Saturday, October 3, 2015

নিজের হাতে নিজেকে ধ্বংস করো না

নিজের হাতে নিজেকে ধ্বংস করো না
মানুষ একটি অদ্ভূত প্রানী। খারাপ কাজের পরিনতি  খুব ভাল করে জানার পরও  ইচ্ছা করে সে নিজেই নিজের ক্ষতি করে। সে জানে কাজটা খারাপ, তারপরো সে সেটা থেকে বের হতে পারেনা। অগনিত সৃষ্টির মধ্যে একমাত্র মানুষকেই দেওয়া হয়েছে সবচেয়ে বেশি বুদ্ধিমত্তা, তারপরও দেখা যায় অধিকাংশ মানুষ তার বুদ্ধি ব্যবহার করেনা, চিন্তা করেনা। জন্তু-জানোয়ারের মতন নিজের প্রবৃত্তির দাস হয়ে থাকে আজীবন।
অসীম দয়ালু আল্লাহ্‌ আমাদেরকে যা যা করতে মানা করেছেন, তার প্রত্যেকটা  শুধুই আমাদের ভালর জন্য। সত্যি বলতে কি, শুনতে যতই খারাপ লাগুক, কিন্তু এটা বাস্তবতা যে, হালাল-হারাম শব্দগুলোকে এখন আর আমরা পাত্তা দেইনা। পাত্তা না দিতে দিতে এখন কোনটা যে হালাল আর কোনটা যে হারাম সেটাও আমরা এখন আর পরিষ্কারভাবে বুঝিনা। যেটা আমাদের ভাল লাগে সেটা আমরা করি, যেটা লাগেনা সেটা করিনা। মানুষের স্বভাবই হচ্ছে যেসব কাজ করতে আমাদের ভাল লাগে সেগুলোর পক্ষে যুক্তি খুজে বের করা ও সেগুলোর বিপক্ষের যুক্তি এড়িয়ে চলা।
এই আর্টিকেলটির বিষয় “সিগারেট” । এটা  এমন একটি অপরাধ যা আমাদের সামাজিক জীবনে ডাল-ভাতের মতই সহজ ব্যাপার । গলিতে গলিতে সিগারেট, মোড়ে মোড়ে সিগারেট। কিশোর যুবক বৃদ্ধ সবার হাতে হাতে সিগারেট।  এটা এতই ভয়ানক একটি ব্যাধি হয়ে গিয়েছে এখন যে, আমাদের মধ্যে এমন একজনও নেই যে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সিগারেট থেকে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে না। আপনি কি এমন কোন মুসলিমকে চেনেন যে প্রায়ই শূকরের মাংস দিয়ে ভাত খায়? না, আপনি চিনেন না। আমিও চিনিনা। যদিও ঢাকায় এটা পাওয়া যায়। কিন্তু আপনি কি এমন কোন মুসলিমকে চিনেন, যে নিয়মিত সিগারেট খায় ? আপনি নিশ্চয়ই  উত্তরটা জানেন ।
এই আর্টিকেল এ যে বিষয়গুলো দেখানো হয়েছে –
  •  কুর’আনে আল্লাহ কি বলেছেন
  • সেখান থেকে স্কলাররা কি সিদ্ধান্তে এসেছেন
  • আধুনিক বিজ্ঞান গবেষনা করে কি কি তথ্য বের করেছে
  • মানুষ কি কি কারনে সিগারেট খাওয়া শুরু করে তারপর সেটা আর ছাড়তে পারেনা।
  • সিগারেট কিভাবে শরীরের মাথা থেকে পা পর্যন্ত প্রতিটা অংশের ক্ষতি করে।

[] সিগারেট কি  হালাল নাকি হারাম নাকি মাকরুহ ?

চিকিৎসাবিজ্ঞানের একজন প্রফেসর বলেছিলেন- Smokers are the most notorious liars ।  পৃথিবীর সব স্মোকার-রাই অগনিত অজুহাত দিতে জানে। তার কয়েকটি এরকম-
– আরে আমি তো মাঝে মাঝে খাই। আমার সেলফ-কন্ট্রোল খুবই ভাল। এইতো পুরো ৩ মাস না খেয়ে থাকলাম। আমার ক্ষেত্রে এটা নেশা না, এটা বদ অভ্যাস। নেশা করা হারাম, এটা আমিও জানি। কিন্তু আমার যেহেতু নেশা হয়না,  তাই আমার ক্ষেত্রে এটা “অতটা হারাম” না। ( এই ধরনের মানুষেরা সেলফ-কনভিনসিং এর চরম পর্যায়ে চলে গেছেন।)
– সিগারেট ছাড়া কোন ব্যাপার নাকি ? আমি তো ২০ বার ছাড়লাম এখন পর্যন্ত ( অট্টহাসি) ।
– কমিয়ে দিচ্ছি ভাই। এই তো, সামনেই ছেড়ে দিব। ( এই একই কথা এরা ১০ বছর ধরে বলে যাচ্ছে )
– আমি যতটুকু সিগারেট খাই, তাতে আমার শরীরের তেমন কোন ক্ষতি হয়না।  (মানব শরীরের উপর সিগারেটের ক্ষতি সম্পর্কে তাদের বিন্দুমাত্র জ্ঞান নাই। শরীরের ভেতর কি কি ঘটনা ঘটে সেটাও এরা জানেনা।  )
– হায়াত মউত আল্লাহর হাতে ভাই। আর বাঁচবই বা কয়দিন বলেন? এত হিসাব করে কি হবে? নন-স্মোকাররা মরে না? প্রতিদিন রাস্তাঘাটে কি পরিমান ধোয়া খাচ্ছি দেখেন না? সেটা কি সিগারেটের চেয়ে কম খারাপ?  (এদের সাথে কথা বলে সময় নষ্ট করবেন না একদম।  )
– (হঠাৎ রেগে উঠে) আপনার বাপের টাকায় সিগারেট খাই নাকি আমি ? আমার শরীর নিয়ে আমি যা ইচ্ছা তাই করব। যান নিজের রাস্তা মাপেন।
কুর’আনে  খাবারের বিধি-নিষেধ বিষয়ে কয়েকটা আয়াতে আল্লাহ বলেছেন-
“তারা তোমাকে( মুহাম্মাদ সাঃ) জিজ্ঞেস করে তাদের জন্য কি কি হালাল করা হয়েছে। তুমি বল- ‘ তোমাদের জন্য হালাল করা হয়েছে সকল তায়্যিবাত। …” (কুর’আন ৫ঃ৪)
“আজকের দিনে সকল তায়্যিবাত-কে হালাল করা হল। …” (কুর’আন ৫ঃ৫ )
“তিনি(মুহাম্মাদ সঃ) তাদের নির্দেশ দেন সৎকর্মের এবং নিষেধ করেন অসৎকর্ম থেকে। তাদের জন্য যাবতীয় তায়্যিবাত কে হালাল ঘোষনা করেন ও নিষিদ্ধ করেন হারাম বস্তুসমূহ….।”  (৭ঃ১৫৭)
সবগুলো আয়াতে আল্লাহ একটাই শব্দ বলেছেন- তায়্যিবাত। তায়্যিবা মানে “ভাল ও পবিত্র” । কাজেই সোজা কথা হচ্ছে, যে খাবার আমাদের জন্য ভাল না, পবিত্র না, আমাদের ক্ষতি করে, সেটা অবশ্যই আমাদের জন্য নিষিদ্ধ।
আল্লাহ্‌ আরো বলেছেন-
সূরা বাকারা। আয়াত ১৯৫(আংশিক)-
“Do not make your OWN hands the cause of your OWN destruction…” ( ২ঃ১৯৫)
” তোমরা নিজেদের হাত দিয়ে নিজেদেরকে ধ্বংস কোরনা…”
সূরা নিসা। আয়াত ২৯ (আংশিক)-
“And Do not Kill Yourselves (Nor kill one another)” (৪ঃ২৯)
” আর নিজেদেরকে হত্যা কোরনা…”
কাজেই যদি বৈজ্ঞানিক তথ্য ও যুক্তি দিয়ে দেখান যায় যে –
– সিগারেট কোন “তায়্যিব” খাবার নয়। এটা ভাল বা পবিত্র কোনটাই নয়।
– এটার ভাল দিক ০%। খারাপ দিক ১০০%।
– সিগারেট খাওয়া আর নিজের শরীরকে ধ্বংস করার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই।
তাহলে নিশ্চয়ই আপনি সিগারেট সংক্রান্ত হারাম-হালালের কনফিউশান থেকে বের হয়ে আসবেন ।
সিগারেট খাওয়া নিয়ে বর্তমানকালের সবচেয়ে গ্রহনযোগ্য ইসলামিক আইন হল-
কমপক্ষে ৪০০ জন স্কলার একমত হয়েছেন যে সিগারেট ও সকল তামাকজাত দ্রব্য ( জর্দা, গুল, ইত্যাদি) হচ্ছে হারাম, পরিমান যত কমই হোক না কেন।  আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্নতির কারনে মানুষ সিগারেটের ক্ষতিকর দিকগুলো এখন জানতে পেরেছে  যা কয়েকশ বছর আগে স্কলাররা জানতেন না। সেকারনে একটা সময়ে এটা হারাম নাকি হালাল সেটা নিয়ে দ্বিমত ও দ্বিধাদ্বন্দ  থাকলেও এখন বৈজ্ঞানিক প্রমানের মাধ্যমে সন্দেহতীতভাবে প্রমানিত হয়েছে যে সিগারেট একটি স্লো-পয়জনিং ছাড়া আর কিছুই নয়। সিগারেট মানুষের শরীরকে ধীরে ধীরে ধ্বংস ছাড়া আর কিছুই করে না। যে সিগারেট খাচ্ছে, সিগারেট শুধু তার-ই ক্ষতি করে না, সিগারেট ক্ষতি করে আশেপাশের সবার। কাজেই আপনি  নিশ্চিত থাকতে পারেন এটি একটি নেশা, এবং এটি হারাম। রক্ত, শূকর, মদ যেমন হারাম, ঠিক একই রকম হারাম। হারামের মধ্যে কোন উনিশ-বিশ-কম-বেশি নেই ইসলামে । শূকরের মাংশ খাবার কথা শুনলে যেমনি আমরা আঁতকে উঠি, তেমনি সিগারেট খাবার কথা শুনলেও আমাদের আঁতকে ওঠা উচিত। আর যদি আপনি সিদ্ধান্ত নিয়েই থাকেন, হারাম হালাল নিয়ে আপনি কেয়ার করেন না,  তাহলে একজন ডাক্তার হিসেবে আমি আপনাকে জানাতে পারি যে সিগারেট খাওয়ার চেয়ে শূকরের মাংস খাওয়া বরং আপনার স্বাস্থ্যের জন্য অনেক কম ক্ষতিকর । যদিও আমি আপনাকে কোনটাই করতে  বলব না।
এই আর্টিকেল আপনাকে হালাল-হারাম শেখানোর জন্য লেখা হয়নি । আপনি যদি  সিগারেটের নেশার শিকার হয়ে থাকেন, তাহলে শুধুমাত্র হালাল-হারাম এই কথা শুনে আপনি জীবনেও এটা ছাড়বেন না।  একেকজন মানুষ একেকভাবে যুক্তি গ্রহন করে। কেউ ধর্মীয় যুক্তি বেশি গ্রহন করে । কারোর কাছে হয়ত বিজ্ঞানের তথ্যগুলো বেশি শক্তিশালী অনুপ্রেরনা। আপনাকে কটাক্ষ করার বা হেয় প্রতিপন্ন করার কোন উদ্দেশ্য আমার নেই। আপনি নিজেও জানেন সিগারেট ক্ষতিকর। কতটা ভয়ঙ্কর ক্ষতিকর সেটা আমি আপনার কাছে এখানে তুলে ধরব।  আপনি যদি একজন বুদ্ধিমান, শিক্ষিত ও চিন্তাশীল মানুষ হয়ে থাকেন তাহলে আপনি আমার কথাগুলো উপলব্ধি করে কাজে লাগাতে পারবেন ইনশাআল্লাহ।
অধিকাংশ মানুষ সিগারেট সম্পর্কে এই একটাই লাইন জানে- ” সিগারেট খেলে ক্যান্সার হয়।” সিগারেট খেলে কি ক্যান্সার হয়? হ্যা, অবশ্যই হতে পারে। হবেই, এটা গ্যারান্টি দিয়ে বলা যাবেনা। ধরুন,  ১০০০ জন লোক সিগারেট খায়। তাদের মধ্যে ৬০ জনের ফুসফুস ক্যান্সার হল। আর অন্য ১০০০ জন লোক সিগারেট খায় না। তাদের মধ্যে ৫ জনের ফুসফুস ক্যান্সার হল। আশা করি ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছেন। সিগারেট আপনার ফুসফুস সহ অন্যান্য অনেকগুলো অঙ্গের ক্যান্সার হবার সম্ভাবনা বহু গুনে বাড়িয়ে দেয়। নন-স্মোকারদেরও ফুসফুস ক্যান্সার হতে পারে, কিন্তু সেটার সম্ভাবনা খুবই কম।  Smokers are many times more riskful to develop Lung Cancer in comparison with Non-smokers.
এটা ছিল জরিপ। আসুন তথ্য দেখা যাক।
– পৃথিবীতে মৃত্যুর সবচেয়ে বড় কারন হচ্ছে মদ্যপান । দুই নাম্বারে আছে সিগারেট।
– ক্যান্সার এর সবচেয়ে বড় কারন হচ্ছে ধূমপান । মুখ, খাদ্যনালী( Esophagus) , শ্বাসনালি( Laryngx) , পাকস্থলী (Stomach), কিডনী, ব্লাডার, অগ্নাশয় (Pancreas), জরায়ু(Cervix) প্রতিটি জায়গায় ক্যান্সার করার ক্ষমতা আছে সিগারেট এর।
– ফুসফুস ক্যান্সারে যারা মারা যায়, তাদের মধ্যে ৯০% এর কারন হচ্ছে তারা স্মোকার।
– যাদের ব্রঙ্কাইটিস (Bronchitis ) হয়, তাদের ৭০% এর পিছে কারন হচ্ছে সিগারেট।
– পৃথিবীতে ৬০০ কোটির মধ্যে ১০০ কোটি মানুষ স্মোকার। প্রতি ৬ জন এ একজন।
– প্রতিদিন ১৫ বিলিয়ন ( ১৫০০ কোটি) সিগারেট বিক্রি হয়। এবং  প্রতি মিনিটে ১ কোটি।
– প্রতি ৬ সেকেন্ডে একজন মারা যাচ্ছে স্মোকিং এর কারনে।
– প্রতিদিন ৮০ হাজার থেকে ১ লক্ষ নতুন শিশু সিগারেট খাওয়া শুরু করছে।
– সিগারেট এর মধ্যে ৪০০০ টির মতন আলাদা আলাদা কেমিক্যাল আছে। যার মধ্যে কমপক্ষে ৫০ টির ক্ষমতা আছে ক্যান্সার তৈরী করার।
সিগারেট একটি স্লো পয়জন। আপনি টের পাবেন না  কিন্তু খুব ধীরে ধীরে এটি আপনার শরীরকে ধ্বংস করে ফেলছে। যেদিন আপনি টের পাবেন, সেদিন হয়ত অনেক দেরি হয়ে যাবে। সেদিন হয়ত আপনার আর পেছনে ফিরে আসার কোন রাস্তা খোলা থাকবেনা। ক্যান্সারের কথা বাদ দিলাম।  সিগারেট আপনার শরীরের অন্যান্য  এমন কতগুলো ক্ষতি করছে যে আপনি হয়ত না মরলেও সুস্থভাবে বাচঁতে পারবেন না কোনদিন। একটা একটা করে আপনার শরীরের অমূল্য অঙ্গগুলো ভেতরে ভেতরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। নিজেই দেখে নিন।

কি আছে সিগারেটের ধোয়াতে (Tobacco Smoke) ?

