করতে ক্ষমতার প্রয়োজন।
খেলাফত নির্বাচনে সাহাবায়ে কেরাম যে বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েছেন, তা হলো মুসলমান গোত্রগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের গোড়া পত্তন। কুরাইশ গোত্রের দশটি শাখার একটি হাশেমী গোত্রকে করা সম্ভব ছিল না। রাষ্ট্রীয় সরকার প্রতিষ্ঠায় যতো অধিক সংখ্যক মানুষ জড়িত হবে, ততোই শক্তিশালী হবে সরকার। এই কারণেই কুরাইশ গোত্রের নেতৃস্থানীয় কাউকে নির্বাচন করা জরুরি ছিল। আর নির্বাচিত ব্যক্তিকে কেবল গোত্রীয় পরিচয় ও বংশ মর্যাদায় শ্রেষ্ঠ হলে চলবে না, বরং ইসলামের দৃষ্টিতেও উচ্চ মকামের অধিকারী হতে হবে। কুরাইশ গোত্রের মধ্যে তখন শ্রেষ্ঠ ছিল বনী উমাইয়া বংশ এবং তাদের মধ্যে নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন আবু সুফিয়ান ইবনে হরব। তবু ওহুদ জেহাদে মুসলমানদের প্রতি তাঁর দ্বারা কৃত ক্ষতি তখনো একদম বিস্মৃত হয় নি। ইতিমধ্যে তিনি একজন খাঁটি ও দৃঢ় বিশ্বাসী মুসলমানে পরিণত হয়েছিলেন। কিন্তু অন্যান্য মুসলমানগণ তাঁকে পুরোপুরিভাবে বিশ্বাস করতে পারেন নি। ফলে হিজরতের সময় গুহাতে রাসূলুল্লাহ্ (দ:)-এর সাথী, প্রাথমিক সময়কার মুসলমান ও অন্যান্যদেরকে মুসলমান হতে উদ্বুদ্ধকারী এবং রাসূলুল্লাহ্ (দ:) কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত ইমাম হযরত আবু বকর (রা:)-এর সমকক্ষ আর কেউই ছিলেন না। সবাই তাঁর পক্ষে রায় দেবেন এটাই ছিল নিশ্চিত। উপরন্তু, যেহেতু খলীফা নির্বাচনে সকল সাহাবা ঐক্যবদ্ধভাবে সমর্থন করাটা ছিল স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, সেহেতু আনসার সাহাবাদের নিজেদের মধ্যে খলীফা নির্বাচনের প্রচেষ্টা বিশৃংখলার জন্ম দিতো। অতএব, হযরত আবু বকর (রা:) ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে এই বিপদকে মোকাবেলা করে মুসলমান সমাজকে মহা একটা ফিতনা থেকে রক্ষা করেন।
এই সময় হযরত আলী (ক:) তাঁর স্ত্রী হযরত ফাতেমা (রা:)-এর ঘরে অবস্থান করছিলেন। হযরত আবু বকর (রা:)-এর মেয়ের জামাই যুবাইর, মিকদাদ, সালমান, আবু যর এবং আম্মার ইবনে ইয়াসের প্রমুখ সাহাবায়ে কেরাম (রা:)-গণও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের এজতেহাদ তৃতীয় দলটির সাথে মিলে যায়। তাই হযরত আব্বাস (রা:) হযরত আলী (রা:)-এর কাছে এসে হাত বাড়িয়ে তাঁর খেলাফতের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন। কিন্তু হযরত আলী (ক:) ইতিমধ্যেই জেনে গিয়েছিলেন যে হযরত আবু বকর (রা:) খলীফা হয়ে গিয়েছেন, তাই তিনি এই প্রস্তাব অস্বীকার করেন। আবু সুফিয়ান (রা:) বলেন, “আপনার হাত বাড়িয়ে দিন, আমি আনুগত্য স্বীকার করবো। যদি আপনি ইচ্ছা করেন, তবে আমি সর্বত্র অশ্বারোহী ও পদাতিক সৈন্য দ্বারা পরিপূর্ণ করে দেবো।” হযরত আলী (ক:) এ প্রস্তাবকেও নাকচ করে দেন এ কথা বলে, “ওহে আবু সুফিয়ান! ইসলামী জাতির মধ্যে কি আপনি বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে চান?”
