Monday, August 31, 2020

সুরা তাকাসুর অনেক ভাবায় চিন্তাশীলদের

সুরা তাকাসুর অনেক ভাবায় চিন্তাশীলদের

 কুরআন মাজিদের যেই সূরাটি আমাকে সবচেয়ে বেশি ভাবায় এবং দুনিয়া বিমুখ হতে সবসময় সাহায্য করে তা হলো সূরাতুল তাকাসুর। এই সূরাটির মাধ্যমেই বুঝা যায় আল্লাহ তার বান্দাদের সম্পর্কে কত ভালোভাবেই না জানেন! যতবার'ই পড়ি আল্লাহর ভয়ে বুক কেঁপে উঠে।আল্লাহু আকবার। আজকে এই সূরার (১,২,৩,৫,৮)আয়াতসমূহের ভাবার্থতা ও গভীরতা মুফাসেরগণ,শায়েখ ও হাদিস এর আলোকে তুলে ধরার চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ।ওয়ামা তৌফিকী ইল্লা বিল্লাহ।


আল্লাহ সুবহানাহুওয়াতা'লা বলেন -


★‌"অধিক (পার্থিব) সুখ সম্ভোগ লাভের মোহ/প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদেরকে (অধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে) ভুলিয়ে রেখেছে।"[১]


ব্যাখ্যাঃ দুনিয়ার ধন-সম্পদ, পুত্র-পরিবার, বংশ, সম্মান-মর্যাদা, শক্তি ও কর্তৃত্বের উপকরণ এবং যে সব বিষয়ে এরূপ প্রতিযোগিতা হয় তার সবই উদ্দেশ্য। [সা’দী]

প্রাচুর্যের জন্য মানুষ সাধারণত চেষ্টা করে থাকে এবং অহংকার করে থাকে। হতে পারে সেটা ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্ততি, সাহায্য-সহযোগিতাকারী, সৈন্য-সামন্ত, দাস-দাসী, মান-মর্যাদা ইত্যাদি যা-ই মানুষ বেশী পেতে চায় এবং অপরের উপর প্রাধান্য নেয়ার চেষ্টা করে। আর যা দ্বারা আল্লাহ্র সন্তুষ্টি উদ্দেশ্য থাকেনা। [সা‘দী] এভাবে মানুষ আল্লাহ্ থেকে, তাঁর মা‘রিফাত থেকে, তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন থেকে, তাঁর ভালবাসাকে সবকিছুর ভালবাসার উপর স্থান দেয়া থেকে, যার ইবাদতের জন্য তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে সেটা থেকে গাফেল হয়ে গেছে। [সা‘দী] অনুরূপভাবে তারা আখেরাত থেকে গাফেল হয়ে গেছে। [বাদায়ে‘উস তাফসীর]

.

.

★‌"এমনকি (এ অবস্থাতেই) তোমরা কবরে এসে পড়।"[২]


ব্যাখ্যা:আবদুল্লাহ ইবনে শিখখীর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, আমি একদিন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট পৌছে দেখলাম তিনি الْهٰكُمُ التَّكَاثُرُ তেলাওয়াত করে বলছিলেন, “মানুষ বলে, আমার ধন! আমার ধন! অথচ তোমার অংশ তো ততটুকুই যতটুকু তুমি খেয়ে শেষ করে ফেল, অথবা পরিধান করে ছিন্ন করে দাও, অথবা সদকা করে সম্মুখে পাঠিয়ে দাও। এছাড়া যা আছে, তা তোমার হাত থেকে চলে যাবে- তুমি অপরের জন্যে তা ছেড়ে যাবে।” [মুসলিম: ২৯৫৮, তিরমিয়ী: ২৩৪২]


অন্য হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “আদম সন্তানের যদি স্বর্ণে পরিপূর্ণ একটি উপত্যকা থাকে, তবে সে (তাতেই সন্তুষ্ট হবে না; বরং) দুটি উপত্যকা কামনা করবে। তার মুখ তো (কবরের) মাটি ব্যতীত অন্য কিছু দ্বারা ভর্তি করা সম্ভব নয়। [বুখারী-৬৪৩৯,৬৪৪০]


আরেক হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “আমি তোমাদের জন্য দারিদ্রতার ভয় করছিনা। বরং তোমাদের জন্য প্রাচুর্যের ভয় করছি। অনুরূপভাবে আমি তোমাদের জন্যে ভুল-ভ্ৰান্তি হয়ে যাওয়ার ব্যাপারে ভয় করছি না, বরং ভয় করছি ইচ্ছাকৃত অন্যায়ের ” [মুসনাদে আহমাদ; ২/৩০৮]