সিগারেট কোম্পানীগুলো আপনাকে কখনোই বলবেনা তারা কি দিয়ে সিগারেট বানায়, কিন্তু বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে বের করেছেন মাত্র একটি সিগারেট এ কমপক্ষে ৪ হাজারটি আলাদা আলাদা কেমিক্যাল কমপাউন্ড আছে। যার মধ্যে কমপক্ষে ৫০-৭০ টি সরাসরি মানবদেহে ক্যান্সার করতে পারে। আপনি যদি স্মোকার হন, তাহলে আপনার জেনে রাখা উচিত  প্রতি টানে টানে আপনি যেসব কেমিক্যাল খাচ্ছেন  সেগুলো আর কিসে কিসে পাওয়া যায়। মাত্র কয়েকটি আমি দিলাম।
what-is-in-a-cigarette2
ক্যাডমিয়াম- ব্যাটারি
বিউটেন- লাইটার এর জ্বালানি
মিথেন- ম্যানহোলের গ্যাস
আর্সেনিক- বিষ বানাতে
টলুইন- ইন্ডাস্ট্রি তে সলভেন্ট হিসেবে
নিকোটিন- কীটনাশক বানাতে
এমোনিয়া- টয়লেট ক্লীনার এ
ডি ডি টি- কীটনাশক
ন্যাপথালিন- তেলাপোকার ওষুধ
আমি যদি আপনাকে টাকা দিয়েও বলি যে ভাই,  আপনাকে উপরের জিনিসগুলো খেতে হবে, আপনি কখনোই রাজি হবেন না। তাহলে আপনি নিজেকে জিজ্ঞেস করেন আপনি আসলে কি করছেন, কি ঢুকাচ্ছেন নিজের শরীরে প্রতিদিন । এবার ধরুন,  আমি সেই একই জিনিসগুলো নিয়ে বসে আছি রাস্তার পাশে। আপনি হাসিমুখে এসে উলটা আমাকে টাকা দিয়ে সেই জিনিসগুলো কিনে কিনে খাচ্ছেন আর চরম আনন্দ পাচ্ছেন । জিনিসটার নাম আমি দিয়েছি বেনসন, পলমল, মার্লবোরো ইত্যাদি। আমি সিগারেট কোম্পানি, আমার নাম ব্রিটিশ এমেরিকান টোব্যাকো । আমি বিষ বানাই। আপনি সেই বিষ আমার কাছ থেকে আপনার নিজের টাকা দিয়েই কিনে খান।
সিগারেট এর ধোয়া প্রথমেই সরাসরি যায় ফুসফুসে। সেখান থেকে রক্তের মাধ্যমে সারা শরীরে  এই কয়েক হাজার কেমিক্যাল ছড়িয়ে পড়ে। তাই সবচে বেশি ক্ষতি লাংস এর হলেও সারা শরীরেই এর প্রভাব আছে। ফুসফুসের পরেই সিগারেট সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে আপনার হৃৎপিন্ড ও রক্তনালিকা (Blood Vessel) গুলোকে।
সিগারেট এর ধোঁয়ার মূল উপাদান ৩টি।  তা হল-
  • TAR( আলকাতরা) ,
  • CO ( কার্বন মনো-অক্সাইড) ,
  • Nicotine ( এটি-ই সিগারেটের নেশার জন্য দায়ী মূল ড্রাগ)
আসুন দেখি কোনটি আপনার কি করে।

TAR/ আলকাতরা –

আলকাতরা দিয়ে রাস্তার পিচ ঢালাই করা হয়। টিনের চাল লেপা হয়।  সিগারেট এর ধোঁয়াতে সেই হুবহু একই আলকাতরা আছে। সিগারেট এর কেমিক্যালগুলো পুড়ে যে বিষাক্ত অবশেষ থাকে সেটাই হচ্ছে টার ( TAR= Total Aerosol Residue) ।   এটি একটি ভয়ঙ্কর বিষাক্ত  জিনিস যা আপনার ফুসফুসের ভিতরে দিন দিন আস্তে আস্তে জমা হয়। আমাদের লাংস দুইটি বড় স্পঞ্জ এর মতন জিনিস যা মিনিটে গড়ে ১২-১৮ বার সংকোচিত-প্রসারিত হয়ে আমাদের দেহে অক্সিজেন পৌঁছে দেয়। আমাদের ২টি লাংস এর ভিতরে রয়েছে প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ( ৬০ কোটি) ছোট ছোট বেলুনের মতন জিনিস, এগুলার নাম Alveoli ( অ্যালভিয়োলাই) . এদের গায়ে আছে আরো কোটি কোটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র রক্তনালী ( Alveolar Capillary). আমরা নাক দিয়ে যে শ্বাস নেই তা এই Alveous এর মধ্যে যায়, সেখান থেকে রক্তে মিশে, সেখান থেকে শরীরের সবগুলো কোষ এ যায়। কোষ এই অক্সিজেন ব্যবহার করে বেচে থাকে, বদলে কার্বন ডাই অক্সাইড তৈরী হয়, সেটা আমরা আবার নাক দিয়ে বের করে দেই। এই প্রক্রিয়া আমৃত্যু চলতে থাকে আমাদের অজান্তেই। (ছবি ও এনিমেশন)
01 Respiratory System
প্রতিটি সিগারেট এ ব্র্যান্ডভেদে ৭-২২ গ্রাম আলকাতরা থাকে। সিগারেট এ যতই ফিল্টার দেয়া থাকুক, এগুলো সবই ভুয়া জিনিস, আপনার ফুসফুসে ঠিকই আলকাতরা যাচ্ছে। আপনি যখন সিগারেট টানেন, তখন এই আলকাতরা আপনার লাংস এর ভিতর জমতে থাকে। সেটা আপনি টের পান না। কিন্তু তাতে কিছু যায় আসে না, যা ঘটার সেটা ঘটে যাচ্ছেই। প্রতিদিন একজন মানুষ মিনিটে ৬ লিটার করে সারাদিনে ৮০০০ লিটার বাতাস গ্রহন করে যার ভিতরে অগনিত ধূলা-বালি ও রোগ-জীবানু আছে।    আমাদের শ্বাসপ্রশ্বাস এর যে সিস্টেমটা আছে ( Respiratory sytem) এটার ভিতর Cilia নামে ছোট ছোট ব্রাশের  মতন  লক্ষ লক্ষ জিনিস আছে যারা সবসময় নড়াচড়া করে ও বাতাসের  ধূলা-ময়লা, জীবানু কে ফিল্টার করে লাংস কে পরিষ্কার রাখে । আরেক ধরনের কোষ আছে যাদের নাম গবলেট কোষ( Goblet Cell) যাদের কাজ হল প্রতিরক্ষাকারী পিচ্ছিল মিউকাস (Mucus) তৈরী করা। সিলিয়া ও গবলেট কোষ এরা দুইয়ে মিলে সব ধূলা-বালিকে আটকে ফেলে, আর সেগুলো আমরা একটু পর পর গলা খাঁকারি দিয়ে, কাশি-হাচি দিয়ে বের করে দেই বা গিলে ফেলি। সিলিয়া  প্রতি মিনিটে ১০০০-১৫০০ বার নড়াচড়া করে তার কাজ করেই যাচ্ছে, আমরা টেরও পাই না, চিন্তাও করিনা। চলছে চলুক না। (ছবি ও এনিমেশন)
203061_01XR
টার একটি মারাত্বক ক্ষতিকর কেমিক্যাল (Irritant Chemical) ।  টার এই cilia গুলোর কাজ করার ক্ষমতাকে নষ্ট  করে দেয়। ফলে ফুসফুসের ভিতরে আস্তে আস্তে ময়লা, ব্যাক্টেরিয়া জমতে থাকে, এবং ভিতরে ইনফেকশন তৈরী হয়।  যখন ফুসফুসে আলকাতরা যাওয়া শুরু করে তখন গবলেট কোষেরা মনে করে – “আরে এত ময়লা যাচ্ছে কেন, দেখি আমি আরো বেশি বেশি  মিউকাস তৈরী করতে থাকি যাতে ময়লা পরিষ্কার হয়” । একদিকে আপনার সিলিয়া নষ্ট, অন্যদিকে তৈরী হচ্ছে বেশি বেশি মিউকাস। ফলে এগুলো আপনার লাংস এর ভেতরেই জমতে থাকে। এই আলকাতরা আপনার Alveolus গুলোকে আস্তে আস্তে চিকন ও বন্ধ করে দেয়। এটা একদিনে হয় না, বছরের পর বছর ধরে এই প্রক্রিয়া চলতে থাকে। প্রতি বছর ধূমপানের ফলে আপনার ফুসফুসে কমপক্ষে এক গ্লাস বা ২০০ মিলি. আলকাতরা জমে (World Health Organization )।
smokers-lungs_1
89001055 (1)
আপনি দেখবেন যারা বহুদিন ধরে সিগারেট খায়, তারা খুক খুক করে কাশে। এটার নাম Smokers Cough. তাদের শরীর তাদের লাংস এর ভেতরে জমে থাকা আলকাতরা ও মিউকাস গুলোকে বের করার একটা নির্জীব চেষ্টা চালায়। আপনার যদি অনেকদিন ধরে এ ধরনের খুক খুক কাশি ডেভেলপ করে থাকে, তারমানে আপনার শরীরেও এই ঘটনা ঘটছে। এই যে পুরো অসুখটির কথা বললাম আমি, এটার নাম ব্রঙ্কাইটিস ( Chronic Bronchitis) । সিগারেট খেলে আপনার ক্যান্সার হোক বা না হোক, আপনার লাংস এর ভিতরে এই ক্ষতি হচ্ছে এটা আপনি লিখে রাখতে পারেন।
bronchitis
এইরকম আরেকটি অসুখ আছে যেটার নাম এমফাইসিমা ( Emphysema) . দিনের পর দিন আলকাতরা জমে  ঘন ঘন ইনফেকশান ও ফুসফুসের অ্যালভিয়োলাইগুলোর ইনজুরির কারনে সেগুলোর স্বাভাবিক সঙ্কোচন-প্রসারন ক্ষমতা ( Elasticity)  নষ্ট হয়ে যায়। ফলে সেগুলো আর আগের মতন সঙ্কোচন-প্রসারন করতে পারেনা। ফলে আপনার রক্তে আর যথেষ্ট অক্সিজেন পৌছায় না। আস্তে আস্তে শ্বাসকষ্ট বাড়তে থাকে, ঘন ঘন ঠান্ডা-কাশি লেগে থাকে, বুকের ভিতরে মাঝে মাঝে ব্যথা বা কেমন দমবন্ধ অনূভুতি ( Chest Tightness)  হয়। এ দুটি রোগকে একসাথে বলা হয় COPD বা Chronic Obstructive Pulmonary Disease.  এই দুটি রোগের কোনটারই কোন চিকিৎসা নেই। এগুলো কখনোই ভাল হয়না। আপনার ক্ষতি যা হবার হয়ে গেছে। এই ক্ষতি IRREVERSIBLE, তার মানে যা হয়ে গেছে তা আপনি ফেরত পাবেন না, বাকি যা আছে তা দিয়েই আপনাকে বাকি জীবন চলতে হবে। (ছবি ও এনিমেশন)।
এখনো যদি আপনার টনক না নড়ে, তাহলে দয়া করে দেখে নিন টার কিভাবে জমা হয় ফুসফুসে এবং কিভাবে সেটা ফুসফুসকে ঠিকমতন কাজ করতে দেয়না।
২- CO/ কার্বন মনো-অক্সাইড –
কার্বন মনো-অক্সাইড কি ক্ষতি করে সেটা জানতে হলে আগে জানতে হবে কিভাবে লাংস থেকে শরীরে অক্সিজেন পৌছায়। আমাদের রক্তের মধ্যে আছে চ্যাপ্টা গোল এক ধরনের কোষ, যাদের নাম লোহিত রক্ত কনিকা বা Red Blood Cell (RBC). এদের প্রত্যেকের মধ্যে আছে ৪টি করে প্রোটিন যার নাম হিমোগ্লোবিন। লাংস থেকে অক্সিজেন প্রথমে রক্তের RBC তে ঢুকে এই হিমোগ্লোবিনের সাথে জোড়া লেগে অক্সি-হিমোগ্লোবিন তৈরি করে। তারপর সেটা রক্তের মাধ্যমে সারা শরীরে যায় ও কোষে কোষে অক্সিজেন সাপ্লাই  দিয়ে ও কোষ থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড নিয়ে আবার লাংস এ ফেরত আসে। আমরা যে প্রতিবার শ্বাস নিচ্ছি আর ফেলছি , এর মধ্যেই এই অসাধারন ঘটনাগুলো ঘটে যাচ্ছে।
oxygentransport2
Hemoglobin + Oxygen = Oxyhemoglobin
কার্বন মনো অক্সাইড(CO)  এত বিষাক্ত একটি গ্যাস যে বিশুদ্ধ কার্বন মনো-অক্সাইড এ মাত্র কয়েক মিনিট থাকলেই মানুষ মারা যাবে। সিগারেটের ধোয়ায় এই বিষ আছে, কিন্তু তা থেকে মানুষ মরে না কারন ধোয়াটা বাতাসের সাথে মিশে অনেকটাই হালকা ( Dilute/Masking )  হয়ে যায় এবং তার পারসেন্টেজ কমে আসে। এছাড়াও ধূমপানের সময় মানুষ নাক দিয়ে স্বাভাবিক ভাবে শ্বাস নেয়, কাজেই সে মরে না।

এই ধোয়া কি ক্ষতি করে?

