Saturday, October 3, 2015

কুরবানি ও ইবরাহিম(আ)

কুরবানি ও ইবরাহিম(আ)
১.
কোরবানির ঈদ চলে এসেছে। শফিক সাহেব বরাবরের মতই এবারো ভাগে কোরবানি দিচ্ছেন। তার স্ত্রী ও তিনটি সন্তান অবশ্য গত কয়েকমাস ধরেই তাকে বলছে যে ছোট হলেও একটা আলাদা গরু কিনতে এইবার। কিন্তু এইসব গরু হাতাহাতি-কাটাকাটি শফিক সাহেবের কাছে বেশ যন্ত্রনা মনে হয়। গরু কিনে আন রে, সেটাকে খাওয়াও রে, ময়লা পরিষ্কার কর রে, কসাই আনো রে...ব্লা ব্লা ব্লা। এরচে ফ্ল্যাটের অন্যদের সাথে মিলে ভাগের টাকাটা দিয়ে দিলেই তো হয়। ফরযও আদায় হয়ে গেল, ঝামেলাও কমে গেল। তাছাড়া এই মাত্র কয়েকদিন আগেই বড় মেয়েটার বিয়ে দিয়েছেন। এনগেজমেন্ট, পানচিনি, গায়ে হলুদ, অফিসার্স ক্লাবে রিসেপসন সব মিলিয়ে বেশ ধুমধাম করেই বিয়ে দিয়েছেন । লাখ দশেকের মতন খরচ গেছে সেখানেই। এখন কি তার অবস্থা আছে ৪০-৫০ হাজার দিয়ে একটা গরু কিনার? এটা কি বোঝে না তার পরিবার ? ইসলাম তো কাউকে জোর করে কষ্ট দেয়না তাইনা? আল্লাহ নিশ্চয়ই বুঝবেন তার "এত বিশাল" সমস্যা।
তাই এবারো শফিক সাহেব উপরের ফ্ল্যাটে যেয়ে ভাগের লামসাম একটা টাকা দিয়ে কুরবানির ফরয আদায় করে ফেললেন।
২.
গনি সাহেব বেশ বিমর্ষ এবার ঈদে। ঈদের দুইদিন আগে তিনি ৮০ হাজার টাকা দিয়ে একটা বেশ বড় গরু কিনে এনেছেন। ঈদের ঠিক আগের দিন রাতে যশোর থেকে কয়েকশ গরু ভর্তি ট্রাক চলে আসায় গরুর দাম অস্বাভাবিক কমে গেছে। তার দোতালার প্রতিবেশী আলতাফ সাহেব ৫০ হাজার টাকা দিয়ে ঈদের আগের দিন রাত ১১টায় একটা প্রকান্ড গরু কিনে এনেছেন। গরুটা গনি সাহেবের গরুর চেয়েও কয়েক ইঞ্চি উঁচু। আলতাফ সাহেব চোখেমুখে যুদ্ধজয়ের ভাব নিয়ে তার গরুটাকে বাঁধলেন ঠিক গনি সাহেবের গরু পাশেই। দুয়েকবার গলা খাকারি দিয়ে পাশের দাঁড়ানো গনি সাহেবকে বলেই ফেললেন- "বেশ কমেই পেয়েছি গরুটা, কি বলেন ভাই তাইনা হেহেহে ? ৫ মণ মাংস হবেনা ? "
৩.
আরিফ সাহেব একজন সেক্যুলার মুসলিম। তিনি মনে করেন , তিনি মনেপ্রানে একজন বাঙ্গালী, তারপর তার ধর্ম হচ্ছে ইসলাম। পহেলা বৈশাখে শোভাযাত্রা-ইলিশ-পান্তা , লালনগীতি-রবীন্দ্রসঙ্গীত, গায়ে হলুদ-বৌভাত , বিভিন্ন মন্দির-মন্ডপ ঘুরে পূজা দেখা সহ বাঙ্গালী কালচারের এমন কোন অংশ নেই যেখানে তাকে পাওয়া যাবে না। "ধর্ম যার যার, উৎসব হচ্ছে সবার" - এই নীতিতে তিনি অটুট। যেহেতু বাঙ্গালী কালচারের অনেক কিছুই ইসলাম ধর্ম সমর্থন করেনা, তাই তিনিও ইসলাম ধর্মের অনেককিছু পছন্দ করেন না ! কুরবানী জিনিসটা তিনি খুব একটা পজিটিভ চোখে দেখেন না। একদিন ঘটা করে সারা দুনিয়ার সবাইকে দেখিয়ে দেখিয়ে কতগুলো নিরীহ গরু ছাগল জবাই করার মাঝে কি আনন্দ তিনি সেটা ধরতে পারেন না। তাই তিনি প্রতি কুরবানী ঈদেই দেশের বাড়িতে টাকা পাঠিয়ে দিয়ে পরিবার পরিজন সহ ব্যাঙ্কক, সিঙ্গাপুর, নেপাল বা মালদ্বীপ চলে যান। সপ্তাখানেক সেখানে রিল্যাক্স করে দেশে গরু-গোবর-রক্ত-বর্জ্যের গন্ধ চলে গেলে তারপর তিনি ফেরত এসে আবার বাঙ্গালী মুসলিম হয়ে যান।
৪.
২০১৩ সাল। কুরবানী ঈদের দিন। ফেইসবুকে একটি স্ট্যাটাস আমার চোখে পড়ল। যিনি দিয়েছেন তিনি মুসলিম। ৩ নাম্বার পয়েন্টটার মতন একজন মুসলিম। তিনি লিখেছেন-
" দাও, রাস্তাঘাট রক্তে ভাসিয়ে দাও। আজকে তো তোমাদেরই দিন। রাস্তাঘাট রক্তে ভাসিয়ে কোরবানী কর, আর ত্যাগের মহিমায় মহিমান্বিত হও। "
৫.
এটাও ২০১৩। বাংলাদেশে কিছু সেলিব্রিটি লেভেলের নাস্তিক আছে আপনারা সবাই জানেন। এরা ইসলামকে নিয়ে এত তীব্র পর্যায়ের কুৎসিত কথা বলে যে একটা সময়ে সাধারন মানুষের ধারনাই হয়ে গিয়েছিল - "সকল ব্লগার নাস্তিক !" । এদের একজনের প্রোফাইল এ কুরবানী ঈদের সময়ে আমি ঢুকেছিলাম। সে একটা ছবি দিয়েছিল। কোন একটা দেশে ঈদ উল আযহা হচ্ছে। মুসলিমরা এক জায়গায় অনেক গরু কুরবানি দিচ্ছে। রক্তে লাল হয়ে আছে পুরো উদ্যান। ছবিটা তুলে দিলাম। ছবির বর্ননা সে দিয়েছিল অনেকটা এরকম- ইসলাম একটি জঘন্য বর্বর মধ্যযুগীয় ধর্ম ।ইসলাম মানেই সন্ত্রাস, রক্তপাত, হানাহানি।
৬.
ঢাকার মোহাম্মদপুর। কোন একটি এলাকা, কোন একটি রোড। এক বাড়ির সামনের রাস্তায় দুটি গরু বেধে রাখা হয়েছে। সামনে উৎসুক জনতার ভীড়। দুইটি গরুর দাম ৬ লাখ টাকা। প্রায় ৬ ফিট এর উপর উচু একেকটি গরু। এই বাড়ির দুই ভাই পুরো এলাকায় "ঐযে যারা বড় গরু আনে প্রতিবার" নামে পরিচিত। এরা দুইজনই রাজনীতির সাথে জড়িত, এলাকায় এরা বেশ প্রভাবশালী লোক। খুব বেশি মানুষ তাদের ঘাটায় না কখনোই। এরা খুব যে প্র্যাকটিসিং মুসলিম ফ্যামিলি তা মোটেও না। কিন্তু এরা গরু কিনবে প্রতিবারই এইরকম। রাস্তায় ভীড় জমে যায় তাদের গরু দেখার জন্য।
এই বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলো আমাদের সমাজেরই ঘটনা। কোরবানির ঈদ আসন্ন। সারা বিশ্বের মুসলিমদের অন্যতম প্রধান একটি উৎসব। বাড়িতে যাওয়া, গরু কিনা, কুরবানি করা, মাংস ভাগ করা, এসব করেই উৎসবের উৎসাহে কেটে যাবে আরেকটি ঈদ। এই আর্টিকেল এ এই বিষয়গুলো দেখানো হয়েছে-
- গরু তো প্রতিদিনই জবাই হচ্ছে, খাওয়া হচ্ছে। ঘটা করে একদিন গরু কিনে জবাই করে উৎসব করার কি পেছনে কি অর্থ রয়েছে ?
- কোরবানীর ঈদ কি একটি মাংস খাওয়ার উৎসব মাত্র?
- কিভাবে কোরবানী শুরু হল? কে ছিলেন ইবরাহীম (আ) ? কি ঘটেছিল তাঁর জীবনে?
- জবাই দিলে কি আসলেই পশু খুব কষ্ট পায়?
[কখনো কখনো ইবরাহীম(আ) এর নামের পরে (আ) দেওয়া হয়নি। এটা ইচ্ছাপূর্বক ও শুধুই পড়ার সুবিধার্থে। অবশ্যই তাঁর প্রতিটি নামের জন্য সালাম, শান্তি, শ্রদ্ধা ও ভালবাসা। ]
কুরবানি আরবি শব্দ "কুরবাতুন/কুরবান" থেকে এসেছে যার অর্থ "ত্যাগের মাধ্যমে নৈকট্য লাভ" বা Sacrifice . হাজার বছর আগে নাবি ইবরাহিম(আ) এর জীবনে যে ঘটনা ঘটেছিল সেটাকে সম্মান জানানোর জন্য ও মহান আল্লাহর আদেশ পালন করার জন্য মুসলিমরা প্রতি বছর কুরবানির ঈদ পালন করে।
কুর’আনে ৭০ বার ইবরাহীম(আ) এর কথা বলা আছে। তাঁর নামে পুরো একটি সূরা আছে। প্রত্যেক নামাজে নাবি ইবরাহীম(আ) এর উপর আমরা দরূদ পাঠ করে তাকে সালাম ও শান্তি জানাই। কি করেছিলেন আল্লাহর এই নবী যার জন্য আমরা তাকে প্রতিদিন স্মরন করি?
ইবরাহীম বা আব্রাহাম জন্মেছিলেন ব্যাবিলনে, আনুমানিক ৭৫০০ বছর আগে। স্রষ্টা মানুষকে বানিয়েছেন শুধুই তাঁর উপাসনা করার জন্য, কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সবসময়েই কিছু মানুষ সেটা ভুলে গিয়েছে। কেউ মূর্তি, কেউ রাজা-বাদশাহ, কেউ গ্রহ-নক্ষত্র কে পূজা করেছে। কেউ বা নিজেই নিজেকে স্রষ্টা দাবি করেছে [ফেরাউন/ ফারাও]। কেউ নিজের জীবন, সাধ-আহ্লাদ, জাগতিক আনন্দ কে পূজা করে যাচ্ছে দিনের পর দিন। মানুষের মধ্যে থেকে কেউ কেউ এই ব্যাপারগুলো নিয়ে গভীরভাবে ভাবতেন। তাদেরই কাউকে কাউকে আল্লাহ বেছে নিতেন তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে, যাদেরকে মুসলিমরা নাবি-রাসূল বলে সম্বোধন করে।
বহু মানুষের ধারনা ধর্ম একটি অন্ধ বিশ্বাস ছাড়া আর কিছুই না। কেউ যদি ঠান্ডা মাথায় নিরপেক্ষ মনোভাব নিয়ে কুর’আন পড়ে দেখেন, তিনি দেখতে পারবেন এখানে প্রত্যেকটি কথা অত্যন্ত লজিক্যাল। বালক ইবরাহীম এর বাবার নাম ছিল আযার। তিনি ছিলেন একজন মুশরিক। তিনি শুধু মূর্তি পুজাই করতেন না, তিনি মূর্তি বানিয়ে বানিয়ে পাইকারী সাপ্লাই দিতেন যাতে অন্যরাও সেগুলোর পুজা করতে পারে!তার সমাজের অন্যান্য লোকেরা মূর্তিপূজার পাশাপাশি গ্রহ নক্ষত্র এসবেরও পূজা করত।
শিক্ষাঃ যেসব প্র্যাকটিসিং মুসলিম ভাই বোনেরা মনে করেন যে- “আহারে, আমার প্যারেন্টস যদি আরেকটু ইসলামিক হোত!”- তারা যেন ইবরাহীম(আ) এর অবস্থাটা একবার কল্পনা করার চেষ্টা করি।
বালক ইবরাহীম অত্যন্ত বুদ্ধিমান ছিলেন।তার আশেপাশের সবাই মূর্তিপুজা করত, স্বাভাবিকভাবে তারও সেটা করার কথা ছিল।কিন্তু তিনি নিজের লজিক ও যুক্তি দিয়ে বুঝতে পারতেন, এইসব প্রানহীন পাথরের মুর্তির কোন ক্ষমতা নেই, স্রষ্টা অবশ্যই অন্য কেউ আছেন।নিজেই একটা পাথরের মূর্তি বানিয়ে তারপর সেটাকে পূজা করাকে তাঁর কাছে খুব নির্বুদ্ধিতা মনে হত। তিনি তাঁর বাবাকে একদিন বললেন-
“আমার প্রিয় বাবা !কেন তুমি এমন জিনিসের পূজা কর যেটা শুনেও না, দেখেও না বা কোন উপকারও করে না? প্রিয় বাবা , আমার কাছে এমন জ্ঞান এসেছে যা তোমার কাছে আসেনি। তাই, আমাকে অনুসরন কর, আমি তোমাকে সরল পথ দেখাব। প্রিয় বাবা, শয়তানের উপাসনা কোরনা। নিশ্চয়ই শয়তান পরম দয়াময়ের সাথে বিদ্রোহ করেছে। প্রিয় বাবা, আমার ভয় হয় যে না জানি পরম দয়াময়ের কাছ থেকে তোমার উপর আযাব আসে আর তুমি শয়তানের সঙ্গী হয়ে যাও।” [১৯ঃ ৪১-৪৫]
বালক ইবরাহীম বারবার বলেছেন “ইয়া আবাতি- প্রিয় বাবা”। তিনি তাকে আল্লাহর রাহমা~ন ( সীমাহীন দয়ালূ) নামটি বলে আল্লাহর দয়ার কথা কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন। কত ঠান্ডা মাথার বুদ্ধিমান ও মমতাবান একজন মানুষ হলে নিজের মুশরিক বাবার সাথে এত চমৎকার আচরন করা যায় সেটা আল্লাহ এখানে আমাদেরকে দেখাচ্ছেন।
বাবা আযার উত্তর দিলেন-
“ইবরাহীম, তুমি কি আমার উপাস্যকে অস্বীকার করছ? তুমি এরকম করা না থামালে আমি তোমাকে অবশ্যই পাথর মেরে হত্যা করব। তাই আমি তোমাকে শাস্তি দেবার আগেই আমার কাছ থেকে দূর হয়ে যাও!”
ইবরাহীম বললেন-
“তোমার উপর শান্তি বর্ষিত হোক। আমি আমার প্রভুর কাছে তোমার জন্য মাফ চাইব। নিশ্চয়ই তিনি আমার উপর সবসময়েই দয়ালু। কিন্তু আপাতত আমি তোমাকে ও তুমি যেসব মূর্তির পূজা কর, সেগুলোকে ছেড়ে চলে যাব। আর আমি আমার প্রভুর কাছে প্রার্থনা করব। আমি বিশ্বাস করি যে আমার প্রার্থনা ব্যর্থ হবেনা। ”
শিক্ষা ঃ ইসলাম পালন করার কারনে মুসলিমদের উপর নানারকম ঝামেলা আসে।কেউ টিটকারি মারে, কেউ গালি দেয়, কেউ হাসাহাসি করে। কেউ কি আমাদেরকে বাড়ী থেকে বের করে দেয়? হত্যা করার থ্রেট দেয়? দেয়না। ইবরাহীম(আ) যদি সেই অবস্থাতেও এত বিনয়ী আচরন করতে পারেন, আমরা কেন পারবনা বলেন? আল্লাহ এখানে সমাধান দিয়ে দিয়েছেন। সমাধান হচ্ছে ভাল ব্যবহার ও ধৈর্যধারন ও আল্লাহর কাছে তাদের জন্য মাফ চাওয়া। আমাদের আশেপাশেই অনেক মানুষ আছে যারা ইসলামকে দেখতে পারেনা। আসেন আমরা তাদের সাথে আরো বেশি করে ভাল আচরন করা শুরু করি। আল্লাহ আমাদের শিখাচ্ছেন, যে কোন অবস্থাতেই আমরা বাবা-মার সাথে ভাল ব্যবহার করতে বাধ্য। অথচ কত সামান্য কারনেও আমরা বাবা-মার সাথে কতই না খারাপ আচরন করি। আল্লাহ আমাদের ক্ষমা করুন।
১৪ বছরের বালক ঘরছাড়া হলেন। যাকে বলে- Kicked out from Home. দোষ- এক আল্লাহকে বিশ্বাস। তাঁর হাতে কুর’আন-হাদিস ছিলনা। তিনি আমাদের মতন বর্ন মুসলিম ছিলেন না। তারপরো দেখুন কিভাবে তিনি প্রকৃত স্রষ্টাকে খুজে পেলেন।
“ আর যখন ইবরাহীম তাঁর বাবা আযারকে বলল- তুমি কি মূর্তিকে উপাস্য হিসেবে নিচ্ছ? নিঃসন্দেহে আমি দেখি যে তুমি আর তোমার গোত্র খুবই ভুলের মধ্যে আছ।
আর এভাবেই আমরা ইবরাহীম কে পৃথিবী ও আকাশের সাম্রাজ্য দেখালাম যাতে করে সে নিশ্চিত বিশ্বাসীদের একজন হতে পারে। যখন রাতের অন্ধকার তাকে ঢেকে ফেলল, সে একটা তারা দেখে বলল- এটাই আমার প্রভু। কিন্তু যখন সেটা ডুবে গেল সে বলল- যা ডুবে যায় সেটা আমার পছন্দ না।
যখন সে চাঁদ উঠতে দেখল, সে বলল- এটাই আমার প্রভু। কিন্তু যখন এটাও ডুবে গেল, সে বলল- যদি আমার প্রভু আমাকে পথ না দেখান , তাহলে নিশ্চয়ই আমি পথগ্রস্থদের একজন হয়ে যাব। যখন সে সূর্য ঊঠতে দেখল, সে বলল- এটা আরো বড়, এটাই আমার প্রভু। কিন্তু যখন এটা অস্ত গেল, সে বলল- হে আমার কওম !আল্লাহর সাথে তোমরা যাকিছুকে শরীক কর, তার সবকিছু থেকে আমি মুক্ত। অবশ্যই, আমি তাঁর দিকেই আমার মুখ ফিরালাম যিনি আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন। আর আমি মুশরিকদের কেউ নই।“ [৬ঃ ৭৪-৭৯]
শিক্ষাঃ ১৪ বছরের বালক ইবরাহীম স্রষ্টা ও সৃষ্টির পার্থক্য খুব দ্রুতই ধরতে পেরেছিলেন।যা কিছু আমরা দেখি আশেপাশে, সবকিছুই কোন এক মহান অচিন্ত্য ক্ষমতাধর সত্তার সৃষ্টি করা জিনিস। একটাবার চোখ খুলে তারাভরা আকাশের দিকে তাকালেই তাঁর ক্ষমতা একটু হলেও বোঝা যায়। কাজেই কমন সেন্স ব্যবহার করলেই বোঝা যায়, তিনি সাদা দাড়িওয়ালা বুড়ো একজন লোক নন, বা একাধিক হাত-ওয়ালা কোন নারী নন। তার কোন মানব রূপ নেই; কারন তিনি কোন মানব নন। কিন্তু কোনভাবেই কোন মানুষের পক্ষে চাঁদ-তারা-সূর্য বানানো সম্ভব না। এটা বুঝতে বিশাল কোন জ্ঞানী হওয়া লাগেনা। এটা খুব সাধারন সহজ একটা যুক্তি।স্রষ্টাকে মানব রূপ দেওয়া মানে তাঁকে তাঁর সৃষ্টির পর্যায়ে নামিয়ে এনে তারপর তাঁর সৃষ্টিকে উপাসনা করা। এটা ইসলামের দৃষ্টিতে সবচেয়ে বড় ও ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ।
ইবরাহীম(আ) একদিন তাঁর বাবা ও গোত্রকে জিজ্ঞেস করলেন- “তোমরা এত একাগ্র হয়ে যেসবের পুজা কর, এই মূর্তিগুলো আসলে কি?” তারা উত্তর দিল- “আমাদের পুর্বপুরুষরাও এসবের পূজা করত। ইবরাহীম বললেন- “তোমাদের পূর্বপুরুষ আর তোমরা নিঃসন্দেহে ভুলে পথে গিয়েছ।“
শিক্ষাঃ যুগ যুগ ধরে একটা জিনিস চলে আসলেই সেটা শুদ্ধ হয়ে যায়না। অথচ এই জিনিসগুলো আমাদের দেশে হয়ে আসছে। আমাদের উপমহাদেশে বেশ ভাল পরিমানে ইসলাম বিকৃতি হয়েছে। অগনিত পরিবারে আপনি তাবিজের ব্যবহার, পীরের মুরিদ, মাজার পূজা, মিলাদ-কুলখানি-চল্লিশা-ঈদে মিলাদুন্নাবী সহ অসংখ্য জিনিশ পাবেন যা আমাদেরকে নাবি মুহাম্মাদ(স) শিখিয়ে দিয়ে যাননি। সমাজের বেশিরভাগ মানুষ চোখকান বন্ধ করে কোন চিন্তা ভাবনা না করেই বাপদাদার রেখে যাওয়া ইসলাম পালন করতে থাকে। কারন জিজ্ঞেস করলে সেই একই উত্তর দেয় এরা- “সবাই করে, তাই আমরাও করি। সবাই কি আর ভুল জিনিস করে আসছে এত বছর ধরে?
আমার চোদ্দ গুষ্ঠির মধ্যে আমি একমাত্র মানুষ যে ভিন্নভাবে নামাজ পড়ি। মানুষ আমাকে শিয়া-আহলে হাদিস-লা মাযহাবি নানা ট্যাগ দেওয়ার চেষ্টা করে। আমার কাছে আমার ট্যাগ একটাই- মুসলিম। বাপ-দাদার রেখে যাওয়া নামাজ আমি চোখকান বুজে অনুকরন করিনি। রাসূল(স) যেভাবে নামাজ পড়তে শিখিয়েছেন, সেটা আমি শিখেছি ও সেটাই আমি গ্রহন করেছি। আল্লাহ আমাদেরকে বিচারবুদ্ধি করার ক্ষমতা দিয়েছেন। আমরা যেন স্রেফ গোয়ার্তুমি ও যুগের পর যুগ চলে আসা অন্ধ বিশ্বাসকে আকঁড়ে না ধরে সেগুলোকে ব্যবহার করি।
ইবরাহীম(আ) তাঁর গোত্রকে দিনের পর দিন বোঝান, কিন্তু কোন লাভ হয়না।তিনি ঠিক করলেন, এদেরকে একটু অন্য পথে বুঝাতে হবে। একদিন তিনি তাদের সব মূর্তিগুলোকে ভেঙ্গে দিলেন , শুধু সবচেয়ে বড়টা বাদে। কুড়ালটাকে রেখে দিলেন বড় মূর্তিটির মাথার উপর। তারা যখন ইবরাহীম(আ) কে জিজ্ঞেস করল- “আমাদের মূর্তির সাথে এই কাজ কি তুমি করেছ?” তিনি নির্বিকারভাবে উত্তর দিলেন- “সেটা ওকেই জিজ্ঞেস করছ না কেন?”
“তুমি খুব ভাল করেই জান এই মূর্তিগুলো কথা বলতে পারেনা”
ঠিক এই প্রশ্নটাই চাইছিলেন ইব্রাহীম(আ)। তিনি বললেন-
“তাহলে স্রষ্টার পরিবর্তে কিভাবে তোমরা সেটার পুজা কর যেটা তোমাদের উপকারও করেনা, ক্ষতিও করেনা? তোমাদের আর তোমাদের উপাস্যের উপর লজ্জা ! তোমাদের কি কোন বোধশক্তি নাই?” [২১ঃ ৫৭-৬৭]
তাদের কাছে কোন উত্তর নেই। রাগে ক্রোধে অপমানে এই মূহুর্তে একটাই কাজ করতে পারে তারা এখন। খুব সোজা কাজ সেটা। জোর যার মুল্লুক তার।মেরে ফেললেই তো আপদ বিদেয় হয়ে যায়। স্বেচ্ছাচারী রাজা নিমরুদ সেটাই সিদ্ধান্ত নিল।
“তারা বলল- ওকে পুড়িয়ে দাও আর তোমাদের উপাস্য(মূর্তি)দের সাহায্য কর, যদি তোমরা কিছু করতে চাও। “ [২১ঃ৬৮ ]
শিক্ষাঃ সত্য ও ন্যায় কথা বললে কিছু মানুষ সবসময়েই আপনার বিরোধিতা করবে, আপনাকে ভয় দেখাবে, আপনার ক্ষতি করবে। তাতে কিছু আসে যায়না। আল্লাহ সত্যবাদীদের সাথে আছেন। আল্লাহ এমনভাবে আপনাকে রক্ষা করবেন যা কল্পনার বাইরে। সেটাই এখন ঘটবে।
গনগনে আগুন প্রস্তুত।গভীর গর্ত করে সেটার মধ্যে আকাশচুম্বী আগুন তৈরি করা হল। প্রচন্ড তাপে সেটার ধারেকাছেও যাওয়া যায়না। ইবরাহীম(আ) কে আগুনে ফেলার জন্য একটা ক্যাটাপুল্ট (যুদ্ধের গোলা ছোড়ার যন্ত্র) আনা হল। তাঁর হাত-পা বেধে তাঁকে সেটার মধ্যে রাখা হল। জনতা শিহরিত চোখে তাকিয়ে আছে যুবকের করুন মৃত্যুর দিকে।
ফেরেশতা জিব্রাইল(আ)এলেন। ইবরাহিম(আ) কে জিজ্ঞেস করলেন- তুমি কি কোন সাহায্য চাও? ইব্রাহিম উত্তর দিলেন- Nothing from you .