★‌"(তোমরা যে ভুল ধারণায় ডুবে আছো তা) মোটেই ঠিক নয়, শীঘ্রই তোমরা জানতে পারবে,"[৩]


ব্যাখ্যাঃ তোমরা ভুল ধারণার শিকার হয়েছ। বৈষয়িক সম্পদের এ প্রাচুর্য এবং এর মধ্যে পরস্পর থেকে অগ্রবর্তী হয়ে যাওয়াকেই তোমরা উন্নতি ও সাফল্য মনে করে নিয়েছো। অথচ এটা মোটেই উন্নতি ও সাফল্য নয়। অবশ্যই অতি শীঘ্রই তোমরা এর অশুভ পরিণতি জানতে পারবে। [ইবন কাসীর, আদ্ওয়াউল বায়ান]


★‌"কখনো নয়! যদি তোমরা নিশ্চিত জ্ঞানে জ্ঞানী হতে"[৫]


ব্যাখ্যাঃ কেয়ামতের হিসাব-নিকাশে তোমরা যদি নিশ্চিত বিশ্বাসী হতে, তবে কখনও প্রাচুর্যের বড়াই করতে না এবং উদাসীন হতে না বরং সাবধান হয়ে যেতে। [সা‘দী]


★‌"তারপর তোমাদেরকে অবশ্য অবশ্যই নিয়ামা'ত সম্পর্কে সেদিন জিজ্ঞেস করা হবে।"[৮]


ব্যাখ্যাঃ তোমরা সবাই কেয়ামতের দিন আল্লাহ্-প্রদত্ত নেয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। যে, সেগুলোর শোকর আদায় করেছ কি না, সেগুলোতে আল্লাহর হক আদায় করেছ কি না; নাকি পাপ কাজে ব্যয় করেছ?এতে সকল প্রকার নেয়ামত এসে যায়।[সা‘দী]


“কান, চোখ, হৃদয়- এদের প্রত্যেকটি সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব করা হবে।” [সূরা আল-ইসরা: ৩৬] এতে মানুষের শ্রবণশক্তি দৃষ্টিশক্তি ও হৃদয় সম্পর্কিত লাখো নেয়ামত অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়, যেগুলো সে প্রতি মুহুর্তে ব্যবহার করে।


বিভিন্ন হাদীসেও নেয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হওয়ার কথা স্পষ্টভাবে এসেছে। যেমন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “দু’টি নেয়ামত এমন আছে যাতে অধিকাংশ মানুষই ঠক খায়। তার একটি হলো, স্বাস্থ্য অপরটি হচ্ছে অবসর সময়।” [বুখারী: ৬৪১২]


পরিশেষে,আমার প্রিয় ভাই ও বোনেরা উপরোক্ত আয়াতসমূহের দ্বারা সুস্পষ্ট ভাবেই বোঝা যায় যে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতালার আমাদেরকে কতই না ভালবাসেন।আমরা যাতে দুনিয়াবি মোহে নিজের আখিরাতকে বরবাদ করে জাহান্নামের টিকেট না কিনে ফেলি তাই মহান রাব্বুল আলামিন পরম করুণাময় আমাদের আগে থেকেই সাবধান করে দিয়েছেন।আমরা আর কবে বুঝবো!এখনো কী আমাদের রবের দিকে ফিরে আসার সময় হয় নাই?

Wednesday, March 23, 2016

পিতার বয়স ৫০ ছেলের বয়স ১০০ সুরা বাকারা ২৫৯

পিতার বয়স ৫০ ছেলের বয়স ১০০ সুরা বাকারা ২৫৯
সুরা বাকারা,আয়াত# ২৫৯,( পিতার বয়স ৫০,ছেলের বয়স ১০০)
“অথবা এমন ব্যক্তির(প্রতি লক্ষ্য করনি) যে এক জনপদ(১) দিয়ে অতিক্রম করেছিল যা এমনই বিধ্বস্ত হয়েছিল যে,এর ছাদ সমুহের উপর ভেঙ্গে পড়েছিল,(তা দেখে) সে বলল, ‘আল্লাহ এর(এদের) ইন্তেকালের পর একে(এদেরকে) কিরুপে জীবিত করবেন’? অতপর আল্লাহ তাকে(ইন্তেকাল দান করলেন এবং ) শত বছর পর্যন্ত মৃত রাখলেন;পরে তাকে পুরুথথান করে বললেন, ‘তুমি কতকাল অবস্থান করেছ’? সে বলল, ‘একদিন বা একদিনের কিয়দংশ’।তিনি বললেন,’বরং তুমি শত বছর অবস্থান করেছ’......”