গাণিতিক  হিসাব দেখা যাক।   আশা করি আপনার নিজের উপর  অনুশোচনা হবে যে আপনি স্রষ্টার দেয়া অমূল্য শরীরটাকে কিভাবে নষ্ট করে ফেলছেন  ।
আমাদের শরীরে ৫ লিটার রক্ত আছে। এদের মধ্যে আছে লোহিত রক্ত-কনা, বা red blood cell(RBC), এরাই অক্সিজেন বহন করে নিয়ে যায় সব কোষ এ।
১ লিটার=১ লক্ষ মাইক্রোলিটার ( ১,০০,০০০)
প্রতি মাইক্রোলিটার এ লোহিত রক্ত-কনা আছে ৬ মিলিয়ন, বা ৬০ লক্ষ।
তাহলে পুরো শরীরে লোহিত রক্ত-কনা আছে = ৬০ লক্ষ X ১০০০০০ X ৫ = ৩0,00,00,00,00,000
বা ৩ লক্ষ কোটি
প্রত্যেকটি লোহিত রক্ত-কনা তে ২৫ কোটি হিমোগ্লোবিন (hemoglobin) আছে।
প্রত্যেকটি হিমোগ্লোবিন ৪টি করে অক্সিজেন বহন করতে পারে।
তাহলে প্রত্যেকটি লোহিত রক্ত-কনা ১০০ কোটি অক্সিজেন বহন করে একেকবারে। ( এবার এটাকে ৩ লক্ষ কোটি দিয়ে গুন করে দেখতে পারেন সারা শরীরের জন্য )
অক্সিজেন যত দ্রুত হিমোগ্লোবিন এর সাথে জোড়া লাগে, কার্বন মনো-অক্সাইড তার চেয়ে  ২৫০ গুন বেশি গতিতে হিমোগ্লোবিন এর সাথে জোড়া  লেগে তৈরী করে কারবক্সি- হিমোগ্লোবিন । ফলে কার্বন মনো-অক্সাইড রক্তে আসা মাত্রই তারা অক্সিজেন এর যায়গা দখল করে নেয় অত্যন্ত কম সময়ে। একজন ধূমপায়ীর রক্তের ১/৫ অংশ দখল করে নেয় কার্বন মনো-অক্সাইড ।
Carbon Mon Oxide (CO) + Hemoglobin= CarboxyHemoglobin
ফলাফল – উপরের বিশাল সংখ্যা দেখে বুঝতে পারছেন শরীরের ভিতরে কি ঘটে যাচ্ছে প্রতি সেকেন্ডে । শরীরের কোষগুলোর অক্সিজেন দরকার বাচার জন্য, কিন্তু ধূমপানের ফলে তারা পায় কার্বন মনো-অক্সাইড। দিনের পর দিন এই ঘটনা ঘটতে থাকে। আস্তে আস্তে কোষগুলো  ধ্বংস হতে থাকে। কমতে থাকে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা। মাথা থেকে পা পর্যন্ত  শরীরের 100 trillion (1014) কোষের প্রতিটি কোষ এ ঘটছে এই ক্ষতি।
৩- নিকোটিন/Nicotine :
এটিই সেই DRUG যার জন্যে মানুষ ধূমপান করে। Nicotine কে এখন ড্রাগ বলা হয়, কারন এটি একটি নেশা। তাই ধূমপান কেও এখন addiction বলা হয়। যারা ধূমপান করেন, তারা addict. এটা নিয়ে আপনি তর্ক করতে পারেন, কিন্তু এটাই পরীক্ষিত সত্য এখন পৃথিবীতে। Nicotine রক্তের মাধ্যমে ব্রেইন এ যায় এবং নির্দিষ্ট কিছু কেমিক্যাল রিলিজ করে ( ডোপামিন, এড্রেনালিন ) । ডোপামিনের প্রভাবে স্মোকারের নার্ভাস সিস্টেমে কিছু অনুভুতির সৃষ্টি করে, যেমন- ভাল লাগা, মাথা ঝিম ঝিম করা, মনোযোগের মাত্রা বাড়া। এটাই নেশা। কিছুক্ষন পরেই রক্তে ডোপামিনের পরিমান কমে যাবে। তখন সেই মানুষের আরেকটা সিগারেট ধরাতে ইচ্ছা হবে। এরপর আরেকটা…এভাবে চলতেই থাকবে।  Nicotine এ আস্তে আস্তে অভ্যস্ত হয়ে গেলে এটা মানুষ ছাড়তে পারেনা সহজে। তখন এটার নাম হয় Nicotine Dependence. যার অর্থ নির্ধারিত মাত্রার নিকোটিন রক্তে না গেলে সেই ব্যক্তির অস্থির লাগবে, বিরক্ত লাগবে, মানসিক অশান্তি হবে।
নিকোটিন আরো ক্ষতি করে । এটা ব্রেইনে যেয়ে এড্রেনালিন হরমোন কে বেশি বেশি রিলিজ করে। এবং একই সাথে শরীরের রক্তনালীগুলোকে আরো সঙ্কোচিত ( Vasoconstriction) করে দেয়। ফলে রক্তনালীর চাপ বেড়ে যায়।  আমাদের শরীরের রক্তনালীর মোট দৈর্ঘ্য ১ লক্ষ কিলোমিটার যা পুরো পৃথিবী আড়াই বার ঘুরে আসার সমান। এই বিশাল লম্বা রাস্তায় যখন দিনের পর দিন ধরে রক্তচাপ বাড়তে থাকে তখন ব্লাড প্রেসার বেড়ে যায় ও হার্টের উপর চাপ বেড়ে যায়।
রক্তনালী চিকন হয়ে যাওয়ার কারনে হাত ও পায়ে রক্ত সরবরাহ কমে যেতে থাকে। নিকোটিন আরো একটা মারাত্বক ক্ষতি করে। আমাদের শরীরের কোন জায়গায় কেটে গেলে সেটা জমাট বাধার জন্য যারা কাজ করে তাদেরকে অনুচক্রিকা বা প্লাটিলেট( Platelet) বলে। নিকোটিন রক্তনালির ভেতর রক্ত জমাট বাধার এই প্রবনতাকে বহুগুনে বাড়িয়ে দেয়। এমনিতেই রক্তনালী সিগারেট খেয়ে খেয়ে চিকন হয়ে আছে, এরমধ্যে যদি কোনভাবে একটা রক্তের জমাট ( Embolus) তৈরী হয়, সেটা আপনার শরীরের যেকোন রক্তনালীতে যেয়ে আটকে যেতে পারে। এই ঘটনা হার্টে ঘটলে সেটার নাম হার্ট অ্যাটাক, আর ব্রেইনে ঘটলে সেটার নাম স্ট্রোক। আপনি নিশ্চয়ই কোন না কোন স্ট্রোকের রুগীকে প্যারালাইসিস হয়ে বিছানায় পড়ে থাকতে দেখেছেন? আপনিও কি একই পরিনতি চান?
কেন মানুষ ধূমপান শুরু করে ?
বেশিরভাগ মানুষ ধূমপান শুরু করে আশেপাশের পরিবেশ, বন্ধুবান্ধব, সঙ্গদোষের কারনে। কেউ মায়ের পেট থেকে সিগারেট খাওয়া শিখে আসেনা। এটা কোন সুস্বাদু খাবার নয়, এমনকি এটা কোন খাবারই না। সিগারেট খাওয়ার আগে ও পরে  বিসমিল্লাহ ও আলহামদুলিল্লাহ বলে নাই কেউই। ঘরে পরিবারের সামনে সিগারেট টানেনা কেউই।   সিগারেটে প্রথমবার টান দিয়ে কাশতে কাশতে অবস্থা খারাপ হয়ে গিয়েছে প্রতিটা মানুষেরই। তারপরো মানুষ এটা খায়। টীন-এজ বয়সে ছেলেরা ধূমপান শুরু করে সবচেয়ে বেশি। তারা এটাকে খুব পুরুষালী কিছু মনে করে। কেউ হয়ত বান্ধবীকে আকৃষ্ট করার জন্য স্মোকিং শুরু করে।  আর স্মোকার বন্ধুদের আড্ডা-সঙ্গদোষের প্রভাব তো আছেই, এটাকে বলা হয় Peer Pressure.  এভাবেই আস্তে আস্তে শুরু, শুরু থেকে অভ্যাস, অভ্যাস থেকে বদ-অভ্যাস, সেখান থেকে নেশা, সেখান থেকে মরননেশা, সেখান থেকে ধ্বংস।
কেন ক্যান্সার হয় ?
আমাদের শরীরের প্রতি সেকেন্ডে নতুন নতুন কোষ মারা যাচ্ছে ও তৈরী হচ্ছে। যখন কোষ বিভাজনের হারকে শরীর আর নিয়ন্ত্রন করতে পারে না, তখন সেটাকে ক্যান্সার বলে। সিগারেটের ক্ষতিকর কয়েক হাজার কেমিক্যাল মানুষের শ্বাসতন্ত্রের কোষগুলোকে বারবার ক্ষতিগ্রস্থ করতে থাকে, এটার নাম Cell Injury. দিনের পর দিন ইনজুরি হতে থাকলে কোষের স্বাভাবিক কাজ করার ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। তখন সে অতিরিক্ত বিভাজন শুরু করে, মূলত এভাবেই ক্যান্সারের শুরু হয়।
আপনি যদি আজীবন সুস্থ ও সুন্দর থাকতে চান…
আপনি দেখবেন, কিছু মানুষ খুব অল্প বয়সেই বুড়িয়ে যায়। এদের চামড়ায় দ্রুত ভাঁজ পড়ে, চুল পড়ে যায়, চেহারা নষ্ট হয়ে যায়। প্লেট উপচিয়ে ভাত খাওয়া বাংগালীরা এই দলে পড়ে ।   অন্যদিকে কিছু মানুষ আছে যাকে দেখে আপনার ৩০ বছর মনে হবে, কিন্তু আসলে তার বয়স ৫০। এগুলোর পিছে মূল কারন আমি আপনাকে জানিয়ে দিচ্ছি।
একটা কারন উপরে বলা হয়েছে- Cell Injury. শরীরের কোষের অক্সিজেন সাপ্লাইতে যদি আপনি ক্ষতি করেন, তাহলে কোষ নষ্ট হতে বাধ্য। সিগারেট ঠিক এই কাজটাই করে যা উপরে ব্যখ্যা করা হয়েছে । ধূমপান, স্ট্রেস, মানসিক চাপ, অস্থিরতা, এইগুলো কোষের অক্সিজেন সাপ্লাই কমিয়ে দেয়। ফলে মানুষের Ageing Process দ্রুতগতিতে হয়। ফলে চেহারা নষ্ট হয়ে যায় কম বয়সেই।
২য় রহস্য হচ্ছে আপনার ফুসফুস, হার্ট ও রক্তনালী। আপনি যদি সিগারেট না খান, আপনার ১ লক্ষ কিলোমিটার লম্বা রক্তলানীর উপর বাড়তি চাপ পড়বে না, ফলে আপনার হার্টের উপরও চাপ পড়বে না। আপনি যত বেশি পরিমানে এক্সারসাইজ করবেন, আপনার রক্তনালীর ভেতর থেকে তত বেশি নাইট্রিক অক্সাইড (Nitric Oxide) রিলিজ হবে। নাইট্রিক অক্সাইড আপনার রক্তনালীকে সবসময়ে প্রসারিত ( Vasodilation) করে রাখবে।  একজন এভারেজ মানুষের হার্ট মিনিটে ৬০-১০০ বার পাম্প করে, যেটাকে পাল্‌স বলে। আপনার পাল্‌স আপনি যত কমিয়ে আনতে পারবেন, আপনার হার্ট ততই ভাল থাকবে। আপনি যদি নন-স্মোকার হন এবং নিয়মিত এক্সারসাইজ করেন, আপনার পাল্‌স অবশ্যই কম থাকবে।
একজন এভারেজ পূর্নবয়ষ্ক মানুষ প্রতি নিশ্বাসে ৫০০ মিলিলিটার  ও প্রতি মিনিটে ৬ লিটার বাতাস নেয়। এজন্য তাকে ১২ বার শ্বাস-প্রশ্বাস ফেলতে হয়। আপনার ফুসফুস কতটা ভাল আছে তার প্রমান হচ্ছে আপনার শ্বাসের হার ( Respiratory Rate) কতটা কম ।  আপনার শ্বাসের হার কম এটার মানে হচ্ছে, আপনার ফুসফুস অত্যন্ত ভাল,  সেকারনে আপনার শ্বাসের গভীরতা (Respiratory Depth) অনেক বেশি, যার অর্থ আপনি এক শ্বাসেই ৫০০ মিলিলিটারের চেয়ে অনেক বেশি বাতাস নিতে পারেন ( ধরুন ৮০০ মিলি ) । সিগারেট খেয়ে আপনি যদি আপনার ফুসফুসের বারটা বাজিয়ে রাখেন, তাহলে এই ৬ লিটার বাতাস নিতে আপনাকে কমপক্ষে ২০-২৫ বার শ্বাস ফেলতে হবে। ব্যাপারটাকে এভাবে তুলনা করা যেতে পারে- ১০০ মিটার দৌড়াতে আমি পা ফেলি ৩০০ বার, আর আপনি পা ফেলেন ২০০ বার। যার অর্থ একই কাজ আপনি অনেক কম কষ্টে করতে পারেন।
এই হচ্ছে আজীবন সুন্দর স্বাস্থ্য ধরে রাখার রহস্য। আপনাকে আপনার পাল্‌স ও শ্বাসের হার কমিয়ে রাখতে হবে ব্যায়াম/খেলাধূলা করে ও সিগারেট না খেয়ে। আমাদের আয়ু অবশ্যই আল্লাহর হাতে এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা আল্লাহ আমাদের দিয়েছেন। আপনি সিগারেট খাবেন কি খাবেন না এই সিদ্ধান্ত আপনার ।  আপনি যেরকম সিদ্ধান্ত নিবেন এই পৃথিবীতে এবং এর পরের জীবনে সেটারই প্রতিদান পাবেন।
তাহলে ডাক্তাররা যে সিগারেট খায়…? 
আল্লাহ আমাদের সৃষ্টিই করেছেন যেন আমরা عقل (আ’ক’ল) ব্যবহার করি এবং فكر (ফিকর) করি
  • عقل (আ’ক’ল) অর্থ বিচার-বুদ্ধি, যুক্তি, জ্ঞান, বুদ্ধিমত্তা, মানসিকতা, বোধ।
  • فكر (ফিকর) অর্থ চিন্তা, উপলব্ধি, অনুধাবন, প্রতিফলন, মাথা ঘামানো।
আল্লাহ কু’রআনে ৪৯ বার আ’ক’ল এবং ১৮ বার ফিকর করতে বলেছেন। যদি যোগ করি তাহলে পুরো কু’রআনে আল্লাহ আমাদেরকে কমপক্ষে ৬৭ বার চিন্তা করতে, বিচার-বুদ্ধি ব্যবহার করতে বলেছেন।। জ্ঞান থাকলেই মানুষ সেটা কাজে লাগাবে এমন কোন কথা নেই।   এই আর্টিকেল এর শুরুতেই বলা হয়েছে মানুষ জেনেশুনে নিজের ক্ষতি করে। ডাক্তাররাও এর ব্যতিক্রম না। আপনি যদি সিগারেট না খান তাহলে আপনি একজন ধূমপায়ী কার্ডিওলজিস্ট এর চেয়ে বেশি বুদ্ধিমত্তা রাখেন এ ব্যাপারে আপনি নিশ্চিত থাকতে পারেন।
Passive Smoking-
আপনি যখন আপনার ধূমপায়ী বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেন, তখন আপনি হন Passive Smoker. আপনি সারা জীবন একটি সিগারেট না খেয়েও তাদের ধোয়া, কার্বন মনো অক্সাইড, আলকাতরা খেয়ে চলেছেন। খুন করে ফাসিতে ঝুলবেন নাকি খুন না করে ফাসিতে ঝুলবেন এটা আপনার সিদ্ধান্ত ! হয় বন্ধুদের বোঝান, বা নিজের জীবন ও ধূমপায়ী বন্ধু থেকে একটি বেছে নিন।
যদি কোন নবজাতক বাচ্চার বাবা-মা দুইজনেই প্রতিদিন ২০টি করে সিগারেট খায়, তাহলে বাচ্চাটির বয়স এক বছর হবার আগেই সে কমপক্ষে ৮০টি সিগারেট পরোক্ষভাবে খেয়ে ফেলবে। কাজেই আপনি যদি আপনার সন্তানের ক্ষতি না চান, আপনার উচিত হবে সিগারেট খাওয়া ছেড়ে দেওয়া। আজকে থেকে ১৫ বছর পরে আপনার ছেলের হাতে সিগারেট দেখলে আপনার কেমন লাগবে? আপনি কি তাকে মানা করতে পারবেন? মানা করতে গেলে যখন আপনার ছেলে বলবে- “বাবা তুমি তো সবসময় খাও, তাই আমিও খাই। ” একথা শুনার পর আপনি কি করবেন কখনো চিন্তা করেছেন?
passivechildren-passive-smoking
আপনি যদি একজন ধূমপায়ী , ও এই আর্টিকেল পড়ে বোঝার মতন শিক্ষিত এবং বুদ্ধিমান হয়ে থাকেন তাহলে আপনি নিচের যেকোন একটি করবেন-
১। আপনি সবসময়েই জানতেন সিগারেট ক্ষতিকর। এই আর্টিকেল পড়ে ও ছবি/ভিডিও দেখে সেটা আরো ভালভাবে নিশ্চিত হলেন। আপনি সিগারেট জীবনের তরে ছেড়ে দেওয়ার চেষ্টা করবেন।
২। কিছুদিন আপনি ছেড়ে দিবেন। এরপর  যখন এই কথাগুলো ভুলে যাবেন তখন আবার শুরু করবেন।
৩। এই আর্টিকেল পড়ে আপনার কিছু যায় আসে না। এটা পড়তে পড়তেই হয়ত আপনি একটা সিগারেট ধরাবেন ও মনিটরের উপর একগাল ধোঁয়া ছাড়বেন।
আপনি কি করবেন এটা একান্তই আপনার ব্যাপার। মুসলিম হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে মানুষকে সত্য কথা জানানো, ভাল কাজের অনুপ্রেরনা দেওয়া ও খারাপ কাজ করতে মানা করা। এই আর্টিকেল পড়ে বেশ কয়েকজন মানুষ সিগারেট খাওয়া ছেড়ে দিয়েছিলেন আগে। কাজেই আপনিও পারবেন। আমরাই আমাদের অভ্যাস বানাই। ভাল অভ্যাস, খারাপ অভ্যাস, নেশা, সবই আমরাই বানাই। ধরতে যখন পারি, ছাড়তেও পারি।
We create our Habits, then our habits create us. As we have the power to create one, so we must also have to power to quit one. It only depends how much effort you will give. 

আপনাকে অনুরোধ করব, এই কথাগুলো মানুষকে জানান। দরকার হলে অন্তত এক কপি প্রিন্ট করে কাউকে পড়তে দিন। আপনার আমার চেষ্টার মাধ্যমে যদি আল্লাহ কাউকে পথ দেখান, সেটার প্রতিদান আমরা কখনো কল্পনাও করতে পারবনা।