মনে করুন, ৫ তালার ছাদ থেকে পা পিছলে আপনি পড়ে গেছেন। মাত্র কয়েক সেকেন্ড, তারপরেই আপনার জীবন শেষ। অভিকর্ষজ ত্বরনের তীব্র টানে আপনি মাটির দিকে পড়ছেন। জিবরাঈল (আ) এলেন আপনার কাছে ঠিক সেই মূহুর্তে। আপনাকে জিজ্ঞেস করলেন- তুমি কি কোন সাহায্য চাও? আপনি কি বলতে পারবেন- নাথিং ফ্রম ইউ??? আমি কি পারতাম? নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে একজন সম্মানিত ফেরেশতাকে ফিরিয়ে দিতে হলে আল্লাহর উপর কি পরিমান বিশ্বাস দরকার সেটা কি আমরা কল্পনাও করতে পারি?
ইবরাহীম (আ) স্বয়ং আল্লাহর সাহায্য চাইছিলেন। স্বয়ং আল্লাহই এগিয়ে এলেন। প্রকৃতির চিরন্তন নিয়মকে পালটে দিলেন।
“ আমরা বললাম- আগুন তুমি ইবরাহীম এর জন্য ঠান্ডা ও নিরাপদ হয়ে যাও। তারা শুধুই তাঁর ক্ষতি করতে চেয়েছিল, কিন্তু আমরা তাদেরকেই সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্থ করলাম” [২১ঃ ৬৯-৭০]
শিক্ষাঃ একমাত্র আল্লাহর উপর বিশ্বাস রাখুন, আল্লাহ কল্পনাতীত উপায়ে আপনাকে সাহায্য করবেন। ফিজিক্স এর সূত্র আল্লাহর জন্য কোন সমস্যা না, কারন ফিজিক্স তিনিই বানিয়েছেন।
এই মিরাকলের পরও মাত্র দুজন মানুষ ছাড়া আর কেউ আল্লাহর উপর ঈমান আনলেন না। একজনের নাম লুত(আ), আরেকজনের নাম সারাহ, যিনি তাঁর স্ত্রী । তারা দেশ ছেড়ে মিশরের দিকে চলে গেলেন। ইবরাহীম অত্যন্ত বয়স্ক হয়ে গিয়েছিলেন, তাঁর চূল ধূসর হয়ে গিয়েছিল। তিনি আল্লাহর কাছে একটী সুসন্তান চান।
“আমার প্রভু ! আমাকে এক সৎপুত্র দান করুন।
্তাই আমরা তাঁকে একজন ধৈর্যশীল পুত্রের সুসংবাদ দান করলাম।“
তাঁর ২য় স্ত্রী হাজেরার গর্ভে জন্ম নেন তাঁর পুত্র ঈসমাইল(আ)।
আল্লাহ একটার পর একটা পরীক্ষা নিয়েছিলেন ইবরাহীম(আ) এর। নাবি হলেও তিনি মানুষ ছিলেন, তাঁর অনূভুতি ছিল ঠিক আমাদের মতই। তিনি তাঁর মুশরিক পিতাকেই কত ভালবাসতেন আপনি দেখেছেন। কাজেই তাঁর বৃদ্ধবয়সের সন্তান যে তাঁর সবচেয়ে প্রিয় হয়ে উঠবে সেটাই খুব স্বাভাবিক। যাদের জীবনে টাকা পয়সা সম্মান সবকিছু আছে, কিন্তু একটি সন্তান নেই, একমাত্র তারাই জানেন সন্তান না থাকার কষ্ট।বালক ঈসমাইল জুরহুম গোত্রের মধ্যে বড় হতে লাগলেন। ইবরাহীম(আ) মাঝে মাঝে তাদেরকে এসে দেখে যান।
“ছেলেটি যখন তাঁর পিতার সাথে কাজ করার মতন পরিনত বয়সে উপনীত হল, তখন ইবরাহীম বলল- আমার পুত্র ! আমি স্বপ্নে দেখেছি আমি তোমাকে কোরবানি দিচ্ছি। তুমি কি মনে কর? সে বলল- বাবা, যা তোমাকে হুকুম করা হয়েছে তাই কর। ইনশাআল্লাহ তুমি আমাকে ধৈর্যশীল হিসেবেই পাবে।“
আসুন চিন্তা করি। ইবরাহীম(আ)এর বিষয়টা এরকম ছিল না যে তিনি আসলে আগে থেকেই জানতেন আল্লাহ তাঁর এই ঘটনাটা থেকে কোরবানির ঈদ প্রচলন করবেন। তিনি জানতেন না এটা তাঁর জন্য একটা বড় পরীক্ষা। আল্লাহ তাঁকে আগে থেকে কোন গ্যারান্টী দেন নি। আল্লাহ তাঁর কাছে কোন গরু ছাগল বা ঊট ও চাননি। ইবরাহীম(আ) জানতেন আল্লাহ মহান ও দয়ালু, কিন্তু কমন সেন্স থেকে এটাও বোঝার কথা যে জবাই দিলে মানুষ মরে যায়। ধরুন আপনি বা আমি ঠিক হুবহু এরকম একটা স্বপ্ন দেখলাম। প্রায় শতভাগ সম্ভাবনা যে আমরা কেউই আমাদের সন্তানকে কোরবানি করতাম না। হয় আমরা ভাবতাম এটা একটা আজেবাজে দুঃস্বপ্ন হ্যালুসিনেশন, বা বুঝলেও আসলে আমরা করতাম না, আল্লাহর কাছে বড়জোর মাফ চেয়ে একটা ছাগল কোরবানি করে দিতাম!
এই ছিলেন ইবরাহিম(আ)। তিনি আল্লাহর উপর অভিমান করে বলতেই পারতেন- “আল্লাহ! আমি ইসলামের সব ভালবাসি। কিন্তু তাই বলে কি এখন আমার একটামাত্র ছেলেটাকে নিজের হাতে জবাই দিতে হবে। এটা না করলেই কি না? আমি কি তোমার নাবি না?আমি কি স্ত্রী-সন্তানকে মরুভূমিতে ফেলে আসিনি তোমার কথায়? জবাইটা না হয় নাই করলাম? “
কিন্তু না। তিনি আল্লাহকে একটা প্রশ্নও করেননি। একটাবারো তিনি অসন্তোষ জানাননি। তাঁর শিশুপুত্র তাঁকে বলেনি- বাবা তুমি কি পাগল হয়ে গেছ? তুমি কি বর্বর কশাই যে আমাকে জবাই করবে? বরং একজন শিশু হয়েও ঈসমাইল বলেছে যে আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী তাঁকে জবাই করে দিতে। আসেন ভাই, আমরা এই ব্যাপারটা নিয়ে অনেক চিন্তা করি। ইবরাহিম(আ)আল্লাহর একজন প্রকৃত দাস ছিলেন। আমরা প্রত্যেকেই সুরা ফাতিহায় বলি- ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতাঈন। না’বুদু মানে দাসত্ব করা, নিজেকে আল্লাহর ইচ্ছার সামনে ১০০ভাগ সমর্পন করা। কিন্তু বাস্তব জীবনে আসলে সেটা আমরা করিনা। ইসলামের যেটা যেটা আমাদের ভাল লাগেনা, সেগুলোকে আমরা আমাদের মনমত ছাটাই-বাছাই করে দেই।
[] আরে এত কম বয়সে হিজাব না করলেও চলবে। এটা জরুরি, কিন্তু “অতটা” না। আরো বয়স হোক। এত কম বয়সেই হুজুর হয়ে গেলে কে আমাকে বিয়ে করবে বলেন?শুনে্ন পবিত্রতা মানুশের মনে, বোরখায় না। আপনারা বেশি বাড়াবাড়ি করেন এইসব নিয়ে।
[] এটা কি দাড়ি রাখার বয়স? হ্যা, রাখব আল্লাহ যেদিন চাইবেন( উনি একফোঁটাও চান না) । দাড়ি রাখা সুন্নাত, রাখলে ভাল, না রাখলেও চলে আসলে (উনি নিজের মনমত ফতোয়া বানাচ্ছেন)। শুনেন এইসব নিয়ে বেশি বাড়াবাড়ির কিছু নাই। আপনি জঙ্গী-টঙ্গী নাকি ঠিক করে বলেন তো?

[] কি বললেন, প্রেম করা নিষেধ? শুনেন আমার গার্লফ্রেন্ড হিজাবি মাশাল্লাহ, নামাজ ও পড়ে। আমরা ইসলাম নিয়ে কথা বলি। আর আমরা অন্য দশজন কাপলের মত না ( প্রত্যেকেই একই কথা বলে) এটা নিশ্চয়ই আল্লাহ অ্যালাউ করবেন।
[] ভাই আমার অনেক অনেক কাজ সারাদিনে। আমি কত ব্যস্ত আপনার কোন ধারনাও নাই। ডেইলি ৫ বার নামাজ পড়ার সময় আমার হয়না। আল্লাহ ঠিক ই বুঝবেন আমার সমস্যা।
হাজার লক্ষ কোটি অজুহাত আমাদের। সেলফ-কনভিনসিং এর চরম পর্যায়ে চলে গেছে আমাদের মানসিকতা। ইসলামের যা ভাল লাগেনা সেগুলো নিয়ে তর্ক করি, প্রশ্ন তুলি, ডিবেট করি। অথচ প্রশ্ন তোলার মতন যদি একজনও থাকতেন তিনি হতেন ইবরাহীম(আ)।তিনি আমাদের দেখিয়ে দিয়ে গেছেন আল্লাহর প্রতি পূর্ন দাসত্ব কি জিনিস, কতপ্রকার, কি কি, উদাহরন ও প্র্যাকটিক্যাল সহ।
“তারপর যখন তারা দুইজনেই নিজেদেরকে আল্লাহর ইচ্ছার কাছে সমর্পন করল, আর ঈসমাইল কে তাঁর কপাল মাটিতে কাত করে রাখল, তখন আমরা বললাম- হে ইবরাহীম !তুমি স্বপ্ন সত্যি করেছ। অবশ্যই এভাবেই আমরা তাদেরকে পুরস্কার দেই যারা ভাল কাজ করে। অবশ্যই এটা একটা পরিষ্কার পরীক্ষা ছিল। আমরা তাঁর সন্তানের পরিবর্তে দিলাম একটি মহান জন্তু। আর আমরা তাঁর পরবর্তি বংশধরের মধ্যে স্মারনিকা হিসেবে এটি রেখে দিয়েছি। সালামুন আ’লা ইবরাহীম- ইবরাহীমের উপর শান্তি বর্ষিত হোক। এভাবেই আমরা মুহসিনুন দের(যারা ভাল কাজ করে) পুরস্কৃত করি। অবশ্যই কোন সন্দেহ নেই, সে আমাদের একজন বিশ্বাসী বান্দা ছিল। “
আপনি কি কল্পনা করতে পারেন যে আগামিকাল ঈদে আপনি আপনার ছেলের গলায় ছুরি চালাচ্ছেন? আমি কি পারি ভাবতে যে আমার বাবা কালকে আমাকে কুরবানি দিচ্ছেন? আমি কি পারব সেটা হাসিমুখে মেনে নিতে? আপাতদৃষ্টিতে এ হয়ত অসম্ভব এক কাজ, কিন্তু ইবরাহীম(আ) সেটা করে দেখিয়ে গেছেন আমাদেরকে। এক আল্লাহর উপর পূর্ন ভরসা থাকলে এটা কোন কঠিন কাজ না।
When we are advised to follow God’s commands, we make excuses. At times in order to hide our own weakness, we question God’s wisdom behind His laws. How dare we question the wisdom of the One who CREATED wisdom, and who is the source for all wisdom? But we use our own intellect to compete with God’s wisdom. We cannot make time for the daily prayers, because we think we have some “better things” to do. What will make us see the reality of our existence in Earth, the TRUE purpose of our life? When will we wake up, my dear brother and sister???
এর কিছুদিন পরই পিতা-পুত্র মিলে তৈরী করেন আল্লাহর ঘর বায়তুল্লাহ, কা’বা । এই সেই কা’বা যা কোনদিন খালি হয়না। এই সেই কা’বা যেখানে ইবরাহীম(আ) এর পায়ের ছাপ রেখে দেয়া আছে গভীর ভালবাসায়। এই সেই ঘর সেখানে প্রতি বছর ছুটে যায় কোটি কোটি মুসলিম শুধু এক আল্লাহর কাছে। যেয়ে তারা বলে- আল্লাহ আমরা তোমার কাছে হাজির। লাব্বায়েক আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক। পৃথিবী যতদিন আছে, ইবরাহীম(আ) ও আমাদের মাঝে আছেন। একটি মুসলিমও যতদিন জীবিত আছে, ইবরাহীম(আ) এর উপর শান্তি ও সালাম যাবেই যাবে।
কি আধ্যাত্মিক শিক্ষা দেয় আমাদেরকে এই ঘটনাগুলো?
[] Allah tests us many times with hardships. Any hardship that brings us closer to Allah, even if it looks or feels bad to us, is actually good for us. Any ease that takes us away from Allah, is actually bad for us. When God takes away something from us, in return, He Blesses us something better, so much better. That is "Nearness to Him" . And what can be more in a Muslim's life than to be near his God, his Creator. ?
[] পৃথিবী ক্ষনস্থায়ী। আমরা ক্ষনস্থায়ী। আমাদের সন্তান, বাবা মা, টাকা, সম্পদ, খ্যাতি সবকিছু ক্ষনস্থায়ী। আমরা এখানে একা এসেছি, অল্প কিছুদিন থাকার পর আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর কাছে আবার নিয়ে যাবেন। হযরত ইব্রাহীম (আ) তার জীবনের সবচে দামি জিনিস আল্লাহ কে দিয়ে দিয়েছিলেন। দিয়ে এটাই প্রমান করলেন - আল্লাহ! আপনার চেয়ে প্রিয় আমার কাছে আর কিছুই নাই। আপনার সন্তুস্টি-ই আমার সন্তুষ্টি। একজন মুসলিমের কাছে আল্লাহ সবার আগে, সবার উপরে। একজন মুসলিম তাঁর সন্তানের চেয়েও বেশি ভালবাসে আল্লাহকে। সন্তানকে সে জন্ম দিয়েছে, আর আল্লাহ তাঁকে বানিয়েছেন। আপনি কখনো চিন্তা করেছেন কিভাবে একটি মানুষ বানানো সম্ভব? আমি অনেক করেছি। কোন লাভ হয়নি, আমার বিন্দুমাত্র কোন ধারনাও নেই।
[] একজন মুসলিম যখন তাঁর পশুটিকে নিজ হাতে লালন পালন করে, তখন তার মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই মায়া তৈরী হয়, কারন আল্লাহ আমাদের এভাবেই তৈরী করেছেন। তারপর যখন নির্দিস্ট দিনে সে তার প্রিয় পশুটিকে কোরবানি করে, তখন তার কাছে খারাপ লাগে, কারন শত হলেও সে পেশাদার কসাই না, চোখের পলকে সে পশু হত্যা করতে পারে না। তার খারাপ লাগে কারন সে একটি জীবন কেড়ে নিল। এই খারাপ লাগাটাই হচ্ছে sacrifice and Hardship.This hardship will take Him closer to his God. And this is the greatest achievement, these are the greatest feelings. For a Muslim, this is the answer to God's Call.
"God, here I am. I sacrificed this animal for You. Only for You. You have blessed me so that I don't have to sacrifice my son, indeed You are the kindest. You have given me so many attachments in this life. My family, parents, children, friends, society, so many things. It is You who has created me and to You I shall return. I will have to leave everything in this world, today or tomorrow. But above every attachment, Nothing is more favorite to me than you. If you are not displeased with me, that is my greatest achievement.
[] আপনার প্রিয় পশুটিও জানে যে তাকে কোরবানি করা হবে। সেও কষ্ট পায়, তারও অনুভূতি আছে। একটা পশুকে কষ্ট দেওয়া, নিজে কষ্ট পাওয়া, সবকিছুই শুধু আল্লাহর জন্য করা, এই মিশ্র অনূভুতির নাম-ই কোরবানি ও ঈদ-উল-আযহা।
"আল্লাহর কাছে পৌছায় না কোরবানির রক্ত ও মাংস, পৌছায় শুধু তোমাদের তাকওয়া ( উত্তম চরিত্র) - আল কোরান, সুরা হজ । "
[] কুরবানি কোন মাংস খাওয়ার উৎসব নয়। এই পশু, এই কোরবানি শুধুমাত্র আল্লাহ-কে সন্তুষ্ট করার জন্য, আর কোনই নিয়ত নেই কোরবানির। আমাদের নিয়ত যেন খাটি হয়। মাংস খাব এই নিয়ত ভুলেও চলে আসলে কোরবানি হবে না ভাই। নিয়ত খুব জরুরি জিনিস। কোনভাবেই যেন আমাদের মধ্যে লোক দেখানো/ show off এর প্রবৃত্তি চলে না আসে। আমরা দামি গরু, ঊট কিন্‌তেই পারি, এতে কোন বাধা নেই। কিন্তু এতে বিপদ আছে। এত সূক্ষ্ম ও গোপন বিপদ যে আপনি সেটা টের ও পাবেন না। এগুলোকে বলা হয় রিয়া বা ছোট শিরক। মানুষ যখন আপনার ৩ লাখ টাকা দামের গরুর পাশে ভীড় করে দাঁড়িয়ে থাকবে, তখন এক মিলিসেকেন্ডের জন্যও যদি আপনার মনে অহংকার বা গর্ব চলে আসে, সেটা একটা খুবই বড় পাপ হবে। কাজেই আমার নিজের কাছে আমার নিজের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ হচ্ছে দেখতে খুব সাধারন একটা পশু কিনা, যেটার দিকে কেউ দুইবার তাকাবেনা।
[] নিজের সাধ্যের মধ্যে চেষ্টা করা উচিত একটি সুস্থ পশু কিনতে। বড়ো ছোট কোন বিষয় না। দাম কোন বিষয় না। ওজন কোন বিষয় না। কোনভাবেই কাউকে তার পশুর দাম নিয়ে হেয় করা যাবে না। রাস্তা দিয়ে নেওয়ার সময় কারোর গরুর দাম শুনে আমরা অনেকেই একটা মন্তব্য করি বা অন্য কোন গরুর সাথে তুলনা করি। এখানে ঠকা জিতার কোন বিষয় নাই। হতে পারে আপনার চেয়ে আরেকজন একি গরু অনেক কমে কিনেছেন। তাতে কিছু যায় আসে না। প্রত্যেকটি পয়সায় বিনিময় আল্লাহ-ই দিবেন।
[] প্রতিবছর দেখা যায় আমরা ' এবার গরু খুব সস্তা, সামনের বছর খবর আছে' বা 'ভাই আমার গরুর সাইজের গরু আজকে দাম ডাবল" জাতীয় এনালাইসিস করে টেবিল গরম করে ফেলি। এতে কি কিছু যায় আসে ভাই ? আমরা একটা গরু কিনব সারা বছরে, নিল সেটা ৫/১০/১৫ হাজার বেশি। নিল তো নিল। কেন আমরা ভাবি এখানে হারজিতের কোন ব্যাপার আছে ?? অর্থ নিশ্চয়ই এখানে বিচারের মান্‌দন্ড না ?? যদি তাই হয় তাহলেও আমি বলব, আল্লাহ-র রাস্তায় ১ টাকা খরচ করলে আল্লাহ ৭০০ গুন প্রতিদান দান করেন। এবার আপনার "লস" এর ১০ হাজার টাকা কে ৭০০ গুন করতে পারেন। আপনি কি জানেন সৌদি আরবে বিত্তবান মানুষেরা ঊট কোরবানী করে নির্দিস্ট যায়গায় ফেলে রাখে, যাতে গরীব মানুষ সেখান থেকে মাংস কেটে নিয়ে যেতে পারে? শত শত নয়, একটি মাত্র পশু কিনবো আমরা, আসুন দাম নিয়ে একদম মাথা না ঘামাই। প্রতিটি পয়সা আল্লাহর জন্য।
[] চেষ্টা করা উচিত নিজের পশু নিজের হাতে কোরবানি করার জন্য। কিছু টাকা দিয়ে একজন হুজুর/ঈমাম কে এনে কোরবানি করিয়ে আমরা কি স্যাক্রিফাইস আর তাকওয়া অর্জন করতে পারি আসলেই ? পশুর গলায় ছুরি চালাতে ভয় লাগলে নিজেকে আবার মনে করিয়ে দিবেন যে, এটি আপনার সন্তান হতে পারত যদি আল্লাহ চাইতেন। আল্লাহ পরম দয়ালু, সেটা আমাদের করতে হয়নি। পশুর সামনে ছুরি ধার দেওয়া বা এক পশুর সামনে আরেকটি জবাই করা একদম অনুচিত। খুব ধারাল ছুরি দিয়ে খুব দ্রুত কোরবানি করে ফেলতে হবে। যবাই এর পর পশুটিকে ফেলে রাখতে হবে, অহেতুক তাকে খোচানো যাবে না।
গত কয়েকবছর ধরে আমি নিয়মিত পশু কোরবানী করি আমাদের বাসায়। সত্যি বলতে কি, একটা কোরবানির পশুর প্রতি খুব দ্রুত মায়া মমতা তৈরী হয়ে যায় । আর একটা দুই তিনশ কেজির বিশাল প্রানীকে মেরে ফেলতে খারাপ লাগে আমার, কারন আমি পেশাদার কসাই না। কিন্তু যখন আমি পশুটির গলায় "আল্লাহর নামে, আল্লাহ মহান" বলে ছুরি চালাই এবং ফিনকি দিয়ে গরম রক্ত এসে আমার কাপড় রক্তাক্ত হয়ে যায় এবং আমার প্রতিবারই আমার খুব মন খারাপ লাগতে থাকে, তখন আমি আবারো নতুন করে বুঝতে পারি যে নাবি ইব্রাহীম (আ) এর আরো কতটা বেশি খারাপ লেগেছিল। কিন্তু পরমুহুর্তেই আমি এই উপলব্ধি করতে পারি যে , Because of letting go of this attachment, because of this sacrifice, I am nearer to God, and that is the greatest of all feelings.
কোরবানি হচ্ছে পশু জবাই দেওয়ার সবচেয়ে কম কষ্টদায়ক ও বিজ্ঞান্সম্মত উপায়। খুব ধারালো ছুরি দিয়ে পশুর গলার চামড়া, তারপরে শ্বাসনালী( Trachea), খাদ্যনালী(Esophagus) ও ব্রেইনে রক্তবাহী প্রধান দুটি ধমনী ক্যারোটিড আর্টারী ( Carotid Artery) ও প্রধান দুইটি শিরা জুগুলার ভেইন (Jugular Vein) কেটে ফেলা হয়। এই আর্টারি কাটার সাথে সাথেই পশু অজ্ঞান হয়ে যায় এবং সে আর কোন ব্যাথা অনুভব করেনা।
তাহলে সেটা পা ছুড়ে কেন ?
কারন অনেকগুলো ঘটনা পরপর ঘটে। প্রত্যেক মেরুদন্ডি প্রানীর পিঠে থাকে একটি মেরুদন্ড বা স্পাইনাল কর্ড। কুরবানীতে এটা কাটা হয়না। স্পাইনাল কর্ড ব্রেইনের সাথে আমাদের শরীরের সব পেশীগুলোর( Muscle) যোগাযোগ রক্ষা করে। একটি গরুর শরীরে ২০-৩০ লিটার রক্ত থাকে। যখনি ক্যারোটিড আর্টারি দিয়ে এই রক্ত বের হয়ে যেতে থাকে, ব্রেইন হৃৎপিন্ডকে মেরদন্ডের মাধ্যমে সঙ্কেত পাঠায় যে- আমি মরে যাচ্ছি, আমাকে আরো রক্ত পাঠাও। হার্ট তখন আরো জোরেজোরে পাম্প করে। ফলে শরীর থেকে সব রক্ত খুব অল্প সময়ে বের হয়ে যায়। এতে মাংসের মধ্যে কোন রক্ত থাকেনা।রক্ত খাওয়া একদম নিষেধ ইসলাম এ কারন রক্তের মধ্যেই যাবতীয় জীবানু থাকে।
[] হিন্দুরা এক কোপে পশু বলি দেয়। এতে সমস্যা কি? এতে স্পাইনাল কর্ড পুরো আলাদা হয়ে যায় এবং কোন রক্তই শরীর থেকে বের হয় না, কারন মস্তিষ্ক হার্টকে কোন সিগনালই পাঠাতে পারেনা । এই মাংস হারাম এবং স্বাস্থ্যসম্মত নয়। পশ্চিমা বিশ্বে গুলি করে বা ইলেক্ট্রিক শক দিয়ে পশু মারা হয়। সেখানেও একই সমস্যা। মাংসে যে শুধু রক্ত রয়েই যায় শুধু তাইনা, পশু তীব্র যন্ত্রনা পেয়ে মারা যায়। আল্লাহ মহাবিশ্বের সবচেয়ে জ্ঞানী সত্বা, তাঁর নিয়মে কোন খুঁত আমরা চাইলেও বের করতে পারব না।
O Allah ! Accept all our Qurbani. You don’t need these animals. You don’t need anything from Us. Its only us who need You. Forgive all our mistakes both intentional and non-intentional, Indeed You are the Gafoor-ar-Raheem. Forgive all of us, and let all of us enter in Paradise and let us to Meet you. Give Prophet Ibrahim(A) and Ismail (A) the best rewards and let us meet them one day. Send Salaam and blessings from all of Us. Our Lord, make us devoted to you . Show us How to worship and accept our repentance, for you are the Most Merciful.
কুরবানীর দু’আ-
Bismillahi Wallahu Akbar, Allahumma Taqabbal Minnee
[ আল্লাহর নামে কুরবানি করছি, আল্লাহর সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ। আল্লাহ আমার পক্ষ থেকে কবুল করে নাও তুমি]

ধৈর্য, কৃতজ্ঞতা, ও বিশ্বাস

ধৈর্য, কৃতজ্ঞতা, ও বিশ্বাস
১.