অতএব, এটা স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে মুসলমানদের মধ্যে একটা সম্ভাব্য ফিতনা বা বিবাদের ব্যাপারে হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা:) ও হযরত আলী (ক:) উভয়ই শংকিত ছিলেন। প্রথমাবস্থায় সাকিফার ঝোপ-ঝাড়ের আশ্রয়কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে না ডাকার কারণে হযরত আলী (ক:) একটু ব্যথিত হয়েছিলেন। হযরত মুহিউদ্দীন ইবনে আরবী (রহ:)-এর “মুসামারাত” গ্রন্থে এবং হামিদ বিন আলী ইমাদী (১৭৫৭ খৃষ্টাব্দ)-এর “দাও’উস্ সাবাহ্” গ্রন্থে কৃত ব্যাখ্যানুযায়ী, হযরত আবু উবায়দা (রা:) হযরত আলী (ক:) যে ঘরে অবস্থান করছিলেন, সেখানে গমন করেন। হযরত আবু বকর (রা:) ও হযরত উমর (রা:) কর্তৃক প্রদত্ত সমস্ত বক্তব্য-বিবৃতি তিনি হযরত আলী (ক:)-এর কাছে বর্ণনা করেন [এ সকল দীর্ঘ ও কার্যকর ভাষণ ’কাসাসে আম্বিয়া’ গ্রন্থে লিপিবদ্ধ আছে]। হযরত আলী (ক:) সেগুলো মনোযোগ সহকারে শোনেন। এ সব বক্তব্য এতো আকর্ষণীয় ছিল যে, তা তাঁর মজ্জার অভ্যন্তরে প্রবেশ করার অনুভূতি তিনি লাভ করেন। তিনি বল্লেন,“ওহে আবু উবায়দা! খলীফা হওয়ার উদ্দেশ্যে কিংবা ’আমর-ই-মা’রূফ’ (সৎ কাজের আদেশ)-এর প্রতিবাদ করার জন্যে অথবা কোনো মুসলমানকে সমালোচনা করার খেয়ালে আমি এ ঘরের কোণায় বসি নি। রাসূলে খোদা (দ:)-এর বিচ্ছেদ জ্বালায় আমার বোধশক্তি লোপ পেয়েছে এবং আমি পাগলের মতো হয়ে গিয়েছি।” পরবর্তী সকালে তিনি মসজিদে নববীতে প্রবেশ করে সবাইকে অতিক্রম করে হযরত আবু বকর (রা:)-এর কাছে গিয়ে আনুগত্য স্বীকার করেন এবং তার পর বসে পড়েন। খলীফা তাঁকে বলেন, “আপনি আমাদের কাছে পবিত্র ও সম্মানিত। যখন আপনি রাগান্বিত হন, তখনো আল্লাহকে ভয় করেন। যখন আপনি খুশি হন, তখন খোদা তা’লাকে ধন্যবাদ জানান। আল্লাহ্ প্রদত্ত পদমর্যাদার অতিরিক্ত কিছু দাবি যে ব্যক্তি করেন না, তিনি কতো মহান ও সৌভাগ্যবান! আমি খলীফা হতে চাই নি। তবু আমাকে তা গ্রহণ করতে হয়েছে পাছে কোনো ফিতনা জাগ্রত হয়। এ দায়িত্ব পালনে আমার বিশ্রাম নেই। আমার ওপর একটা ভারী বোঝা ন্যস্ত করা হয়েছে। এটা বহন করা শক্তি আমার নেই। আল্লাহ্ আমায় শক্তি দান করুন! আল্লাহ্ তা’লা আপনার কাঁধ থেকে এই বোঝা নামিয়ে দিয়েছেন। তাই আপনাকে আমাদের প্রয়োজন। আমরা আপনার শ্রেষ্ঠত্ব ও উন্নত গুণাবলী সম্পর্কে ওয়াকিবহাল।”