জন্মগত মুসলিম

জন্মগত মুসলিম
আমরা বাঙ্গালিরা আরবি বুঝিনা। একারনে আমাদের মধ্যে বেশিরভাগই কুর’আন পড়ি কিছুই না বুঝে। ছোটবেলা থেকে আমাদেরকে হুজুরের কাছে তাজঊইদ সহকারে কুর’আন রীডিং পড়তে শিখানো হয়। বেশিরভাগ মুসলিমের কুর’আন শিক্ষা সারাজীবন এটুকুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। অনেকেই বড় হয়ে চর্চার অভাবে তাজঊইদ ও তিলাওয়াত ভুলে যায়, তখন তারা আর কুর’আন ছুয়েও দেখে না। সমগ্র মানবজাতির জন্য আল্লাহর পাঠানো এই পথপ্রদর্শক বইটির স্থান হয় বসার ঘরের শো-কেসে বা বইয়ের তাকে ধূলার মাঝে।
অনেকেই মূল আরবির পাশাপাশি বাংলা বা ইংরেজি অনুবাদ পড়েন কুর’আন বোঝার জন্য। আমাদেরকে সবসময় মনে রাখতে হবে কুর’আনের অনুবাদ কখনোই “কুর’আন” নয়। কুর’আনের ভাষা শুধুমাত্র আরবি। কোন অনুবাদই কুর’আনের সম্পূর্ন মেসেজ ও অসাধারন ভাষাগত সৌন্দর্যকে ১০০ ভাগ প্রকাশ করতে পারেনা। আপনি অনুবাদের ততটুকুই বুঝবেন যতটুকু অনুবাদক নিজে বুঝেছেন। প্রত্যেকটি ভাষার আলাদা আলাদা সৌন্দর্য আছে। আমি একটা উদাহরন দেই। “তোমার কথা শুনে আমার চোখ কপালে উঠে গেল। তুমি কি মামাবাড়ির আবদার পেয়েছ? “ – এই লাইনটির ভাষাগত সৌন্দর্য একমাত্র একজন বাংলাভাষী মানুষের পক্ষেই বোঝা সম্ভব। যতই চেষ্টা করা হোক, আর কোন ভাষাতেই এটার ভাব পুরোপুরি প্রকাশ করা সম্ভব না। এটাই অনুবাদের সীমাবদ্ধতা।
আমাদের চোখে যেটা খুব সাধারন একটা আয়াত, সেটার আড়ালে যে আল্লাহর কি পরিমান অসাধারন জ্ঞান ও সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে তা নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। এই আর্টিকেল এ ২২ নম্বর সূরা আল-হাজ্জ এর ৭৫ ও ৭৮ নম্বর আয়াতের কিছু ভাষাগত সৌন্দর্য তুলে ধরা হয়েছে।
আয়াত ৭৫ঃ
ٱللَّهُ يَصۡطَفِى مِنَ ٱلۡمَلَـٰٓٮِٕڪَةِ رُسُلاً۬ وَمِنَ ٱلنَّاسِ‌ۚ إِنَّ ٱللَّهَ سَمِيعُۢ بَصِيرٌ۬ (٧٥)
ইংরেজিঃ Allah chooses messengers from angels and from men. Verily, Allah is All-Hearer, All-Seer
বাংলাঃ আল্লাহ ফেরেশতা ও মানুষদের মধ্যে থেকে রাসূলদের বেছে নেন। নিশ্চয়ই অবশ্যই আল্লাহ সবকিছু শুনেন, সবকিছু দেখেন।
এখানে আল্লাহ ব্যবহার করেছেন- ইয়াস্‌তাফি/ Yastafee. এটা একটা ক্রিয়াপদ, মূল শব্দটি এসেছে "ইস্‌তিফা/Istifa" থেকে। এটার অর্থগুলো এরকম দাঁড়ায়- বেছে নেওয়া, মনোনীত করা, To Choose, To Select. এই বাক্যে শব্দটি 3rd Person Present Tense এ আছে। Yastafee= He Selects।
"ইস্‌তিফা" মানে নিজের খেয়ালখুশি ইচ্ছামতন কোন কিছু বেছে নেওয়া। ধরুন আপনি একটা ব্যুফে রেস্টুরেন্টে গেছেন। ৩০-৪০ রকমের খাবার সাজানো আছে। এক পাশে পুডিং, মিষ্টি, ফল, পায়েস, কেক রাখা। আপনি পুডিং তুলে নিলেন। কেউ যদি আপনাকে জিজ্ঞেশ করে- “কেন তুমি আর সব রেখে পুডিং নিলে?” আপনি হয়ত বলবেন- “আমার ইচ্ছা তাই। এটা আমার ভাল লাগে”। কেন পুডিং আপনার বেশি ভাল লাগে বা অন্যগুলো কম ভাল তাঁর কোন বৈজ্ঞানিক বা গানিতিক কারন নেই। ভাল লাগে, ব্যস, এটাই হচ্ছে কারন। সবকিছুর ব্যাখ্যা হয়না, সবকিছুর ব্যাখ্যা জিজ্ঞেস করতে যাওয়াটা একধরনের নির্বুদ্ধিতা।
আল্লাহ বলেছেন, তিনি তাঁর রাসূল মনোনীত করার ব্যাপারে "ইস্‌তিফা" করেন। আল্লাহ কাকে তাঁর রাসূল হিসেবে বেছে নিবেন সেটা তাঁর সম্পূর্ন একার ইচ্ছা। ইহুদীরা দাবি করে, তাদের বংশে নাবি মূসা(আ) এর মতন এত বড় একজন নাবি এসেছিলেন। তাহলে কুর’আন কেন তাদের জাতির উপর নাযিল না হয়ে একজন আরব মানুষের উপর নাযিল হল? তারা আরো প্রশ্ন করত- “কেন জীবরাঈল(আ) কেই আল্লাহ বেছে নিলেন কুর’আন নাযিল করার জন্য? অন্য ফেরেশতারা কি দোষ করেছিল?” কুরাইশ বংশের কাফেররা প্রশ্ন করত- “কেন আল্লাহ মুহাম্মাদের মতন একজন এতিম নিরক্ষর লোকের উপর কুর’আন নাযিল করল? কেন আমাদের সমাজের বড় বড় ধনীদের উপর কুর’আন নাযিল করল না?"
আল্লাহ কাকে নাবি-রাসূল হিসেবে বেছে নিবেন সেটার জন্য তাঁর অন্য কারোর উপদেশের কোন প্রয়োজন নেই। মানুষের কি কি যোগ্যতা থাকলে সে আল্লাহর রাসূল হতে পারে আল্লাহ কারো কাছে সেটার কারন ব্যাখ্যা করতে বাধ্য নন। আল্লাহ হচ্ছেন আল-আলীম, সর্বজ্ঞানী। মহাবিশ্বের এমন কোথাও কোন অনু পরমানু নেই যেটা তাঁর জ্ঞানের বাইরে। নয়। আল্লাহ হচ্ছেন সামীউল বাসির (সর্ব-শ্রোতা ও সর্ব-দ্রষ্টা)। এই মহাবিশ্বের অতীত বর্তমান ভবিষ্যত একই সাথে পুরোটা তিনি অনেক আগে থেকেই জানেন। সময় আমাদের জন্য যেভাবে প্রযোজ্য, সেভাবে সেটা আল্লাহর সাথে প্রযোজ্য নয়। কোন কাজের ফলাফল আমরা আগে থেকেই জানিনা, সেকারনে "সহজ/কঠিন/ অনিশ্চিত/ভুল/সঠিক" এই ব্যাপারগুলো মানুষের মধ্যে কাজ করে, যেগুলো আল্লাহর জন্য প্রযোজ্য নয়। যেহেতু তিনি আগে থেকেই সব কিছুর ফলাফল জানেন, কাজেই তাঁর কোন কিছুতেই কোন "ভুল" বা "অনিশ্চয়তা"-র কোন সম্ভাবনা নেই। তিনি নিজের ইচ্ছায় যে ঘটনাই ঘটান বা যা সিদ্ধান্তই নেন, সবকিছুই নিখুঁত। তাঁর ইচ্ছায় কোন খামখেয়ালিপনা বা উদাসীনতা থাকতে পারেনা, কারন এই গুনাবলীগুলো স্রষ্টার ক্ষেত্রে প্রযোজ্যই নয়।
কাজেই কুরাইশদের বা ইহুদীদের করা এই ভিত্তিহীন প্রশ্নগুলোর কোন মূল্য নেই। আজকের দিনেও অনেক মুসলিমদের দেখবেন প্রশ্ন করতে- "আল্লাহ কেন এটা করলেন?" , "এটা এভাবে না হয়ে ওভাবে হলে ভাল হত" , "ইশ ঐদিন অমুক কাজটা না করলেই আর দূর্ঘটনাটা হোত না"...ইত্যাদি ইত্যাদি। আমাদের ঈমানের একটি মৌলিক অংশ হচ্ছে "তাকদীর" বা আল্লাহ আমাদের জন্য আগে থেকেই যা কিছু প্রোগ্রাম করে রেখেছেন সেটার উপর শক্ত বিশ্বাস স্থাপন করা। কি করলে কি হবে সেটা আল্লাহ আমাদের চেয়ে অনেক ভাল করে জানেন। দ্বিতীয় কথা হল, আল্লাহ যদি কুর'আন ইউরোপে নাযিল করতেন বা নাবি মূসা(আ) এর উপর কুর'আন নাযিল করতেন, তাহলেই কি মানুষের প্রশ্ন করা বন্ধ হয়ে যেত?! আল্লাহর সিদ্ধান্ত নিয়ে এইসব আলতু ফালতু প্রশ্ন করে নিজের ঈমানের ক্ষতি করার মতন দুঃসাহস আমরা যেন কখনো না দেখাই। আল্লাহর "ইস্‌তিফা" -কে যেন আমরা শতভাগ পজিটিভলি হাসিমুখে মেনে নেই। এটাই সত্যিকারের বিশ্বাসীদের বৈশিষ্ট্য।
এবার আমরা ৭৮ নম্বর আয়াতটি দেখি।
আয়াত ৭৮-
وَجَـٰهِدُواْ فِى ٱللَّهِ حَقَّ جِهَادِهِۦ‌ۚ هُوَ ٱجۡتَبَٮٰكُمۡ وَمَا جَعَلَ عَلَيۡكُمۡ فِى ٱلدِّينِ مِنۡ حَرَجٍ۬‌ۚ مِّلَّةَ أَبِيكُمۡ إِبۡرَٲهِيمَ‌ۚ هُوَ سَمَّٮٰكُمُ ٱلۡمُسۡلِمِينَ مِن قَبۡلُ وَفِى هَـٰذَا لِيَكُونَ ٱلرَّسُولُ شَهِيدًا عَلَيۡكُمۡ وَتَكُونُواْ شُہَدَآءَ عَلَى ٱلنَّاسِ‌ۚ فَأَقِيمُواْ ٱلصَّلَوٰةَ وَءَاتُواْ ٱلزَّكَوٰةَ وَٱعۡتَصِمُواْ بِٱللَّهِ هُوَ مَوۡلَٮٰكُمۡ‌ۖ فَنِعۡمَ ٱلۡمَوۡلَىٰ وَنِعۡمَ ٱلنَّصِيرُ
ইংরেজী-
And strive for Allah with the striving due to Him. He has chosen you and has not placed upon you in the religion any difficulty. [It is] the religion of your father, Abraham. Allah named you "Muslims" before [in former scriptures] and in this [revelation] that the Messenger may be a witness over you and you may be witnesses over the people. So establish prayer and give zakah and hold fast to Allah . He is your protector; and excellent is the protector, and excellent is the helper.
বাংলা (আংশিক)-
" আর আল্লাহর পথে এমনভাবে সংগ্রাম কর যেমনটা তাঁর জন্য করা উচিত। তিনি তোমাদেরকে বেছে নিয়েছেন আর তোমাদের ধর্মের উপর কোন বোঝা চাপিয়ে দেননি। এটা তোমাদের পূর্বপুরুষ ইবরাহীম এর ধর্ম। "
ইজতিবাঃ-
এখানে আল্লাহ ব্যবহার করেছেন- ইজতাবা ( هُوَ ٱجۡتَبَٮٰكُمۡ)। ইজতিবা অর্থও বেছে নেওয়া, পছন্দ করা, To Choose. কিন্তু এটা নিজের ইচ্ছামতন কোন কিছু বেছে নেওয়া নয়। আমি কয়েকটা উদাহরন দেই।
আপনি একটা বড় মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীর কর্মচারী নিয়োগ পদে (Officer Recruitment) কর্মরত আছেন। আপনাদের অফিসে ২ জন কর্মচারী নেওয়া হবে। নির্ধারিত দিনে আপনি ১০ জনের ভাইভা নিলেন। প্রত্যেককে খুঁটিয়ে খুটিয়ে প্রশ্ন করলেন। শেষে ৭ আর ১০ নম্বর ক্যান্ডিডেটকে চাকরির জন্য মনোনয়ন দিলেন।পরেরদিন আপনার অফিসের এম.ডি. সাহেব যদি আপনাকে জিজ্ঞেস করেন যে, কি কি যোগ্যতা দেখে আপনি ঐ দুইজনকে বেছে নিলেন, তাহলে আপনি কখনোই বলবেন না- “ স্যার, আমি তাদেরকে বেছে নিলাম কারন , ৭ নম্বর সংখ্যাটা আমার খুব প্রিয়, আর ১০ নম্বর ক্যান্ডিডেটের প্রিয় খাবার পুডিং। “
আপনি আপনার খেয়ালখুশি মনের ইচ্ছামতন র‍্যান্ডমলী কাউকে বেছে নেননি। ইজতিবা শব্দের পূর্ন অর্থ হল- সঠিক কাজের জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া, To make the right decision for the right task. আপনি চাকরিপ্রার্থীদের সাথে "ইজতিবা" করেছেন। আপনি অনেককে পরীক্ষা করেছেন, সেখান থেকে যোগ্যতার ভিত্তিতে শ্রেষ্ঠ দুইজনকে বাছাই করেছেন। কেন আপনি এই দুইজনকেই বেছে নিয়েছেন এর পিছনে অবশ্যই আপনি গ্রহনযোগ্য ব্যখ্যা দিতে পারবেন ।
ধরুন আপনার গাড়ির একটা চাকা পাংচার হয়ে গিয়েছে। সেটা খোলার জন্য ২০ নম্বর সাইজের একটা স্ক্রু-ড্রাইভার লাগবে। আপনি আপনার টুলবক্স খুলে খুজে খুজে ২০ নম্বর স্ক্রু-ডাইভার বের করলেন। আপনি যেভাবে সঠিক সাইজের স্ক্রু-ডাইভারটা বেছে বের করেছেন এটার নামই হচ্ছে ইজতিবা। তাই ইজতিবা শব্দের পূর্ন অর্থ হচ্ছে- To Pick the right thing for the right task. You have a reason for your choice.
আগের আয়াতে আল্লাহ বলেছিলেন, তিনি নাবি-রাসুলদের বেছে নেন “ইসতিফা”-র মাধ্যমে। এখানে আল্লাহ আমাদেরকে বলেছেন, তিনি আমাদেরকে অর্থাৎ মুসলিমদেরকে বেছে নিয়েছেন “ইজতিবা”-র মাধ্যমে। দুইটি শব্দের অনুবাদেই Choose শব্দটি ব্যবহার করা হয়। কিন্তু এই দুইটি শব্দের মূল অর্থ মোটেও একরকম নয়।
আমরা যারা জন্মসূত্রে মুসলিম হবার অকল্পনীয় সোভাগ্য নিয়ে এই পৃথিবীতে এসেছি তারা অনেকেই হয়ত এরকম ধারনা পোষণ করি যে, এমনিই আমরা মুসলিম। আমাদের বাপ-দাদা মুসলিম, তাই আমরাও মুসলিম। আল্লাহ এখানে উত্তরটা দিয়েছেন এক শব্দেই। বিষয়টা মোটেও তা নয়। আমরা কেউই “এমনিই” মুসলিম নই। জন্মগত মুসলিম হোক আর রিভার্ট মুসলিম হোক, কে কে ইসলাম নামক নিয়ামতটি পাবে তা আল্লাহ নিজে তাঁর অসীম জ্ঞানের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আমি মুসলিম কারন আল্লাহ আমাকে সৃষ্টি করার লক্ষ কোটি বছর আগেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে আমাকে তিনি মুসলিম পরিবারে পাঠাবেন। একই কথা আপনার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
পৃথিবীতে প্রায় ৭০০ কোটি মানুষ আছে। এর মধ্যে মাত্র ১৫০ কোটি মানুষের মধ্যে আমরা একজন যারা “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বলার অকল্পনীয় সৌভাগ্য পেয়েছি। সবাই মুসলিম হবার সৌভাগ্য পায় না এ জীবনে।আমরা বুঝি আর না বুঝি, আল্লাহ আমাদের মধ্যে কোন না কোন যোগ্যতা দেখেছেন যে কারনে তিনি আমাদেরকে মুসলিম হিসেবে পাঠিয়েছেন।আমাদের সৌভাগ্য যেমন বড়, তেমনি আমাদের প্রত্যেকের উপর রয়েছে একজন মুসলিম হিসেবে অনেক বড় দায়িত্ব।
বাংলাদেশের প্রায় তিনদিক ঘিরে আছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় হিন্দু দেশ। এমন সম্ভাবনা খুবই প্রবল যে কয়েকশ বছর আগে আমাদের পুর্বপুরুষরা হিন্দু ছিলেন। তাদেরই মধ্যে কেউ একজন হয়ত “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বলেছিলেন, যার বংশধর হিসেবে আজকে আমরা ইসলাম ধর্ম পেয়েছি। আপনি মাত্র কয়েকশ কিলোমিটার দূরে ইন্ডিয়াতে একজন হিন্দু পরিবারে জন্ম নিয়ে সারাজীবন মূর্তিপূজা করে কাটিয়ে দিতে পারতেন। আপনি এই দেশেই একজন গারো, সাওতাল, মারমা পরিবারে জন্ম নিতে পারতেন, আপনার কাছে কেউ কোনদিনো ইসলামের বাণী নিয়ে যেতনা। কিন্তু আল্লাহ এর কোনটাই চাননি। আল্লাহ চেয়েছেন আপনি মুসলিম হবেন।
আপনি সমাজে অনেক মুসলিম দেখবেন ইসলাম মেনে চলতে যাদের খুব কষ্ট হয় ।এদের কাছে ইসলাম পালন করা মানেই একটা আতংক। এদের চিন্তাধারনাগুলো অনেকটা এরকম- ইসলাম মানেই রেস্ট্রিকশান।ইসলাম মানেই অগনিত নিয়ম।আমাকে নামাজ পড়তে হবে। প্রত্যেকদিন। ৫ বার। তাও মসজিদে যেয়ে। এই শীতের মধ্যে ভোরবেলায় ঠান্ডা পানি দিয়ে অযু করা কি যা-তা কথা? বাপরে বাপ! ইসলাম মানেই এটা হারাম, ওটা হারাম, সবকিছু হারাম। গান-বাজনা হারাম। আরে গান শুনলে ক্ষতিটা কি শুনি? বয়ফ্রেন্ড নিষেধ, গার্লফ্রেন্ড নিষেধ। আমাকে দাঁড়ি রাখতে হবে, হিজাব করতে হবে। আরে এত কম বয়সে কেউ এসব করে নাকি? এখন যদি আমি দাঁড়ি রেখে মোল্লা হয়ে যাই, কালকে থেকে আমি বন্ধুদের মধ্যে মুখ দেখাব কেমনে?বাজারে কত লেইটেস্ট ডিজাইনের ড্রেস চলছে, এখন সব বাদ দিয়ে আমাকে একটা ম্যাটম্যাটে বোরখা পরে ঘুরতে হবে? সুদ হারাম, ঘুষ হারাম। আরে ভাই ব্যাঙ্ক লোন না নিলে আমি বাড়িটা করব কেমনে? আর সব ঘুষই কি ঘুষ? এগুলাও তো একধরনের “গিফট” তাইনা?
এই ধরনের সাইকোলজির মানুষদের সবার মূল সমস্যা একটাই। এরা সবাই By Born Muslim. এরা একজনও এখনো By Choice Muslim হয়ে উঠতে পারেনি। এদের চিন্তাভাবনা সবই পার্থিব জীবনকে কেন্দ্র করে। কে কি বলবে, কে কি ভাববে এগুলো নিয়ে ভেবে ভেবে এদের চিন্তার কোন অন্ত নেই। পার্থিব জীবনের চিন্তাগুলোকে একটু পাশে সরিয়ে রেখে “কিভাবে আমি আমার স্রষ্টাকে খুশি করতে পারব” বা “যেহেতু আল্লাহ বলেছেন, অতএব তা অবশ্যই আমার ভালর জন্য” জাতীয় চিন্তা করতে এরা এখনো শেখেনি।
ইসলাম পালন করতে যদি কারোর খুব কষ্ট হয়, নিয়মের চাপে দম বন্ধ হয়ে আসে, মনে হয় যে “আমার দ্বারা এইসব সম্ভব নয়, মাপ চাই” তাহলে আল্লাহ এই আয়াতে প্রথমে আমাদেরকে মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, তিনি আমাদের মধ্যে ইসলাম পালন করার যোগ্যতা দেখেছেন। তিনি আমাদেরকে মুসলিম হিসেবে বেছে নিয়েছেন। তিনি জানেন আমরা পারব। আমরা না বুঝতে পারি, কিন্তু আমাদেরকে পূর্ন বিশ্বাস রাখতে হবে যে আল্লাহ আমাদের চেয়ে লক্ষ কোটিগুন বেশি জ্ঞানী। তাঁর হিসাবে কোন ভুল হয়না, তাঁর পরিকল্পনায় কোন খুঁত থাকেনা।
"তিনি তোমাদেরকে বেছে নিয়েছেন আর তোমাদের ধর্মের উপর কোন বোঝা চাপিয়ে দেননি। এটা তোমাদের পূর্বপুরুষ ইবরাহীম এর ধর্ম। "
এটুকু বলে আল্লাহ থামেননি। এরপর আল্লাহ আমাদেরকে মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে , তিনি আমাদের দ্বীন ইসলামের ভেতর কোন কষ্ট আমাদের উপর চাপিয়ে দেননি।তিনি আমাদের জন্য ইসলামকে সহজ করে দিয়েছেন। এখানেও আল্লাহ শেষ করেননি। উদাহরন হিসেবে তিনি আমাদেরকে আমাদের আদি পিতা ইবরাহীম (আ) এর কথা বলেছেন। এত মানুষ থাকতে ইবরাহীম(আ) কেন !!! আসুন ইবরাহীম(আ) এর জীবনের কয়েকটা “সহজ” ঘটনা দেখি।
বালক ইবরাহীমের গোষ্ঠী মূর্তিপূজা করত। তাঁর নিজের বাবা মূর্তি বানিয়ে বানিয়ে বিক্রি করত। পাথরের তৈরী মূর্তির কোন ক্ষমতা আছে এটা ইবরাহীম কখনোই মেনে নিতে পারেননি। নিজ ধর্ম না মানার ফলে তাঁকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। আকাশের চাঁদ তারা সূর্য দেখে ইবরাহীম বুঝে যান, এগুলো সবই সৃষ্টি। এগুলোর কোন ক্ষমতা নেই, ক্ষমতা রয়েছে শুধু তারই যিনি এগুলো সৃষ্টি করে নির্ধারিত কক্ষপথে প্রোগ্রাম করে রেখেছেন। আরেকটু বড় হলে ইবরাহীম(আ) কে আগুনের মধ্যে ফেলা হয়। ইবরাহীম(আ) এর শিশু হলে তাঁকে ও তাঁর মাকে জনমানবহীন মরূভুমিতে ফেলে আসতে হয় আল্লাহর ইচ্ছায়। সেই ছেলে বড় হলে তাঁকে আল্লাহর হুকুমে কুরবানী করার জন্য নিয়ে যেতে হয়।
কোথায় ইবরাহীম(আ) এর ঈমান, আর কোথায় আমাদের ঈমান ! ফেলে আসা তো অনেক দূরের কথা, আমরা আমাদের স্ত্রী ও নবজাতক শিশুকে নিয়ে এসি গাড়িতে করেও মরুভূমি দেখাতে নিয়ে যেতাম না !!আল্লাহ আমাদেরকে মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, তিনি আমাদের জন্য ইসলামকে সহজ করে দিয়েছেন। এরপরো যদি আমাদের ইসলাম মানতে কষ্টে বুক ফেটে যায়, তাহলে যেন আমরা একবার ইবরাহীম (আ) এর কথা চিন্তা করি। যে অকল্পনীয় পরীক্ষা, সংগ্রাম ও ত্যাগ তিনি আল্লাহর জন্য করেছিলেন তাঁর একশ ভাগের এক ভাগও আমাদেরকে আল্লাহর জন্য করতে হয়না। ইবরাহীম(আ) যদি কোন কমপ্লেইন না করেন, তাহলে আমাদের কিসের এত কমপ্লেইন??? কেন আমরা আল্লাহর উপর পূর্ন অবিচল আস্থা রেখে ইসলাম মেনে চলি না? যদি আল্লাহ ইবরাহীম(আ) এর পরীক্ষাগুলোকে পর্যন্ত সহজ করে দিতে পারেন, তাহলে আমাদেরকে কেন তিনি সাহায্য করবেন না যদি আমরা একটু চেষ্টা করি?
আমরা আল্লাহর পাঠানো শেষ নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অনুসারি(উম্মাহ)। আপনি, আমি, আমরা প্রত্যেকেই এর একটি অংশ। নবী মুহাম্মাদ সারা পৃথিবীতে শান্তির বানী ও স্রষ্টার পাঠানো একমাত্র সত্য ধর্ম ইসলামের যে মিশন শুরু করেছিলেন, তার বাহক এখন আমরা প্রত্যেকে। নবি ইবরাহীম(আ), নবী মুহাম্মাদ(স) যে পথ দেখিয়ে দিয়ে গেছেন আমরা সেই একই পথের পথিক। আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব এই মিশনকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। নবী মুহাম্মাদ(সঃ) মুসলিম উম্মাহর পুরো দায়িত্বভার নিজ কাঁধে একা বহন করে গেছেন, যেটা আজকে আমরা দেড়শ কোটি মুসলিম মিলেও পারিনা। নিঃসন্দেহে এটা অনেক বড় ও কঠিন দায়িত্ব। কিন্তু সবচেয়ে আনন্দের ও সৌভাগ্যের কথা হচ্ছে, আমাদের প্রত্যেকের মধ্যে আল্লাহ এই দায়িত্ব পালন করার মতন যোগ্যতা দেখেছেন বলেই তিনি আমাদেরকে বেছে নিয়েছেন।
ঐতিহাসিক কারন, ভৌগোলিক কারন, পারিবারিক কারন, বংশপরম্পরা ইত্যাদি কোনটাই আমাদের মুসলিম হবার পিছে আসন কারন নয়। আসল কারন হচ্ছে আল্লাহর ইচ্ছা। আল্লাহ চেয়েছেন তাই আমরা এই সৌভাগ্য পেয়েছি। যদি কেউ একটা বড় চাকরি পায় কিন্তু ঠিকমতন তার দায়িত্ব পালন না করে, তাহলে তার চাকরি চলে যায়।আমাদের সবাইকে খুব পরিষ্কারভাবে মনে রাখতে হবে যে মুসলিম পরিবারে জন্ম নিয়ে আমরা কেউ জান্নাতের টিকেট অগ্রীম বুকিং দিয়ে রাখিনি। আল্লাহর সাথে আমাদের কোন চুক্তি হয়নি যে আমরা জীবনের ৪০-৫০ বছর ফূর্তি করব, আর শেষ ১০ বছর একটূ নামাজ-কালাম-ওযিফা-টুপি-দাড়ি নিয়ে একটা মুসল্লী ভাব ধরে মৃত্যুর পর হাসতে হাসতে জান্নাতে চলে যাব। পরম ন্যায়বিচারক স্রষ্টার সাথে এইধরনের সস্তা প্রতারনা চলেনা।
আল্লাহ আমাদেরকে দয়া করেছেন, ইসলাম দিয়েছেন না চাইতেই। আমরা যদি ঠিকমতন সেটা পালন না করি তাহলে আমাদেরকে ইসলামের কোন প্রয়োজন নেই। নিজের হাতে সুবর্ন সুযোগ থাকার পরও স্বেচ্ছায় দিনের পর দিন ইসলামকে উপেক্ষা করতে থাকলে আমরা সেটার গন্ডী থেকে বের হয়ে যাব। আল্লাহ আমাদেরকে যেই সুযোগ দিয়েছিলেন সেটা অন্য কাউকে দিয়ে দিবেন যে আমাদের চেয়ে বেশি যোগ্যতা রাখে। ইসলাম একটি সম্মান, সবাই সেটার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনা। কয়েকজন নামধারী মুসলিম ইসলাম থেকে বের হয়ে গেলে ইসলামের কোন ক্ষতি হবে না। সবসময়ই অন্য কেউ না কেউ থাকবে যে ইসলামকে আরো সুন্দর করে ব্যবহার করবে। দুইটি ঘটনা দেখি-
শুভ-র ভাল নাম মুহাম্মাদ শফিকুল ইসলাম। তার নামটা একটি চমৎকার মুসলিম নাম, কিন্তু ইসলাম ধর্ম তার কাছে একফোটাও ভাল লাগত না। তার বাবা-মা তাকে নামাযের কথা বলতেন, কিন্তু সে নামাজ পড়ত না। তার জীবনের মূল উদ্দেশ্য ছিল কিভাবে আনন্দ ফূর্তি বিনোদন করা যায়। প্রথমে সে শুরু করল ভিডিও গেইম দিয়ে। সনি প্লে-স্টেশন, এক্স-বক্স, নিনটেন্ডো, কম্পিউটার গেইম ইত্যাদি সে খেলল ২০ বছর পর্যন্ত। ইউনিভার্সিটিতে উঠে সে শুরু করল গান-বাজনা, সিগারেট, গাজা, গার্ল-ফ্রেন্ড, ডিজে পার্টি । গোটা দশেক প্রেম করার পর ৩২ বছর বয়সে সে একটা বিয়ে করে। বিয়ের পরও তার এক্সট্রা ম্যারিটাল এফেয়ার চলতেই থাকে। আরেকটু বয়সে সে ক্লাবে যাওয়া আর মদ খাওয়া শুরু করে। তার বন্ধুবান্ধবের কোন অভাব ছিলনা, সে টাকা উড়াত পানির মতন। আল্লাহ শুভ ওরফে শফিক সাহেবকে সারাজীবন সুযোগ দিয়েছিলেন। সে নিজেই নিজের ধ্বংসের পথ বেছে নিয়েছিল। শফিক সাহেবের মৃত্যু হয় ফুসফুস ক্যান্সারে। দীর্ঘ দুই বছর অসহ্য যন্ত্রনায় ভুগে ভুগে তিনি হাসপাতালেই মারা যান। তার চিকিৎসক মৃত্যুর সময় তার পাশেই ছিলেন। তিনি অনেক চেষ্টা করলেন রোগীকে দিয়ে একবার হলেও “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বলাতে। বিস্মিত হয়ে তিনি লক্ষ্য করলেন, তার রোগী এই কথাটি বলতেই পারছেনা।
সজীব দে হিন্দু পরিবারের একটি ছেলে। সে যখন ক্লাস নাইনে পড়ে তখন থেকে তার ধর্ম নিয়ে অদম্য কৌতুহল।হিন্দু ধর্ম নিয়ে তার সবসময়েই খটকা ছিল। স্রষ্টার পাঠানো সত্য ধর্ম খুজতে খুজতে একদিন সে এক মিশনারির কাছে যেয়ে খ্রীষ্ট ধর্মে দীক্ষিত হয়ে এল। কিছুদিন পর একই সমস্যা, খ্রীষ্টান ধর্মেও প্রচুর অসংগতি। একই ধর্মের নানারকম ভার্সন। কি করা যায়? একদিন একটা বই পড়ল সজীব। বইয়ের নাম “ The Bible, The Qur'an and Science” । লিখেছেন একজন ফরাসী রিভার্ট মুসলিম, নাম “ ড. মরিস বুকাইলি ”। বই পড়ে ও বইয়ের তথ্যগুলো যাচাই করে সজীব নিশ্চিত হল যে ১৪০০ বছর আগে পাঠানো কুর’আন মানবরচিত কোন বই হতে পারেনা, এবং ইসলাম হচ্ছে একমাত্র সত্য ধর্ম। তার ইসলাম গ্রহনের কথা শুনে তার বাবা তাকে মারধোর করলেন, বড় ভাই ঘরে তালাবন্ধ করে রাখলেন, এবং মা কাঁদতে কাঁদতে বললেন- “পাগলামি করিস না”।
সজীব দে কে ত্যাজ্যপূত্র হয়ে বাড়ি ছাড়তে হয়। পৃথিবীতে আপন কেউ নেই তাঁর, শুধু একজন বাদে। এমন একজন, যিনি থাকলে আর কোনকিছুরই কোন দরকার হয়না। শুরু হয় ইসলামের পথে সজীবের যাত্রা। সজীব সত্যের অনুসন্ধানে বেরিয়েছিল, আল্লাহ তাকে ইসলাম দিয়েছেন। সজীবের এই ঘটনা একটি নিখাদ সত্যি ঘটনা। সে এই শহরেই আছে কোন এক জায়গায়। আল্লাহ তাকে ভাল রাখুন এবং যেভাবে তাকে পথ দেখিয়েছেন সেভাবে আমাদেরকে সঠিক পথের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখুন।
আপনি হয়ত রবার্ট ডাভিলার গল্প জানেন। যদি না জানেন আপনার উচিত হবে জেনে নেওয়া কারন এরকম ঘটনা আপনি আপনার জীবনে খুব বেশি পাবেন না।