শফিক সাহেব ও তার স্ত্রী নিঃসন্তান দম্পতি। তাদের বিয়ে হয়েছে ২০ বছর, আজো তারা সন্তানের মুখ দেখেননি। জীবনে কোন কিছুর-ই তাদের কোন অভাব নেই, একমাত্র একটি সন্তান ছাড়া। তারা দুজনেই ধার্মিক মুসলিম, আল্লাহর কাছে বছরের পর বছর দু'আ করে যাচ্ছেন। বিয়ের ২৫ বছর পর তাদের একটি ছেলে হয়। মহান আল্লাহর প্রতি তারা ১০০ রাকাত নামাজ পড়ে কৃতজ্ঞতা জানালেন। তাদের নিঃসঙ্গ জীবন স্বর্গীয় সুখে ভরে উঠল।
৫ বছর বয়সে ধরা পড়ে তাদের ছেলেটি লিউকেমিয়া( ব্লাড ক্যান্সার) রোগে আক্রান্ত। তারা তাদের সবটুকু ক্ষমতা দিয়ে চেষ্টা করলেন। দেশে, দেশের বাইরে সম্ভাব্য সকল উপায়ে তারা তার চিকিৎসা করালেন। কোন লাভ হয় না। টানা দুই বছর চিকিৎসা করানোর পর ৭ বছর বয়সে ছেলেটি মারা যায়। কাঁদতেও ভুলে যান নিঃসন্তান দম্পতি। এ দুঃখের কি কোন সীমা আছে?
আর ধৈর্য ধরতে পারলেন না শফিক সাহেব। তার দুঃখ, কষ্ট, হাহাকার, যন্ত্রনা যেন বিস্ফোরিত হয় স্রষ্টার কাছে-
"আল্লাহ্‌! কি দোষ করেছি আমি জীবনে? কেন তুমি আমাকে এইভাবে কষ্ট দিচ্ছ? আমাকে কষ্ট দিয়ে তোমার কি লাভ???"
২.
শুভ মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে। চাকরিতে যাতায়াতের জন্য একটা মোটরবাইক তার খুব দরকার। ছোটবেলা থেকেই সে নিজে নিজে সংগ্রাম করে বড় হয়েছে, খুব প্রয়োজন ছাড়া কখনো সে তার সীমিত আয়ের বাবা-মার কাছে টাকা চায়নি । সে একজন প্র্যাকটিসিং মুসলিম, জীবনে যখন যা লাগে আল্লাহর কাছে চেয়েছে, আল্লাহ্‌ কিভাবে কিভাবে যেন ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। ২ বছর ধরে কয়েকটা টিউশ্যনি করে তিলে তিলে টাকা জমিয়ে সে একটা মোটরবাইক কিনে। ঠিক ১ সপ্তাহের মাথায় সেটা তার বাসার নিচ থেকে চুরি হয়ে যায়। চাবি হাতে শুন্য গ্যারাজে স্থানুর মত দাঁড়িয়ে থাকে শুভ। টপটপ করে তার চোখ থেকে পানি পড়তে থাকে। কি প্রচন্ড কষ্ট করে সে টাকা জমিয়েছিল। কেমন একটা অভিমানে বিড়বিড় করে সে বলে- " আল্লাহ্‌, এত মানুষ থাকতে কেন আমারটাই ?? কি দোষ ছিল আমার ? "
এই উদাহরনগুলো আমাদের মতন "মুসলিমদের" বাস্তব জীবনের। যতক্ষন আমরা ভাল থাকি, আল্লাহর উপর আমাদের আস্থাও ভাল থাকে। যেই না আমাদের জীবনে কোন দুর্ঘটনা, দূর্যোগ, বিপর্যয় নেমে আসে, সাথে সাথে আমরা ভুলে যাই যে আল্লাহ্‌ হচ্ছেন আর-রাহমান ( অকল্পনীয় দয়ালু, সীমাহীন দয়ালু, চিন্তাক্ষমতার বাইরে দয়ালু). আমরা তখন ধরেই নেই যে আল্লাহ্‌ আমাদেরকে কষ্ট দিচ্ছেন, আমাদের উপর অবিচার করছেন, আমাদেরকে শাস্তি দিচ্ছেন। আমাদের বিশ্বাসের ভিত আসলে খুব মজবুত কিছু নয়, টুকটাক ধাক্কা আসলেই আমরা আল্লাহর উপর আস্থা হারিয়ে ফেলি।
এই আর্টিকেল এ আল্লাহর এমন একজন বান্দার কথা বলা হয়েছে যিনি তার সারা জীবনে এতো বেশি পরিমানে কৃতজ্ঞতার নমুনা রেখে গেছেন যে আল্লাহ্‌ নিজেই এই মানুষটির প্রশংসা করেছেন !! এই মানুষটি নবী আইয়ুব (আ), ইংরেজীতে ও বাইবেলে তাঁর নাম Prophet Job (Ayoub) । এই আর্টিকেল এর তথ্য গুলো নেওয়া হয়েছে কুর'আন এর আয়াত , ইমাম ইবন কাসীর এর বই "Stories of the Prophets" , এবং বাইবেলের ওল্ড টেস্টামেন্ট এর "Job" থেকে।
আল্লাহ্‌ পৃথিবীর শুরু থেকে আজ পর্যন্ত ১ লক্ষ ২৪ হাজার নবী পাঠিয়েছিলেন মানুষের কাছে। এর মধ্যে কুর'আনে আনুমানিক ২৯ জনের কথা আছে। কুর'আন মানুষের মনোরঞ্জনের জন্য কোন এডভেঞ্চার বা থ্রীলার বই নয় বা এখানে আল্লাহ্‌ আপনাকে আমাকে ইতিহাসের গল্প বলেন নাই, খুব সোজা কথায় এটি একটি Instruction Manual. এটার প্রত্যেকটা লাইনে আল্লাহ্‌ আপনাকে আমাকে কোন না কোন Guidance দিয়েছেন। আপনি যদি এটা ব্যবহার করে সফলতা অর্জন করতে চান, আপনাকে প্রত্যেকটি লাইন পড়ে পড়ে চিন্তা করতে হবে যে সেখানে আল্লাহ্‌ "শুধুমাত্র আপনার জন্য" কি বলেছেন। কুর'আনের ২৯ জন নবীর জীবনের ঘটনাগুলোও আমাদের জন্য প্রচন্ড গুরুত্বপূর্ন একেকটি চ্যাপ্টার। আপনাকে উপলব্ধি করতে হবে যে, তাঁদের ঘটনাগুলো কি কারনে আল্লাহ্‌ আপনাকে বলেছেন। আল্লাহ্‌ চেয়েছেন আপনি তাঁদের কাছ থেকে শিক্ষা নেন এবং সেটা আপনার জীবনে কাজে লাগান। আপনি যখন নবী আইয়ুব (আ) এর জীবনের ঘটনা পড়বেন, আপনি গভীরভাবে চিন্তা করে নিজেকে নিজে জিজ্ঞেস করবেন যে হুবহু ঐ ঘটনাটা আপনার জীবনে ঘটলে আপনি কি করতেন। তাঁর মতন আপনি কি পারতেন ধৈর্য্যের পরীক্ষায় পাস করতে ? ঈমান একদিনে ডেভেলপ করেনা। আপনি আগামীকাল সকালে ঘুম থেকে উঠে লাফ দিয়ে বলতে পারবেন না - " ইয়েস ! তাকওয়া এসে গেছে আমার ! " . আপনাকে প্রতিদিন একটু একটু করে ঈমানের সিঁড়ি বেয়ে উপরের দিকে উঠতে হবে। আর এর জন্য আপনার প্রথম ও প্রধান গাইডলাইন হচ্ছে কুর'আন।
আইয়ুব (আ) রোমের বাসিন্দা ছিলেন। তিনি ইবরাহীম(আ) এর বংশধর ছিলেন। তাঁর প্রতি আল্লাহ্‌ এত খুশি হয়েছেন যে আল্লাহ্‌ নিজেই তার প্রশংসা করে বলেন-
Truly ! We found him patient. How excellent a slave ! Verily, he was ever oft-returning in repentance to Us. ( Ch 38:44)
এটা খুব সাধারন কোন ব্যাপার নয় যখন আল্লাহ্‌ নিজেই কারো সম্পর্কে বলেন - "নিঃসন্দেহে ! আমি তাকে পেয়েছি অত্যন্ত ধৈর্য্যশীল হিসেবে। কি চমৎকার একজন বান্দাই না ছিল সে !! সে বার বার আমার কাছে তাওবা করে প্রত্যাবর্তন করত" (ভাবানুবাদ). যখন আল্লাহ্‌ নিজ থেকে কারোর প্রশংসা করেন তাঁর মানে সেই মানুষটি সাধারন মানুষের সীমার বাইরে কোন কাজ করে উদাহরন স্থাপন করে গেছেন।
আল্লাহ্‌ আইয়ুব (আ) কে ধন- সম্পদ, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য সবকিছু দিয়েছিলেন। বাইবেলের তথ্য অনুযায়ী তাঁর ছিল ৭ ছেলে ও ৩ মেয়ে, ৭ হাজার ভেড়া, ৩ হাজার উট, ৫০০ গাধা ও ১০০০ অন্যান্য মেষপাল। আপনাকে আমি বলছি না এই তথ্য হুবহু বিশ্বাস করতে, কিন্তু এখান থেকে অন্তত আপনি কিছুটা হলেও তাঁর সম্পদের পরিমান সম্পর্কে ধারনা করতে পারেন। তিনি আল্লাহর একজন নবী ও অত্যন্ত কৃতজ্ঞ একজন বান্দা ছিলেন। জীবনের প্রতি মুহুর্তে তিনি আল্লাহকে ধন্যবাদ জানাতেন সবকিছুর জন্য, আল্লাহর কাছে বারবার তাওবা করতেন, আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতেন, ধৈর্য ধরতেন ও আল্লাহর শোকর আদায় করতেন। তিনি গরীব মানুষদের খাবার ও পোষাক দিতেন, দাস কিনে তাদেরকে মুক্ত করে দিতেন।
ইবলিসের হিংসাঃ
আইয়ুব (আ) এর প্রতি আল্লাহর সন্তুষ্টি ইবলিসের কাছে ভাল লাগল না। সে নিজে আল্লাহকে অমান্য করেছে, কাজেই কেউ আল্লাহর প্রিয়পাত্র হোক এটা সে সহ্য করতে পারে না। নানাভাবে ছলে বলে কৌশলে সে আইয়ুব (আ) কে তাঁর ইবাদাত থেকে দূরে সরানোর চেষ্টা শুরু করল। তাঁকে পৃথিবীর জীবনের নানারকম আনন্দময় লোভনীয় জিনিসের কথা বারবার মনে করিয়ে দিতে থাকল। এতে কোন লাভই হোল না কারন আইয়ুব (আ) ছিলেন একজন সত্যিকারের আবদ-আল্লাহ ( আল্লাহর দাস) . এতে ইবলিস আরো বেশি বিরক্ত হয় ও তাঁকে আরো বেশি করে ঘৃনা করা শুরু করে।
ইবলিস আইয়ুব (আ) এর সম্পদ ধ্বংস করলঃ
ধূর্ত ও চতুর ইবলিস আল্লাহর কাছে আইয়ুব (আ) এর নামে অভিযোগ করল। তাঁর অভিযোগের বক্তব্যটা ছিল যে, যদিও আইয়ুব (আ) প্রতিমূহুর্তে আল্লাহকে স্মরন করেন, কিন্তু তিনি আসলে এসব ইবাদত মন থেকে করেন না, তিনি এসব শুধুমাত্র এই কারনেই করেন যাতে করে আল্লাহ্‌ তাঁর বিপুল সম্পদ কেড়ে না নিয়ে যান। তাঁর ইবাদত লোক দেখানো শো-অফ ছাড়া আর কিছুই না। ইবলিস এটাও আল্লাহকে বলল-
" আজকে তাঁর সম্পদ আছে, তাই সে তোমাকে স্মরন করে আল্লাহ্‌। তুমি তাঁর সম্পদ কেড়ে নাও, তুমি দেখতে পাবে যে তাঁর মুখে তোমার নাম আর স্মরণ হবে না। তুমি দেখবে তাঁর ইবাদত বন্ধ হয়ে যাবে। তুমি আমাকে তাঁর সকল সম্পদ নষ্ট করে দেওয়ার ক্ষমতা দাও, তারপর দেখো তাঁর কৃতজ্ঞতা কই গিয়ে ঠেকে। "
আল্লাহ্‌ সময়ের ঊর্দ্ধে, অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ তাঁর জন্য প্রযোজ্য নয়। তিনি খুব ভাল করেই জানেন ইবলিশের মতলব কি। তিনি ইবলিশকে বললেন যে, আইয়ুব(আ) তাঁর সবচে কৃতজ্ঞ বান্দাদের একজন, তিনি কখনই সম্পদের লোভে বা লোক দেখানোর জন্য কোন ইবাদত করেন না। তারপরো ইবলিশকে একটা নমুনা দেখানোর জন্য তিনি ইবলিশের ইচ্ছাপূরন করলেন।
ইবলিশ মহা খুশি। সে তাঁর দলবল সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে আইয়ুব(আ) এর হাজার হাজার পশু, দাস, ফার্ম ও অন্যান্য সব সম্পদ মূহুর্তের ভিতর ধ্বংস করে দিল। একজন বৃদ্ধ লোকের ছদ্মবেশ ধরে ইবলিশ আইয়ুব(আ) এর কাছে যেয়ে বলল- " তোমার তো সব কিছুই শেষ। কেউ কেউ বলে যে এটার কারন হচ্ছে তুমি অনেক বেশি দান করতে আর তুমি সারাক্ষন আল্লাহর ইবাদত করে তোমার সময় নষ্ট করতে। আবার অনেকে এটাও বলে যে আল্লাহ্‌ তোমার শত্রুদের খুশি করার জন্য তোমার সম্পদ নিয়ে গেছেন। যদি তোমার সম্পদ রক্ষা করার ক্ষমতা আল্লাহর থাকত, তাহলে নিশ্চয়ই তিনি সেটা করতেন। "
কপর্দকহীন আইয়ুব(আ) শান্ত কন্ঠে উত্তর দিলেন- " কোন কিছুই আমার না। আল্লাহর সম্পদ আল্লাহ্‌ নিয়ে গেছেন। আমি সামান্য কয়েকদিনের জন্য এগুলোর আমানতকারী ছিলাম মাত্র। তিনি যাকে ইচ্ছা দেন, আর যার কাছ থেকে ইচ্ছা নিয়ে যান। " এ কথা বলে তিনি আল্লাহর কাছে সিজদা করলেন।
এবার আপনার পালা। আমি যতবার আপনাকে আইয়ুব(আ) এর ঘটনা বলব ততবার আপনাকে ভাবতে হবে যে এটা আপনার জীবনে ঘটলে আপনি কি করতেন। মনে করুন আপনার বাবা একটা ৫ তালা বাড়ি রেখে গেছেন আপনার জন্য। বর্তমান বাজার মূল্যে এটার দাম প্রায় ১০ কোটি টাকা। এটার ভাড়া দিয়ে আপনি সচ্ছল জীবনা যাপন করেন ও আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় করেন। একদিন মাঝারি মাপের একটা ভূমিকম্প হল। অফিস থেকে ফিরে আপনি দেখলেন, আপনার আশেপাশের প্রত্যেকটি বাড়ি ঠিক আছে, শুধু আপনার বাড়িটিতে ফাটল ধরেছে ও আস্তে আস্তে হেলে পড়ছে। মাথায় হাত দিয়ে আপনি বসে পড়লেন। আপনার চোখের সামনে সরকারের লোক এসে আপনার বাড়িটি ভেঙ্গে ফেলল। নিঃস্ব ছাদহীন অবস্থায় দাঁড়িয়ে কি সেদিন আপনি আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় করতেন নাকি ভাবতেন আল্লাহ্‌ কেন আপনার উপর এত বড়ো অবিচার করলেন??
ইবলিস আইয়ুব (আ) এর সন্তানদের ধ্বংস করলঃ
ইবলিশ আইয়ুব (আ) এর অসাধারন ঈমান দেখে হতাশ ও ক্ষুব্ধ হয়ে উঠল। সে আল্লাহর কাছে গিয়ে আবার বলল- " আমি তাঁর সকল সম্পদ ধ্বংস করেছি, কিন্তু সে এখনো তোমার প্রতি কৃতজ্ঞ। সে আসলে তাঁর দুঃখ চেপে রেখেছে কারন এখনো তাঁর অনেকগুলো সন্তান আছে। তাঁর আসল পরীক্ষা শুরু হবে যখন তাঁর সন্তানগুলো থাকবে না। তুমি আমাকে তাঁর সন্তানগুলো কেড়ে নেবার ক্ষমতা দাও, তারপর দেখো সে কিভাবে তোমাকে অস্বীকার করে আল্লাহ্‌। "
আল্লাহ্‌ তাকে এটাও দিলেন। ইবলিশ তার দলবল নিয়ে তার শয়তানী শুরু করল। তারা আইয়ুব (আ) এর বাড়িটির ভিত্তিপ্রস্তর ধ্বংস করে দিল। একদিন বাড়ি ফিরে আইয়ুব (আ) স্তব্ধ হতবাক হয়ে দেখেন, তাঁর মৃত ১০ ছেলেমেয়ে সহ পুরো বাড়িটি ভেঙ্গে ধ্বংসস্তূপ হয়ে পড়ে আছে। ইবলিশ আবারো সৌম্য বৃদ্ধের বেশে আইয়ুব (আ) এর কাছে এসে মোলায়েম কন্ঠে বলল- " যেভাবে তোমার সন্তানরা মারা গেছে এটা খুবই দুঃখজনক। নিশ্চয়ই তোমার প্রভু তোমার ইবাদতগুলোর যথাযথ মর্যাদা দিচ্ছেন না তোমাকে। " এ কথা বলে ইবলিশ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগল যে নিশ্চয়ই এখন আইয়ুব (আ) আল্লাহকে অভিশাপ ও অস্বীকার করা শুরু করবেন।
আইয়ুব (আ) ইবলিশকে নিরাশ করলেন। তিনি বললেন- " কখনো আল্লাহ্‌ দেন, আবার কখনো তিনি নিয়ে যান। কখনো তিনি আমাদের কাজের উপর সন্তুষ্ট হন, আবার কখনো অসন্তুষ্ট হন। একটা জিনিস আমার জন্য ভাল বা খারাপ যাই হোক না কেন, আমি আবার বিশ্বাসে অটল থাকব আর আমার স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকব। " একথা বলে আবার তিনি আল্লাহর কাছে সেজদা করলেন। রাগে ক্ষোভে ও চরম হতাশায় ইবলিশের নোংরা মন আরো কলুষিত হয়ে উঠল।
আবার আপনার পালা। আপনার বাসস্থান ও আয়ের উৎস বাড়িটি ভেঙ্গে পড়েছিল। তারপরো আপনি ধৈর্য্য ধরেছিলেন, আল্লাহর উপর ভরসা করেছিলেন। একটা ছোট ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে চলে যাচ্ছিল আপনার। ফুটফুটে ৩টি বাচ্চা আছে আপনার। এদের মুখের দিকে তাকিয়ে অভাব অনটনেও আপনার জীবন মোটামুটি চলছিল। একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে বাস এক্সিডেন্ট এ আপনার ৩টি সন্তানই মারা যায়। প্রবল শোকে স্তব্ধ হয়ে আপনি টানা ৩ দিন বসে থাকেন তাদের কবরের পাশে। আপনার স্ত্রীকে মানসিক হাসপাতালে কড়া ঘুমের অসুধ দিয়ে রাখা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে আপনি কি করতেন??? আপনি চিন্তা করুন, নিজেকে জিজ্ঞেশ করুন।
- ভাগ্যকে গালাগালি করতেন?
- আল্লাহ্‌ আপনার উপর চরম অবিচার করেছেন ভাবতেন?
- ধৈর্য্য ধরতেন ও আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতেন?
ইবলিস আইয়ুব (আ) এর সুস্বাস্থ্য ধ্বংস করলঃ
ইবলিস আবার আল্লাহর কাছে গিয়ে বলল- " ও আল্লাহ্‌, তাঁর সম্পদ নেই, তাঁর সন্তান নেই, কিন্তু এখনো তাঁর সুস্বাস্থ্য আছে। আর যতক্ষন তাঁর সুস্বাস্থ্য থাকবে, সে সম্পদ ও সন্তানের আশায় তোমার ইবাদত করবে। আমাকে তাঁর শরীরের উপর ক্ষমতা দাও যাতে আমি সেটা নষ্ট করতে পারি। তারপর তুমি দেখবে যে সে তোমাকে অস্বীকার করে।
আল্লাহ্‌ ইবলিসকে একটা ফাইনাল শিক্ষা দিতে চাইলেন। তার ৩য় অনুরোধটাও রাখলেন। বললেন- "আমি তোমাকে ক্ষমতা দিচ্ছি, কিন্তু মনে রেখ, তুমি তাঁর চিন্তাশক্তি ও বুদ্ধির উপর কোন ক্ষমতা পাবেনা, কারন সেখানে তার ঈমান আছে।"
নতুন ক্ষমতা পাওয়ামাত্র ধূর্ত ও কুটিল ইবলিস আইয়ুব (আ) এর শরীরকে আক্রমন করা শুরু করল। দিনের পর দিন তিনি অসহ্য যন্ত্রনায় পশুর মতন গোঙাতে থাকেন। তাঁর শরীরে পচন ধরা শুরু করল। দিনে দিনে তিনি শুধুমাত্র হাড় ও চামড়া বিশিষ্ট একটি জীবন্মৃত জীবে পরিণত হলেন। তাঁর শরীরে এমন কোন অঙ্গ ছিলনা যেটাতে অসুখ ছড়িয়ে পড়েনি। অকল্পনীয় অসহনীয় যন্ত্রনার মাঝেও আইয়ুব (আ) তাঁর বিশ্বাসে অটুট থাকলেন আর বার বার আল্লাহ-র দয়ার আশায় রইলেন। সকল আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধব তাঁর ভয়ঙ্কর রোগ দেখে তাঁকে ছেড়ে চলে গেল। কেউ তাঁর প্রতি করুনা ও সহানুভূতি দেখালো না। একমাত্র তাঁর মমতাময়ী স্ত্রী তাঁর সাথে রইলেন ও দিনের পর দিন তাঁর সেবা করে গেলেন।
আইয়ুব (আ) এর দু'আঃ
ইবলিস হতাশার শেষ সীমায় পৌঁছে গেল। সে তাঁর সঙ্গীদের পরামর্শ চাইল। তারা তাকে বলল- " এই কি তোমার বুদ্ধি যা দিয়ে তুমি আইয়ুব (আ) কে ধ্বংস করতে পারছ না? অথচ তুমিই না আদমকে কুবুদ্ধি দিয়ে জান্নাত থেকে বের করে দিয়েছিলে? কই আজকে তোমার সেই বুদ্ধি? "
ইবলিসের মাথায় নতুন বুদ্ধি এল। হাজার হাজার বছর আগে ঘটনাটা তাঁর মনে পড়ল। তার মনে পড়ল সে হাওয়া(আ) কে কিভাবে প্রতারনা করেছিল। সে মানুষের বেশ ধরে আইয়ুব (আ) এর স্ত্রীর কাছে গেল।
"তোমার স্বামী কোথায়?"- জিজ্ঞেস করল ইবলিস।
তিনি আঙ্গুল তুলে বিছানায় মৃতপ্রায় একটি আকৃতিকে দেখালেন। - "ঐ তো উনি, জীবন ও মৃত্যুর মাঝে লড়াই করছেন।"
ধূর্ত ইবলিস তাঁর স্ত্রীকে আগের সুন্দর দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দিল, যখন তাদের সব ছিল। সন্তান, স্বাস্থ্য, সম্পদ, সব। সে তাঁকে বোঝাল যে আল্লাহ্‌ দিনের পর দিন তাদেরকে কত কষ্ট দিচ্ছেন।
আর সহ্য করতে পারলেন না স্ত্রী। কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন তিনি। আইয়ুব (আ) কে বললেন-
" আর কতদিন তুমি আল্লাহর এই যন্ত্রনা সহ্য করবে? আমরা কি আজীবন এভাবেই নিঃস্ব হয়ে থাকব? কেন তুমি তাঁকে ডেকে আমাদের কষ্টের কথা বলনা ? কেন তুমি তাঁকে বলনা এসব দূর করে দিতে? "
দীর্ঘশ্বাস ফেললেন মৃতপ্রায় আইয়ুব (আ) . ক্ষীন নরম কন্ঠে বললেন- " নিশ্চয়ই ইবলিস তোমাকে কুবুদ্ধি দিয়েছে। তুমি আমাকে বল কতদিন আমার ধন-সম্পদ আর সুস্বাস্থ্য ছিল? "
- "৮০ বছর"- তিনি বললেন।
- " আর কতদিন ধরে আমি এভাবে ভুগছি?"