হযরত আলী (ক:) ও যুবাইর (রা:) বলেন যে, খেলাফতের জন্যে হযরত আবু বকর (রা:) অন্যান্যদের চেয়ে অধিক যোগ্য ছিলেন। তাঁরা আরো বলেন যে খলীফা নির্বাচন সম্পর্কে তাঁদেরকে না জানানোর জন্যে তাঁরা প্রথমাবস্থায় দুঃখিত হলেও পরে তাঁরা এর দরুণ অনুতপ্ত হন। খলীফা তাঁদের ক্ষমা করেন। অতঃপর হযরত আলী (ক:) মসজিদে নববী থেকে প্রস্থানের অনুমতি চেয়ে উঠে দাঁড়ান। হযরত উমর ফারুক (রা:) তাঁকে বিনয় সহকারে বিদায় দেন। বিদায় নেয়ার মুহূর্তে হযরত আলী (ক:) বলেন, “আমার এখানে আসায় দেরি হওয়াটা খলীফার বিরোধিতা করার উদ্দেশ্যে নয়; আর এখন এখানে আসাটাও ভয় হতে নিঃসৃত নয়।” সকল হাশেমী হযরত আলী (ক:)-এর দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে খলীফার আনুগত্য স্বীকার করে নেন। ফলে একটা মতৈক্য প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়।
খেলাফত নির্বাচনের পুরো সময় হযরত আবু বকর (রা:) ও হযরত আলী (ক:) উভয়ই অত্যন্ত তৎপর এবং জ্ঞানসমৃদ্ধ ভূমিকা পালন করেন। সাকিফার ঝোপ-ঝাড়ের আশ্রয় কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত সভায় সেই দিন হযরত আলী (ক:)-কে না ডাকাটাই সৌভাগ্যময় ছিল। কেননা, তিনি যদি সেই দিন ওখানে থাকতেন, তবে হাশেমীদের অংশগ্রহণ দ্বারা আনসার ও মুহাজিরদের তর্ক-বিতর্ক দ্বিগুণ আকার ধারণ করতো, যার দরুন পরিস্থিতি আরো ঘোলাটে হয়ে যেতো। খেলাফত নির্বাচন সংক্রান্ত এজতেহাদগত পার্থক্য সম্পর্কে আমাদের মন্তব্য করা উচিৎ নয়। সাহাবায়ে কেরাম হলেন শ্রেষ্ঠ মুসলমান। তাঁদের প্রত্যেকেই নক্ষত্র সমতুল্য যা মানুষদেরকে হেদায়াত দানে সক্ষম । তাঁদের কাছ থেকেই কুরআন মজীদের অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছে। তাঁদের কাছ থেকেই শত-সহস্র হাদীস শ্রুত হয়েছে। আর তাঁদের মাধ্যমেই আল্লাহ্ তা’লার আদেশ-নিষেধ শিক্ষা করা হয়েছে। তাঁদের কাছ থেকে প্রাপ্ত শিক্ষাকে তাঁদের আচরণ যাচাইয়ের মানদণ্ড বানানো আমাদের জন্যে অশোভনীয় হবে। হ্যাঁ, ভুল করা মানুষেরই স্বভাব। মুজতাহিদগণও ভুল করতে পারেন। কিন্তু মুজতাহিদগণ ভুল করলেও সওয়াব পেয়ে থাকেন; ভুল না করলে দশটি এবং ভুল করলে একটি সওয়াব পান।
প্রত্যেক সাহাবী-ই দ্বীন ইসলামের স্তম্ভ। তাঁদের মধ্যকার মতভেদসমূহ তাঁদের এজতেহাদ হতে নিঃসৃত ছিল। একে অপরকে সমালোচনা করলেও তাঁরা একে অপরের মূল্যায়ন-ও করতেন। যদি হযরত যুবাইর (রা:) তাঁর ধর্মীয় বিশ্বাসের চেয়ে ব্যক্তিগত পছন্দকে অগ্রাধিকার দিতেন, তাহলে তিনি তাঁর শ্বশুর হযরত আবু বকর (রা:)-এর সাথে দ্বিমত পোষণ করতেন না। খেলাফত নির্বাচনে হযরত আবু বকর (রা:)-এর সবচেয়ে স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থক ছিলেন হযরত ওমর ফারুক (রা:)। আবার তিনি-ই হযরত আলী (ক:)-এর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। একদিন তিনি হযরত আলী (ক:)-কে একটা প্রশ্ন করেন এবং হযরত আলী (ক:) তার উত্তর দেন। এতে হযরত উমর ফারুক (রা:) বলেন, “হযরত আলী (ক:)-এর অনুপস্থিতিতে জটিল প্রশ্নের সম্মুখীন হওয়া থেকে আমি আল্লাহর হেফাযত চাই।” হযরত আলী (ক:) সব সময় বলতেন, “রাসূলুল্লাহ্ (দ:)-এর পরে এই উম্মতের মধ্যে সবচেয়ে উপকারী হলেন হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা:) এবং হযরত উমর ফারুক (রা:)।”