রবার্ট একজন প্যারালাইজড মানুষ। সে ইসলাম খুজে পেয়েছিল স্বপ্নের মধ্যে। নবী মুহাম্মাদ(স) স্বপ্নের মধ্যে এসে তাঁর সাথে কথা বলে গেছেন। রবার্টের মধ্যে আল্লাহ কি দেখেছিলেন সেটা আমরা জানিনা, একমাত্র তিনিই জানেন। রবার্ট আল্লাহর কাছে এতই প্রিয় একজন বান্দা যে আল্লাহ তাকে ইসলাম উপহার দিয়েছেন অকল্পনীয় এক উপায়ে।
নিচের এই কথাগুলো একজন জন্মগত মুসলিমের। শুনুন তাঁর মুখ থেকেই-
" একজন মুসলিম হওয়া কোন সুবিধাও না, অসুবিধাও না। আমি বলব এটা অনেক বড় একটা দায়িত্ব। আপনাকে এই বিশাল উপহারটা দেওয়া হয়েছে, এবং আপনাকে এটা নিতে হবে। আপনাকে এই গিফট ব্যবহার করতে হবে আপনার মৃত্যু পর্যন্ত। কাজেই এটাকে হালকাভাবে নিবেন না। আমার বাবা একজন রিভার্ট মুসলিম ছিলেন। কনভার্টরা যা কিছুর মধ্যে দিয়ে যায় তাঁর সাথে সবই হয়েছিল। তাঁর পরিবার তাকে রিজেক্ট করেছিল। তিনি বাসায় গেলে দাদি শূকরের মাংস রাঁধতেন। দাদি বুঝতে পারতেন না কেন কেউ তার ধর্ম পরিবর্তন করে ফেলবে। আমার বাবাকে প্রথমদিকে কেউ মেনে নেয়নি। কিন্তু তিনি হাল ছাড়েননি, তিনি ধৈর্য ধরেছিলেন। পরিবর্তন এসেছিল খুব আস্তে আস্তে। আস্তে আস্তে তিনি তাঁর মাকে ও পরিবারকে বুঝাতে পেরেছিলেন। আমি আমার বাবাকে ও প্রত্যেক কনভার্টকে তাদের সাহসের জন্য শ্রদ্ধা ও সম্মান করি।
আমি কনভার্ট করার কথা কল্পনাও করতে পারিনা। কারন আমি তো সবচেয়ে সত্যি ধর্ম নিয়েই জন্মেছি। আমার কাছে বর্ন মুসলিমদেরকে মনে হয় যেন তারা কোটি কোটি টাকা নিয়ে জন্মগ্রহন করেছে। কেউ যদি জন্ম থেকেই কোটিপতি থাকে, তাহলে সে কখনো উপলব্ধি করতে পারবেনা দারিদ্র কি জিনিস। কাজেই একজন মানুষ যখন সত্য ধর্ম খুজতে খুজতে দিশেহারা হয়ে যায় তখন তার কেমন লাগে সেটা আমি আসলে কখনো বুঝতে পারবনা । আমি সবসময় আল্লাহকে ধন্যবাদ দেই যে তিনি আমাকে এই বিশাল উপহার দিয়েছেন। "
[https://www.youtube.com/watch?v=6MLyQv2hR0g]
একজন মুসলিম যে আল্লাহর সম্পর্কে সঠিক ধারনা পেয়েছে, সে কখনোই ইসলাম নিয়ে হাবিজাবি তর্ক বা কমপ্লেইন করেনা। একজন মুসলিম তার চিন্তার দৃষ্টিভঙ্গি পুরোটা তৈরী করে আল্লাহকে নিয়ে। সে এভাবে চিন্তা করে- “আল্লাহ আমাকে এই এই কাজগুলো করতে মানা করেছেন। কিন্তু এই কাজগুলো করতে মজা বেশি, আনন্দ বেশি। কিন্তু তারপরো আমি এই কাজগুলো করব না কারন এটাই আল্লাহর পরীক্ষা। আল্লাহ আমাকে দিনে ৫বার নামাজ পড়তে বলেছেন। হ্যা, হয়ত এই ঠান্ডার মধ্যে ভোরে অজু করে মসজিদে যাওয়া কষ্টকর, কিন্তু তারপরো আমি যাব। কারন যেহেতু এটা আল্লাহ আমাকে করতে বলেছেন, কাজেই এটাই আমার জন্য ভাল। তাছাড়া খুব কম মানুষই ফজরের নামাজ মসজিদে যেয়ে পড়ে। আমি খুব কম মানুষদেরই একজন হতে চাই। আমি চেষ্টা করি পৃথিবীতে যত বেশি সম্ভব বিনিয়োগ করে যেতে, যাতে আমি আখিরাতে আল্লাহর কাছ থেকে সেটার জন্য অকল্পনীয় পুরস্কার পাই। যেহেতু আল্লাহ আমাকে আশ্বাস দিয়েছেন তিনি আমার উপর কষ্ট চাপিয়ে দেননি, কাজেই আমি তাঁর কথা বিশ্বাস করব। যদি আমার কষ্ট হয়ও বা আমি অধৈর্যও হয়ে যাই, সেটা আমার সমস্যা, সেটা ইসলামের সমস্যা না। আমাকে চেষ্টা করতে হবে আমার সমস্যাগুলো দূর করার। ”