তাফসীরঃ (১)
তাফসীরকারকদের মধ্যে এ বিষয়ে মতভেদ আছে যে, সে জনপদটি কোনটি এবং সেই ব্যক্তি কে ছিলেন। অনেকের মতে তিনি হযরত উযায়ের(আঃ) ছিলেন এবং জনপদটি বায়তুল মোকাদ্দাসের নিকটবর্তী বা সঙ্গলগ্ন ছিল। এক ভুমিকম্প তাদের ঘরগুলোকে ধ্বংশ করে দিল, আর তাদের লাশ গুলো পশুরা খেয়ে ফেললো। হযরত উযায়ের(আঃ) ঘটনাক্রমে ঐ স্থান দিয়ে যাচ্ছিলেন এবং এ দৃশ্য দেখে বিস্ময়ে বলে উঠলেন,
‘আল্লাহ এদেরকে ইন্তেকালের পর কিভাবে জীবিত করবেন?’ তখন আল্লাহ তাঁর রুহ কবজ করেলেন এবং শত বছরব্যাপী তাকে মৃত রাখলেন এবং তাঁর দুশসহ অন্যান্য খাদ্য যা তাঁর সঙ্গে ছিল তা মোটেই নষ্ট হল না;তার দেহকে কীট-পতঙ্গের আক্রমন থেকে রক্ষা করলেন লোকজনের চোহের আড়ালে রাখলেন। যখন তিনি আবার জীবিত হলেন এবং তাঁর গাধাও জীবিত হল তখন বায়তুল মোকাদ্দাসে নতুন লোকবসতি গড়ে উঠেছে!

যখন তিনি বাড়ি ফিরে আসলেন তখন তাঁর পৌত্রদের বৃদ্ব অবস্থায় পেলেন, কিন্তু তিনি (হযরত উযায়ের আঃ) যুবক ছিলেন। কেউ তাঁর এ ব্যাপার বিশ্বাস করছিলেন না। এমতাবস্থায় তিনি তাঁর রেখে যাওয়া ২০ বছরের দাসী-যার বর্তমান বয়স ১২০ এবং সে অন্দ্ব হয়ে গিয়েছিল,তাকে দোয়া করে দৃষ্টি দান করলেন এবং নিজ ছেলে যাকে মায়ের পেটে থাকাবস্থায় ছেড়ে গিয়েছিলেন তাকে নিজের শনাক্তকারী চিনহ কাধের তিল যা খুবই দর্শনীয় ছিল তা দেখালেন। তখন মানুষের বিশ্বাস হল যে, তিনিই উযায়ের। আল্লাহর কত মহিমা যে,তার বয়স ৫০ বছর, আর তাঁর ছেলের বয়স ১০০ বছর।এজন্যই আল্লাহ বললেন, ‘আমি তোমাকে নিদর্শন করলাম(আমার ক্ষমতার নমুনা বানালাম)’।

কোন কোন মুফাসসীর বলেছেন,হযরত উযায়ের এর প্রতি বিস্ময় প্রকাশ করেছেন যে,’এমন ধ্বংশ প্রাপ্ত বস্তিও কিভাবে আবার বসবাসযোগ্য হতে পারে?’ কিন্তু এ মত সঠিক নয়। কারন আল্লাহ একদিকে স্বয়ং তাকে ১০০ বছর মৃত অবস্থায় রাখার পর জীবিত করেছেন, আবার তাকে তাঁর মৃত গাধা জীবিত করার প্রক্রিয়াও প্রত্যক্ষ করিয়েছেন যা পুনরুথানের প্রক্রিয়া সম্পর্কে তাকে অবহিত করার উদ্দেশ্যেকেই প্রমান করে। তদুপরি ধ্বংশ প্রাপ্ত বসতি বসবাসযোগ্য হওয়া ও তাতে নতুন বসতি স্থাপিত হওয়া আশ্চর্য কোন বিষয় নয়। আয়াতটি মহান আল্লাহ পাক যে কত উচ্চতর কোন উদ্দেশ্যে পৃথিবীতে মৃত মানুষদের পুনরুজ্জীবিত করতে পারেন,তারও সাক্ষ্য বহন করে।