খেলাফত নির্বাচনের এক মাস পরে হযরত আবু বকর (রা:) মিম্বরে আরোহণ করেন এবং বলেন, “আমি এই খলীফার দায়িত্ব হতে পদত্যাগ করতে চাই। যদি রাসূলে খোদা (দ:)-এর পদাংক অনুসরণ করতে আমাকে তোমরা দেখতে চাও, তবে তা সম্ভব নয়। কারণ, শয়তান তাঁর কাছে আসতে পারতো না। উপরন্তু, তাঁর প্রতি ওহী (ঐশী প্রত্যাদেশ) নাযেল হতো।” প্রিয় পাঠক! এ ধরনের মহান ব্যক্তিত্বদের হৃদয়ে কি রাষ্ট্রীয় পদ ও ক্ষমতার মোহ বিরাজ করতে পারে? তাঁদের প্রতি বিষোদগার করা কি কোনো জিহ্বার পক্ষে শোভনীয়?
প্রকৃত ঘটনা হলো এই যে, হযরত ফাতেমা যাহরা (রা:) তাঁর পিতার বিচ্ছেদ বেদনায় এতোই ভেঙ্গে পড়েছিলেন যে তিনি ঘর থেকে বেরুতে পারেন নি। এমতাবস্থায় হযরত আলী (ক:)-কেও বাসায় থাকতে হয়েছে তাঁকে শান্ত্বনা দেয়ার জন্যে। তাই তিনি ঘন ঘন খলীফার সোহবতে যেতে পারেন নি। তবে হযরত ফাতেমা (রা:)-এর বেসালপ্রাপ্তির পরে তিনি খলীফার দরবারে গমন করতেন এবং তাঁকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিতেন।
’কাসাসে আম্বিয়া’ হতে উদ্ধৃত উপরোক্ত ঘটনাবলীর বর্ণনা প্রমাণ করে যে হযরত আলী (ক:) ও অপর ছয় জন সাহাবী হযরত আবু বকর (রা:)-এর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন নি মর্মে শিয়া অভিযোগটি ভিত্তিহীন। হযরত আবু বকর (রা:)-কে না মেনে সাহাবায়ে কেরামের ঐকমত্যের বিরোধিতা করা ও এ সম্পর্কে অশোভন মন্তব্য করা শুধু ইসলামের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণই নয়, বরং তা সাহাবায়ে কেরামকে প্রদত্ত রাসূলুল্লাহ্ (দ:)-এর এই আদেশটিরও খেলাফ যা ঘোষণা করে- “ঐক্যবদ্ধ হও এবং মতবিরোধ এড়িয়ে চলো” (আল হাদীস)। হযরত আলী (ক:) ও ছয়জন সাহাবী এবং নারীকুল-শ্রেষ্ঠ মা ফাতেমা যাহরা (রা:) এই আদেশ মান্য করেন নি ও দ্বীন ইসলামকে অমান্য করেছেন বলাটা তাঁদেরকে ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ তো নয়ই, বরং তাঁদেরকে হেয় প্রতিপন্ন করার অপপ্রয়াসই। তাঁদের প্রতি আরোপিত এই বিতর্ক এতোই মারাত্মক যে এটা দ্বীন ইসলামের মধ্যে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছে এবং পৃথিবীর অন্তিম লগ্ন পর্যন্ত আগত লক্ষ লক্ষ মুসলমানকে বিচ্যুতির অতল গহ্বরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। আহলে সুন্নাতের সাথে মতভেদ সৃষ্টি করে যারা লক্ষ লক্ষ মুসলমানের রক্ত ঝড়িয়েছে এবং ইসলামের ক্ষতি সাধন করেছে কেবল হুরুফী শিয়াদের এই মিথ্যা ও বানোয়াট কাহিনী পড়ে, তারা-ই দ্বীন ইসলামের অগ্রগতির পথে অন্তরায় সৃষ্টি করেছে। আহমদী ও কাদিয়ানী সম্প্রদায় দ্বীনের যে ক্ষতি সাধন করেছে তা তো সবার সামনেই দৃশ্যমান। দ্বীন ইসলামের জ্ঞানের আলো দ্বারা উদ্ভাসিত ও ঈমান দ্বারা পূর্ণ হৃদয়সম্পন্ন কোনো মানুষের পক্ষে কি এ কথা বলা সম্ভব যে হযরত আলী (ক:)-ই এই মহা ফিতনা-ফ্যাসাদের একমাত্র কারণ।