আপনি যদি আমার মতন জন্মগত মুসলিম হন তাহলে আমি আপনাকে অনুরোধ করব আপনি নিজেকে জিজ্ঞেস করেন- Am I Muslim by Born or Muslim By Choice? আপনি কি অনেকদিনের চর্চার অভাবে ইসলাম থেকে অনেক দূরে আছেন?আপনি কি নতুন করে মুসলিম হতে চান? আপনি আজকে থেকে নামাজ পড়া শুরু করুন। এটাই সমাধান। নামাজ মানেই আল্লাহর সাথে কানেকশন। আপনি নামাজ ঠিক করেন, সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।
আমরা সবাই নিজেদেরকে জিজ্ঞেস করি- "কেন আমাকে সৃষ্টি করা হয়েছে? কেন আমি মুসলিম? আমার জীবনের উদ্দেশ্য কি? জীবন মানে কি শুধুই আয়- রোজগার, পানাহার, আনন্দ-বিনোদন আর প্রজননের মতন নিছক জৈবিক চাহিদা পূরন? জীবন মানেই কি ভাল ভাল রেস্টুরেন্টে চেক-ইন করা আর সেলফি তুলে ফেইসবুকে আপলোড করা? নাকি আমাকে কে সৃষ্টি করেছেন, কেন আমাকে একটি অস্তিত্ব দিয়ে পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছে, তিনি আমার কাছে কি চান...এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুজে বের করা?
ছোটবেলায় বাংলা বইয়ে একটা গল্প ছিল। দাদা তাঁর ছোট নাতিকে বলছেন- দাদু দোয়া করি তুমি মানুষের মতন মানুষ হও। নাতি প্রশ্ন করেছে- মানুষের মতন মানুষ হয় কেমন করে দাদু?
আমরা যেন মুসলিমের মতন মুসলিম হই। প্রতিদিন যেন আমরা এই পৃথিবীর মাত্র ৬ ভাগের ১ ভাগ মুসলিম হবার জন্য আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। কুর'আন থেকে শিক্ষাগুলো উপলব্ধি করে যেন আমরা আমাদের জীবনে কাজে লাগাই। পৃথিবীতে কত সামান্য কষ্ট ও বিনিয়োগের জন্য আল্লাহ আমাদেরকে যে অনন্তকালের শান্তির জীবনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন সেটা যেন আমরা প্রতিমূহুর্তে মনে রাখি।

আল্লাহ্‌ শপথ নিচ্ছেন

আল্লাহ্‌ শপথ নিচ্ছেন
ঘটনা ১-
আপনার বড় ভাইয়ের সাথে আপনার তুমুল কথা কাটাকাটি হচ্ছে। একটা ভাল বড় ভাই পাওয়া বেশ ভাগ্যের ব্যাপার, সবার কপালে সেটা জুটে না। পিঠাপিঠি দুই ভাই থাকলে সাধারনত বড়ভাইরাই একটু সুবিধা পায়, যখন তখন মনের আনন্দে যন্ত্রনা দিতে পারে ! আপনার ভাই তাঁর ক্রিকেট খেলার জার্সিটা খুঁজে পাচ্ছেনা। কিছুক্ষন এই রুম ঐ রুম খুঁজে সে আপনার কাছে এসে বলল- “এই আমার জার্সি দে। নিশ্চয়ই তুই পরেছিলি ঐটা।"
আপনি পড়ার টেবিলে বসে ছিলেন। আপনার মেজাজ খারাপ হয়ে গেল।
- “আমি নেই নাই ভাইয়া ”।
সে আপনার দিকে বিষদৃষ্টিতে তাকিয়ে গোঁয়ারের মতন বলল- “তোর কথা বিশ্বাস করিনা। তুই-ই নিয়েছিস। এর আগেও তুই আমার জার্সি পরে বাইরে গিয়েছিলি। জানিসনা না বলে অন্যের জিনিস নিলে সেটা চুরি হয়? তুইতো একটা চোর !” শুধু এই বলেই সে থামলনা। লাফাতে লাফাতে সে মায়ের কাছে গেল আর আপনার নামে কমপ্লেইন করতে লাগল।
আপনার মনে হল রাগে আপনার মাথা এখনি বিস্ফোরিত হয়ে যাবে। প্রথমে চোর অপবাদ, তারপর মিথ্যা অভিযোগ, এটা কারোর সহ্য হয়? রাগে ক্রোধে আপনার ইচ্ছা হল তাকে ছিন্নভিন্ন করে দিতে। কিন্তু চাইলেই সব করা যায়না। একদৌড়ে আপনি মায়ের রুমে গেলেন। শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে চিৎকার করে বললেন- “আল্লাহর কসম! খোদার কসম ! আমি নেই নাই তোর জিনিশ !! লজ্জা করেনা তোর এতগুলা মিথ্যা কথা বলতে ?? “
আপনার ক্রোধে আগুনঝরা রক্তচক্ষুর দিকে তাকিয়ে আপনার ভাই বুঝে নিল যে অবস্থা সিরিয়াস। সে এটাও বুঝে নিল যে, আসলেই আপনি সত্যবাদি। মাথা নিচু করে সে আপনার সামনে থেকে চলে গেল।
ঘটনা ২-
আপনি ক্লাসে বসে মনোযোগ দিয়ে একটা অঙ্ক করার চেষ্টা করছেন। আপনার দুষ্ট বন্ধুটি অনেকক্ষন ধরে নানাবিধ উপায়ে আপনাকে জ্বালাতন করে যাচ্ছে। কিছুক্ষন আপনাকে পেছনে থেকে পেন্সিল দিয়ে খোঁচাল। আপনি চরম বিরক্ত হলেন - "দোস্ত ডিস্টার্ব করিসনা প্লিজ"।
কে শুনে কার কথা ! দ্বিগুন উদ্যমে সে শুরু করল। কাগজ পাকিয়ে একটা চিকন নল বানিয়ে সে আপনার কানের মধ্যে ঢুকানোর চেষ্টা করতে লাগল। কানের ভিতরে একটা খোচা খেয়ে আপনি ভয়ঙ্কর চমকে গেলেন। আপনার হাতের ধাক্কা লেগে টেবিলে রাখা পেপসির ক্যানটা উলটে গিয়ে সারা টেবিল মাখামাখি হয়ে গেল। প্রচণ্ড রেগে গিয়ে হাতের মুঠি পাকিয়ে আপনি আপনার বন্ধুকে বললেন- " I SWEAR to God, I'll Kill you man"
আমি দুটি সিরিয়াস দৃশ্য তুলে ধরার চেষ্টা করেছি উপরে। সিরিয়াস ঘটনা আমাদের জীবনে প্রায়ই ঘটে। কোন বিষয়ে উত্তেজিত হতে থাকলে আমরা গলার স্বর চড়াতে থাকি। অবস্থা আরো বেশি সিরিয়াস হয়ে গেলে আমরা শপথ নেই, কসম করি । যেহেতু আল্লাহ সবচেয়ে বড় ও মহান ও পবিত্র, তাই যখন কেউ আল্লাহর শপথ নিয়ে কোন কথা বলে, স্বাভাবিকভাবেই আশেপাশের মানুষ (Audience) বুঝতে পারে যে অবস্থা আসলেই সিরিয়াস। শপথ নিয়ে কথা বলা কোন ফাজলেমী বা মশকরা নয়। বিনা কারনে মানুষ শপথ নেয় না। মানুষ কোর্টে শপথ নেয়, সাক্ষ্য দেবার সময় শপথ নেয়।শপথের অন্যান্য প্রতিশব্দগুলো হচ্ছে কসম, oath, swear।
আল্লাহ কিভাবে শপথ নেন, আল্লাহ কেন শপথ নিয়েছেন কুর’আন এ, সেটার একটা নমুনা এই আর্টিকেল এ দেখানো হয়েছে। এই আর্টিকেল এ কুর'আনের ১০০ নম্বর সূরার ( আল-আদিয়াত) ভাষাগত সৌন্দর্য তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। আপনাকে মনে রাখতে হবে যে , পুরো কুর'আন এ যতগুলো শপথ নিয়েছেন আল্লাহ্‌, সবগুলোর পিছেই এরকম কোন না কোন শিক্ষা আছে। এই আর্টিকেল এ আরো যে কয়টি বিষয় দেখান হয়েছে-
[] কুর’আনের সূরাগুলো ইচ্ছেমতন কোন র‍্যান্ডম অর্ডার এ লিপিবদ্ধ করা হয়নি। কোনটার পরে কোনটা হবে এটা আল্লাহ নিজে তাঁর জ্ঞান দিয়ে ঠিক করেছেন। প্রত্যেকটি সূরা তার আগের বা পরের সূরার সাথে কোন না কোন সম্পর্ক বজায় রাখে। এখানে সেটার একটু নমুনা দেখান হয়েছে।
[] এখানে Quranic Imagery দেখানো হয়েছে। কুর’আন প্রচন্ড শক্তিশালী একটি রিমাইন্ডার। কখনো কখনো আল্লাহ মূল মেসেজটা বলার আগে একটা তীব্র দৃশ্য তৈরী করে নেন, এটাকেই বলা হয় Imagery.
[] কিভাবে অনুবাদে ভাব হারিয়ে যায় সেটা এখানে দেখানো হয়েছে। এজন্য মোটামুটি ভাবানুবাদ দেয়া হয়েছে, তারপরে মূল আরবি শব্দগুলোর ব্যখ্যা দেওয়া হয়েছে। আরবি যারা পড়তে পারেন না সেজন্য আরবি উচ্চারন ( Transliteration) দেয়া হয়েছে।
প্রত্যেকটি শপথের দুটি অংশ আছে- সাবজেক্ট আর অবজেক্ট। উপরের ১ম ঘটনায় আপনি একটা শপথ নিয়েছিলেন।
Object = যেটার নামে শপথ নেয়া হয়। The Thing being sworn by. [ আল্লাহর কসম, খোদার কসম]
Subject= যে তথ্যটি আপনি জানাতে চাচ্ছেন। The answer to the oath. [আমি নেই নাই তোর জিনিস]
মানুষ কেন শপথ নেয়? মানুষ কেন কসম কাটে? আপনি শপথ করেছিলেন তার কারন ছিল-
[] আপনি প্রচন্ড সিরিয়াস ছিলেন। একই কথা যদি আপনি স্বাভাবিকভাবে নরমাল টোনে বলতেন, আপনার কথা ততটা বিশ্বাসযোগ্য হত না।
[] আপনি শপথ করে আপনার কথার প্রতি শ্রোতার দৃষ্টি আকর্ষন করলেন।
[] ভয় দেখাতে, থ্রেট দিতে।
কথার মাঝে শপথ নেওয়ার এই প্রথা নতুন কিছু না। প্রাচীন আরবরাও একই কাজ করত।কথার মাঝখানে উত্তেজিত হয়ে গেলে, বা সিরিয়াস কিছু বললে, বা শ্রোতার মনোযোগ ধরে রাখার জন্য তারা তাদের জীবনের গুরূত্বপূর্ন জিনিসগুলোর নামে শপথ নিত। সেটা হতে পারে তাদের জীবন, বাবা-মা, তলোয়ার, ঘোড়া। আরবিতে যেকোন শপথ শুরু হয় ("wa" وَ) দিয়ে। আরবদের মধ্যে খুবই প্রচলিত একটা শপথ ছিল Wallahi= I swear by Allah।
কুর'আন আমাদের যুগে আসেনি। কুর'আন এসেছিল ১৪০০ বছর আগে একটি আরব সমাজে। কুর'আনের পুরো মেসেজ উপলব্ধি করতে হলে আমাদেরকে সেই সময়ে আরবদের জীবন সম্পর্কে জানতে হবে। ইন্টারনেট ও তথ্য প্রযুক্তিকে ধন্যবাদ, আরবদের জীবন ও ইসলাম নিয়ে প্রচুর ভাল ভাল ডকুমেন্টারী এখন পাওয়া যায় । কুর'আনে আল্লাহ্‌ বহুবার শপথ নিয়েছেন। ৩০তম পারায় শেষ ৩৭ টি সূরায় আল্লাহ্‌ যে সবের নামে শপথ নিয়েছেন সেগুলোর কিছু কিছু এখানে দেয়া হল-
ফেরেশতা, মহাকাশ, কিয়ামতের দিন, ভোর, দশ রাত, জোড়-বিজোড়, মক্কা শহর, সূর্য, চাঁদ, পৃথিবী, মাটি, মানুষের রূহ, আল্লাহ্‌, ভোরের আলো, রাতের অন্ধকার, ডুমুর, জলপাই, যুদ্ধের ঘোড়া, সময় ।
আল্লাহর করা শপথের মধ্যেও সাবজেক্ট ও অবজেক্ট রয়েছে। সেটার চেয়েও বেশি গুরুত্বপুর্ন হল, তাঁর শপথের সাবজেক্ট ও অবজেক্ট এর মধ্যে একটা নিবিড় সম্পর্ক আছে। যখনি আল্লাহ্‌ কুর'আনে শপথ নিয়েছেন তারমানে সেখানে তিনি অত্যন্ত সিরিয়াস কোন মেসেজ আমাদেরকে দিয়েছেন। কুর'আনের কথাগুলোর বাচনভঙ্গির সাথে প্রাচীন আরবদের বাচনভঙ্গীর মিল আছে । একারনে যখনি তারা নাবি(স) এর মুখ থেকে কুর'আন শুনত, তাদের অনেকেরই অনূভুতি হত এরকম-
- " একি !! মুহাম্মাদ এগুলো কি বলছে ? ওকে আমি ছোটবেলা থেকে চিনি। এরকম শক্তিশালী কথা তো আমি জীবনেও কখনো শুনিনি। এভাবে কথা বলা কোন মানুষের পক্ষে সম্ভব না। আমি এখনই সাক্ষী দিচ্ছি যে আল্লাহ ছাড়া আর কোন উপাস্য নেই, আর মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। "
বহু কাফের আরব কুর'আনের আয়াত শুনামাত্র সাথে সাথে মুসলিম হয়ে গেছে এরকম অগনিত নজির আছে। আরবদের কাছে কুর'আনের ভাষা বোঝা সহজ। কুর'আনের ভিতরে যে প্রচন্ড শক্তিশালী ভাষাগত সৌন্দর্য ও আবেগ( Linguistic Beauty) আছে সেটা সহজেই তারা ধরতে পারত। সেই হুবহু একই আবেগ আমরাও ধরতে পারব যদি আমরা আরবি ভাষা ও গ্রামার ব্যবহার করে কুর'আন-কে বোঝার চেষ্টা করি। আধুনিক যুগে এসে অতিরিক্ত মর্ডান মানুষে পরিনত হয়ে আমরা আসলে মানুষের খোলসবিশিষ্ট একটি অন্তঃসারশূন্য জৈবিক প্রানীতে এসে ঠেকেছি। হিন্দী সিনেমার সস্তা ডায়লগ শুনে আমাদের বুকের ভিতর হুহু করে উঠে। রোমান্টিক সিনেমা আর বই পড়ে আমরা কেঁদে বুক ভাসাই। সবকিছুই আমাদের আবেগকে নাড়া দেয়, একমাত্র আল্লাহর কথাগুলো ছাড়া। দোষ যে পুরোপুরি একপাক্ষিক, সেটাও আসলে বলা যাবেনা। এই ধরনের কমপ্লেক্স সমস্যাগুলোর পিছে নানারকম কারন আছে (Multi factorial causes) । ছোট একটা নমুনা আমি দেখাচ্ছি।
সমাজে কুর'আন নিয়ে কারা পড়াশুনা করে এটা চিন্তা করতেই অটোমেটিক্যালি আমাদের মনের পর্দায় যে প্যারামিটারগুলো ফুটে উঠে তা অনেকটা এরকম- মাদ্রাসার ছাত্র। রঙ জ্বলা ফিকে আধময়লা পাঞ্জাবি-পায়জামা, বা জোব্বা। দাড়ি আছে, মাথায় টুপি আছে। চেহারায় খুব বেশি শিক্ষার ছাপ নেই। কথাবার্তায় যথেষ্ট "স্মার্টনেস" নেই। দামি স্কুল-কলেজ-ভার্সিটির ব্যাচেলরস মাস্টার্স ডিগ্রী নেই। পান খাওয়া দাঁত। বিজ্ঞান-আধুনিক প্রযুক্তি-কারেন্ট ওয়ার্ল্ড সম্পর্কে তেমন কিছু জানেনা। কুসংস্কারাচ্ছন্ন। কথার মাঝখানে বারবার ঈমান/এক্বীন/ ফায়দা/ মেহনত/ওলামা/বুজুর্গ/ হুজুরে পাক/ আল্লহর কুদরত শব্দগুলোর ব্যবহার। সমাজে হুজুর/মাওলানা/ মোল্লা/ মুন্সী নানা নামে পরিচিত, কৌতুক ও ব্যঙ্গাত্মক হিসেবেই নামগুলো বেশি প্রচলিত। হুজুরদের নিয়ে বানানো ট্রল সামাজিক মাধ্যমগুলোতে বিনোদনের একটি হট আইটেম। সমাজের শিক্ষিত শ্রেনীর সাথে এদের বেশ ভাল একটা কমিউনিকেশন গ্যাপ তৈরী হয়ে গেছে। ধর্মীয় প্রয়োজন ছাড়া এনাদের সাথে সাধারন মানুষজনের তেমন একটা মেশা হয়না। অনেকটা তেল আর জলের মতন; ঝাকাবেন, কিন্তু মিশবে না।
কুর'আনের একজন ছাত্রের যে চিত্র/ধারনা কখনো আমাদের মাথাতেই আসেনা তা হল- ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। বড় মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীর কর্মকর্তা। একজন ডাক্তার। একজন ইউনিভার্সিটির শিক্ষক। একজন প্রোগ্র্যামার। একজন সফটওয়্যার ডেভেলপার। একজন আরকিটেক্ট। একজন জীববিজ্ঞানী। আমাদের ধারনা অনুযায়ী, সমাজের এই স্তরের উচ্চশিক্ষিত লোকজন কুর'আন পড়ে না, কুর'আন নিয়ে গবেষনা করেনা, চিন্তা করে না। এরা কেন করবে? কুর'আন নিয়ে তো পড়বে ঐসব অর্ধ শিক্ষিত হুজুররা, যারা জীবনে তেমন কিছু করতে পারেনি। আমাদের কাজ বিজ্ঞান পড়া, গবেষনা করা। উনারা ধর্মকর্ম করবেন...এইতো। Were not their type. We're Muslims, but not "that" muslim !
একদম না। মোটেও না। কখনোই না। পৃথিবীর যেকোন ধর্ম , বর্ন , পেশার মানুষ কুর'আন নিয়ে স্টাডি করতে পারে। কুর'আন কাউকে "হুজুর" খেতাব দেওয়ার জন্য নাযিল হয়নি বা এটা কোন "হুজুরদের বই" না। এটি পৃথিবীর প্রত্যেকটি মানুষের জন্য একটি কমপ্লিট ইন্সট্রাকশন ম্যানুয়াল।আমাদের রোগগুলো হচ্ছে কূর'আনের প্রতি অনীহা/ ভাল-না-লাগা / কিছু-না-বোঝা/ ইসলাম-ফোবিয়া/ হুজুর এলার্জী... ইত্যাদি ইত্যাদি এবং ইত্যাদি। আমাদের পক্ষ থেকে আমাদের গাফিলতি/অপরাধ হচ্ছে কুর'আনের মেসেজ বোঝার চেষ্টা না করা। আমরা এমন একটি উন্নত সময়ে বাস করি যখন রিসোর্স কোন সমস্যাই না। বরং উলটা সমস্যা হতে পারে, এত এত রিসোর্সের মধ্যে কোনটা ফেলে কোনটা শিখব সেটা নিয়ে কনফিউশান তৈরী হতে পারে ! যেখানে সাহাবারা একটা হাদিস শিক্ষা করার জন্য দিনের পর দিন সফর করতেন, সেখানে আমরা মনিটরের সামনে বসেই সবকিছু পেয়ে যাচ্ছি, কিন্তু তারপরো শিখছি না। আমাদের প্রত্যেককে মনে রাখতে হবে, একদিন আমাদেরকে এই সবকিছুর পাই-পাই অনু-পরমানু হিসাব দিতেই হবে, আমরা চাই আর না চাই। সেদিন আমরা আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে কখনো বলতে পারব না যে আমাদের শেখার সুযোগ ছিলনা। কখনো না।
মানুষ একটি বিনোদনপ্রিয় জীব। হাজার বছর আগেও মানুষ বিনোদন করত, এখনো করে। সময়ের সাথে সাথে বিনোদনের মাত্রা পাল্টেছে, কিন্তু বিনোদন বন্ধ হয়নি কখনো। আজকের যুগে আমরা হাই রেজ্যুলেশন থ্রিডি সিনেমা দেখি। যুদ্ধের সিনেমা, একশান সিনেমা, এগুলোসবসময়েই মানুষের প্রিয়, বিশেষত ছেলেদের ! আরবদের সময়ে সিনেমা দেখার ব্যবস্থা ছিলনা। তারা মুখে মুখে ছড়া তৈরী করত। কবিতার লড়াই ছিল তাদের অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি বিনোদন। আমাদের দেশে এখনো কোন কোন গ্রামাঞ্চলে "কবির লড়াই" প্রচলিত আছে। কবিতার কথাগুলোকে আরবরা নিজেদের মনের মধ্যে কল্পনা করে একধরনের সিনেমা দেখতে পেত। কুর'আন প্রাচীন আরবদের কথা বলার, কবিতা বলার এই বাকরীতি অনেকটাই ধরে রেখেছে। এ কারনে কুর'আনের ভাষা না গদ্য, না পদ্য। কুর'আনের সুরাগুলো কোন কবিতা নয়, কিন্তু আবার লাইনে লাইনে কেমন অদ্ভূত একটা ছন্দ আছে। মুসলিম , এমনকি অমুসলিম ভাষাবিদরা পর্যন্ত স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন যে আরবি ভাষায় এরচেয়ে শক্তিশালী কোন মৌখিক কাব্য রচিত হয়নি এর আগে।
আসুন সূরা আদিয়াতের গঠনটা দেখা যাক। এটা ১০০ নম্বর সূরা, কিন্তু নাযিলের ক্রম ( Revelation Order) অনুযায়ী এটা ১৪ নম্বর সূরা। এটা একটা মাক্কী সূরা, যার অর্থ এটার মেসেজ প্রথমে এসেছিল মক্কার কুরাইশদের কাছে। যেহেতু এটা ১৪ নম্বর সূরা, তারমানে এটা একটা Early Meccan Sura. মক্কার প্রথম ১৩ বছর নাবি মুহাম্মাদের (স) জন্য অত্যন্ত কঠিন ও দুঃসহ একটি সময় ছিল। এ সময়ে তাঁকে আরব সমাজের সীমাহীন অত্যাচার, গালাগালি, কটূ কথা সহ্য করতে হয়েছে। আমি এখানে সেগুলো বিস্তারিত বলতে চাচ্ছি না।
এর আগের সূরা হচ্ছে সূরা যিলযাল( The Earthquake) । এখানে দেখানো হয়েছে যে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, ভয়ঙ্করভাবে কাঁপছে। পৃথিবী তার ভেতরের সব জিনিস উগলে দিচ্ছে। আতঙ্কে পাথর হয়ে মানুষ জানতে চাইছে- "কি হয়েছে এর !!?". সূরা আদিয়াত সুরা যিলযাল এর ঘটনাকে জাস্টিফাই করছে। এখানে আল্লাহ্‌ দেখাচ্ছেন কি কি কারনে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে একদিন। কি কি অন্যায় মানুষ করে যাচ্ছে দিনের পর দিন যার কারনে পৃথিবী একদিন ধ্বংস হয়ে যাবে।
এই সূরায় আল্লাহ মূলত একটি শপথকে ব্যাখ্যা করেছেন। প্রথম ৫ আয়াতে তিনি আরবদের মনে একটি একশান সিনেমার মতন দৃশ্য তৈরী করে আগ্রহ জাগিয়ে তুলেছেন। তারপরের ৬ আয়াতে তিনি তাঁর মূল মেসেজটি দিয়েছেন। আপনি যদি ভুলে গিয়ে থাকেন তাহলে আমি আপনাকে আবার মনে করিয়ে দিচ্ছি যে, প্রত্যেকটি শপথের দুটি অংশ আছে- সাবজেক্ট আর অবজেক্ট । এই সূরায় প্রথম ৫ আয়াতে আল্লাহ্ তাঁর শপথের অবজেক্ট জানিয়েছেন, তারপরের ৬ আয়াতে সেটার সাবজেক্টকে ব্যাখ্যা করেছেন।
Object = যেটার নামে শপথ নেয়া হয়। The Thing being sworn by.
Subject= যে তথ্যটি বক্তা জানাতে চাচ্ছেন। The answer to the oath.
এই সূরাটার বাংলা অনুবাদ করলে সেটা খুব একটা প্রাঞ্জল হয় না, সেকারনে আমি সাথে একটা ইংরেজি অনুবাদ দিলাম। অনুবাদে আল্লাহর কথার যে অসাধারন বিষয়গুলো হারিয়ে যায় সেটাই আমি তুলে ধরার চেষ্টা করি মাত্র। আর এটাও মাথায় রাখতে হবে যে বিক্ষিপ্তভাবে বিচ্ছিন্ন কোন/কয়েকটি আয়াত পড়ে আসল তথ্যটা সঠিকভাবে পাওয়া যাবেনা, যদি না আপনি মূল টপিক ও পটভূমি ( যেটাকে Context বলে) ধরতে না পারেন। এ কারনেই আপনি খেয়াল করবেন কুর'আন এ একটু পর পর আল্লাহ্‌ প্রসংগ পরিবর্তন করে ফেলেছেন, যেটা সম্পূর্ন তাঁর উদ্দেশ্যপ্রণোদিত (Intentional) ও সেটার পিছে অসাধারন কোন সৌন্দর্য অবশ্যই আছে। মূল কুর'আন বোঝার ক্ষেত্রে অনুবাদের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত এই প্রশ্নগুলোর প্রতি-
"আল্লাহ্‌ এখানে কি বলতে চেয়েছেন? আল্লাহ্‌ কেন এই কথাটা বললেন? আল্লাহ্‌ শুধুই আমার জন্য কি বললেন এই লাইনে? আল্লাহ্‌ কেন এই ঘটনাটা বলেছেন আমাকে? এখানে আমার জন্য কি কি নির্দেশ ও গাইড্যান্স আছে? এই লাইনের শিক্ষাটা আমি কিভাবে আমার জীবনে কাজে লাগাতে পারি?কেন এখানে আল্লাহ্‌ হঠাৎ করে টপিকটা পালটে দিলেন? কি শিক্ষা আছে এটার মধ্যে? "
আসুন আমরা আরবের দিনগুলো একটু কল্পনা করি, কারন কুর'আন বোঝার জন্য সেইদিনগুলো কেমন ছিল এটা জানা আমাদের জন্য জরুরী। মনে করুন কয়েকজন আরব এক জায়গায় বসে কথাবার্তা বলছে। সূরা আদিয়াত নাযিল হয়েছে, একজন সেটা নাবি মুহাম্মাদ(স) এর মুখ থেকে শুনে এসেছে একটুআগে, এখন সে সেটা তার বন্ধুদের শুনাচ্ছে। আল্লাহ্ সূরা আদিয়াত শুরু করেছেন এভাবে-
وَٱلۡعَـٰدِيَـٰتِ ضَبۡحً۬ا (١) - Wal ‘Aadiyaati Dab’Haan
"I swear by the charging battle horses those pant"
"সেই যুদ্ধের ঘোড়াগুলোর শপথ, যারা প্রচন্ড গতিতে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে আসে"
আরবিতে যেকোন শপথ শুরু হয় ("wa" وَ) দিয়ে। আরবি একটি অত্যন্ত concise ভাষা। অনেকসময়ই কুর’আনে এমন শব্দ আসে যেটার পূর্ন ভাবার্থ বাংলা বা ইংরেজি অনুবাদে ঠিকমতন ফুটে না ওঠায় সেখানে ঠিক কি বোঝানো হয়েছে তা পাঠক বুঝতে পারেনা।
আরবিতে Adiy= প্রচন্ড গতিতে ডাইনে বামে না তাকিয়ে কোন কিছুর দিকে ছুটে যাওয়া। ঠিক যুদ্ধের ময়দানে যোদ্ধারা যেটা করত আগের দিনে।
aadiyAAT (feminine)= ৮-১০ টির মতন মাদী যুদ্ধের ঘোড়ার একটি ছোট দল।
Dab’Haan, ضَبۡحً۬ا= হাঁপান/ জোরে জোরে শ্বাস নেয়া/ panting of the war horse in its aggression। ঘোড়া যখন তার সর্বোচ্চ গতিতে দৌড়াতে থাকে তখন সে নাক দিয়ে ফোঁস ফোঁস করে শব্দ করে শ্বাস নেয় ও হাঁপায়। এটাকেই দব’হা বলে।
ঘোড়া?!? ঘোড়া কেন?? এত কিছু থাকতে আল্লাহ, যিনি মহাবিশ্বের স্রষ্টা, তিনি কেন ঘোড়ার শপথ নিচ্ছেন এখানে??আসুন আমরা বোঝার চেষ্টা করি।
সেই সময়ের একজন আরবের কাছে তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন জিনিসগুলো ছিল- সম্মান, বংশ-মর্যাদা, আভিজাত্য, গোত্র, বাহন(ঘোড়া), যুদ্ধ, ইত্যাদি ।আপনি একটিও পুরান দিনের যুদ্ধের সিনেমা দেখেননি যেখানে ঘোড়া নেই। পৃথিবীতে আজকের দিনেও যতগুলো ঘোড়ার জাত (breed) আছে তার মধ্যে এক নম্বর হল অ্যারাবিয়ান হর্স। গুগল এ “World's best Horse Breed” দিয়ে সার্চ করলে ১ নম্বরে যেটা আসে সেটা হচ্ছে অ্যারাবিয়ান হর্স।