- "৭ বছর" - স্ত্রী বললেন।
আইয়ুব (আ) তাকে বললেন- " সেক্ষেত্রে আমি লজ্জিত আল্লাহর কাছে এই কষ্টের মুক্তি চাইতে। আমার দুঃখের চেয়ে আমার সুসময়ের পরিমান অনেক অনেক বেশি। আমার মনে হচ্ছে তোমার বিশ্বাস দূর্বল হয়ে গেছে আর তুমি আল্লাহর উপর অসন্তুষ্ট। আমি শপথ নিচ্ছি যে আমি যদি সুস্থ হই, আমি তোমাকে ১০০ বার আঘাত করব ! আজকে থেকে আমি তোমার হাত থেকে খাবার খেতে বা পান করতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছি। তুমি আমাকে ছেড়ে চলে যাও, আল্লাহ্‌ সেটাই করবেন যা তিনি ভাল মনে করেন। "
একমাত্র সঙ্গী স্ত্রী ভগ্ন হৃদয়ে কাদঁতে কাদঁতে চলে গেলেন। সম্পূর্ন একাকী অসহায় অবস্থায়, আইয়ুব (আ) আল্লাহর কাছে দু'আ করলেন।
"স্মরন কর, যখন আইয়ুব তার মালিককে ডেকে বলেছিল, হে আল্লাহ্‌, আমাকে এক কঠিন অসুখে পেয়ে বসেছে, আমাকে তুমি নিরাময় কর, কেননা তুমিই হচ্ছ, দয়ালুদের সর্বশ্রেষ্ট দয়ালু। তারপর আমি তার ডাকে সাড়া দিলাম, তাঁর যে কষ্ট ছিল তা দূর করে দিলাম, তাকে যে শুধু তার পরিবার পরিজনই ফিরিয়ে দিলাম তা নয়; বরং তাদের সবাইকে আমার কাছ থেকে বিশেষ দয়া এবং আমার বান্দাদের জন্য উপদেশ হিসেবে আরো সমপরিমান অনুগ্রহ দান করলাম।" ( 21: 83-84)
কিভাবে আইয়ুব(আ) সুস্থ হলেন আল্লাহ্‌ নিজেই তা বলেছেন-
" হে নবী, তুমি আমার বান্দা আইয়ুবের কথা স্মরণ কর। যখন সে তাঁর মালিককে ডেকে বলেছিল, হে আল্লাহ্‌, শয়তান তো আমাকে যন্ত্রনা ও কষ্টে ফেলে দিয়েছে। আমি বললাম, তুমি তোমার পা দিয়ে মাটিতে আঘাত কর। আঘাত করার পর যখন পানির একটি কূপ বেরিয়ে এল, তখন আমি আইয়ুবকে বললাম, এ হচ্ছে তোমার পরিষ্কার করার ও পান করার উপযোগী পানি। আমি তাঁর সাথে তাঁর পরিবার পরিজন ও তাদের সাথে একই পরিমান অনুগ্রহ দান করলাম, এটা ছিল আমার পক্ষ থেকে রহমত এর নিদর্শন ও জ্ঞানবান মানুষের জন্য উপদেশ। ( 38: 41-43)
আইয়ুব(আ) আল্লাহর নির্দেশ পালন করলেন। ৭ বছরের কষ্টের অবসান ঘটল মূহুর্তের মধ্যে। এর মধ্যে তাঁর স্ত্রী তাঁর কাছে ফেরত এলেন । নিজের বাড়িতে এসে তিনি বিশ্বাস করতে পারলেন না তিনি কোথায় এসেছেন। সবকিছু হুবহু আগের মতন। সন্তান, সাস্থ্য, সম্পদ সবকিছু আগের মতন হয়ে গেছে। এ কিভাবে সম্ভব! আবেগাপ্লুত বাকরুদ্ধ হয়ে তারা আল্লাহকে ধন্যবাদ জানালেন।
ছোট একটি সমস্যা রয়ে গেছে। আইয়ুব(আ) শপথ করে বলেছিলেন তিনি সুস্থ হলে স্ত্রীকে ১০০ বার আঘাত করবেন। তিনি স্ত্রীকে আঘাত করতে চান না, কিন্তু শপথ যে রাখতেই হবে। এখন কি হবে?
আল্লাহর প্রিয় বান্দার সাহায্যে এগিয়ে এলেন আল্লাহ্‌ নিজেই। এক মুঠো নরম ঘাস দিয়ে স্ত্রীকে হালকা আঘাত করার নির্দেশ দিলেন আল্লাহ্‌। কি মহান তিনি, কি মহান তাঁর ভালবাসা।
"আমি তাকে বললাম, তুমি তোমার হাতে এক মুঠো তৃণলতা নাও আর তা দিয়ে তোমার স্ত্রীকে মৃদু আঘাত কর, তুমি কখনো শপথ ভংগ কোর না; নিঃসন্দেহে ! আমি তাকে পেয়েছি অত্যন্ত ধৈর্য্যশীল হিসেবে। কি চমৎকার একজন বান্দাই না ছিল সে ! সে বার বার আমার কাছে তাওবা করে প্রত্যাবর্তন করত। " ( 38:44)
.........................................................................................................
মানুষের বিশ্বাসের লেভেল অনুযায়ী আল্লাহ্‌ তার পরীক্ষা নেন। আল্লাহ্‌ আইয়ুব(আ) এর ধৈর্য্যের পরীক্ষা নিয়েছিলেন। সর্বোচ্চ পর্যায়ের পরীক্ষা। নবী হলেও তিনি মানুষ ছিলেন, তাঁরও আমাদের মতই আবেগ অনুভূতি ছিল। আল্লাহ্‌ তাঁকে সবকিছু দিয়েছিলেন, তারপর তাঁর কাছ থেকে একে একে সব নিয়ে গিয়েছিলেন, তাঁর ধৈর্য্য ও কৃতজ্ঞতায় কোনদিন কোন ফাটল ধরেনি। অকল্পনীয় পুরস্কার হিসেবে আল্লাহ্‌ তাঁকে তাঁর সবকিছু আবার ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। The stronger the faith, the harder the tests, the greater the rewards.

আইয়ুব(আ) এর জীবনের ঘটনা গুলো আমার জীবনে একটি মিরাকল । এটি বইয়ের মাত্র ৪ পৃষ্ঠার একটি জীবনী, কিন্তু আমি আপনাকে বলব কিভাবে এটি আমার জীবনকে রাতারাতি পরিবর্তন করে দিয়েছে, কিভাবে এটি আমাকে গাইড্যান্স দিয়েছে। আমি আপনাকে প্রমান দিব। আমি আগেও বলেছি কুর'আনের যে আয়াতগুলো আমি আমার জীবনে যখনি প্রয়োগ করার চেষ্টা করেছি, আমার জীবন পরিবর্তিত হয়ে গেছে। নবী আইয়ুব(আ) এই ঘটনাগুলো আমাকে পরিবর্তন করেছে সবচেয়ে বেশি পরিমানে।
নবী আইয়ুব(আ) এর ঘটনাগুলো আমাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। আমি অনেকবার চিন্তা করে দেখেছি কিভাবে তিনি জীবনের সবরকম পরিস্থিতিতে কৃতজ্ঞ হতে পেরেছিলেন। আমি ভেবেছি যে আমার প্রিয় পরিবার, ভাইবোন, বাড়ী, সম্পদ সবকিছু যদি আজকে ধ্বংস হয়ে যায় আমি কি পারতাম তাঁর মতন ধৈর্য্য ধরতে ও কৃতজ্ঞ হতে ? হয়ত আমি পারতাম না, কিন্তু আমি নিজেকে বুঝিয়েছি যে চেষ্টা করলে কিছুটা আমি নিশ্চয়ই পারব। হয়ত আইয়ুব(আ) এর মতন পারবনা, কিন্তু তাঁর ১% হলেও তো পারব। তাঁর ঘটনাগুলো পড়ার পর এগুলো আমার মস্তিষ্কে স্থায়ীভাবে গেঁথে যায়। আমি উপলব্ধি করতে পেরেছি যেকোন জঘন্যতম পরিস্থিতিতেও আল্লাহর উপর কৃতজ্ঞ হওয়া যায়। কারন নবী আইয়ুব(আ) এর চেয়ে কঠিন পরীক্ষায় পড়া কারোর পক্ষে সম্ভব না। আস্তে আস্তে আমি চেষ্টা করেছি "আমি কি চাই" , "আমার কি কি দরকার" " আমার কি কি সমস্যা" এসব বাদ দিয়ে "আল্লাহ্‌ আমাকে কি কি দিয়ে যাচ্ছেন" এটার কথা চিন্তা করে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ হতে।
কষ্টের মধ্যেও কৃতজ্ঞ হলে কি লাভ হয় সেটার প্রমান আমি পাই ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ২৪ আর ২৫ তারিখে। এই ঘটনাটি আমার জীবনের একটি মিরাকল। কিন্তু আপনার কাছে এটা শুধুমাত্র একটা গল্প। আপনি হয়ত আমার অনুভুতির ১% গ্রহন করতে পারবেন, কিন্তু আমি চাই আপনি এটা জানুন।
জানুয়ারি মাসে ২১৫০ টাকা দিয়ে আমি গ্যালারী এপেক্স থেকে একটা স্যান্ডেল কিনি। আমার আম্মা আমাকে ২০০০ টাকা দেন, ১৫০ টাকা আমি যোগ করি। এত দামী স্যান্ডেল এর আগে আমি কখনো আমার জীবনে পরিনি। ঘটনার শুরু ২৪শে ফেব্রুয়ারী দুপুরে। স্যান্ডেলটা পরে আমি যোহরের নামাজ পড়তে যাই। দামি জুতা আমি সবসময় মাথার সামনে রাখি, সেদিন সামনে জায়গা না থাকায় বাধ্য হয়ে আমার পেছনের বাম পাশে বাক্সে রাখি। রাখার সময় মনটা একটু খুঁতখুঁত লাগছিল, কিন্তু আমার করার কিছু ছিলনা। নামাজ শেষে দেখি আমার প্রায় নতুন স্যান্ডেলটি নেই। মাসজিদ থেকে জুতা আমি অনেক হারিয়েছি। কিন্তু সেদিন আমার অত্যন্ত খারাপ লাগল, কারন ঘটনাটিতে আমার অসতর্কতা দায়ী।

অনেকক্ষন আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম মাসজিদে। আমার নবী আইয়ুব(আ) এর কথা মনে পড়ল। আমি দুইটি দু'আ একসাথে পড়লাম- ইন্নালিল্লাহ ও আলহামদুলিল্লাহ। আমি নিজেকে বুঝালাম যে, অবশ্যই এটাতে আমার জন্য কোন ভাল কিছু আছে।
আমি যে বাসায় থাকি এটা আমাদের পারিবারিক হাসপাতাল। এখানে আমার বাবা ও আমি শিশু চিকিৎসক, আর আমার মা গাইনোকলোজিস্ট। দুপুরে আমি ১টি রোগী দেখে দিলাম আর একজনের মাথায় কয়েকটা সেলাই করে দিলাম, আমাকে তারা ৮০০ টাকা দিয়ে গেল। আমি আল্লাহর প্রতি আবারো কৃতজ্ঞ হলাম যে তিনি কত দ্রুত আমার ক্ষতিপূরন করে দিচ্ছেন। কিন্তু তখনো আমি তারঁ প্ল্যান বুঝিনি।
বিকালে আমি পাখির খাবার কিনে আনি ৩০০ টাকার। ৮০০ টাকা থেকে আবার আমার ৫০০ টাকা হয়ে যায়। সেদিন বাকি দিন আর ২৫ তারিখ সারাদিন আমার ঘুরে ফিরে স্যান্ডেলটির কথা মনে হতে থাকে। নিজের অসতর্কতার জন্য নিজের উপর আক্ষেপ হয়। মানসিক শান্তির জন্য আমি নিজে নিজেই চিন্তা করি যে- যে চোর স্যান্ডেলটি নিয়েছে তার সন্তান হয়ত অসুস্থ, সে হয়ত এটা বিক্রী করে তার অসুধ কিনেছে। আমি আল্লাহর কাছে এই প্রার্থনাও করি যেন তিনি চোরটিকে ক্ষমা করে দেন।
২৫ তারিখ সকালে আমার বাবা ঢাকার বাইরে চলে যান। রাত ১০টায় আমার মা আমাকে জানান যে, এক্ষনি একটা সিজার অপারেশন হবে, নবজাতকটি জন্মের পর আমি একা "বেবী ম্যানেজ" ( নাড়ী কাটা সহ আনুসঙ্গিক চিকিৎসা) করতে পারব কিনা। আমি বহুবার এ কাজ করেছি, কিন্তু সাথে আমার বাবা ছিলেন সবসময়। একমাত্র সেদিন আমি একা একা কাজটি করি।
কাজ শেষ করে আমি উপরে বাসায় চলে আসি। আমার মা রাত ১টায় আমাকে একটি খাম দিলেন। সাধারনত জন্মের পর একটি নবজাতককে ম্যানেজ করার জন্য আমার মা আমাকে সবসময় ১ হাজার টাকা করে দেন। আমি খাম খুলে দেখি সেখানে ১৫০০ টাকা। আমি মা-কে বলেছি যে এখানে বেশি টাকা আছে। তিনি আমাকে বললেন যেহেতু আমি একদম একা ছিলাম, তাই তিনি আমার সম্মানী একটু বাড়িয়ে দিয়েছেন।
টাকাটা টেবিল এ রেখে একটু চিন্তা করলাম আমি। কয়েক মূহুর্ত পর ইলেক্ট্রিক শক খাওয়ার মতন চমকে উঠলাম আমি। স্যান্ডেল চুরির ৩৬ ঘন্টার মাথায় আমার কাছে ২৩০০ টাকা এসেছে, এর মধ্যে আমি ৩০০ টাকা খরচ করেছি, ২ হাজার টাকা আছে। স্যান্ডেলটা কেনার জন্য জানুয়ারী মাসে আমার মা আমাকে ঠিক ২ হাজার টাকা দিয়েছিলেন !
আপনি বলতেই পারেন এটা একটা কাকতালীয় ঘটনা, কোনভাবে মিলে গেছে। সেদিনের আগে ও পরে আজকে পর্যন্ত আমি বহু নবজাতক ম্যানেজ করেছি। একমাত্র সেদিন বাদে আর কোনদিন আমি ১ হাজার টাকার কাজের জন্য ১৫০০ টাকা পাইনি। জীবনেও না। সামান্য একটা স্যান্ডেলের জন্য আমি কিছুটা কষ্ট পেয়েছিলাম। আমি ধৈর্য ধরেছিলাম ও আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় করেছিলাম। আল্লাহ্‌ আমার কষ্ট দেখেছিলেন, তিনি আমার কৃতজ্ঞতা দেখেছিলেন। আল্লাহ্‌ এমনভাবে আমাকে সেটার প্রতিদান দিলেন যা আমি কোনভাবেও কল্পনা করতে পারিনি।
কুর'আনে আল্লাহ্‌ বহুবার আমাদেরকে কৃতজ্ঞ হতে বলেছেন, ধৈর্য ধরতে বলেছেন। আপনি যেকোন পরিস্থিতিতে কৃতজ্ঞ হতে শিখুন। আপনি চেষ্টা করুন, আপনি পারবেন। এটা কুর'আনের শিক্ষা। কুর'আন শুরুই হয়েছে "আলহামদুলিল্লাহ" দিয়ে ( সকল প্রশংসা, কৃতজ্ঞতা, বিনয়, নম্রতা, ভালবাসা, শ্রদ্ধা আল্লাহর জন্য) . দিনে রাতে হাঁচি, কাশি টয়লেট সহ যাবতীয় কাজে আল্লাহ্‌ আমাদেরকে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ হতে শিখিয়ে দিয়েছেন।
[] যদি তোমরা বিশ্বাসী হও আর কৃতজ্ঞ হও, তাহলে তোমাদের শাস্তি দিয়ে আল্লাহর কোন লাভ আছে কি?
What can Allah gain by your punishment, if you are grateful and you believe? ( 4:147)
[] যে-ই আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য মুক্তির পথ বের করে দিবেন। আর তাঁকে এমন যায়গা থেকে রিযিক দিবেন যা তার কল্পনারও বাইরে। যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা করে তার জন্যে তিনিই যথেষ্ট। অবশ্যই আল্লাহ তাঁর উদ্দেশ্য পূর্ণ করবেন। আল্লাহ সবকিছুর জন্যে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ স্থির করে রেখেছেন। (65: 2-3)
[] "মনে পড়ে তোমাদের প্রভু বলেছিলেন, তোমরা যদি একবারও কৃতজ্ঞ হও, শুধুই একবার, তাহলে আমি তোমাদেরকে দিতেই থাকবো, দিতেই থাকবো, দিতেই থাকবো।" (১৪:৭)

[] "আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব ভয়ভীতি, ক্ষুধা, কখনোবা তোমাদের জান-মাল ও ফসলাদির ক্ষতি সাধন করে; তাই যারা ধৈর্য্যধারন করে তাদেরকে সুসংবাদ দাও। " ( ২:১৫৫)
[] "No disaster strikes except by permission of Allah . And whoever believes in Allah - He will guide his heart. And Allah is Knowing of all things." ( 64:11)
[] " তোমাদের কাছে হয়তো কোন একটা বিষয় পছন্দসই নয়, অথচ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। আর হয়তোবা কোন একটি বিষয় তোমাদের কাছে পছন্দনীয় অথচ তা তোমাদের জন্যে অকল্যাণকর। বস্তুতঃ আল্লাহই সবচে ভাল জানেন, তোমরা জান না।" (২:২১৬)
হয়ত আল্লাহ্‌ নবী আইয়ুব(আ) এর মতন আমাদের পরীক্ষা নেবেন না কোনদিনও। কিন্তু আপনি নিজের বিশ্বাসকে তাঁর মতন করে প্রস্তুত করুন। আপনি সরাসরি আল্লাহ্‌ ও নবীদের কাছ থেকে গাইডলাইন নিন।পার্থিব জীবনে আল্লাহ্‌ অবশ্যই আমাদের সবার পরীক্ষা নিবেন, কিন্তু সেটা আমাদেরকে কষ্ট দেওয়ার জন্য নয়, আমরা ধৈর্য্য ধরে কৃতজ্ঞ হয়ে তাঁর আরো কাছে যেতে পারি কিনা সেটারই সুযোগ দেন আল্লাহ্‌। আমরা সবাই তাঁর কাছ থেকেই এসেছি, শুধুমাত্র তাঁর কাছেই আমরা ফেরত যাব একদিন। তাঁর চেয়ে আপন আমাদের আর কেউ নেই, তাঁর চেয়ে বড় বন্ধু আমাদের আর কেউ নেই। আপনি যদি আপনার চরম দুর্দিনেও কৃতজ্ঞ হতে পারেন তাহলে আপনি নিশ্চিত থাকতে পারেন, আল্লাহও আপনাকে এমন এক দিনে স্মরণ করবেন যেদিন কেউ কারোর কাজে আসবে না। কেমন হবে সেই মূহুর্ত টা যদি হাশরের ময়দানে আল্লাহ আপনাকে ডেকে বলেন- " আমার বান্দা ! তুমি অসাধারন একজন কৃতজ্ঞ বান্দা ছিলে । আজকে আমি আল্লাহ্‌ তোমার উপর অত্যন্ত সন্তুষ্ট । "
এর বেশি কি কিছু চাওয়ার আছে আমাদের???
" ও আল্লাহ, আপনি আমাকে এবং আমার বাবা-মা কে যে অনুগ্রহ করেছেন, তা উপলব্ধি করে কৃতজ্ঞ হবার সামর্থ্য দিন। যে সৎকাজগুলো আপনাকে খুশি করে, সেগুলো করার সামর্থ্য দিন। আমার সন্তানদেরকে সৎ হতে দিয়েন। আমি ক্ষমা চাই, আমি এখন আপনার অনুগতদের একজন। " (কু’রআন ৪৬:১৫)

তিনি আর-রাহমান

তিনি আর-রাহমান
বেশিরভাগ মুসলিমের ধর্মের প্রতি তীব্র উদাসীনতা কাজ করে। সেটা আপনি আপনার চারপাশ দেখলেই বুঝতে পারবেন। মানুষের জীবনের প্রয়োজনীয়তা গুলোকে যদি প্রায়োরিটি অনুসারে সাজানো হয় তাহলে আপনি দেখবেন বেশিরভাগ মানুষের বেলায় ধর্মের স্থান লিস্টের একদম নীচের দিকে। অথবা তাদের লিস্টে ধর্ম বলে কিছু নেই। আমাকে একজন বলেছিল- আমি মনে করিনা আমাকে গাইড করার জন্য ধর্মের কোন প্রয়োজন আছে। ধর্ম ছাড়াই আমি ভাল আছি ও এটা ছাড়াই আমি একজন ভাল মানুষ হয়ে থাকতে পারব।
প্রশ্ন হচ্ছে, কেন এমন হয়? কিভাবে মানুষ এত ঔদ্ধত্যপূর্ন দুঃসাহস দেখাতে পারে? এর অনেক উত্তর আছে। একটা কারন হচ্ছে, স্রষ্টাকে দেখা যায় না। মৃত্যুকে দেখা যায়, কিন্তু এর পরের জগতটাকে দেখা তো দূরের কথা, কল্পনাও করা যায়না। তাই ধর্মকে প্র্যাক্টিস করতে হলে মানুষকে সেই পরিমান বিশ্বাস অর্জন করতে হয় আগে। যে শুধু একদিন জুমাহর নামাজ পড়ে, সে এই কাজটা যতটা করে বিশ্বাস থেকে, তার চেয়ে বেশি করে সামাজিকতা থেকে, ছোটবেলার অভ্যাস থেকে, শুক্রবারে তার বাবা বাসায় থাকে এই কারনে, নামাযে না গেলে মা বকবে এই কারনে। তার বিশ্বাস এখনো তাকে ৫বার নামাজ আদায় করাতে পারছেনা। আপনাকে যদি একজন ধর্মহীন মুসলমান এসে বলে যে- আমি আগে নামায পড়তাম, অনেকদিন ধরে পড়িনা। কই, আমার জীবন তো আগের মতই চলছে। স্রষ্টা তো আমাকে কোন শাস্তি দিচ্ছেন না। তাহলে নামাজ না পড়ে তো আমার কোন ক্ষতি হচ্ছেনা।
এই মানুষটিকে আপনি উত্তরে কি বলবেন ?! আপাত দৃষ্টিতে সাদা চোখে দেখলে এরকম মনে হয় যে ধর্ম ছাড়াই তো জীবন চলে যাচ্ছে। তাহলে ধর্মের কি দরকার? এত কষ্ট করে সারাজীবন ধরে প্রতিদিন ৫বার নামাজ পড়ার কি দরকার?
এই মানুষগুলো এবং আরো কোটি কোটি ধর্মহীন মুসলমানের সমস্যা হল , স্রষ্টা সম্পর্কে এদের এখনো ভালমতন ধারনা হয়নি। স্রষ্টা কিভাবে কাজ করেন, কিভাবে মহাজগতকে নিয়ন্ত্রন করেন এগুলো নিয়ে এরা কখনো চিন্তা করেনা। একজন সৃষ্টির পক্ষে তার স্রষ্টাকে কখনই পুরো জানা সম্ভব নয়। আপনার ঘড়িটা কি জানে আপনার নাম কি, আপনি ছেলে না মেয়ে,বা আপনি কোনদেশি ? আপনার ঘড়িটা একটা সৃষ্টি, তার কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। একইভাবে মানুষ আল্লাহর সৃষ্টি, তার কিছু সীমাবদ্ধতা আছে যেটার বাইরে সে কখনই যেতে পারেনা। আমি আমার সর্বোচ্চ ক্ষমতা দিয়ে স্রষ্টাকে চিন্তা করার চেষ্টা করেছিলাম। ফলাফল খুব ভয়ঙ্কর হয়েছিল। ভয়ঙ্কর একধরনের অনুভূতি আমার হয়েছিল, আমার মনে হচ্ছিল আমি একটা অসীম খাদের মধ্যে দিয়ে পড়ে যাচ্ছি। মানুষ অসীম কোন কিছুকে গ্রহন করতে পারেনা, আমিও পারিনি। আমার কাছে মনে হয়েছিল আমার মস্তিষ্ক বিস্ফোরিত হয়ে যাবে। অনেক কষ্টে আমাকে সেই বিচিত্র অনুভূতি থেকে সরে আসতে হয়েছে নিজের মঙ্গলের জন্যই।
স্রষ্টাকে নিয়ে অল্প একটু চিন্তা করলেই একজন মানুষ উপলব্ধি করতে পারে যে, তাঁর তুলনায় আমরা কত তুচ্ছ, কত নগন্য একটি প্রায় জড় পদার্থ। এই তুচ্ছবোধ থেকেই শুরু হয় তাঁর কাছে নিজেকে আত্মসমর্পন, তাঁর প্রতি আনুগত্য, তাঁর ইচ্ছা কে নিজের ইচ্ছার উপর প্রাধান্য দেওয়া, তিনি অনন্তকালের যে আনন্দের ও শান্তির জীবনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন সেটার জন্য চেষ্টা করা, বার বার তাঁর কাছে ক্ষমা ও সাহায্য চাওয়া, জীবনের প্রতিমূহুর্তে তাঁকে স্মরণ করা।
মানুষের আরেকটা সমস্যা হল, মানুষ আল্লাহর দয়া দেখতে ও বুঝতে পারেনা। মানুষ মনে করে এটাই আসলে নরমাল, এটাই স্বাভাবিক। মানুষ মনে করে সে সবসময়ই ভাল থাকবে, তার কোন অসুবিধা হতেই পারেনা। আর যদি হয়ও, তখন সে ভেবে নেয় স্রষ্টা তার প্রতি অবিচার করছেন। বেশিরভাগ মানুষ এই চক্র থেকে বের হতে পারেনা ও বিশ্বাসের পরবর্তী লেভেলে যেতে পারেনা।
এই আর্টিকেল এ আল্লাহর একটি মাত্র নাম কে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সেটি "আর-রাহমান" . আল্লাহর অনেকগুলো গুনবাচক নাম আছে। আল্লাহ্‌ চান যে আমরা তাঁর নামগুলো বুঝি ও উপলব্ধি করি। আপনি যদি এই আর্টিকেল টি পড়ার পরে আর-রাহমান শব্দটি নিয়ে চিন্তা করেন, আপনি আরো গভীরভাবে তাঁকে উপলব্ধি করতে পারবেন ইনশাআল্লাহ।
কুর'আনে বহুবার আর-রাহমান শব্দটি আছে। বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম, আর-রাহমানির রাহীম...সহ বহুবার আছে। বিশ্লেষণের জন্য আমি বেছে নিয়েছি সূরা আর-রাহমানের প্রথম ও দ্বিতীয় আয়াতটি।
আয়াতদুটি হচ্ছে- ১) আর-রাহমান ২) আ'ল্লামাল কুর'আন
অর্থ এরকম হয়- ১) আর-রাহমান ২) কুর'আন শিখিয়েছেন
আল্লাহ্‌ এখানে একটি কাজ করেছেন। এই দুইটি আয়াত আসলে একটি বাক্য, যার অর্থঃ আর-রাহমান কুর'আন শিখিয়েছেন। কিন্তু আল্লাহ্‌ এটাকে মাঝখান থেকে ভেঙ্গে দিয়েছেন। তিনি একটি সম্পূর্ন বাক্যকে ভেঙ্গে দুটি বাক্য বানিয়েছেন।
সচরাচর এরকম করা হয় না। আপনি কি কখনো লিখবেন-
আমার বাবা। আমাকে খুব ভালবাসেন।
আপনি কি এভাবে লিখবেন?? না, আপনি লিখবেন না। আপনি লিখবেন- আমার বাবা আমাকে খুব ভালবাসেন। আপনি একটি বাক্যকে মাঝখান দিয়ে ভাঙ্গবেন না।
আল্লাহ্‌ কেন করলেন?? আল্লাহ্‌ কি চাচ্ছেন এখানে?