Saturday, October 10, 2015

খোরাসান থেকে কালো পতাকাধারী তারা কারা ?

খোরাসান থেকে কালো পতাকাধারী তারা কারা ?
যখন কোনটা হাদীসে উল্লেখিত খোরাসান, এটা নিয়ে Confusion হবে, তখন এ সংক্রান্ত হাদীসে উল্লেখিত অন্যান্য অঞ্চলের নামগুলোও দেখতে হবে। যেমন -

খোরাসান ছাড়াও,
রেই
কাযভিন
তালেকান
ফার্স, প্রভৃতি।

এখন খোরাসান বলতে ইসলামী ইরানকে নাকি আফগানিস্তানকে বোঝানো হয়েছে, এটা নিয়ে যদি Confusion থাকে, তাহলে বাকি অঞ্চলগুলো কোন দেশে অবস্থিত, এটা দেখলেই পরিষ্কার হয়ে যাবে।

রেই প্রদেশ ইসলামী ইরানে অবস্থিত। তেহরান শহর রেই অঞ্চলে অবস্থিত।

তালেকানও ইসলামী ইরানে অবস্থিত।

কাযভিন ইসলামী ইরানে অবস্থিত।

ফার্স অঞ্চল মধ্য ইরানকে বলা হয়।

আর তাছাড়া যেই হাদীসে খুরাসানীদের পরিচয় দেয়া হয়েছে, সেই হাদীসে খুরাসানীদেরকে হযরত সালমান ফার্সী (রাঃ) এর জাতি বলা হয়েছে। আর সবাই জানে যে হযরত সালমান ফার্সী (রাঃ) ইরানী ছিলেন ...

এখনও যদি Confusion থাকে যে খুরাসানী কারা, তাহলে আর কিছুই বলার নাই ...

হযরত ইমাম মাহদী (আঃ) সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাঃ {তাঁর জন্য আমার শ্রবনশক্তি কুরবান হোক} এর সকল হাদীস এক করলে 'কাল পতাকাবাহী' দুইটি দলের উল্লেখ পাওয়া যায়!