হাজার হাজার বছর ধরে আরব মরু বেদুইনরা বাহন ও যুদ্ধের জন্য আরবীয় ঘোড়াকে ব্রিডিং করে এসেছে। মরুর প্রচন্ড রুক্ষ কর্কশ ও বন্ধুর জলবায়ুতে টিকে থাকার জন্য আরবীয় ঘোড়াগুলোর ফুসফুসের আকার হত বিশালাকার ও স্ট্যামিনা ছিল অসাধারন।রুক্ষ পরিবেশে মানুষ ও ঘোড়াকে খাবার ও পানি শেয়ার করে চলতে হত, এমনকি কখনো একই তাবুতে থাকতে হত। মানুষের সাথে থাকতে থাকতে এই ঘোড়াটির মানুষের সাথে অত্যন্ত নিবিড় সম্পর্ক ডেভেলপ করে হাজার হাজার বছর ধরে। মূলত যুদ্ধের হাতিয়ার হিসেবেই এই ঘোড়া ব্যবহার করত আরব বেদুইনরা। আরব বেদুইনদের মরুর জীবনে ঘাত-সঙ্ঘাত লেগেই থাকত। যে যখন পারত আরেক কাফেলা দলকে লুটপাট করে নিত। ঝড়ের গতিতে হামলা চালিয়ে একদল বেদুইন দস্যু আরেকদলের উট, দুম্বা, ভেড়া, বকরির পাল লুঠ করে নিত। এ কাজ তারা শুধু তখনই করতে পারত যদি তাদের কাছে দ্রুতগতির কিছু ঘোড়া থাকত।

চেঙ্গিস খান, নেপোলিয়ন, আলেকজান্ডার দা গ্রেট, জর্জ ওয়াশিংটন এরা সবাই আরবীয় ঘোড়া চালিয়েছেন। একজন আরব কয়টি ভাল ঘোড়ার মালিক সেটা দিয়ে তাদের সম্পদ ও মর্যাদা বিচার করা হত। মূল্যবান এই প্রানীটির প্রজননের ব্যাপারে আরবরা অত্যন্ত সাবধানী ছিল, কারন ক্রস-ব্রিড হয়ে গেলে এই রাজকীয় প্রানীটির মূল্য হারিয়ে যেত। তাই আজকের দিনেও যেসব Pure Bred আরবীয় ঘোড়া পাওয়া যায়, সেগুলো হুবহু সেই হাজার বছর আগের প্রাচীন আরবের ঘোড়াগুলোর মতই। এরাবিয়ান হর্স এসোসিয়েশন এর অনলাইন মার্কেটে ঢুকে আমি দেখেছি এখানে ঘোড়ার দাম সর্বোচ্চ ৬০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত আছে। নাবি মুহাম্মাদ(স) তাঁর অনুসারীদের নির্দেশ দিয়ে গিয়েছিলেন যেন তারা আরবি ঘোড়ার প্রতি যত্নবান ও দয়ালু হয়। তিনি আরো বলে গিয়েছিলেন যেন তারা মাদি ঘোড়াগুলোকে বিশেষ মনোযোগ দিয়ে যত্ন করে, কারন এদের উপরই বংশ নির্ভর করে।

আল্লাহ এখানে ঘোড়ার শপথ নিচ্ছেন। সাধারন কোন ঘোড়া নয়, আরবীয় ঘোড়া। সাধারন কোন আরবীয় ঘোড়া নয়, আরবীয় যুদ্ধের ঘোড়া। শুধু যুদ্ধের ঘোড়া বলেও আল্লাহ থামেননি, আল্লাহ বলেছেন- মাদী যুদ্ধের ঘোড়া। মাদী ঘোড়া পুরুষ ঘোড়ার চেয়ে জোরে ছুটতে পারে বলে যুদ্ধের জন্য সেটা আরবদের বেশি পছন্দ ছিল। একজন আরব বেদুইনের কাছে সবচেয়ে দামি সম্পদ ছিল তার মাদি ঘোড়া। ঘোড়া ছাড়া একজন আরব তার জীবন কল্পনা করতে পারত না তখন। ২০১৪ সালের শহুরে যান্ত্রিক জীবনে এসে ঘোড়া বিলুপ্ত হয়ে গেলেও এখনো শখের বশে আদর করে বহু দেশের মানুষ এই রাজকীয় প্রানীটিকে নিজের জীবনে স্থান দিয়ে রেখেছেন। আল্লাহ এখানে যেধরনের এলিট ঘোড়ার কথা বলছেন প্রতিটি আরব স্বপ্ন দেখত এমন একটি ঘোড়ার সৌভাগ্যবান মালিক হবার। পাহাড়ের মতন প্রকান্ড কালো চকচকে শক্তিশালী একটা ঘোড়া কে না চায়? আহা !