আল্লাহ্‌ চাচ্ছেন যাতে আপনি আর-রাহমান শব্দটি নিয়ে চিন্তা করেন। আপনি যেন আর-রাহমান পড়েই পরের আয়াতে না চলে যান। আপনি যেন খেয়াল করেন আল্লাহ্‌ এখানে গ্রামার ভেঙ্গেছেন, আপনি যেন নিজেকে প্রশ্ন করেন আল্লাহ্‌ কেন প্রচলিত গ্রামার ভেঙ্গেছেন। আপনি যেন চিন্তা করেন, আল্লাহ্‌ কেন একটি সূরা শুরু করলেন একটিমাত্র শব্দ দিয়ে। যদি এটি একটি পুরো বাক্য হত, আমরা বাক্যটি নিয়ে চিন্তা করতাম। আল্লাহ্‌ চেয়েছেন আপনি শুধুমাত্র আর-রাহমান শব্দটিকে বুঝেন, চিন্তা করেন, উপলব্ধি করেন, তারপর পরের আয়াতে যান।
আর-রাহমান শব্দটির বাংলা ও ইংরেজী অনুবাদ দাঁড়ায়-
পরম করুনাময়
The Most Merciful
The Beneficent
The Most Gracious
অনুবাদের একটি সমস্যা আছে। অনুবাদ তৈরী করার কারন হচ্ছে যাতে আমি আপনি সহজ দৈনন্দিন ভাষায় আমাদের মতন করে কুর'আন কে বুঝতে পারি। আমাদের জীবনে Beneficent, Gracious এই শব্দগুলো আমরা ব্যবহার করিনা। কাজেই আমরা যখন দেখি আর-রাহমান মানে হচ্ছে Beneficent, আমরা এটা নিয়ে আর খুব বেশি চিন্তা করিনা যেহেতু আমরা আরবি জানিনা, আর এইরকম খটমটে একটা অনুবাদ করাতে এখন ইংরেজীটাও বুঝিনা ! যদি এমন সব শব্দ দিয়ে কুর'আন অনুবাদ করা হয় যেই অনুবাদের মানেই আমরা বুঝিনা, তাহলে অনুবাদ আসলে খুব একটা সাহায্য করেনা।
বাকি রইল আরেকটি অর্থ- The Merciful. এটিরও একটা সমস্যা আছে। কারন আর-রাহমান আর Merciful আসলে এক জিনিস নয়। রাহ্‌মা আর Mercy দুটির অর্থ আলাদা। ব্যাখ্যা নিচে পাবেন।
রাহমান এসেছে আরবি "রাহমা" থেকে । রাহমা শব্দটির একটি অর্থ "মায়ের গর্ভ" . যখন একজন নারী গর্ভধারন করে, তখন তার জরায়ু বা ইউটেরাস কে আরবিতে রাহমা বলা হয় ।
গর্ভ? জরায়ু? এত কিছু থাকতে মায়ের জরায়ু কেন?!
মায়ের গর্ভ তার অনাগত শিশুর জন্য নিরাপদতম স্থান। এরচে নিরাপদ কোন স্থান তার শিশুর জন্য তৈরী করে দেওয়া সম্ভব নয়। মায়ের সাথে শিশুর কিছু সম্পর্ক আছে।
গর্ভের শিশুটি কি তার মা সম্পর্কে জানে ? উত্তর- না, জানে না। তার কোন ধারনা নেই কে তার মা।
মা কি তার শিশু সম্পর্কে জানে? উত্তর- হ্যা, সে জানে। যে কারোর চেয়ে ভাল জানে।
গর্ভের শিশুটি কি তার মাকে ভালবাসে? উত্তর- না। তার সে সময় এখনো আসেনি।
মা কি তার শিশুটিকে ভালবাসে যদিও সে তাকে দেখেনি? উত্তর- হ্যা। অত্যন্ত ভালবাসে।
মা কি তার গর্ভের শিশুটির সবরকমের যত্ন নিচ্ছে? উত্তর- হ্যা, সে নিচ্ছে।
গর্ভের শিশুটির পুরো জগত হচ্ছে তার মা। যদিও সে তার মাকে চেনেই না, কিন্তু তারপরো তার সম্ভাব্য সকল চাহিদা তার মা পূরন করে দিচ্ছে, এবং অত্যন্ত অত্যন্ত আদর যত্ন মায়া মমতা নিরাপত্তা ভালবাসার সাথে। শিশুটির কোন ধারনাও নেই তার মা তাকে কতটা ভালবাসে।
আপনাকে কেউ মারতে আসছে। আপনি দেখবেন, আপনার অজান্তেই আপনি আপনার হাত সামনে বাড়িয়ে দিয়েছেন আত্মরক্ষার জন্য। এটা মানুষের একটা সহজাত প্রবৃত্তি বা ন্যাচারাল রিফ্লেক্স। কিন্তু আপনি দেখবেন, একজন মা সবসময় বাড়তি সচেতন তার পেটের ব্যাপারে। যেকোন একটা টেবিলের কোনা দিয়ে যাওয়ার সময়-ও তিনি তার পেটের উপর একটা হাত রাখবেন যাতে তার পেটে বিন্দুমাত্র কোন বাড়তি আঘাত না লাগে। কখনও পড়ে গেলেও তিনি সবার আগে তার পেটে হাত দিবেন সাথে সাথে। তার নিজের নিরাপত্তার চেয়ে শিশুটির নিরাপত্তা তার কাছে অনেক বেশি জরুরি। যারা মা হয়েছেন বা হবেন, তারা এই কথাগুলো খুব ভাল করে জানেন।
এই ধরনের একটা সম্পর্ক থেকে এসেছে রাহমা শব্দটি। আদর, মমতা, ভালবাসার নিবিড়তম একটা সম্পর্ক। এটাকে যখন অনুবাদ করা হয় Mercy বা করুনা হিসেবে, তখন একটা সমস্যা তৈরী হয় । এটা মূল ভাব থেকে সরে যায়। আমি আপনাকে উদাহরন দিচ্ছি। করুনা বলতে আমরা বুঝি যে, আসলে একজনের শাস্তি পাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু আপনি তাকে দয়া করে, করুনা করে, শাস্তি দিলেন না, তাকে শাস্তি থেকে রেহাই দিলেন, তাকে মাফ করে দিলেন।
আপনার কাজের ছেলেটা একটা প্লেট ভেঙ্গেছে। দামি জিনিস, আপনার খুব রাগ হচ্ছে। আপনি ঠিক করলেন তাকে একটা চড় দিবেন। তাকে ডাক দিয়ে সামনে আনার পর দেখলেন সে মাথা নিচু করে অপরাধীর মতন তাকিয়ে আছে ও ভয়ে একটু একটু কাঁপছে। আপনার করুনা হল। আপনি বললেন- যা, এরপর থেকে সাবধানে কাজ করবি। মনে থাকে যেন।
আপনি করুনা দেখালেন। আপনি Mercy দেখালেন। কিন্তু আপনি রাহমা দেখালেন না। কারন রাহমা ছিল উপরে মায়ের সাথে শিশুর সম্পর্ক।
করুনা বা Mercy বলতেই আমরা আগে শাস্তির কথা ভেবে নেই, কারন শাস্তি থেকে রেহাই দেওয়াটাই আমাদের কাছে করুনা। কিন্তু রাহমা শব্দের সাথে শাস্তির কোন সম্পর্কই নেই !!! এটি শাস্তির সম্পূর্ন বিপরীত, এখানে ভয়ের কোন ব্যাপার নেই, আতঙ্কের কোন ব্যাপার নেই।
যে আপনার সাথে রাহমা দেখায় , তার আচরন হবে অত্যন্ত নরম, অত্যন্ত নম্র, অত্যন্ত আন্তরিক, সে আপনাকে খুবই কেয়ার করবে, আপনার কথা অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে শুনবে, আপনাকে মন থেকে সাহায্য করবে, আপনার প্রতি সহমর্মিতা ও ভালবাসা দেখাবে। এরকম মানুষ সমাজে বিরল, কিন্তু আছে। আপনি রিকসা থেকে রাস্তায় পড়ে মাথা ফাটিয়ে ফেলেছেন। আশেপাশের কেউ পাত্তাও দিল না। একজন আন্টি তার গাড়ি থামিয়ে আপনাকে তুলে নিলেন। আপনাকে সাহস দিলেন, সুন্দর করে কথা বললেন। আপনাকে হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা করালেন। তারপর আপনাকে গাড়ি করে বাসায় নামিয়ে দিলেন। এটা হচ্ছে রাহমা ।
রাহমা শব্দটি দিয়ে আল্লাহ্‌ আমাদের ব্যবহার, সৌজন্য ও আন্তরিকতা শিখিয়েছেন। আপনি দেখবেন, আজকের পৃথিবীতে বড় বড় কোম্পানীগুলো ভাল ব্যবহার, আন্তরিকতা, সৌজন্যবোধ, এগুলোকে অত্যন্ত বেশি গুরুত্ব দেয়। একজন ডাক্তার যিনি আপনার সাথে খুব সুন্দর করে আন্তরিকভাবে কথা বলেন তার কাছে যেতেই আপনার সবচে ভাল লাগে, যদিও তিনি হয়ত দেশের সবচে বিখ্যাত ডাক্তার নন। আল্লাহ্‌ আমাদেরকে হাজার হাজার বছর আগেই এটি শিখিয়ে দিয়েছেন ।
যখন আল্লাহ বলেন তিনি হচ্ছেন আর-রাহমান, তিনি আপনাকে বলেন যে তিনি আপনাকে ভালবাসেন। তিনি আপনাকে কেয়ার করেন। তিনি জানেন যে আপনি একটি ক্ষুদ্র সৃষ্টি, আপনাকে তিনি প্রতি মূহুর্তে দেখে শুনে যত্ন করে রাখছেন। তিনি জানেন আপনার অনেক চাহিদা, তিনি সবগুলো পুরন করছেন। তিনি আপনাকে ভালবাসা, মমতা, নিরাপত্তা, সাহায্য, কেয়ার এসবের কথা বলেছেন আর-রাহমান এর মাধ্যমে। তিনি আপনাকে শাস্তি বা করুনা বা ভয়ের কোন কথা বলেননি। একজন মা যেমন কখনো তার সন্তানকে ত্যাগ করবেন না, আল্লাহ্‌ আপনাকে আমাকে কখনই তাঁর রাহমা থেকে বঞ্চিত করেন না। মায়ের তীব্র ভালবাসাও আল্লাহর ভালবাসার অনু পরিমানের ধারে কাছেও আসতে পারেনা। এমনকি যারা দিনের পর দিন আল্লাহকে অস্বীকার করে, আল্লাহর পরিবর্তে মূর্তি, পীর, মাজার কে পূজা করে আল্লাহ তাদেরকেও খাওয়াচ্ছেন, পরাচ্ছেন, ভাল রাখছেন। যারা বলে যে নামাজ না পড়ে তো আমি ভালই আছি তারা এটা বুঝেনা যে সে আসলে তার নিজের যোগ্যতায় ভাল নেই, আল্লাহ্‌ এখনো তাকে দয়া করে যাচ্ছেন।
আপনি কি আল্লাহ্‌ সম্পর্কে সব জানেন? উত্তর- না, আপনার পক্ষে সম্ভব নয়।
আল্লাহ কি আপনার সম্পর্কে জানেন ? উত্তর- হ্যা, তিনি জানেন। আপনার অনু পরমানু এমনকি প্রতিটি চিন্তা সহ।
আপনি কি আল্লাহকে ভালবাসেন? উত্তর- সেটা আপনার করা উচিত।
আল্লাহ্‌ কি আপনাকে ভালবাসেন ? উত্তর- হ্যা। আপনার কোন ধারনাও নেই।
আল্লাহ্‌ কি আপনার সব রকমের যত্ন নিচ্ছেন? উত্তর- হ্যা, প্রতিমুহূর্তে, প্রতিদিন।
রাহমান শব্দটির আরো ব্যাপার আছে। এটি রাহমান নয়, এটি হচ্ছে রাহমা--ন। এখানে একটা নূন আছে এবং একটা টান আছে। এটাকে আরবি তে বলা হয় " সিগাতুল মুবালাগা " . এটার মানে হচ্ছে যখন কোন কিছুর পরিমান সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে যায়, এরপর আর বাড়ানো সম্ভব নয়, এই অস্বাভাবিক প্রচন্ড পরিমানকে বলা হয় সিগাতুল মুবালাগা । উদাহরন দিচ্ছি।
আরবিতে পিপাসার্ত হচ্ছে "আতিশ" .কিন্তু আপনি যদি বলেন আপনি "আতশা--ন" তার মানে হচ্ছে যে এর চেয়ে বেশি আর এক বিন্দু পিপাসার্ত হলেই আপনি সাথে সাথে মরে যাবেন। এর চেয়ে বেশি পিপাসার্ত হওয়া সম্ভব নয়।
আল্লাহ্‌ বলেছেন, তিনি আর রাহমা---ন। অর্থাৎ এরচেয়ে বেশি দয়ালু হওয়া সম্ভব নয়, এরচে বেশি কোন দয়া হতে পারেনা, এরচে বেশি দয়া কেউ কোন সম্ভাব্য অসম্ভাব্য উপায়ে দেখাতে পারেনা। আর রাহমা---ন এর পূর্ন অনুবাদ হবে এরকম-
INCREDIBLY MERCIFUL, UNIMAGINABLY MERCIFUL, EXTREMELY MERCIFUL BEYOND IMAGINATION, UNLIMITED MERCIFUL
অকল্পনীয় দয়ালু, চিন্তা ক্ষমতার বাইরে দয়ালু, সর্বোচ্চ পর্যায়ের দয়ালু।
রাহমান শব্দটির আরো ভাষাগত ব্যাপার আছে। এটি একটি Present Continuous Tense.
'আমি খাই' আর 'আমি এখন খাচ্ছি' এক জিনিস নয়। রাহ্‌মার ক্ষেত্রেও একই জিনিস প্রযোজ্য। আপনার প্রতিবেশি শফিক সাহেব খুব দয়ালু মানুষ। কিন্তু তার মানে এই না যে তিনি এখন, এই মুহুর্তে দয়ালু। এই মুহূর্তে তিনি কোন দয়ার কাজ নাও করতে পারেন।
আর-রাহমান মানে হচ্ছে আল্লাহ্‌ এই মুহুর্তে তাঁর রাহ্‌মা দেখাচ্ছেন। এই মুহুর্তে তিনি আপনাকে ভালবাসা দেখাচ্ছেন। এই মুহুর্তে তিনি আপনার কথা চিন্তা করছেন। এই মুহুর্তে তিনি আপনার কথা খেয়াল রেখেছেন। এই মুহুর্তে তিনি আপনাকে নিরাপত্তা দিচ্ছেন। কালকে না, পরশু না, আজকে না, ঠিক এই মূহুর্তে।
এই মুহুর্তে আল্লাহ্‌ আপনাকে আমাকে এই পৃথিবীর ৬০০ কোটি মানুষ জীব-জন্তু গাছ সহ প্রান এবং পৃথিবীর বাইরে আমাদের সৌরজগত, আমাদের মিল্কি ওয়ে, আমাদের গ্যালাক্সি ও এর বাইরের যাবতীয় কিছুর প্রতি ঠিক এই মুহুর্তে রাহমা দেখাচ্ছেন।
কিভাবে আপনি বের করবেন আল্লাহ্‌ আপনাকে কতটা ভালবাসা ও নিরাপত্তা দিচ্ছেন? আমি আপনাকে বলে দিচ্ছি। আপনি আপনার জীবনের সমস্যাগুলোর কথা চিন্তা করা বন্ধ করেন। আমাদের এমন কেউ নেই যার জীবনে কোন সমস্যা নেই। পড়াশুনা, চাকরি, পরিবার, সন্তান, ক্যারিয়ার, টাকা পয়সা, ব্যবসা, সাস্থ্য, ভবিষ্যত সবকিছু নিয়ে আমরা সবসময় অভিযোগ করি। আমরা আল্লাহ্‌র রাহ্‌মা দেখতে পাই না আমাদের অগনিত অভিযোগের কারনে। আমি আপনাকে মানুষের একটা আজব সাইকোলজি বলব।
আমি যখন সেইন্ট যোসেফ স্কুলে পড়তাম (৯৬-০৩) সেখানে প্রতিদিন হাউজ ওয়াইফ আন্টিরা আসতেন বাচ্চাদের দিতে ও নিতে। তাদের একটা "ভাবী সার্কেল" ছিল। তারা সবাই সবার ভাবী, তাদের প্রতিদিনকার আলোচনার একটা বিষয় ছিল কার সন্তান কত খারাপ।
ভাবী ১- ভাবী আপনার ছেলেটা এত্তত্ত ভাল কি আর বলব। আমার ছেলেটা পড়তেই চায়না।
ভাবী ২- আরে না না ভাবী কি যে বলেন। আপনার ছেলেটা তো সোনার টুকরা। আমার ছেলেটা তো পড়াশুনা ছেড়েই দিয়েছে, এবারো সেকেন্ড হয়েছে। এভাবে কি হয় বলেন?
আমি ছোট থাকতে দেখেছি বাবা-মা রা নিজের সন্তানদের বিরুদ্ধে অগনিত অভিযোগ করতেই থাকে , করতেই থাকে। পড়ে না, খায় না, বেশি খায়, কথা কম বলে, কথা বেশি বলে, বেশি বাইরে ঘুরে, বেশি বাসায় বসে থাকে.........তাদের অভিযোগ কখনো থামে না। আমার বাবা আমাকে বলতেন- যা অমুকের পা ধোয়া পানি খা, দেখ্‌ যদি তোর কোন উন্নতি হয়।
আমি আপনাকে লিখে দিতে পারি, ঠিক এই রকম অভিযোগী অসন্তুষ্ট কোন মায়ের সন্তান যদি মরে যায়, সাথে সাথে তার কথার টোন পালটে যাবে। তিনি বাকী জীবন আর কোনদিনও বলবেন না তার সন্তানের কি কি দোষ ছিল। তিনি যা বলবেন তা হল- আহারে আমার বাবুটা, কত ভাল ছিল। একদম বিরক্ত করত না। এত লক্ষী একটা ছেলে ছিল। কত বকেছি ওকে, তাও কিছু বলত না কোনদিন। হায় আল্লাহ্‌ কেন আমার বাবুটাকে নিয়ে গেলা তুমি?
কেন মানুষ এমন করে ? গতকালকে পর্যন্ত যাকে বকাঝকা দেওয়া হয়েছে, আজকেই কেন তার প্রতি এত ভালবাসা?? উত্তর হচ্ছে- এটা বেশিরভাগ মানুষের স্বভাব। আমাদের যা কিছু আছে আমরা সেগুলোর মূল্য দেই না, আমরা সেগুলকে এপ্রিশিয়েট করি না। আমরা ধরে নেই এগুলো সবসময়ই থাকবে। সেজন্য আমরা এগুলো নিয়ে সবসময় কমপ্লেইন করতে থাকি। যেদিন এগুলো সত্যি সত্যি চলে যায় তখন আমরা এগুলোর মূল্য বুঝতে পারি। যার একটাও দাঁত নেই, সে জানে দাঁত কত দামী একটা জিনিশ।
আপনি আপনার জীবনের সমস্যাগুলো নিয়ে ভাবছেন। কিন্তু আপনি এটা নিয়ে ভাবেন না যে আল্লাহ্‌ আপনাকে কত হাজার হাজার সমস্যা থেকে উদ্ধার করছেন প্রতি মূহুর্তে। এবং প্রতিদিন। আপনার হয়ত হাত কেটে গেছে, কিন্তু আপনি এটা ভাবছেন না যে আপনার হাতটা ভেঙ্গে যেতে পারত, আল্লাহ্‌ আপনাকে রক্ষা করেছেন। আপনি হয়ত পরীক্ষায় ফেইল করেছেন তাই আপনার ভয়ঙ্কর মন খারাপ, কিন্তু আপনি খেয়াল করছেন না আপনার স্কুলের পাশের একটা অন্ধ লোককে যার কাছে পরীক্ষার কোন মূল্য নেই। আপনার বাবার সাথে আপনার সম্পর্ক ভাল না, কিন্তু আপনি চিন্তা করে দেখেন না যে, এখনো আল্লাহ্‌ আপনার বাবাকে জীবিত রেখেছেন, এবং তার সেবা করে আপনি আপনার জান্নাতের রাস্তা তৈরী করে নিতে পারেন। আপনি যদি খুব প্র্যাকটিসিং মুসলিম ও হন কিন্তু বাবা মায়ের সাথে ভাল আচরন না করেন, আপনি এখনো ইসলামে প্রবেশ করতে পারেননি। আপনার বাবা-মা আপনার জান্নাত। জান্নাতের দরজা বন্ধ রেখে আপনি জান্নাতে যেতে পারবেন না জীবনেও। তাদেরকে আপনি আপনার শ্রেষ্ট ব্যবহার দিতে বাধ্য। তারা কাফির হলেও। তারা মুশরিক হলেও। আপনার নিজের স্বার্থের জন্যই।
আপনি আর- রাহমান শব্দটা নিয়ে প্রতিদিন চিন্তা করুন। আজকে আল্লাহর কাছে থেকে আপনি কি কি ভালবাসা পেয়েছেন? এই মুহুর্তে আল্লাহ্‌ আপনাকে কিভাবে ভালবাসা দেখাচ্ছেন? আপনি কি তাঁকে ভালবাসেন? আপনি কি তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ? তাহলে আপনি তাঁকে সেটা বলুন। আপনি বলুন- আল্লাহ্‌ আমার পক্ষে আপনার রাহ্‌মা ফেরত দেওয়া সম্ভব নয়। তারপরো আমি আপনার প্রতি কৃতজ্ঞ। আমি আপনাকে ভালবাসি। আমার নিজের থেকে, আমার বাবা মা, স্ত্রী, সন্তান, সবকিছুর চেয়ে আমি আপনাকে বেশি ভালবাসি।
আর- রাহমান শব্দটি আমাদেরকে প্রতিদিন নামাজে উচ্চারন করতে হয়। এরপর যখন আপনি এই শব্দটি উচ্চারন করবেন, এই কথাগুলো মনে করবেন। আপনি যত বেশি কৃতজ্ঞ হবেন, আপনি আল্লাহর তত কাছে যেতে পারবেন। প্রত্যেকটি মানুষের জন্য স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ হতে শেখাটা অত্যন্ত জরুরী। আপনি নিজে জেনে উপলব্ধি করতে পারলে আপনিও আরেকজনকে জানাতে পারবেন।

আল্লাহ কতটা দয়ালু

আল্লাহ কতটা দয়ালু
"সবটা ভাত খেয়ে ফেলো বাবু, নষ্ট কোরনা"- মা অনুরোধ করেন ২ বছরের শুভকে।
কাতর কন্ঠে অনুনয় করে শিশুটি-"আর খাবনা মা"।
"ছি বাবা, না খেলে আল্লাহ কত গুনাহ দিবেন জানো? বাকি ভাতগুলো এই এত বড় বড় সাপ বিচ্ছু হয়ে কামড় দিবে। খাও বাবা খাও" - মোক্ষম ঔষধ দিলেন মা। তার মাও তাকে এইভাবেই খাওয়াতেন কিনা।
মুখ বিরস করে খায় শুভ। মনে মনে ভাবে- আল্লাহ এত শাস্তি দেয় কেন?