এই দুই দলের মধ্যে কিছু পার্থক্যও লক্ষ্য করা যায়; যেমনঃ

- একটির আবির্ভাব হবে পরে, আর আরেকটির আবির্ভার হবে আগে।

- একটি হবে বড় কাল পতাকাবাহী দল, আরেকটি হবে ছোট ছোট কাল পতাকাবাহী দলসমূহ।

- একটি হবে ঐক্যবদ্ধ একটি দল, আরেকটি হবে পরষ্পর বিরোধী বহু দল।

- একটি আসবে খুরাসান থেকে সাইয়্যিদ এ খুরাসান (যিনি হবেন সাইয়্যিদ ও তাঁর জন্মস্থান হবে খুরাসান) এর নেতৃত্বে এবং শুয়াইব ইবনে সালেহ (যাঁর জন্মস্থান হবে রেই অঞ্চলে) এর সেনাপতিত্বে, আর আরেকটি আসবে অজ্ঞাত স্থান থেকে (হতে পারে বিভিন্ন জায়গা থেকে) ও বিভিন্ন নেতার অধীনে।

- একটির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হবে ইসরাইলকে ধ্বংস করা, আরেকটির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হবে সিরিয়ার ক্ষমতা দখল করা।

- একটির আবির্ভাবের সময়কাল হবে ঠিক সুফিয়ানী ও হযরত ইমাম মাহদী (আঃ) এর আবির্ভাবের অল্প কিছুকাল আগে, আর আরেকটির আবির্ভাবের সময়কাল হবে সুফিয়ানী ও হযরত ইমাম মাহদী (আঃ) এর আবির্ভাবের অনেক আগে।

- একটির অগ্রগতির রুট হবে পূর্ব দিকের খুরাসান থেকে ইরাকের উপর দিয়ে এগিয়ে গিয়ে সিরিয়া পার হয়ে ইসরাইল সীমান্ত, আর আরেকটির রুট হবে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন শক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান।

- একটির সাহায্যকারী হবে হলুদ পতাকাধারীগণ, আর আরেকটির শত্রু হবে হলুদ পতাকাধারীগণ।

- একটি হবে আহলে বাইত ভক্ত, আর আরেকটি হবে আহলে বাইত বিদ্বেষী।

- একটি হবে ইয়ামানী (হাদীসে উল্লেখিত ইয়েমেনের ইসলামী বিপ্লবের নেতা) ও মিশরীর (হাদীসে উল্লেখিত মিশরের ইসলামী বিপ্লবের নেতা) সমর্থক, আর আরেকটি হবে ইয়ামানী ও মিশরীর বিরোধী।

- একটি হবে সর্বদা সফল ও বিজয়ী, আর আরেকটি হবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিফল ও পরাজিত।

- একটি হবে সুফিয়ানীর আনুগত্যকারী, আর আরেকটি হবে সাইয়্যিদ এ খুরাসানীর আনুগত্যকারী।

- একটি হবে হযরত ইমাম মাহদী (আঃ) এর সাহায্যকারী ও সমর্থক, আর আরেকটি হবে হযরত ইমাম মাহদী (আঃ) এর ক্ষতিকারী ও বিরুদ্ধাচারী।

- একটি হবে সত্যিকারের কাল পতাকাবাহী দল, আর আরেকটি হবে ভন্ড কাল পতাকাবাহী দল।

এখন দু'টি কাল পতাকাবাহী দলের বৈশিষ্ট্য ও তাদের মধ্যকার পার্থক্যগুলো খেয়াল করলেই বোঝা যাবে যে কারা হবে প্রকৃত কাল পতাকাবাহী দল আর কারা হবে ভন্ড কাল পতাকাবাহী দল। আর এটা খুবই স্বাভাবিক যে, হাদীসে যেহেতু হযরত ইমাম মাহদী (আঃ) এর সমর্থক ও সাহায্যকারী হিসেবে কাল পতাকাবাহীদের উল্লেখ আছে, সুতরাং ভন্ডরা এই প্রতীককে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করার চেষ্টা করবে ও মানুষকে ধোকা দেবার চেষ্টা করবে! তাই হাদীসসমূহে সত্য কাল পতাকাবাহীদের পাশাপাশি ভন্ড কাল পতাকাবাহীদের সম্পর্কেও জানানো হয়েছে ...

মহান আল্লাহ পাক আমাদেরকে হযরত ইমাম মাহদী (আঃ) এর সমর্থক ও সাহায্যকারী সত্য কাল পতাকাবাহীদের চেনার ও ভন্ড কাল পতাকাবাহীদের থেকে বেঁচে থাকার তউফিক দান করুন!!

Friday, October 9, 2015

ইসলামের প্রথম দিকের এক হৃদয় বিদারক ঘটনা





এই জায়গাটা হল শিয়াবে আবু তালিব, বিস্তারিত ঘটনা নিম্নে বর্নিত হল।পবিত্র কাবা শরিফের পাসে অবস্থিত ইসলাম গ্রহনের কয়েক দিন পরে ওমার ফারুক(রা:) রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কি সত্যের উপরে নই? তদুত্তোরে তিনি বললেন কেন নয়, নিশ্চয় আমরা সত্যের মধ্যে। ওমর বললেন তাহলে এত গোপনীয়তা কি জন্যে। তখন আরকাম(রা:) বাড়ীতে সমাবেত মুসলিমদেরকে নিয়ে বের হয়ে পড়েন এবং তাদেরকে দুদলে বিভক্ত করে দেন। হামযা বিন আব্দুল মুত্তালিব(রা:) নেতৃত্বে একদল এবং ওমার বিন খাত্তাব(রা:) নেতৃত্বে আর একদলের নব সঞ্চারিত শক্তির ঈঙ্গিত দেয়ার জন্যে মক্কার বিভিন্ন অলি-গলি প্রদক্ষিণ করে।

উমারের (রা) ইসলাম গ্রহণের পর মুসলিমরা কাবার চত্বরে প্রকাশ্যভাবে ছালাত আদায় করতে শুরু করে। এতে বেশ হাংগামা হয়। কিন্তু মুশরিকরা মুসলিমদেরকে ছালাত আদায় করার সুযোগ দিতে বাধ্য হয়। এতে কুরাইশ সরদারদের রাগ চরমে উঠে। তারা ভাবলো, বানু হাশিমের সহযোগিতাই মুহাম্মাদ (সা) এর শক্তির উৎস।তাই বানু হাশিমের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। কুরাইশরা দাওয়াত দমন করার জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করে। শাস্তি, নির্যাতন, নিপীড়ন, প্রলোভন ও হুমকি প্রদর্শনের মতো সর্ব প্রকার পন্থা গ্রহণ করে। কিন্তু এসব কুপরিকল্পিত ব্যবস্থাসমূহ মুসলমানদের ঈমান বৃদ্ধি ও দ্বীন ইসলামকে অধিকতর আঁকড়ে ধরা ছাড়া আর কোন ভুমিকা রাখতে পারেনি।

এক নতুন দুরভিসন্ধি ও মন্দ অভিপ্রায় তাদের অন্তরে জন্ম নিল। আর তা হচ্ছে মুসলমান ও বনী হাশেমকে সম্পূর্ণভাবে বর্জন ও একঘরে করে রাখার এক চুক্তিনামা লিখে, যাতে সবাই সাক্ষর করবে, কাবা শরিফের অভ্যন্তরে ঝুলিয়ে দেবে। চুক্তি অনুসারে তাদের সাথে বেচা- কেনা, বিয়ে শাদি, সাহায্য সহযোগিতা, ও লেন-দেন সম্পূর্ণভাবে বন্ধ থাকবে। এ চুক্তির ফলে আবু তালিব বানু হাশিমের লোকদেরকে নিয়ে বাধ্য হয়ে মক্কা থেকে বের হয়ে শিয়াবে আবু তালিব নামক গিরি সংকটে আশ্রয় নেন।