কয়েক বছর পরের কথা। শুভর হুজুর এসেছে। "শুভ পড়তে যাও বাবা"- মা ডাকেন।
"পেট ব্যথা মা, যাবোনা"- তৎক্ষণাৎ উত্তর রেডী।
"গত সপ্তাহেও তুমি বলেছ পেট ব্যথা শুভ। জানোনা মিথ্যে বললে আল্লাহ কত গুনাহ দেন? যাও পড়তে যাও বলছি"
একটুও ভাল লাগেনা শুভর। নামায পড়তেও একটুও ভাল লাগেনা। কি হবে এইসব করে? সূরা দু'আ কিছুই তো আমি বুঝিনা, কিসব মুখস্থ কথা বলি প্রতিদিন। কই, আমার ক্লাসে যে হিন্দু খ্রীষ্টান ছেলেরা আছে, ওরাও তো নামাজ পড়েনা, আল্লাহ তো ওদেরকে গুনাহ আর আজাব দিচ্ছে না। আমি একা কি দোষ করলাম? আর হুজুর খালি মারে কেন আমাকে কিছু জিগেশ করলেই? ওনাকে আমার একটুও ভাল লাগেনা।
একটি শিশু এক টুকরো কাদামাটি। ধর্ম মানে ভয়- এই ধারনা দিয়ে দিয়ে বড় করা হয় শুভকে। কোনদিনও সে ধর্মের বিষয়গুলোকে ভালবাসে বড় হয় না। তার মনে শত শত প্রশ্ন, সে সেগুলোর উত্তর পায়না। টুকটাক বাবা মার চাপে পড়ে যেটুকুও সে ধর্ম মানত, সেটার মধ্যে কোন আন্তরিকতা বা নিজে থেকে করার ইচ্ছা ছিলনা, আল্লাহ শাস্তি দিবেন এই ভয়ে ভয়ে কিছুটা করত, এর বেশি কিছু না। তিলে তিলে তার মনের মধ্যে ধর্ম সম্পর্কে বিতৃষ্ণা সৃষ্টি হতে থাকে। পড়াশুনার জন্য বিদেশে চলে যাওয়া মাত্র সে ধর্ম কে ছেড়ে দেয় ও শুধুমাত্র মুসলিম নামধারী একজন ধর্মহীন মানুষে পরিনত হয়। সে পৃথিবীতে যতগুলো বংশধর রেখে যায় কাউকেই সে ধর্ম শিখাতে পারে না, কারন সে নিজেই শেখেনি, কারন তার বাবা-মাও তাকে শেখাতে পারেনি। এই চক্র চলতেই থাকে, চলতেই থাকে। পৃথিবীতে বাড়তে থাকে ধর্মহীন নামক একদন জীবন-পূজারী মানুষের সংখ্যা।
শুভ একটি কাল্পনিক চরিত্র। কিন্তু এমন হাজার হাজার শুভ ছড়িয়ে আছে আমাদের সমাজে। ইসলাম ধর্মের প্রতি আমাদের অনীহার সবচেয়ে বড়ো কারনগুলোর একটি হল আল্লাহর প্রতি ভ্রান্ত ধারনা নিয়ে আমরা ছোটবেলা থেকে বড়ো হই। কিছু মুখস্থ আরবি দু'আ, সূরা, আর রীতিনীতির মধ্যে দিয়ে যখন একটি মুসলিম শিশুকে বড় করা হয় তখন আস্তে আস্তে এই ব্যাপারগুলো তার কাছে একঘেয়ে হয়ে যায়, সে এগুলোতে কোন আকর্ষন অনুভব করে না। কেন সে একটা কাজ দিনের মধ্যে ৫ বার করবে যদি জিনিসটা তার ভালই না লাগে ? আর সাথে সাথে ভয় দেখানো ত চলছেই- এটা কর, নয়ত এত গুনাহ, ওটা কর, নয়ত এত আজাব।
খুব কম বাচ্চাই আল্লাহকে ভালবেসে বড় হয়। যারা পারে, তারা সৌভাগ্যবান। যারা পারেনা, এর পিছে বাবা-মা সহ আমাদের সমাজব্যবস্থা, অনেক কিছু দায়ী। আপনি যদি আপনার পরিচিত মানুষদের জিগেস করেন তারা নিয়মিত নামায পড়ে কিনা, দেখবেন তারা বেশিরভাগই পড়ে না। যদি আপনি তাদের কারন জিগেস করেন, দেখবেন আসলে তাদের কোন কারন নেই, তারা এমনিই পড়ে না ! যদিও মুসলিম শিশু হিসেবে ছোটবেলা থেকে সবাইকে নামাজ শিক্ষা দেয়া হয়েছে।
এই লেখাটি লেখা হয়েছে যাতে আল্লাহর যেই অসীম দয়াগুলোর মধ্যে আমরা বাস করি সারাক্ষন, কিন্তু তা বুঝিনা, সেগুলোকে বৈজ্ঞানিক ও ধর্মীয় যুক্তি ও উদাহরন দিয়ে তুলে ধরার। আর্টিকেলটি সব বয়সী মানুষের পড়ার উপযোগী করে লেখা হয়েছে। আল্লাহ অসীম ও তাঁর দয়াও অসীম, কাজেই আমার মতন ভুলত্রুটিতে ভরা ক্ষুদ্র সৃষ্টির পক্ষে কখনই সেটা ব্যাখ্যা করা সম্ভব হবে না, আগেই নিজের অক্ষমতা স্বীকার করে নিচ্ছি।
প্রথমেই আপনাকে দিয়ে শুরু করি-
আপনার নাম মুহাম্মদ, আব্দুল আজীজ, আয়িশা, যেটাই হোক না কেন, আপনি নিজেই আল্লাহর একটা বড় দয়া। পৃথিবী, মহাকাশ, সৌরজগত, ছায়াপথ, এমনকি মহাজগত সৃষ্টির আগেও মহাজ্ঞানী ও অচিন্ত্য কল্পনীয় আল্লাহ জানতেন যে তিনি আপনাকে সৃষ্টি করবেন। আপনার জন্য আল্লাহ বিশেষভাবে চিন্তা করেছেন, আপনার জন্য আল্লাহ সময় দিয়েছেন, আপনাকে আল্লাহ গভীর যত্নে ও ভালবাসায়(মানুষের ভালবাসা যার সাথে তুলনার কোন যোগ্য নয়) সৃষ্টি করেছেন। আপনার ভিতরে তাঁর তৈরী করা পবিত্র আত্মাকে বিশেষভাবে অকল্পনীয় কোন উপায়ে ঢুকিয়েছেন((Chapter 38:71-72 Quran)। মহান আল্লাহ্‌ আপনাকে নিয়ে চিন্তা করেছেন, এই ব্যাপারটিই কি অনেক বেশি নয়?
আপনাকে আল্লাহ্‌ একটা মানুষ হিসেবে বানিয়েছেন। আপনাকে সৃষ্টির সেরা জীব করেছেন। নাও করতে পারতেন। মনে করেন আমি একটা ছাগল। আপনি আমাকে বেধে রেখেছেন, একটু পর আপনি আমাকে জবাই করবেন। আমার চোখের সামনে আপনি আমার মায়ের গলা কেটে চামড়া ছিলা শুরু করলেন। আমার খুব খারাপ লাগছে, এই মা আমাকে দুধ খাইয়ে বড় করেছে। এরপর আমার পালা, কিন্তু আমি জানি আমার কোন কথাই আপনার কাছে একটা ব্যা এর বেশি কিছু না। ইস আমি যদি ছাগল না হয়ে একটা মানুষ হতাম।
দুটি মানুষের মাধ্যমে তিনি আপনাকে পৃথিবীতে এনেছেন। কোটি কোটি শুক্রানুর মধ্যে শুধুমাত্র আপনার তথ্য যেই একটিমাত্র শুক্রানুতে ছিল, সেটিকেই তিনি স্থাপন করেছেন আপনার প্রানপ্রিয় মায়ের "রাহমা"-র মধ্যে(আরবি রাহমা= জরায়ু)| কোটি কোটির মধ্যে অন্য যেকোন একটি শুক্রানু থেকেও আপনার জন্ম হতে পারতনা, কারন তাহলে সেটি কখনই 'আপনি" হতেন না, সেটি হত আপনার অন্য কোন ভাই বা বোন। আপনি কখনো চিন্তা করে দেখেছেন আপনার অস্তিত্তের কোন প্রয়োজন ছিলনা, কিন্তু স্বয়ং আল্লাহ চিন্তা করেছেন তিনি আপনাকে সৃষ্টি করবেন। এবং তিনি করেছেন, এবং তিনি প্রতি মূহুর্তে আপনার যত্ন নিচ্ছেন। দেশের প্রেসিডেন্ট আপনার কথা জানেনা, আপনি বেচে আছেন না মরে গেছেন এটা নিয়ে তার মাথাব্যাথা নাই, সেখানে আল্লাহ্‌ এই মূহুর্তে আপনি সহ পৃথিবীর ভিতরে ও বাইরে যত প্রান আছে সবার দেখা শুনা করছেন। এবং একসাথে। প্রত্যেকের প্রত্যেক চাহিদা তিনি মিটাচ্ছেন।
প্রথম কয়েক সপ্তাহ আপনি প্রানহীন ছিলেন। এরপর আস্তে আস্তে আপনার হৃৎপিণ্ড তৈরী হল, আপনার মধ্যে প্রানের স্পন্দন ধরা পড়ল। আপনার বাবা-মা খুশিতে আত্মহারা হলেন যে আপনার হার্টবিট শুনা যাচ্ছে।
আপনি জীবিত জন্ম নাই নিতে পারতেন। আপনি মৃত শিশু হতে পারতেন। আপনি বিকলাঙ্গ , পঙ্গু, প্রতিবন্ধী, দুই মাথাওয়ালা, ভয়ঙ্কর কোন রোগ নিয়ে আসতে পারতেন। এরকম শিশু কোটি কোটি আছে, খুজলেই পাবেন। আল্লাহ আপনাকে আসতে দিয়েছেন পৃথিবীতে। দুটি মানুষ তাদের দিনরাত ফেলে আপনাকে পেলেপুষে বড় করে তুলেছেন।
আপনি আসার আগে থেকেই আপনার সকল রিযক আল্লাহ রিজার্ভ করে রেখেছেন। রিযক মানে শুধু খাদ্য নয়। খাদ্য, বাসস্থান, পড়াশুনা, ক্যারিয়ার, সঙ্গী, মেধা, স্বাস্থ্য- প্রত্যেকটি জিনিস আল্লাহ আপনার জন্য ঠিক করে রেখেছেন। আপনি কোন দেশে কোন অঞ্চলে থাকবেন, কোথায় পড়বেন, কি পড়বেন, জীবনে কি করবেন, সব কিছুই আপনার জন্য আগে থেকে ঠিক করে রাখা আছে।
আপনি মিনিটে ৬ লিটার অক্সিজেন নেন। দিনে ৮৬৪০ লিটার অক্সিজেন আপনার একার বরাদ্দ আছে। চিন্তা করেছেন কখনো? এক সিলিন্ডার অক্সিজেনের দাম কত জানেন?
আপনার শরীরটা কত দামি জানেন আপনি? আসলে পয়সা দিয়ে এটা আপনি বের করতে পারবেন না, এটা অমূল্য একটা জিনিস। আপনার হার্ট দিনে ১ লক্ষ বার পাম্প করে , আপনার একেকটি কীডনী দিনে ১৫০০ লিটার রক্তকে ফিল্টার করে। আপনার চোখের ধারেকাছেও কোন ঘোড়ার ডিম এসএলআর ক্যামেরা নেই। আপনার মস্তিষ্কের ধারেকাছেও কোন সুপার কম্পিউটার নেই। আপনি শুকনো পোড়ামাটির তৈরী(55:14), কিন্তু আল্লাহ আপনাকে নিখুতভাবে ডিজাইন করে দিয়েছেন।
একটা অন্ধ মানুষের পাশে যদি বসেন, আপনার খারাপ লাগবে। একটা মানুষ আজীবন কিছুই দেখবে না , তার কষ্ট আপনি বুঝবেন না, আমিও না। চিন্তা করুন, আপনার দুটি চোখ কালকে থেকে নেই। দেখুন কেমন লাগে। অনেকেই আজকে অন্ধ হয়ে গেছে পৃথিবীতে, তাইনা? আল্লাহ আপনাকে রক্ষা করেছেন, তাইনা?
ধর্মীয় একটা গল্প-
একজন ধার্মিক লোক ছিল। সে আল্লাহর কাছে দোয়া করল- আল্লাহ আমি একদম একাকী আপনার ইবাদত করতে চাই, আপনি ব্যবস্থা করে দিন। আল্লাহ তাকে বললেন একটা পাহাড়ে চলে যেতে। সেখানে একটা ডালিম গাছ থাকবে, প্রতিদিন সেখানে একটি করে ডালিম হবে, সেটা খেলে তার আর খিদে লাগবেনা।আর পাশে পানির ঝরনার ব্যবস্থা করে দিলেন।
সেই লোক ৫০০ বছর ইবাদত করল। এরপর সে মারা গেল। মৃত্যুর পর তাকে জিগেশ করা হল- তুমি অনেক ইবাদত করেছিলে, আল্লাহ তোমাকে জান্নাত দিবেন। আচ্ছা বলতো, এই যে তুমি জান্নাত পাচ্ছ, এটা কি আল্লাহর দয়ায়, নাকি তোমার ইবাদতের জন্যে?
লোকটি উত্তর দিল- কেন, আমার ইবাদতের জন্যে।
আল্লাহ বললেন- আচ্ছা, তুমি তাই মনে কর? আসো মেপে দেখাই। একদিকে থাকবে তুমি আমাকে কি দিয়েছ, আরেকদিকে থাকবে আমি তোমাকে কি দিয়েছি।
পাল্লার একদিকে তোলা হল তার সব ইবাদত। আরেকদিকে তোলা হল আল্লাহ্‌ তাকে জীবনে যা যা দিয়েছেন। দেখা গেল, তার ৫০০ বছরের ইবাদতের মূল্য হল তার চোখের দৃষ্টিশক্তি।
আল্লাহ্‌ বললেন- তুমি চোখের মূল্য দিয়েছ আমাকে। আর যা যা অগনিত জিনিস আমি তোমাকে দিয়েছি, তার মুল্য তো নেই তোমার কাছে। চল এখন জাহান্নামে,সেখানে কিছুদিন থেকে মূল্য পরিশোধ করে আস।
লোকটি ভুল বুঝতে পারল। সে মাফ চাইল। অসীম দয়ালু আল্লাহ্‌ তাকে মাফ করে দিলেন।
বিশ্বাস করাটা বড়ো ব্যাপার না। গল্পের শিক্ষাটাই মূল বিষয়।
আপনি কি সুস্থ সবল নীরোগ? তাহলে মনে রাখবেন, শুধু এটার-ই মূল্য আপনি জীবনেও শোধ করতে পারবেন না। আপনি যদি মনে করেন, একটা স্বাভাবিক শরীর পাওয়া খুব সাধারন একটা ব্যাপার, আপনি যেকোন সরকারী হাসপাতালে একদিন ঘুরে আসুন। বা আপনার পরিচিত কেউ যদি থাকে যার ২টি কিডনী নস্ট, বা যে স্ট্রোক করে প্যারালাইসিস হয়ে পড়ে আছে, তাকে যেয়ে জিগেস করে আসুন তার কেমন লাগছে। ২টি ভাল কিডনী পেতে তার কেমন লাগবে তাকে জিগেশ করুন।
আপনার যদি বাবা-মা, পরিবার, একটা বাসা, গাড়ি, মোবাইল, ইন্টারনেট, স্কুল কলেজ বিশবিদ্যালয়ের পড়াশুনা, বাসায় একটা ফ্রীজ, ফ্রীজে বাড়তি খাদ্য---এই জিনিশগুলোর সব বা কিছু অংশও থাকে, আপনি লিখে রাখতে পারেন যে আপনার মতন সৌভাগ্য নিয়ে খুব বেশি মানুষ এই মূহুর্তে নেই। আপনি পৃথিবীর ৬০০ কোটি মানুষের সবচে ধনী মানুষদের একজন। দুনিয়ায় অনেক জায়গা আছে যেখানে বিশুদ্ধ পানি, কারেন্ট, গ্যাস এখনো মানুষের স্বপ্ন। বেশিদূর যেতে হবে না, আমাদের দেশেই অনেক যায়গা আছে এমন।
আপনি ভাবতে পারেন এগুলো আপনি অর্জন করেছেন। কিন্তু আসলে এগুলো আল্লাহ্‌ আপনাকে দিয়েছেন বলেই আপনি এগুলোর মালিক হতে পেরেছেন। আপনি হয়ত ৫০ হাজার টাকা বেতন পান। আপনার মতন মেধার, যোগ্যতার, একি পড়াশুনার অনেক অনেক মানুষ আছে যারা ২০ হাজার টাকা বেতন্ পায়। আল্লাহ্‌ আপনাকে দিয়েছেন। এবং তার চেয়েও বড় কথা হল এই জিনিসগুলো দিয়ে আল্লাহ্‌ আপনার কিছু পরীক্ষা নিচ্ছেন।
আপনি শেষ কবে না খেয়ে থেকেছেন? রোজা না, কারন রোজা রেখে আপনি জানেন সন্ধ্যা হলেই আপনি প্রচুর খাবেন। শেষ কবে আপনি সামান্য কয়েকটা ভাতের জন্য মানুষের কাছে হাত পেতেছেন ? শেষ কবে খাবার না পেয়ে ক্ষুধা পেটে ঘুমাতে গিয়েছেন এবং সকালে খাবার মিলবে কিনা তারও কোন গ্যারান্টি নাই? সম্ভবত জীবনেও না। কিন্তু এই শহরেই এমন অনেক অনেক মানুষ আছে।
আপনি, আমি, আমরা সবাই ( যারা নেট এ ঢুকে এই লেখা পড়তে পারেন) কোন এক অজ্ঞাত কারনে অত্যন্ত ভাগ্যবান। অথচ একটা রিকশাওয়ালার কোন দোষ নেই যে সে গরীব। আল্লাহ্‌ আপনাকে আমাকে অত্যন্ত বেশি দয়া করেছেন যদিও আমরা এটার প্রতিদান দেওয়ার বা এই ক্ষমতাগুলোকে ব্যবহার করার কোন চেষ্টা করছি না। আমার এই দুই পয়সার আর্টিকেল দিয়ে আমি কিছুই পরিবর্তন করতে পারবনা। কোন জবাবদিহি আমি করতে পারবনা যদি আল্লাহ্‌ আমাকে পাকড়াও করেন। আপনিও না।
আপনি একজন জন্মগত মুসলিম। পৃথিবীতে আরো ৫০০ কোটি মানুষ আছে যারা এই সৌভাগ্য নিয়ে জন্মায় নাই। এটা তাদের দোষ না যে তারা অন্য ধর্মের। আপনি ছোট থেকেই ইসলাম পেয়েছেন, ইসলামের মধ্যে বড় হয়েছেন। আপনাকে ৩০ বছর পর নিজের ধর্ম ছেড়ে সমগ্র পরিবারের বিপক্ষে গিয়ে ইসলাম গ্রহন করতে হয়নি। মুসলিম হবার কারনে আপনার খ্রীষ্টান বাবা আপনাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়নি বা আপনার স্ত্রী আপনাকে ছেড়ে চলে যায়নি। আপনি সত্য ধর্মের মধ্যেই আছেন।
আপনি মুহাম্মদ(স) এর উম্মাহ। যিনি শেষ নবী, যিনি নবীদের মধ্যে স্রেষ্ট, আপনি তার আদর্শের মানুষ। আপনার কাছে একটা সম্পুর্ন বই কু'রান এসেছে। আপনাকে হাজার হাজার বছরের মূর্তি, বা আগুন পূজা ছেড়ে আল্লাহকে নতুন করে বিশ্বাস করতে হয়নি।
আদম(আ) এর প্রতি দয়াঃ
আদম(আ) একটা ভুল করেছিলেন। আল্লাহ্‌ তাকে একটিমাত্র কাজ করতে মানা করেছিলেন, আদম(আ) সেই কাজটিই করেছিলেন।আদম (আ) নিজের ভুল বুঝতে পারলেন। আল্লাহর কাছে মাফ চাইলেন। আল্লাহ্‌ সাথে সাথে মাফ করে দিলেন। নিজেই মাফ চাওয়ার দোয়া শিখিয়ে দিলেন।
এই সেই দোয়া-
"রাব্বান যালামনা আনফুসানা ওয়া ঈল্লাম তাগফিরলানা ওয়াতারহামনা লানা কুনান্না মিনাল খসিরীন"
(They said, "Our Lord, we have wronged ourselves, and if You do not forgive us and have mercy upon us, we will surely be among the losers.")
আদম(আ) এর পুত্র কাবিলের প্রতি আল্লাহর দয়া-
আদম(আ) এর প্রথম যমজ সন্তান ছিল কাবিল ও তার বোন। দ্বিতীয় যমজ সন্তান ছিল হাবিল ও তার বোন । তারা বড় হলে আল্লাহ্‌ নির্দেশ দিলেন প্রত্যেক ভাইকে অপর ভাইয়ের বোনের সাথে বিয়ে দিতে। কাবিল হাবিলের বোন কে বিয়ে করতে রাজী হলনা কারন হাবিলের বোন তার আপন বোনের মতন সুন্দরী ছিলনা। ঈর্ষায় ক্রোধে সে একদিন হাবিলকে পাথর দিয়ে বাড়ি মেরে হত্যা করে। পৃথিবীর ইতিহাসে সেটি ছিল প্রথম মানব হত্যা।
হত্যা করে কাবিল বুঝতে পারল সে কি ভয়ঙ্কর একটি অন্যায় করেছে। ভাইয়ের লাশ পিঠে নিয়ে ঘুরতে লাগল সে উদ্দেশ্যহীন হয়ে। তীব্র অনুশোচনা ও গ্লানিতে পুড়ে যাচ্ছিল সে। দয়াময় আল্লাহ্‌ খুনীকেও দয়া করলেন। মৃত মানুষকে কবর দেয়া শিখিয়ে দিলেন। দুটি কাক পাঠালেন তার সামনে। একটি আরেকটিকে মেরে ফেলল। জীবিত কাকটি মাটিতে ঠুকরে একটি গর্ত করে মৃত কাকটিকে ফেলে বালু দিয়ে ঢেকে দিল।
শয়তান কে দয়া-
শয়তান আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে সরাসরি আল্লাহকে অমান্য করেছিল। কাজটা অকল্পনীয় রকম অবাধ্যতার পরিচয় দেয়। আপনি সরাসরি আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে আছেন , আল্লাহ্‌ আপনাকে একটা হুকুম দিলেন, আপনি সেটা "করব না" বলতে পারবেন?
আল্লাহ শয়তানকে সেখানেই, সেই মুহুর্তেই অনন্তকালের জন্য জাহান্নামে ঢুকাতে পারতেন। আল্লাহ্‌ তা করলেন না। শয়তানকে বের করে দিলেন জান্নাত থেকে। শয়তান আল্লাহর কাছে আর্জি জানাল- " আমাকে কিয়ামত পর্যন্ত আয়ু দাও আর এমন ব্যবস্থা করে দাও যেন আমি মানুষের মনের ভিতর দিয়ে চলাচল করতে পারি"
আল্লাহ্‌ তাও দিলেন তাকে !!
শয়তান যাওয়ার আগে বলল- "আল্লাহ্‌, এই আদমের কারনে আজকে আমি অভিশপ্ত আর বিতাড়িত। আমিও মানুষকে ছাড়ব না। আমি তাদের কাছে আসব, সামনে ও পিছন থেকে, ডান ও বাম থেকে। তুমি দেখবে তাদের মধ্যে বেশিরভাগ-ই তোমার কৃতজ্ঞ না"
আল্লাহ্‌ বললেন- "বের হয়ে যাও অভিশপ্ত শয়তান! মানুষের মধ্যে যেই তোমার অনুসারী হবে, তোমাদের সবাইকে দিয়ে আমি জাহান্নাম পূর্ন করব।"
পৃথিবীর ডিজাইন-
পৃথিবীটাকে আল্লাহ্‌ এত চমৎকার করে ডিজাইন করেছেন আমাদের বসবাসের জন্যে সেগুলো আমরা সবাই চাক্ষুস দেখি প্রতিদিন। দিনের বেলা আলো আর উষ্ণতা প্রয়োজন, তাপশক্তি প্রয়োজন, একটা সূর্য আছে সব প্রয়োজন মিটানোর জন্য। রাত্রেবেলা শীতলতা আর কোমলতা প্রয়োজন, সূর্য ডুবে যায়, ডিমলাইট হিসেবে একটা কোমল চাঁদ উঠে, আকাশ ভর্তি করে তারা ও নক্ষত্র জ্বলজ্বল করে, নীরবে সাক্ষী দেয় ক্ষমতাধর কোন স্রষ্টার।
যদি আল্লাহ্‌ শুধুই প্রচন্ড রাগী শাস্তিদাতা কোন সত্তা হতেন, তাহলে প্রতিটা দিন-ই আমাদের শুরু হত আতঙ্ক নিয়ে, ভয় নিয়ে, যে আরো একটা দিন বাচঁব কিনা, আজকে নতুন কি কি "গজব" পড়বে আমাদের উপর। আমরা সারাদিন আল্লাহকে অস্বীকার ও অমান্য করতেই থাকি, করতেই থাকি, কিন্তু আল্লাহ্‌ আমাদের উপর দয়া করেই যাচ্ছেন, করেই যাচ্ছেন।
আমরা ঢাকায় থাকি। ঢাকা বিশ্বের এক নম্বর বসবাসের অযোগ্য শহর। আপনি আমি আমরা সবাই এই শহরে বহুদিন ধরে আছি। আমরা কি মরে যাচ্ছি? প্রতিদিন কি আপনার দম আটকিয়ে আসে বা আপনার কি মনে হয় "আজকের দিনটা বাচার মতন অক্সিজেন পাব তো?"
ঢাকায় ২ কোটির উপর মানুষ। যেই পরিমান অক্সিজেন প্রয়োজন এই শহরকে বিশুদ্ধ করার মতন, সেই পরিমান গাছ ঢাকায় নাই। কিন্তু তারপরো আমরা শাসকষ্টে মরে যাচ্ছি না। কখনো পেপারে দেখেছেন কি- "শ্বাস নিতে না পেরে যুবকের মৃত্যু" ??
আমরাও বেচে আছি। ভাল-মন্দ খেয়ে, সুখে, দুখে বেচে আছি। কিছু না কিছু খাবার সবার জুটে এখানে, না খেয়ে কেউ মরে যাচ্ছে না। হ্যা, কেউ হয়ত আজকে খায়নি বা রাতে খেতে পারবেনা, কিন্তু বেচে থাকার মতন খাবার আল্লাহ্‌ সবাইকে দিচ্ছেন। কমলাপুর স্টেশনের ঐ ভিক্ষুকটাও হয়ত একমুঠ ভাত আর ডাল খাবে। কিন্তু খাবে।
ঢাকার খাবারে অনেক ভেজাল, অনেক রঙ, অনেক কেমিক্যাল তাইনা? বিশ্বে প্রতিদিন ১৬ হাজার বাচ্চা মারা যায় না খেতে পেয়ে। তাদের কাছে আমাদের ফেলে দেওয়া বাসি পচা খাবার গুলোর দাম কয়েকটী জীবনের সমান।
ঢাকা খুব খারাপ তাইনা ? আপনাকে কি আমি বলব সিরিয়া গাযা ফিলিস্তিনের কথা? আজকে রাতে অনেক মানুষ-ই সেখানে মারা যাবে, তারা আর কখনই তাদের পরিবারের কাছে ফিরে যাবে না। ঢাকা শহরে বের হলে এখনো কেউ আপনাকে গুলি করে মেরে ফেলে না তাইনা?