আবু লাহাব ছাড়া বানু হাশিমের মুসলিম-অমুসলিম সকল সদস্যই মুহাম্মাদ (সা) এর সঙ্গী হন।
তাঁরা অবর্ণনীয় ক্লেশ ও দুঃখের শিকার হন সেখানে। ক্ষুধা ও অর্ধাহারের বিষাক্ত ছবোল থেকে কেউ রক্ষা পায়নি। স্বচ্ছল ও সামর্থবান ব্যক্তিরা নিজেদের সমস্ত ধন-সম্পদ ব্যয় করে ফেলেন। খাদীজা তাঁর সম্পূর্ণ অর্থ ব্যয় করেন। খাদ্যাভাবে অনেক সময় গাছের পাতা ও ছাল খেতে হয়েছে। শুকনো চামড়া চিবিয়ে চিবিয়ে ক্ষুধার জ্বালা নিবারণের চেষ্টা করতে হয়েছে। পানির অভাবে অবর্ণনীয় কষ্ট পেতে হয়েছে। বিভিন্ন রোগ ছাড়িয়ে পড়লো। অধিকাংশ লোকই মৃত্যূর প্রায়-দ্বার প্রান্তে এসে দাড়ালেন। কিন্ত তাঁরা ধৈর্য অবিচলতার পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেন। তাঁদের মধ্যে একজনও পশ্চাদপদ হননি। অবরোধ একাধারে তিন বছর স্থায়ী রইল। অতঃপর বনী হাশেমের সাথে আত্মীয়তা আছে এমন কিছু শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তি জনসমাবেশে চুক্তি ভঙ্গ করার কথা ঘোষনা করে। চুক্তির কাগজ বের করা হলে দেখা যায় যে সেটা খেয়ে ফেলা হয়েছে। শুধুমাত্র কাগজের এক কোণ যেখানে “বিসমিকা আল্লাহুম্মা” লেখাছিল সেটাই অক্ষত রয়েছে। সংকটের অবসান হল। আর মুসলিম ও বনী হাশেম মক্কায় ফিরে আসেন। কিন্তু কুরাইশরা মুসলিমদের দমন ও মুকাবিলায় সেই রকম রুঢ়তা ও কঠোরতা ক্ষনিকের তরেও পরিহার করেনি। এটা ছিলো নবুয়াতের নবম সনের ঘনটা।

অত্যাচারী শাসকের আনুগত্যের ব্যাপারে বুখারী শরিফে জাল হাদিস

অত্যাচারী শাসকের আনুগত্যের ব্যাপারে বুখারী শরিফে জাল হাদিস
বুখারী শরিফের অনেক হাদিসে অত্যাচারী শাসকদের আনুগত্য করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে
(যেমনঃ ২ঃ২২৬৪-৬৫;৩-২৯২৬,৩৩৩৫-৩৭, ৩৫১০-১২; ৪ঃ ৩৯৮৭;৬ঃ৬৫৬২-৬৪,৬৫৭৫,৬৫৮৮-৮৯,৬৬১২, ৬৬৪৪-৪৫,বুখারী শরিফ,আধুনিক প্রকাশনী)।

এ সকল হাদিসের সারাংশ এইঃ
রাসুল(সাঃ) বলেছেন, আমার পরে এমনও শাসক আসবে যারা আমার প্রদর্শিত পথে তোমাদেরকে পরিচালিত করবে না- আমার সুন্নাহও অনুসরন করবে না। সাহাবারা জিজ্ঞাসা করলেন, “ ঐ সময় আমরা কি করব?” রাসুল (সাঃ) বললেন, “ ঐসব জালিম শাসকদের কথা তোমরা শুনবে ও তাঁদের আনুগত্য করবে।তারা যদি তোমাদের আঘাত করে এবং তোমাদের ধন-সম্পত্তি ছিনিয়েও নেয়, তবুও তোমরা তাঁদের অনুসরন ও আনুগত্য করবে”। অথচ কুরানে আল্লাহ বলেছেন,”এবং তাঁদের সাথে যুদ্ব কর যতক্ষন না সমস্ত অরাজকতা নির্মুল হয়ে যায় এবং দীন কেবল আল্লাহরই জন্যই হয়”...
(সুরা বাকারাঃ১৯৩)।
(এরকম আরও আয়াত আমরা কুরানে পাই,
যেমনঃ ২ঃ১৯০,২১৬-১৭,২৪৪,৪ঃ৭৪-৭৫,৮৯-৯৪ ইত্যাদি)।

আমরা জানি,যে হাদিস কুরানের আয়াতকে সমর্থন করে না সেটি জাল হাদিস
(মুঃ আল বাকির, সহি আল কাফি, ভল্যুম-১,পাতা-৮,সংস্করন ১৪০২ হিজরী)।