আল্লাহ্‌ কতটা দয়ালু বা সহনশীল? ঃ-
নূহ(আ) এর জাতিকে আল্লাহ্‌ ৯৫০ বছর সময় দিয়েছিলেন ঈমান আনার জন্য। একটা মানুষ ৯৫০ বছর ধরে একি কথা বলে গেছেন, এটা আমি আপনি উপলব্ধি করতে পারবনা। সাড়ে নয়শ বছর পর আল্লাহ্‌ তাদের উপর থেকে দয়া তুলে নেন।
এটা কি শাস্তি ছিল নাকি ন্যায়বিচার ছিল? এটা ছিল "ন্যায়বিচার" . আল্লাহ্‌ প্রতিশোধপরায়ন কোন সত্তা নন। নীচু স্তরের অপবিত্র কোন অনূভূতি আল্লাহর মধ্যে নেই। আমরা যেটাকে শাস্তি বলি, সেটা আসলে হচ্ছে "ন্যায়বিচার". মানুষের ক্ষেত্রে বিচার ন্যায় বা অন্যায় হতে পারে, কিন্তু আল্লাহ্‌ কখনো অন্যায় করতে পারেন না, তাঁর বিচার সম্পূর্ন ন্যায় এবং পক্ষপাতবিহীন।
শেষ বিচারের দিনেও যারা জাহান্নামে ঢুকবে, এটাও ন্যায়বিচার। একটা মানুষকে পুরো একটা জীবন দেয়া হয়েছিল সত্য জানার জন্য, সে তা জানে নাই, সে সারা জীবন কাটিয়েছে ভোগ বিলাসের পিছে, আল্লাহকে অস্বীকার করেছে, সে জাহান্নামে যাবে, এটা সে ডিজার্ভ করে।
মূসা(আ) এর সময়ের কথা। প্রচন্ড অনাবৃষ্টি। বনী ঈসরাইল এর লোকেরা মূসা(আ) কে আল্লাহর কাছে দোয়া করতে বলল। মূসা(আ) দোয়া করলেন। আল্লাহ্‌ তাকে বললেন- এই গোত্রে এমন একজন আছে যে আল্লাহকে বিশ্বাস করেনা। সে গোত্র থেকে বের না হয়ে যাওয়া পর্যন্ত আমি বৃষ্টি দিবনা"।
মুসা(আ) সবাইকে ডাকলেন। সবার সামনে এই কথা বললেন। বললেন অবিশ্বাসী মানুষ যে আছে সে যেন মানুষের মঙ্গলের জন্য উঠে বের হয়ে যায়।
কেউ বের হল না। তিনি আবার বললেন। কেউ বের হল না।
একটু পর মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হল। সবাই বিস্মিত। মূসা(আ) বিস্মিত। তিনি আবার গেলেন আল্লাহর কাছে। আল্লাহ্‌ তাকে বললেন-
" মূসা! লোকটি আমার কাছে তওবা করে বলেছে- ' আল্লাহ্‌ আমাকে এভাবে লজ্জিত করবেন না, আমি মাফ চাচ্ছি।' আমি তাকে মাফ করে দিয়েছি।"
মূসা(আ) কৌতুহল বোধ করলেন। তিনি লোকটির পরিচয় জিজ্ঞেস করলেন। আল্লাহ্‌ বললেন-
"যার পরিচয় আমি কাউকে দেইনি, তুমি কিভাবে আশা কর তোমাকে আমি তার পরিচয় দেব? তার পরিচয় আমার আর তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ"।
আল্লাহ্‌ ও জীবরীল (আ) ও আপনি-
মুহাম্মদ(স) প্রথমবার জীবরীল (আ) কে দেখে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর পাখাগুলো ছিল মুহাম্মদ(স) এর পুরো দৃষ্টিসীমা জুড়ে। জীবরীল (আ) ফেরেশতাদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত। আল্লাহর সবচেয়ে গুরুত্তপুর্ন কাজগুলো তিনি করেন। যত গ্রন্থের যত ওহী এসেছে, সবগুলো নিয়ে এসেছেন জীবরীল (আ). তাঁর দায়িত্ত গুলো অত্যন্ত সম্মানের।
আল্লাহ্‌ যখন তাঁর কোন বান্দাকে ভালবাসেন, কারন হয়ত সে আল্লাহর ইবাদত করছে বা যেকোন ভাল কাজ করছে, তখন আল্লাহ্‌ জীবরীল (আ) কে ডাকেন। ডেকে এই আদেশ দেন-
"জীবরীল ! আমি আল্লাহ্‌, আমি সাকিবকে ( সাকিব আপনি) ভালবাসি। অতএব, তুমিও তাকে ভালবাস এবং সবাই তাকে ভালবাসবে।"
জীবরীল (আ) ফেরেশতাদের কাছে আসেন। লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি ফেরেশতাদের তিনি বলেন-
"সাকিবকে আল্লাহ্‌ ভালবাসেন, অতএব আমি তাকে ভালবাসি। অতএব তোমরা এবং পৃথিবীতে যত ফেরেশতা আছ, সবাই তাকে ভালবাস।"
আল্লাহ্‌ যে এই কাজটি করেন, তাঁর কোন দরকার ছিলনা এটি করার। তিনি এটা নাই জানাতে পারতেন। কিন্তু তিনি সবাইকে জানান। পুরো মহাজগত কে তিনি জানিয়ে দেন, যে তিনি আল্লাহ্‌, মহাজগতের মালিক, তিনি আপনাকে ভালবাসেন।
IF ALLAH LOVES YOU RIGHT NOW, WHAT MORE DO YOU WANT ???!!!
THERE IS NO WAY HE WILL PUNISH SOMEONE WHOM HE LOVES. NO WAY.
এটি সহীহ বুখারীর একটি হাদিস। এর আরো অর্ধেক অংশ আছে, সেটা হচ্ছে যখন আল্লাহ্‌ কাউকে ঘৃনা করেন। বুঝতেই পারছেন বাকিটা।
এই মুহূর্তে দুটি সম্ভাবনা আছে আল্লাহ্‌ আপনাকে ভালবাসেন নাকি ঘৃনা করেন। আপনি ভাল জানেন আপনার কি অবস্থা।
একটা বুড়ী কোনদিন-ও কোন ভাল কাজ করে নাই। খালি একবার সে জীবনে একটা পিপাসায় কাতর কুকুরকে কুয়া থেকে পানি তুলে পান করিয়েছিল।
আল্লাহ্‌ তার এই কাজটা এতই ভালবাসলেন, তাকে পুরস্কার হিসেবে জান্নাত দিয়ে দিলেন।
ফেরাউন(ফারাও) এই পৃথিবীর সবচেয়ে অত্যাচারী শাসক ছিল। সে নিজেকে আল্লাহ্‌ দাবি করত। সে প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ ছেলেশিশুদেরকে হত্যা করত, আর মেয়েশিশুদেরকে বাচিয়ে রাখত, কেন মেয়েদের বাচিয়ে রাখত না বললেও চলবে।
আল্লাহ্‌ তাকেও দয়া করেছিলেন। আল্লাহ্‌ মূসা(আ) কে যখন ফেরাউনের কাছে পাঠালেন , মূসা(আ) কে ওহী নাযিল করে বলে দিলেন যেন উনি ফেরাউনের সাথে নম্র ভদ্র সুন্দরভাবে আচরন করেন। আল্লাহর অসীম দয়া ফেরাউন নিতে ব্যর্থ হয়েছিল।
একদিন মুহাম্মদ(স) হাশরের মাঠের বর্ননা দিতে গিয়ে হাসছিলেন। সাহাবারা বললেন- রাসুলুল্লাহ আপনি তো কখনো কেয়ামতের কথায় হাসেন নাই আগে।
তিনি বললেন- আমাকে হাশরের ময়দানের একটি দৃশ্য দেখানো হল। আমার উম্মাহর মধ্যে একদল লোক থাকবে যাদের পাপ অনেক বেশি। সেদিন তারা হাসবে। অন্যান্য মানুষ তাদেরকে জিগেস করবে- কি ব্যাপার, তোমরা এই ভয়ঙ্কর দিনে হাসছ কেন? তারা উত্তরে বলবে- আমরা অনেক পাপ করেছিলাম। কিন্তু আমরা তওবা করেছিলাম। আমরা আল্লাহর কাছে মাফ চেয়েছিলাম। আজকে সেই সবগুলোকে পাপকে আল্লাহ্‌ পূন্য বানিয়ে দিয়েছেন। সেই পাপগুলোর জন্যই আজকে আমরা জান্নাতে যাচ্ছি।
কু'রানে ফুজ্জার(পাপী) শব্দটি ৩ বার এসেছে, আবরার(পূন্যবান) শব্দটি এসেছে তার দ্বিগুণ অর্থাৎ ৬ বার। আযাব শব্দটি এসেছে ১১৭ বার, সোয়াব শব্দটি তার দ্বিগুণ অর্থাৎ ২৩৪ বার। যেকোন ভাল কাজের পুরস্কার কে আল্লাহ্‌ দুইগুন দশগুন হাজারগুন বাড়িয়ে দেন শুধুমাত্র আমাদেরকে দয়া করে। আর একটি খারাপ কাজকে আল্লাহ্‌ একটি করেই ধরেন। মানুষ একটি ভাল কাজ করা মাত্র ডানকাধের ফেরেশতা সেটি লিখে ফেলেন। আর একটি খারাপ কাজ করলে বাম কাধের ফেরেশতা সেটি লেখেন না, অপেক্ষা করেন, যদি মানুষটি ভুল বুঝতে পারেন, তিনি সেটা আর লেখেন না ।
আল্লাহ্‌ অসীম দয়ালু। কিন্তু সবার জন্য না। যে এই দয়া চেয়ে নিবে না, আল্লাহ্‌ তাকে দিবেন না। যে চাইবে, আল্লাহ্‌ তাকে দয়া করতেই থাকবেন, করতেই থাকবেন।
আল্লাহ্‌ যদি সবাইকে দয়া নাই করতেন, তাহলে গুটিকয়েক মুসলিম বাদে অমুসলিম এবং ধর্মহীন মুসলিম কেউই আমরা বেচে থাকতাম না কারন দয়া পাবার মতন তেমন কোন কাজ আমরা করি না। আল্লাহ্‌ কি অমুসলিমদের না খাইয়ে রেখেছেন পৃথিবীতে? যেসব মানুষ মনে করে আরেকটা মানুষ হিন্দু বলে তার বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া তার ইসলাম ধর্মের অধিকার, তারা কি এটা জানে না যে সে আল্লাহর দয়ার উপর একটা চরম অন্যায় করল? সে কি পার পেয়ে যাবে, এতই সোজা?
জাহাজ দুর্ঘটনায় আপনি মহাসাগরে পড়ে গেছেন। কয়েকদিন প্রানপন চেষ্টা করার পর আপনি দেখলেন, আসলে কোন লাভ নেই, আপনি বাঁচবেন না। খুব আস্তে আস্তে আপনি পানির সাথে যুদ্ধ করা বন্ধ করে দিলেন ও নিজেকে ভাগ্যের হাতে আত্মসমর্পণ করলেন।
আপনি যখন একবার বুঝতে পারবেন, অসীম ক্ষমতাধর দয়ালু আল্লাহ্‌ আমাদেরকে যা যা দিচ্ছেন, এর বিনিময়ে আমরা তাঁকে কিছুই ফেরত দিতে পারবনা, তখন আপনার হাতে উপায় হল- আল্লাহর কাছে নিজেকে উজাড় করে আত্মসমর্পণ করা ও আল্লাহর কাছে স্বীকার করা-
"আল্লাহ্‌! আপনার কোন নিয়ামত আমি অস্বীকার করব? আমি জীবনেও আমার সামান্য ইবাদত দিয়ে জান্নাতে যেতে পারবনা, যদি না আপনি আমাকে দয়া করেন। আমি আপনার দয়া চাই প্রভু। আপনার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। নিশ্চয়ই আপনি অসীম দয়ালু"
কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য কু'রানের প্রথন সুরার প্রথম শব্দটিই যথেষ্ট।
“আলহামদু লিল্লাহ” . আসুন শব্দটি বিশ্লেষণ করি।
হামদ শব্দটি একটি বিশেষ ধরণের প্রশংসা। আরবিতে সাধারন প্রশংসাকে মাদহ مدح বলা হয়। এছাড়াও সানাআ ثناء অর্থ গুণগান। শুকর شكر অর্থ ধন্যবাদ দেওয়া।
হামদ শব্দটি দিয়ে একি সাথে প্রশংসা, কৃতজ্ঞতা, ধন্যবাদ, ভালবাসা, শ্রদ্ধা, বিনয়, নম্রতা প্রকাশ করা যায়।
আমরা আল্লাহকে শুধু ধন্যবাদ দেই না, বরং আমরা তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি কারন তিনি আমাদেরকে যে এত অসীম নিয়ামত দিয়েছেন, যা আমরা প্রতিনিয়ত ভোগ করি—তার জন্য তাঁকে ধন্যবাদ দিয়ে তাঁর প্রশংসা করার জন্য হামদ সবচেয়ে উপযুক্ত শব্দ।
একটি ফুল সুন্দর, আপনি সেটির প্রশংসা করবেন, কিন্তু সেটির প্রতি আপনি কখনো কৃতজ্ঞ হবেন না। কেউ আপনার একটা উপকার করলে আপনি তাকে ধন্যবাদ দিবেন, কিন্তু সাথে সাথে তার প্রতি ভালবাসা, বিনয়, কৃতজ্ঞতা, নম্রতা, প্রশংসা আপনি করবেন না। একমাত্র আল্লাহর ক্ষেত্রে এই সবকিছু একসাথে আমরা প্রকাশ করি।
আর-রাহমান এর ব্যাখ্যাঃ
প্রথমত, রাহমা-ন এবং রাহি-ম: এই দুটো শব্দই এসেছে রাহমা থেকে, যার অর্থ: দয়া। আরবিতে রাহমা শব্দটির আরেকটি অর্থ ‘মায়ের গর্ভ।’ মায়ের গর্ভে শিশু নিরাপদে, নিশ্চিতে থাকে। শিশুর জন্য সকল দয়ার উৎস হচ্ছে তার মায়ের গর্ভ।
রাহমা-ন এর শেষে যে একটা টান আছে: ‘আন’, তা প্রচণ্ডতা নির্দেশ করে। রাহমান হচ্ছে পরম দয়ালু, অকল্পনীয় দয়ালু। আল্লাহ তার একটি গুণ ‘আর-রাহমা-ন’ দিয়ে আমাদেরকে বলেছেন যে, তিনি পরম দয়ালু, তাঁর দয়ার কথা আমরা কখনও কল্পনা করতে পারব না।
আল্লাহর দয়াগুলোর প্রতি পূর্নভাবে কৃতজ্ঞ হতে পারলেই ধর্মের প্রতি সে নিজে থেকে অনুভব করা শুরু করতে পারে, তখন তাকে আর গুতিয়ে গুতিয়ে নামাজ পড়তে পাঠাতে হয় না। আপনি যদি কোন মানুষের প্রতি খুব কৃতজ্ঞ থাকেন কারন একবার সে আপনার জীবন বাঁচিয়েছিল, তাহলে আপনি দেখবেন আপনি সবসময় তার জন্য কিছু করার চেষ্টা করছেন। একিভাবে আপনি যখন আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা অনুভব করবেন নিজের ভেতরে, আপনি দেখবেন বাকি কাজগুলো আপনার জন্য কত বেশি সহজ হয়ে যাচ্ছে। কারন আপনি নিজেও জানেন আপনি কোনভাবেই আল্লাহকে এর মূল্য ফেরত দিতে পারবেন না। এমনকি সেটা আল্লাহও জানেন। কিন্তু বিনিময়ে তিনি আপনাকে আরো ভালবাসবেন, আরো দয়া করবেন। আর সেটাই কি আমরা সবাই চাই না মুসলিম হিসেবে?
এরপর থেকে কিছু খাওয়ার আগে চিন্তা করবেন যে , একটা ভাতের দানা সৃষ্টি করার ক্ষমতাও আমাদের নাই। কোন কিছু সৃষ্টি করার ক্ষমতাই আসলে আমাদের নাই। আমরা খালি প্রকৃতির উপাদান গুলো কে বিভিন্ন ভাবে ব্যবহার করি, ব্যস এটুকুই। অতএব, কৃতজ্ঞ হওয়া ছাড়া আমাদের কোন উপায় নেই।
এই আর্টিকেল এর অর্থ এই না যে, তাহলে আগে জীবনটা উপভোগ করে নেই, একবারে শেষকালে মাফ চেয়ে নিব, কারন আল্লাহ্‌ তো অসীম দয়ালু। প্রথমত, আপনি জানেননা আপনি কতদিন বাচবেন। দ্বিতীয়ত, আপনি একি সাথে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ আর অবাধ্য হতে পারেননা, এটা একটা আত্মপ্রতারনা ছাড়া আর কিছুই না।
ইসলাম কোন "Taken as Granted" ধর্ম না যে এটা আমি পৈত্রিক সূত্রে পেয়েছি, কাজেই আমি যা ইচ্ছা করব। পৃথিবীতে অনেক অনেক মানুষ আছে যাদের কাছে ইসলামের বানী নিয়ে গেলে তারা আমাদের চেয়ে হাজার গুন ভাল মুসলিম হতে পারত ( এবং অনেক কনভার্টেড মুসলিম এর প্রমান দিয়ে যাচ্ছে) .আল্লাহর সাথে আমাদের কোন ওয়াদা নাই যে উনি আমাদের জান্নাত দিতে বাধ্য। আমরা আল্লাহকে মানি আর না মানি, আল্লাহর কিছুই যায় আসে না। আমরা যদি নিজের আত্মা কে নিয়ে জুয়া না খেলতে চাই তাহলে আমাদের উচিত এখন থেকেই ইসলাম ধর্মকে শিখে নিজের জীবনে প্রয়োগ করে মানুষকে জানান।

উপাসনা না দাসত্ব

উপাসনা না দাসত্ব
আমাদের ধর্মের প্রতি অনীহার মূল একটা কারন হল, আমরা স্রষ্টাকে ঠিকমতন উপলব্ধি-ই করতে পারিনা। স্রষ্টা্র কথা আমরা জন্মগত মুসলিমরা ছোটবেলা থেকেই শুনে শুনে বড়ো হয়েছি। একারনে তাঁর প্রতি আমাদের "অতিরিক্ত" কোন আবেগ কাজ করে না। বা তিনি যে আসলে কত মহান একজন সত্তা, সেটা নিয়ে আমরা গভীরভাবে কিছু চিন্তাই করিনা কখনো। তিনি আছেন, আমরাও আছি, আমাদের জীবন চলছে, এইতো বেশ আছি। একদিন মরে যেতে হবে, কিন্তু কেন জানি মৃত্যুর কথা আমরা চিন্তাই করতে চাইনা। মৃত্যু নিয়ে যতবার কথা উঠে, আমরা এড়িয়ে যেতে চাই। কোন এক অজ্ঞাত অদ্ভুত কারনে আমরা ভাবতে চাইনা যে আমাকে মাটির মধ্যে একা পুতে রাখা হয়েছে হাজার হাজার বছর ধরে। কি ভয়ঙ্কর অন্ধকার। কেউ নেই আমার সাথে। কেউ নেই। শুধু অন্ধকার জগতের অশরীরী কিছু সত্তা।
প্রশ্ন- পৃথিবীতে মানুষের উদ্দেশ্য কি ?
উঃ- একসময় কিছুই ছিল না। শুধু আল্লাহ ছিলেন। তিনি মহাবিশ্ব সৃষ্টি করলেন, তাঁর অন্যান্য সৃষ্টি যাদেরকে আমরা জীন ও ফেরেশতা বলে জানি, তাদের সৃষ্টি করলেন। একদিন আল্লাহ ইচ্ছা করলেন, তিনি পৃথিবীতে মানুষকে তাঁর "প্রতিনিধি" হিসেবে পাঠাবেন।
যখন কোন রাজা অন্য কোন দেশে তার প্রতিনিধি পাঠান, প্রতিনিধির মূল উদ্দেশ্য থাকে সেখানে যেয়ে রাজার কথা সবাইকে জানানো, আর রাজা যদি কোন কাজ দিয়ে থাকেন সেগুলো ঠিকঠাক মতন করে আবার নিজ রাজ্যে ফিরে রাজার সন্তুষ্টি অর্জন করা।
আমরা আল্লাহর প্রতিনিধি। আল্লাহ আমাদেরকে ফেরেশতা, জীন ও অন্যান্য সকল সৃষ্টির মধ্যে শ্রেষ্ঠ করে তৈরী করেছেন। মানুষকে দেওয়া হয়েছে প্রানীজগতের মধ্যে সবচেয়ে উন্নত মস্তিষ্ক, চিন্তা করার ক্ষমতা, ভাল মন্দ বুঝার ক্ষমতা, অনুভূতি, আবেগ, যুক্তি, কল্পনাশক্তি, বিবেক। একি সাথে পবিত্র ও কলুষিত চিন্তা করার ক্ষমতা। অকল্পনীয় জটিল গঠন মানুষের।
আপনি গ্রামীন ফোনের কাস্টোমার কেয়ারে কাজ করেন। এই মূহুর্তে আপনার সামনে ৩০ মিনিট ধরে যে লোকটি দাঁড়িয়ে দাড়িয়ে আপনার জান ভাজাভাজা করে ফেলছে তাকে আপনার চড়াতে ইচ্ছা করছে। মনে মনে তার গুষ্টী উদ্ধার করা গালি দিতে দিতে আপনি মিষ্টিমুখে তাকে বলছেন- আর কিছু করতে পারি স্যার?
গুলশানের অভিজাত রাস্তা। একটা কমবয়েসী আকর্ষনীয় মেয়ে অত্যন্ত আপত্তিকর কাপড় পরে রাস্তা দিয়ে হেটে যাচ্ছে। একটা চায়ের দোকানের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় সে খেয়াল করল না, ৪-৫টা ছেলে তাকে চোখ দিয়ে গিলে গিলে খাচ্ছে। যতক্ষন সে তাদের দৃষ্টিসীমার মধ্যে রইল তারা তার দিকে তাকিয়ে রইল, নিজেদের মধ্যে অর্থপূর্ন দৃষ্টি আদানপ্রদান করল। রাস্তার উল্টোপাশ দিয়ে একজন চুপচাপ ধরনের যুবক আসছিল। মেয়েটার দিকে চোখ পড়াতে আস্তে করে চোখ নামিয়ে সে তাকে হেটে অতিক্রম করে গেল।
সবগুলোই মানুষের উন্নত মস্তিষ্কের জটিল ক্রীয়াকলাপ।
পৃথিবীতে মানুষের প্রথম ও প্রধান কাজ- আল্লাহর অস্তিত্তে বিশ্বাস করা। এই মহাজগত যে অত্যন্ত ক্ষমতাধর বিচক্ষন কারোর বানানো, সেটা স্বীকার করা ও বিশ্বাস করা। সেটা বিশ্বাস করার জন্য আল্লাহ চারপাশে অসংখ্য প্রমান রেখেছেন। তারাভরা রাতে একবার আকাশের দিকে তাকালেই বোঝা যায় সমগ্র সৃষ্টির তুলনায় আমরা কতটা ছোট, কতটা নগন্য, কতটা ক্ষুদ্র। প্রত্যেকদিন ঠিক একিভাবে দিন ও রাত আবর্তন করে, ঠিক ৩৬৫ দিন পর পর পৃথিবীটা সূর্যকে একবার করে ঘুরে আসে, একদিনও এদিক ওদিক করে না, লীপ ইয়ারও যদি হয়, সেটাও একদম মাপা। অত্যন্ত নিঁখুত ভাবে কেউ একজন এগুলো ডিজাইন করে রেখেছেন এবং সেগুলো নিয়ন্ত্রন করছেন কোটি কোটি বছর ধরে।
এরপর গাইডলাইন হিসেবে আল্লাহ আমাদের দিয়েছেন একটা বই। সেটা আমাদের জন্য কু'রান। তার আগে যখন যে সময়ে যেভাবে প্রয়োজন যতটুকু প্রয়োজন তিনি দিয়ে এসেছেন তাওরাত, যাবূর ও ইঞ্জীল গ্রন্থের মাধ্যমে। বইগুলো তিনি আকাশ থেকে ধাম করে ফেলে দিয়ে বলেননি যে- যাও মুখস্ত কর গিয়ে ! প্রত্যেকটি বই এর প্রতিটি কথা, প্রতিটি আদেশ-নিষেধ মানুষকে বোঝানোর জন্য তিনি মানুষের মধ্যে থেকেই বেছে নিয়েছেন তাঁর মেসেঞ্জার বা নবী-রাসূলদের। তারা হাজার হাজার বছর ধরে মানুষকে এই একটি কথাই বলে গেছেন- আল্লাহ কে বিশ্বাস কর, তাকে মেনে নাও একমাত্র উপাস্য হিসেবে, তাঁর কথাগুলো মেনে চল।
কেউ যদি নিজেকে মুসলমান হিসেবে দাবি করে, তাহলে সে বিশ্বাস করে যে, পরকাল বলে একটা বিষয় আছে, যদিও বিজ্ঞান আজীবন গবেষনা করেও এটি প্রমান করতে পারবেনা, এবং বিজ্ঞানের সাথে ধর্মের সবচে বড়ো বিতর্ক এই যায়গাতেই। কেউ যদি পরকালে বিশ্বাস নাও করে, সে যদি পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো কোন নাস্তিক ও হয়, তাহলেও সে অস্বীকার করতে পারবেনা যে সে একদিন মারা যাবে।
মৃত্যুকে কেউ অস্বীকার করতে পারবেনা।
যদি পরকাল কেমন এটার একটা ক্ষুদ্রতম ধারনাও পাওয়া যেত, তাহলেও মানুষের আক্কেল গুড়ুম হয়ে যেত। বাজারে "কবরের আজাব" জাতীয় যে সিডি গুলো পাওয়া যায় সেটা দেখে আপনার একটু ভয় ভয় লাগতে পারে, কিন্তু সেটাও আসলে কোন না কোন মানুষের বানান। সেই মানুষটা যদি স্টীভেন স্পীলবার্গ এর মতন অসম্ভব মেধাবী কেউ-ও হয়, তাহলেও সেটা কখনই পরকালের জিনিসগুলোকে তুলে ধরতে পারবেনা। পরকাল কেমন এটা জানার জন্য মানুষকে একবার মরে গিয়ে সেটা দেখে এসে আবার বেচে উঠে তারপর মানুষকে জানাতে হবে ! পৃথিবীতে একজন মাত্র মানুষ জিনিসগুলো সরাসরি দেখে এসেছেন, তিনি মুহাম্মদ(স)।
কিন্তু আমাদের জীবনে যেহেতু এটা সম্ভব নয়, তাই মানুষকে বিশ্বাস ও কাজ করতে হয় "অদেখা ভুবনের" উপর। সেটা সবাই করতে পারেনা। হয় বিশ্বাস-ই করতে পারেনা, বা পারলেও কিছু সন্দেহ থাকে( যেমন- জীন ? যাহ, কি বলে! এগুলা আবার হয় নাকি ! কি প্রমান আছে? যতসব ধর্মীয় গাজাখুরি! হেহ !) | অনেকের বিশ্বাস বেশ দৃঢ়, কিন্তু যেই নামাজ-রোজা-যাকাত-হিজাব এর ব্যাপার চলে আসে, তখন নানারকম অজুহাত বের হতে থাকে।
সবচেয়ে সংক্ষেপে বললে, পৃথিবীতে মানুষের উদ্দেশ্য হল-
- তাকে কেন সৃষ্টি করা হয়েছে তা নিয়ে চিন্তা করা।
- প্রকৃত স্রষ্টাকে খুজে বের করা
- তার দেখানো নিয়ম অনুসারে জীবন অতিবাহিত করা
- অন্য মানুষদের সত্য ধর্মের দিকে স্রষ্টার শেখান নিয়মে আহ্বান করা।
FREE-WILL কি জিনিস-
এই জিনিসটা কে ব্যবহার করে আজকালকার মুসলিমরা তর্ক করার চেষ্টা করে। যেমন-
- ভাই, সব-ই তো আল্লাহর ইচ্ছায় হয়। তাহলে এই যে আমি নামায পড়তে পারি না, তাগিদ পাই না( আসলে উনি ইচ্ছা করে পড়েন না) , এটাও তো আল্লাহর ঠিক করা। এখানে আমার কি দোষ ?
- আপা, আল্লাহর ইচ্ছা হচ্ছে না বলে আমি এখনো হিজাব করা শুরু করতে পারি নাই। আমার কি দোষ বলেন?
- দেখেন, আল্লাহ তো জানেন-ই আমি জান্নাতে যাব নাকি জাহান্নামে যাব, তাইনা ? তাহলে এই যে আমার কষ্ট করে নামায-রোজা, যাকাত, হিজাব, এগুলোর তো মানে নাই। আল্লাহ তো আমার নিয়তি আগেই ঠিক করে রেখেছেন , তাইনা ?
- একজন আত্মহত্যা করেছে। আরেকজন যুক্তি দিচ্ছে- ও যে এভাবে মারা যেত এটা আল্লাহর-ই ঠিক করা। কাজেই ও আর অন্য কোনভাবেই মারা যেতে পারত না। কাজেই আল্লাহই ওকে দিয়ে আত্মহত্যা করিয়েছেন। এখন যদি আল্লাহ ওকে ক্ষমা না করেন, এটা কার দোষ বলেন ?
এই ফালতু যুক্তিটার উত্তর হল-
মানুষ, জীন ও ফেরেশতাদের মধ্যে একমাত্র ফেরেশতা দের কোন FREE WILL নাই। তাদের নিজে থেকে সিদ্ধান্ত নেবার কোন ক্ষমতা নাই। তাদেরকে আল্লাহ যে কাজ দিয়ে রেখেছেন সেটাই তারা করে এবং তাদের অন্যভাবে চিন্তা করার কোন শক্তি আল্লাহ দান করেন নাই। যেমন- ইসরাফীল(আ) হাতে একটা শিঙ্গা নিয়ে কোটি কোটি বছর ধরে দাঁড়িয়ে আছেন।
না, তার ক্ষিদে লাগেনা, পা ব্যথা করে না, দাঁড়িয়ে থাকতে তার কোন সমস্যা হয়না। কারন Allah is taking care of him ! তাদের কোন ফ্রী উইল নেই।
মানুষ আর জীন জাতিকে আল্লাহ FREE WILL দিয়ে বানিয়ে পৃথিবীতে ছেড়ে দিয়েছেন। তাদেরকে সঠিক পথের রাস্তা টা দেখিয়ে দিয়েছেন ( নবী এবং বইয়ের মাধ্যমে)| কিন্তু কাউকে আল্লাহ কোন কিছু নিয়ে কোন জোর করেন না। যে যার বুদ্ধি বিবেক খাটিয়ে ইচ্ছা মতন চলতে পারে। আল্লাহ এখন কিছুই বলবেন না। হ্যা, তিনি অসুখ দিতে পারেন, দুর্যোগ দিতে পারেন, কিন্তু আপনার চিন্তায় উনি কোন বাঁধা দিবেন না। আল্লাহ একদিন-ই ধরবেন, মাত্র একদিন, সেদিন কোন ছাড়াছাড়ি নেই। পাই পয়সার হিসেব আদায় করবেন তিনি সেদিন।
FREE WILL এর সবচে বড়ো উদাহরন- আপনি কি গতকালকে ৫ বার মাসজিদে যেয়ে সালাত আদায় করেছেন? আপনার করার কথা ছিল, আপনি করেন নাই। যদিও এ ব্যাপারে আপনার পূর্ন জ্ঞান আছে তাইনা ? এই কাজটার জন্য কি আপনি দায়ী নাকি আল্লাহ দায়ী। কিন্তু আপনি যে গতকালকে যাবেন না, বা আজকে যাবেন এটা আল্লাহ খুব ভালো করেই জানেন। আপনাকে সৃষ্টি করার আগেই জানেন। মহাজগত বানানোর আগেই জানেন।
কিভাবে জানেন? কারন তিনি স্রষ্টা। আপনি চেষ্টা করছেন তাকে জাগতিক জ্ঞানের মধ্যে ধারন করতে, জাগতিক পার্থিক জিনিসের সাথে তাঁর তুলনা করতে, আপনার যুক্তির মধ্যে তাঁকে ধারন করতে। আপনি যেভাবেই তাঁকে চিন্তা করেন, আপনি পারবেন না। কারন আপনি ঠিক যেরকম কল্পনা করবেন, স্রষ্টা একদম তার চেয়ে অন্যরকম।
THERE IS NO POINT IN PERSONIFYING GOD; BECAUSE HE IS NO PERSON, NOR ARE HIS QUALITIES.
শয়তান ঠিক একি কাজ করেছিল। সে আল্লাহকে আমাদের চেয়ে অনেক ভাল করে চিনে, কারন সে আল্লাহর সাথে কথা বলতে পারত, সে জান্নাতেই থাকত। সে তার ফ্রী উইল ব্যবহার করে আল্লাহর অবাধ্যতা করে।
শয়তান কিন্তু জীবনেও বলে নাই- আল্লাহ, আমাকে মানুষের শত্রু বানানোর জন্য আপনি দায়ী।
সে নিজেও এটা জানে।
আদম (আ) কে মানা করার পর-ও তিনি ভুল করে ফেলেন। তিনিও ফ্রী-উইল ব্যবহার করেন। আল্লাহ তাকে সাবধান করেছিলেন, কিন্তু ফল খেতে বাঁধা দেননি।
সবাইকে ফ্রী-উইল দিলে মানুষ আর ফেরেশতার মধ্যে কোন পার্থক্য থাকত না। মানুষ খারাপ -ভাল দুইটাই করতে পারে, ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও যে খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকে আল্লাহর ভয়ে, এইটাই মানুষ ও জীনের একটা স্পেশাল গুন।
[] "ইবাদত" শব্দের Mis-Interpretation:
কু'রানে আল্লাহ খুব সোজা কথায় আমাদেরকে বলে দিয়েছেন-
" And I did not create the jinn and mankind except to worship Me." [ 51:56 ]
(আর আমি জীন ও মানুষকে আমার ইবাদত করা ছাড়া অন্য কোন কারনে সৃষ্টি করিনি)
আপনি যদি বলেন- আমি আজকে ধানমন্ডী যাব। আর আপনি যদি বলেন- আজকে আমি ধানমন্ডি ছাড়া আর কোন যায়গায় যাবনা, যাবনা !!!
দুটির মধ্যে অবশ্যই দ্বিতীয় কথাটিতে অতিরিক্ত জোরাল বক্তব্য দেওয়া হয়েছে।
"আর আমি জীন ও মানুষকে আমার ইবাদত করা ছাড়া অন্য কোন কারনে সৃষ্টি করিনি" - এই কথাটির মাধ্যমে আল্লাহ মানুষের সকল প্রকার সকল অজুহাতকে উড়িয়ে দিয়েছেন।
অজুহাত-
- ভাই, আমি অনেক অনেক ব্যস্ত থাকি সারাদিন। নামাজ কখন পড়ব বলেন ? তাও টাইম পাইলে পড়ি। জুম্মা মিস দেই না।
- ভাই, আমি একজন নিউরোসার্জন। আমার কত কাজ আপনার মতন মানুষের কোন ধারনাও নাই। আমি মানুষের ব্রেইনের ডাক্তার, বুঝলেন ? একেকটা অপারেশনে আমার ১০ ঘন্টাও চলে যায়। এত ধর্মকর্ম করার টাইম আমার নাই। আমার নিয়ত শুধুই মানুষের সেবা করা( টাকা কিন্তু ঠিক-ই নেন) আপনারাই বাড়াবাড়ি করেন ধর্ম নিয়ে। আসলে ধর্ম এত কঠিন কিছু না।
- ভাই, সামনে আমার এডমিশন টেস্ট। দিনে ৫ বার মাসজিদে গেলে আমার পড়া কি আপনি পড়ে দেবেন? বাসায় পড়ে নিব। আল্লাহ তো দয়ালু, তাইনা ?
- আমি মনে করি না এত কম বয়সে আমার হিজাব করার/ দাড়ি রাখার দরকার আছে। আব্বুর মতন বয়স হোক, দেখা যাবে। তাছাড়া আমার মন তো পরিস্কার। ধর্ম নিয়ে এত বাড়াবাড়ির কি আছে?
আসুন একটু ডিটেইল জানা যাক-
কু'রানে বহুবার ইবাদাহ/উ'বুদু/ আবাদা/ আ'বুদু শব্দগুলো এসেছে। প্রথম শুরু হয়েছে সূরা ফাতিহার ৪ নং আয়াত থেকে-
" ইয়্যাকা না'বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতাঈন "
(আমরা একমাত্র আপনার-ই ইবাদত করি এবং আপনার কাছেই সাহায্য চাই) ( 1:4)
তারপরেই আবার ইবাদতের কথা এসেছে সুরা বাকারার ২১ আয়াতে-
মানব জাতি! তোমাদের সেই প্রভুর প্রতি পূর্ণ দাসত্ব ও উপাসনা করো, যিনি তোমাদেরকে এবং তোমাদের আগে যারা ছিল তাদের সবাইকে সৃষ্টি করেছেন, যাতে করে তোমরা তাঁর প্রতি সবসময় পূর্ণ সচেতন থাকতে পারো। [বাকারাহ ২১]
বেশিরভাগ অনুবাদে উ’বুদুকে ٱعْبُدُوا۟ ‘ই’বাদত করো’ বা ‘উপাসনা করো’ অনুবাদ করা হয়, যা মোটেও উ’বুদুর প্রকৃত অর্থকে প্রকাশ করে না। উ’বুদু এসেছে আবাদা عبد থেকে যার অর্থ দাসত্ব করা। আমরা শুধুই আল্লাহর ﷻ উপাসনা করি না, আমরা আল্লাহর ﷻ দাসত্ব করি।
ইবাদত= পূর্ন দাসত্ব , আব্‌দ = দাস ( যেমন, আব্দুর রাহমান= আল্লাহর দাস)
পুরো কু'রান এর সারমর্ম কিন্তু এই এক লাইন- আল্লাহর দাসত্ব কর !!!
উপাসনা আর দাসত্ব এক জিনিস নয়। উপাসনা আসলে দাসত্বের একটি অংশ। যেমন- লাল হচ্ছে একটি রঙ, কিন্তু সব রঙ লাল নয়। শুধু লাল দিয়ে আপনি সব রঙ কখনোই বুঝাতে পারবেন না।
আল্লাহর উপাসনা করি- শুধু এই চেতনা নিয়ে কখনোই আপনি আল্লাহর ইবাদত( দাসত্ব) করতে পারবেন না। নামায পড়ে ফেললেন, তারমানে এই না এখন আপনি অন্যায়, হারাম কাজ করার জন্য লাইসেন্স পেয়ে গেলেন, এখন আপনি মনের আনন্দে যা ইচ্ছা তাই করবেন, কারন আপনি তো আল্লাহর জন্য নামাজ পড়েই ফেলেছেন, এখন খালি ফুর্তি । আপনাকে প্রতি সেকেন্ডে খেয়াল রাখতে হবে যে, আল্লাহ খুব কাছে থেকে আপনার দিকে তাকিয়ে আছেন, আপনার প্রতি কাজ, চিন্তা, কল্পনা স্ক্যান করা হচ্ছে, রেকর্ড করা হচ্ছে। আপনি আল্লাহকে না দেখেও তাঁকে ভয় করবেন, তাঁর আদেশ-গুলো মেনে চলবেন, তাঁর কোটি কোটি নিয়ামতের কথা ভেবে কৃতজ্ঞ হবেন, তাঁর পুরস্কার গুলোর কথা ভেবে আনন্দিত হবেন।
" সকল দাস-ই উপাসনা করে, কিন্তু সকল উপাসক দাসত্ব করতে পারেনা"
উপাসনা= Worship, দাসত্ব= Slavery
আপনার যদি নিজেকে আল্লাহর চাকর হিসেবে চিন্তা করতে খুব কষ্ট হয় তাহলে এটাও চিন্তা করে দেখবেন যে, আপনি আসলে একটা (চাকর+ই) চাকরী করছেন আপনার অফিসে। আপনি সেখানে কাজ করেন, বিনিময়ে আপনাকে কিছু টাকা দেয়, আপনি খাবার কিনে খেয়ে বেচে থাকেন। আপনি সেখানে নিয়মিত না গেলে আপনাকে সেখান থেকে স্যাক করে দিবে। কোন খাতির নেই।
আপনি মিনিটে ৬ লিটার অক্সিজেন নিচ্ছেন নাক দিয়ে। এটা আপনার অফিস আপনাকে দেয় না। আল্লাহ দিচ্ছেন। ফ্রী, কোন টাকা লাগে না। আল্লাহ আপনাকে আজকে ঘুম থেকে উঠিয়ে এখনো বাচিয়ে রেখেছেন। পেপার খুলে দেখেন কালকে কয়জন মারা গেছেন। আল্লাহ আপনাকে এখনো সুযোগ দিচ্ছেন। আল্লাহকে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর অস্বীকার ও অমান্য করার পর-ও আল্লাহ আমাদের কিছু বলছেন না। আমাদেরকে তিনি খাবার, পানি, টাকা, শিক্ষা, আনন্দ, দিয়েই যাচ্ছেন, দিয়েই যাচ্ছেন। আমাদের অকৃতজ্ঞতা সহ্য করেই যাচ্ছেন, করেই যাচ্ছেন।
তাহলে আপনি কার দাস হবেন চিন্তা করে দেখেছেন ???
ঈমানের অনেক লেভেল আছে। এর অনেক গভীরে যাওয়া যায়। আপনি কি বলতে পারবেন মুহাম্মদ (স) যেভাবে আল্লাহকে ফীল করতেন, আপনি সেই একিভাবে আল্লাহকে ফীল করেন ??!
বেশিরভাগ মুসলিম আল্লাহর শুধুমাত্র উপাসনা করে, তাও কোনভাবে ফাকিঝুকি দিয়ে। ৫ ওয়াক্ত নামাজ ফরয , সেটা পড়লেই হয়ে গেল, এমন একটা চিন্তা নিয়ে ঘুরে তারা।
- সূর্য উঠে সাড়ে ৬টায়, কোনরকমে ৬টা ২০ এ উঠে ৪ রাকাত "পশ্চিম দিকে আছাড় খেয়ে" আবার লেপের তলায় শুয়ে পড়ে ভাবা- "ইয়েস ! নামাজ পড়েছি !" অথচ আপনার মাসজিদে যাওয়ার কথা ছিল।
- জুমার নামাজে কোনমতে রাস্তার উপর যায়নামাজ বিছিয়ে ২ রাকাত নামাজ পড়ে আবার বাসায় এসে ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়া- Prayed Jummah, Alhamdulillah !.
আসুন দেখিয়ে দেই কিভাবে আজকের দিনের মুসলিমরা এখনো আল্লাহর উপাসনা করলেও দাসত্ব করতে পারেনা-
[] খুব ধার্মিক, সব নামাজ মসজিদে গিয়ে পড়েন, প্রচুর দান করেন, এলাকায় সবাই সম্মান করে। কিন্তু ব্যাঙ্ক থেকে সুদ নেন।
[] খুব ধার্মিক, মানুষকে দেখলেই ইসলামের দাওয়াত দেন, কিন্তু ফকির দেখলে মুখ কালো করে ফেলেন। সিগন্যাল এ গাড়ি থামলে জানালায় একটা ভিক্ষুক এলে না দেখার ভান করেন, বা দিলেও ছিড়া ২ টাকার নোটটা দেন।
[] মোটামুটি নামাজ পড়েন। নামাজ শুরু হলেই প্যান্টটা গুটিয়ে গোড়ালির উপর তুলে ফেলেন। নামাজ শেষ করে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে তা নামিয়ে ফেলেন। কারন এইভাবে সমাজে ঘুরা যাবে না। লোকে কি বলবে !!
[] বন্ধুরা মিলে জুম্মার নামাজ পড়লেন (সবার পিছনে, দুই রাকাত) | তারপর মোড়ের দোকান থেকে কয়েকটা বেনসন সিগারেট কিনে শুরু করলেন রাজনীতি, চাকরি, খেলা, সিনেমার নায়িকা নিয়ে চরম আড্ডা।
[] নামায-রোজা সব-ই করেন, সাথে বাচ্চার জন্মদিনের উদযাপন, পহেলা বৈশাখ, ভ্যালেন্টাইন ডে, নানারকম এনিভার্সারী, মেরি ক্রিসমাস, গায়ে হলুদ, বউ-ভাত ইত্যাদি হেন কোন প্রোগ্রাম নাই যেটাতে তাকে পাওয়া যায় না। দেশের সংস্কৃতি তার কাছে অত্যন্ত গুরুত্তপূর্ন।
[] প্রচুর ধর্ম কর্ম করেন, তাবলীগ-চিল্লায় বহু সময় লাগান। কিন্তু বাসায় স্ত্রী-পুত্র- কন্যাদের কোন সময়-ই দেন না। ভাল করে জানেনও না কে কোন ক্লাসে পড়ে।
[] নামায পড়বেন, কিন্তু মাসজিদে যাওয়াটাকে খুন একটা গুরুত্ত দিবেন না। মনে করেন, নামায বাসায় পড়ে নিলেই হল।
[] মাথায় কাপড় দেন, কিন্তু পরিস্থিতি বুঝে, যায়গা বুঝে, সময় বুঝে। বাসায় টুকটাক নামাজ রোজা করেন, কিন্তু বিয়ের প্রোগ্রামে যাবেন দামি ফিনফিনে অর্ধ-স্বচ্ছ শাড়ী পরে।
[] আমাদের দেশের চ্যানেলগুলোতে সংবাদ পাঠিকা দের দেখবেন রমজানে মাথায় একটা আধা-ঘোমটা থাকে, ঠিক ঈদের চাঁদ দেখা গেলেই তা নেমে যায়।
[] সৌদি আরবে গেলে বোরখা পরেন, কিন্তু প্লেন এয়ারপোর্ট ছাড়ার সাথে সাথে আবার ঐ বর্বর প্রাচীন বোরখা খুলে আধুনিক কোন পোশাক পরে নেন।
মুখে বলেন হিজাব করি, কিন্তু আসলে পরেন একটা অত্যন্ত রংচঙ্গে খীমার( যেটা দিয়ে মাথা ঢাকা হয়) | আর নিচে থাকে "লেগিংস" নামে স্কিন-টাইট সুইমসুটের মতন কোন জিনিস।
আমি যতগুলো উদাহরন দিলাম, এরা একজন-ও আল্লাহর দাসত্ব করতে পারেনা। এরা শুধুমাত্র আল্লাহর উপাসনা করে, অর্থাৎ ধর্মীয় রীতি গুলো পালন করে। "মানুষ কি মনে করবে"- এটা এদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু ইসলামে কি বলা আছে বা আল্লাহ কি মনে করবেন এটা নিয়ে এরা অতটা মাথা ঘামায় না।
আমরা কেন পূর্ন দাস হতে পারিনা জানেন?
কারন, ইসলাম নিয়ে আমরা প্রচুর প্রশ্ন তুলি। যেটা আমাদের ভাল লাগে না, বা যেটায় কষ্ট বেশি, সেটাকে আমরা নিজেদের পছন্দ মতন মডিফাই করে ফেলি। আমরা ইসলাম মানব কিন্তু দাড়ি রাখবনা, কারন আমাদের ভাল লাগেনা, খ্যাত লাগে। আমরা ইসলাম মানব কিন্তু নিয়ম মতন হিজাব করব না, কারন তাহলে সুন্দর সুন্দর জামা পরে ঘুরা যাবেনা।
আসুন একটু পেছন দিকে ফিরে তাকাই-
ইবরাহীম (আ) কে আল্লাহ বলেছিলেন- তোমার একমাত্র বাচ্চা আর স্ত্রী কে জনমানবহীন মরুভূমিতে ফেলে দিয়ে আস। উত্তরে তিনি কিন্তু বলেন নাই- আল্লাহ, আমি ইসলামের সব ভালবাসি, একমাত্র এই নিয়মটি ছাড়া।
আল্লাহ তাকে বলেছিলেন- তোমার ছেলেকে আমার জন্য কুরবানী কর তো ।
তিনি কিন্তু বলেন নাই- আল্লাহ ! এই নিয়মটি বাদে ইসলাম একদম পারফেক্ট।আমার ছেলেটাকে কি জবাই না দিলেই নয় !!?
তিনি সানন্দে তা করেছিলেন । সানন্দে।
SLAVE! SLAVERY !
আপনি পারবেন ? নিজেকে জিজ্ঞেশ করুন।
আমাদের প্রশ্ন করার কোন সুযোগ নেই। এটাই দাসত্ব।
একজন দাস কে কখনই বলে দিতে হবে না যে নামাযের সময় হয়েছে। আযান হবে, ঠিক সে মাসজিদে চলে যাবে। সেটা ভোর ৬টা হোক আর রাত ৮টা হোক। সে যাবেই। একজন আল্লাহর দাসকে বলে দিতে হবে না- সিগারেট খেও না, এটা হারাম। সে খুব ভাল করেই এটার থেকে দূরে থাকবে। একজন আল্লাহর দাস কে কখনোই বলে দিতে হবে না- এই টাইট জামাটা পোরনা, এই মেকাপ গুলো লাগিওনা। সে নিজে থেকেই তাকে এমন করে ঢেকে রাখবে যে কোন পুরুষ চাইলেও তাকে দেখে আনন্দ মিটাতে পারবেনা।
আপনি ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করে দেখেন, প্রতিদিন ৫ বার করে সপ্তাহে ৩৫ বার আল্লাহ আমাদের ডাকেন মাসজিদে। গত সপ্তাহে ৩৫ বারের মধ্যে আপনি কতবার গিয়েছেন তার ডাকে সাড়া দিতে?
হাস্যকর ব্যাপার কি, আমরা কিছু করি আর না করি, আমরা চাওয়ার বেলায় চাই জান্নাতুল ফেরদৌস, সর্বোচ্চ জান্নাত। যেখানে মুহাম্মদ(স) থাকবেন, অন্যান্য নবীরা থাকবেন, সেখানে তাদের সাথে আমাদের থাকার কথা চাওয়ার আগে আপনি চিন্তা করে দেখেন রাস্তার ফকির যদি ওবামাকে চিঠি লিখে যে- আমি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হতে চাই !- সেটা কেমন শুনাবে।
আমরা কি আদৌ কোন চেষ্টা করি ???
আল্লাহর পূর্ন দাস হতে হলে আমাদেরকে আমাদের মিথ্যা "প্রভু" গুলোকে বাদ দিতে হবে। আমাদের চিন্তাকে আরো পরিশোধিত করতে হবে। না, মুসলমানরা সরাসরি কোন মূর্তি পূজা করে না, কিন্তু তারা যেটা করে সেটা আরো বিপজ্জনক। তারা অদৃশ্য সব জিনিসকে সেই সময়গুলো দিয়ে দেয়, যেটা তাদের আল্লাহকে দেবার কথা ছিল।
দেখে নিন-
[] ভালবাসার মানুষকে মানুষ বলে- তুমি তো আমার জীবন। আমার জীবন মরন সব-ই তো তোমার জন্য।
[] বাবা মা সন্তানকে বলে- বাবা, আমাদের জীবনে আর কে আছে তুমি ছাড়া ?
[] চাকরির জন্য- এই চাকরিটা আমার জীবন-জীবিকা ভাই। এটা গেলে আমি শেষ।
একটা ভাল চাকরি, টাকা, বাড়ী, গাড়ি, বড়ো ডিগ্রী, ভালবাসা, ক্ষমতা, সামাজিক মর্যাদা, বিদেশে সুখের একটা জীবনে জন্য আমরা আমাদের ধর্মকে বিক্রি করে দিচ্ছি। আমরা কেন বারবার ভুলে যাই যে একদিন আমরা উলঙ্গ হয়ে মায়ের পেট থেকে অসহায় হয়ে বের হয়েছিলাম, আবার একদিন আমাদেরকে উলঙ্গ অসহায় করে সস্তা সাদা কাপড়ে পেচিয়ে আমাদের আত্মীয়রা একটা গর্তে পুতে রেখে চলে আসবে আর এক সপ্তাহ পর ভুলে যাবে।
সেই অন্ধকার একাকী জীবনটার জন্য কি আমরা কিছু নিয়ে যাচ্ছি পৃথিবী থেকে ?
" হে আল্লাহ ! আপনি আমার সৃষ্টিকর্তা। আমি তো আপনার কাছ থেকেই এসেছি, আমি তো আপনার কাছেই ফেরত যাব। আমাকে পার্থিব জীবনের মোহ থেকে মুক্তি দিন। আমাকে সাহায্য করুন। আমাকে যে উদ্দেশ্যে পাঠিয়েছেন তা করার মতন শক্তি ও বুদ্ধি দান করুন। আমাকে সরল পথ দেখান। আমি একমাত্র আপনার-ই পরিপূর্ন দাসত্ব করি। আমি একমাত্র আপনার কাছেই আত্মসমর্পন করলাম। আমার জীবন, আমার অস্তিত্ত, আমার মৃত্যু, সব-ই একমাত্র আপনার জন্য। আমার তো অস্তিত্ব ছিল না। আপনি-ই অসীম করুনায় আমাকে গভীর যত্নে সৃষ্টি করেছেন।আমাকে সাহায্য করুন হে আমার মালিক। যাতে কবরের অন্ধকার দিনগুলোতে আমি আপনার দয়া পেতে পারি। আমি জানি আমি আমার সর্বশক্তি দিয়েও সেই জীবন টা কল্পনা করতে পারবনা, আমাকে আপনি সেই ক্ষমতা দেন নাই, এটা আমি জানি। আপনি আমাকে দয়া ও করুনা করুন। আমীন"