প্রতিটি পুরুষ মানুষ অ্যাকশন, এডভেঞ্চার, রোমাঞ্চ, গতি এসব ভালবাসে। আপনি কি নীড ফর স্পীড গেইম খেলেছেন? হ্যা, অবশ্যই আপনি খেলেছেন। আপনি নিশ্চয়ই একটা পোর্শে, ফেরারি, ল্যামবরগিনি স্পোর্টস-কার চালানোর স্বপ্ন দেখেন? বা একটা কয়েক হাজার সিসি ইঞ্জিনের সুজুকি বা ডুকাটি মোটরবাইক আপনার হাতের মধ্যে জান্তব গর্জন করছে আর আপনি ২০০ কিলো বেগে হাইওয়ে দিয়ে ছুটে যাচ্ছেন? হ্যা, সবাই এগুলো ভালবাসে। যুগ পাল্টেছে কিন্তু মানুষের সেই আদি অকৃত্রিম ইচ্ছা আগেও একই ছিল। আমাদের সময়ে যেটা হচ্ছে গাড়ির ইঞ্জিনের হর্স পাওয়ার, আরবদের সময়ে সেটা ছিল সত্যিকার হর্স পাওয়ার। অ্যারাবিয়ান হর্স পাওয়ার !!!
কাজেই একজন আরব শ্রোতা যখন এই আয়াতটি শুনত তখন সে এরকম একটা অ্যাকশন দৃশ্য কল্পনায় দেখতে পেতঃ ৮-১০ জন আরোহীর একটা দল যুদ্ধের ঘোড়ায় চড়ে প্রচন্ড গতিতে ছুটে যাচ্ছে সামনের দিকে তাদের শত্রুর দিকে। ডানে বায়ে কোন দিকে তাকাচ্ছে না তারা, কোন কিছুর পরোয়া করে না তারা। তাদের ঘোড়াগুলো সর্বোচ্চ গতিতে দৌড়াচ্ছে। প্রচন্ড শক্তিশালী এই শ্রেষ্ঠ ঘোড়াগুলো পর্যন্ত হাঁপাচ্ছে। ফোঁস ফোঁস করে তারা ভারি দম নিচ্ছে, তাদের বিশাল বুকের খাঁচা নিঃশ্বাসের তালে তালে হাপরের মতন ঊঠানামা করছে। প্রচন্ড প্ররিশ্রমে তাদের মুখ থেকে লালা ঝরছে, চোখগুলো যেন কোটর থেকে ঠিকরে বের হয়ে আসবে। যুদ্ধের প্রচন্ড আগ্রাসন নিয়ে ছুটে আসছে একদল যোদ্ধা...
এবার আল্লাহ বলছেন-
فَٱلۡمُورِيَـٰتِ قَدۡحً۬ا (٢) - Fal Mooriyaati Qad’Han
And they strike fire sparks with their hooves.
"তাদের ক্ষুরের প্রচন্ড জোরালো আঘাতে আগুনের স্ফুলিংগ ওঠে"
আল্লাহ এই বাক্যটী “ওয়া” দিয়ে শুরু না করে “ফা” দিয়ে শুরু করেছেন [আরবিতে ফা= এবং/তারপর]. অর্থাৎ এটি নূতন কোন শপথ নয়, এটি আগের ঘটনারই পরের দৃশ্য (A continous picture scene)।
Mooriyat= Causing sparks to fly. আগুনের স্ফুলিঙ্গ সৃষ্টি করে যে।
Qad’Haan= Violent strike which is very loud and powerful. জোরাল শক্তিশালী আঘাতের শব্দ।
প্রথম আয়াতে আল্লাহ দূর থেকে আসা একদল ঘোড়সওয়ারের দৃশ্য তুলে ধরেছিলেন। সিনেমাটোগ্রাফির ভাষায়, এরপর ক্যামেরা অ্যাংঙ্গেল জুম ইন করে চলে গেল ঘোড়ার নাকে। এরপর আবার ক্যামেরা অ্যাংঙ্গেল চলে যাচ্ছে ঘোড়ার পায়ে। একজন আরব, হোক সে কাফের বা মুসলিম, যখন নিজেদের বাস্তব জীবনের এই দৃশ্যগুলো আল্লাহর আয়াতের মাধ্যমে শুনতে পেত, তখন আক্ষরিক অর্থেই সে নিজের কল্পনায় একটি অ্যাকশন সিনেমা দেখতে পেত।
এই আয়াতে আল্লাহ যে দৃশ্যটা দেখাচ্ছেন- যুদ্ধের প্রচন্ড আগ্রাসন নিয়ে তীব্র বেগে ছুটে আসছে একদল ঘোড়সওয়ার যোদ্ধা। পাথুরে মাটি্র সাথে ঘোড়ার ক্ষুরের লোহার নাল-এর প্রচন্ড সঙ্ঘর্ষে আগুনের স্ফুলিংগ বের হচ্ছে বারবার। সাথে কানফাটানো শক্তিশালী শব্দ হচ্ছে তালেতালে- খটাখট খটাখট খটাখট। একটার পর একটা ঘোড়া যাচ্ছে আর পিছে রেখে যাচ্ছে একটা আগুনের স্ফুলিঙ্গের শিখা।
আস্তে আস্তে আল্লাহ পুরো দৃশ্যটার তীব্রতা ও প্রচন্ডতা ( Intensity and thrill) বাড়াচ্ছেন। এরপরের দুই আয়াতে তিনি বলছেন-
فَٱلۡمُغِيرَٲتِ صُبۡحً۬ا (٣)فَأَثَرۡنَ بِهِۦ نَقۡعً۬ا (٤) -
Fal Mugheerati Sub’Haan; Fa Atharna bihi naq’An
"Then they ambush at the dawn. Then They rise a cloud of dust. "
"তারপর তারা ভোরবেলায় আক্রমন করে। তারপর ধূলার মেঘ সৃষ্টি করে। "
Mughererah= Attack/ambush/rob/kill . আক্রমন করা।
Subha= ভোরের প্রথম আলো। ঊষা।
আল্লাহ বলছেন, এই দস্যুদল বা যোদ্ধা( বা যাই তাদের পরিচয় হোক) আক্রমন করতে আসছে ভোরবেলায়।আরবরা মরুর মানুষ। মরুভূমিতে তাদেরকে সবসময়ে নিজের দলের সাথে থাকতে হত। দল হারিয়ে ফেলা মানেই মৃত্যু। খাবার, পানি, সম্পদের জন্য একদল বেদুইন আরেকদলের উপর প্রায়ই হামলা করত। কাউকে আক্রমন করার সবচেয়ে মোক্ষম সময়ে হচ্ছে গভীর রাত, যখন সবাই ঘুমিয়ে থাকে। অদ্ভূত ব্যাপার হল, আল্লাহ বলছেন , এই ৮-১০ জনের ছোট দলটা আক্রমন করতে আসছে ভোরের আলোয়। তাদের দলটা যদি ৫০-১০০ জনের হত তাহলেও একটা কথা ছিল। তাছাড়া মরুর বুকে অনেক দূর থেকেই কাউকে আসতে দেখা যায়। ৮-১০ জন নিয়ে দিনের আলোয় সম্পূর্ন জানান দিয়ে শতভাগ প্রস্তুত কোন শত্রুকে হামলা করা নিতান্তই আত্মহত্যার সামিল। তাছাড়া এর আগের আয়াতে আল্লাহ বলেছিলেন, এদের ঘোড়ার ক্ষুরের আঘাতে মাটি থেকে আগুনের ফুলকি বের হয়। ভোরবেলায় শিশির পড়ে, মাটি ভেজা থাকে। ভেজা মাটিতে কত জোরে ঘোড়া চালালে আগুন বের হতে পারে আপনার কোন ধারনা আছে !?
এখানে আল্লাহ যেটা বোঝাচ্ছেন সেটা হচ্ছে, এই ছোট বেদুইন দস্যুদল বেপরোয়া, অকুতোভয়, ড্যাম কেয়ার, নিজেদের জীবন নিয়ে তাদের কোন মায়া নেই । তারা জানে ভোরে অল্প কয়েকজন যোদ্ধা নিয়ে পূর্ন একদল শত্রুকে আক্রমন করা আর মৃত্যুকূপে লাফ দেওয়া একি জিনিস। কিন্তু তাদের কিছু যায় আসে না। কোন কিছুতেই তাদের কিছু যায় আসে না। যার জীবনেরই মায়া নেই, তার কিসের ভয়?
Atharna= They(the horses) cause to rise, Athar= rise
Naq’A= Trail of Dust. Cloud of dust. ধূলির মেঘ।
আল্লাহ আবার ক্যামেরার ফোকাস পরিবর্তন করছেন এখন। তিনি বলছেন এই ঘোড়াগুলো এত জোরে দৌড়ায় যে এদের পেছনে ধূলা উড়তে উড়তে মেঘের মতন সৃষ্টী হয়। এটি জানানোর আরো একটি কারন হল দূর থেকে তাদের ধূলোর মেঘ দেখেই তাদের প্রতিপক্ষ বুঝে নেবে যে বিপদ আসছে এবং তারা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে রেডি হয়ে যুদ্ধের ফরমেশনে দাড়িয়েই থাকবে। যারা দূর থেকে ধূলার মেঘ উড়িয়ে শত্রুকে দেখিয়ে দেখিয়ে আক্রমন করতে যায়, নিঃসন্দেহে তারা মৃত্যুভয় নিয়ে চিন্তিত নয়।
আল্লাহ তাঁর শপথের অবজেক্ট শেষ করছেন এই আয়াত দিয়ে এখন-
فَوَسَطۡنَ بِهِۦ جَمۡعًا - Fa wasatna bihi jam'a.
"And they penetrate through the middle altogether"
"তারপর তারা দলবদ্ধভাবে (শত্রুর ব্যূহকে) ভেদ করে মাঝে ঢুকে পড়ে"
Wasatna= They(horses) penetrate through the middle; তীব্রগতিতে কোন ব্যূহকে ভেদ করা।
Jam’a= Altogether
যুদ্ধের শেষ দৃশ্য। এরকম দৃশ্য আপনি আগের দিনের যেকোন যুদ্ধের সিনেমাতে ( ট্রয়, গ্ল্যাডিয়েটর) অবশ্যই দেখেছেন। একদল ঘোড়সওয়ার আরেকদলের দিকে তীব্র গতিতে ছুটে আসছে। হাতে চকচকে খাপখোলা তলোয়ার। প্রতিপক্ষ আরেকদল পদাতিক যোদ্ধা এক সারিতে দাঁড়িয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে আছে। সারির সামনের জনের প্রত্যেকের হাতে একটা করে খোলা বর্শা। আস্ত ঘোড়া গেঁথে ফেলা যায় এই বর্শা দিয়ে।প্রত্যেকের চোখে রক্তের নেশা, মৃত্যুর নেশা। একটি আরবীয় ঘোড়া সহজেই ৫০-৬০ কিমি গতিতে দৌড়াতে পারে। নরম মাখনের ভিতরে যেমন করে ছুরি ঢুকে যায়, তেমনি করে ঘোড়াগুলো ঢুকে পড়ল শত্রুদলের ভিতর। যুদ্ধের প্রাথমিক ধাক্কায় ছিটকে পড়ল দুইদল দুইদিকে। ঢাল- তলোয়ারের ধাতব ঝনঝনানি, ঘোড়া ও মানুষের আর্তনাদ ও ঘাম-রক্তের ভারি গন্ধে নারকীয় হয়ে এল পুরো পরিবেশ.........।
মনে করুন আপনি একটা যুদ্ধের সিনেমা খুজছিলেন অনেক দিন ধরে। একদিন টিভি ছেড়ে দেখেন সেটা হিস্ট্রি চ্যানেল এ দেখাচ্ছে। চোখের পল্ক না ফেলে আপনি সেটা গোগ্রাসে গিলা শুরু করলেন। সিনেমার মধ্যে যখন একটা প্রচন্ড যুদ্ধের দৃশ্য চলছে, সিনেমার নায়ক ঘোড়া থেকে পড়ে গেছে, তার হাত থেকে তলোয়ার পড়ে গেছে, ঠিক এইসময়ে কারেন্ট টা চলে গেল আর বোনাস হিসেবে বাইরে একটা ট্রান্সফর্মার বার্স্ট করল। রাগে দূঃখে ক্ষোভে আপনার ইচ্ছে করল নিজের হাত চিবিয়ে খেয়ে ফেলতে।
ঘোড়া নিয়ে যুদ্ধের এই প্রচন্ড তীব্র বর্ননাটা আল্লাহ শেষ করেননি। এটা তিনি এটুকু পর্যন্তই বলেছেন। কিন্তু কেন?!? এই পর্যন্ত শুনে যেকোন আরব শ্রোতাই উত্তেজনায় তার হাত মুঠি করে অপেক্ষা করবে পরের লাইনটি শুনার জন্য। আরো মনে করুন, একজন আরব শ্রোতার এক হাতে ধরা রয়েছে তার প্রিয় ঘোড়াটি। সে চরম আগ্রহ নিয়ে ঘোড়ার যুদ্ধের এই আয়াতগুলো শুনছে আর তার ঘোড়াটির গায়ে পরম মমতায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। বিশ্বস্ত ঘোড়াটিও মনিবের পাশে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। ঘোড়াটি তার বহুদিনের সঙ্গী,বহু যুদ্ধ, বহু সুখদুঃখের সাথী। একসাথে তারা বহু পথ পাড়ি দিয়েছে। কাজেই এই মূহুর্তে সে তীব্র আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছে আল্লাহ্‌ এর পরের লাইনে কি বলেন সেটা শোনার জন্য।
আল্লাহ্‌ পরের লাইন বললেন। এতক্ষন ধরে পুরো দৃশ্যটা ধাপে ধাপে তৈরী করেছেন আল্লাহ্‌ শুধুমাত্র এই লাইনটা বলার জন্য। কিন্তু যেটা বললেন সেটা আরব শ্রোতা স্বপ্নেও কল্পনা করেনি। আল্লাহ্‌ বললেন-
إِنَّ ٱلۡإِنسَـٰنَ لِرَبِّهِۦ لَكَنُودٌ۬ (٦) وَإِنَّهُ ۥ عَلَىٰ ذَٲلِكَ لَشَہِيدٌ۬
Innal Insaana lirabbihi la kanood. Wa Innahu 'Ala thalika la Shaheed.
"There is absolutely no doubt that the human being is TRULY, EXTREMELY disloyal/Ungrateful to His Master. And indeed, he is to that a witness. "
আরবীয় ঘোড়া সম্পর্কে এরাবিয়ান হর্স এসোসিয়েশন বলেছে-
"An Arabian will take care of its owner as no other horse will, for it has not only been raised to physical perfection, but has been instilled with a spirit of loyalty unparalleled by that of any other breed. If you're looking for a companion who'll be your partner in adventure or competition-and your friend for life-then an Arabian may be the horse for you "
আরবীয় ঘোড়া প্রখর বুদ্ধিসম্পন্ন ও খুবই বিশ্বস্ত প্রানী। এরা যুদ্ধের ময়দানে অসাধারন বীরত্ব ও সাহসিকতার জন্য বিখ্যাত। যুদ্ধের ময়দানের প্রথমেই প্রতিপক্ষের তরবারির ও বর্শার আঘাত লাগত তাদের ঘোড়ার গায়ে। বিশালাকার হবার কারনে প্রায় সময়েই এরা তরবারির আঘাত, এমনকি বর্শার আঘাতেও মাটিয়ে লুটিয়ে পড়ত না। একজন আরব মনেপ্রানে ঘোড়া ভালবাসত। তার চেয়েও সে বেশি ভালবাসত যুদ্ধের ঘোড়া। তার চেয়েও বেশি ভালবাসত সে মাদি যুদ্ধের ঘোড়া। তার চেয়েও সে বেশি ভালবাসত প্রভুভক্ত বিশ্বস্ত মাদি যুদ্ধের ঘোড়া। আরবরা তাদের ঘোড়ার শক্তি, গতি, বিশ্বস্ততা নিয়ে কবিতা পর্যন্ত লিখত। আগের আয়াতে দেখা যাচ্ছিল, মাত্র কয়েকটি ঘোড়া নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। পশুপাখির কিছু সহজাত প্রবৃত্তি আছে। কোন বিপদ আঁচ করতে পারলে, কোন জায়গায় আগুন লাগলে, মৃত্যুভয় পেলে সাথে সাথে তারা সেখান থেকে পালিয়ে যায়। এটাকে Animal Instinct বলে। কিন্তু যুদ্ধের ঘোড়া ব্যতিক্রম। মরণে তার কোন ভয় নেই, কোন দ্বিধা নেই। তার পিঠে যে বসে আছে সে-ই তার মালিক। মালিক তাকে দিয়ে যা করাবে, সে তাই করবে। আপনি দৃশ্যটা কল্পনা করুন। একটি ঘোড়ার গায়ে এফোঁড়ওফোঁড় বিঁধে আছে একটি বর্শা, গা থেকে ফিনকি দিয়ে ফোয়ারার মত রক্ত ঝরছে । তারপরো ঘোড়াটি পালিয়ে যাচ্ছে না, সে পিঠে তার মনিবকে নিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। যতক্ষন পর্যন্ত তার দেহে শেষ বিন্দু নিঃশ্বাস আছে ততক্ষন সে তাঁর প্রানপ্রিয় মালিককে ত্যাগ করবেনা। যতক্ষন প্রভুর জন্য লড়াই করা সম্ভব, সে করবে। প্রভুর জন্য সে মরবে। কারন সে সাধারন কোন ঘোড়া নয়। সে যুদ্ধের ঘোড়া। হয়ত ক্ষনিকের জীবন তার। কিন্তু জীবনের এরচেয়ে অর্থবহ ও গৌরবান্বিত কোন সংজ্ঞা হওয়া সম্ভব নয়। বিশ্বস্ততার এরচেয়ে বড় কোন নজির হওয়া সম্ভব না।
আরব শ্রোতা এক মূহুর্ত আগেও মনে মনে ভাবছিল তার প্রিয় ঘোড়াটা কতই না বিশ্বস্ত। এবার আল্লাহ্‌ তার ঘুমন্ত বিবেককে প্রচন্ড এক ধাক্কা দিয়ে জাগিয়ে দিয়ে বলছেন-
" কোন সন্দেহ নেই অবশ্যই মানুষ তার রবের প্রতি অত্যন্ত অকৃতজ্ঞ, ভয়ঙ্কর অকৃতজ্ঞ। এবং অবশ্যই তার অকৃতজ্ঞতার সবচেয়ে বড় সাক্ষী সে নিজেই। "
বিস্ময়ে স্তব্ধ ও নির্বাক হয়ে আরব শ্রোতা উপলব্ধি করতে পারল মহান আল্লাহ্‌ তাকে তার ঘোড়ার উপমা দিয়েই কি প্রচন্ড শক্তিশালী একটি রিমাইন্ডার দিয়েছেন। বিশ্বস্ততা কি জিনিস এটা সে তার ঘোড়ার কাছ থেকে খুব ভাল করে জানে। এখন আল্লাহই তাকে আবার মনে করে দিচ্ছেন যে সে আল্লাহর প্রতি কতটা অকৃতজ্ঞ। আল্লাহ্‌ তাকে বানিয়েছেন, আল্লাহ্ তার ঘোড়াটাকেও সৃষ্টি করেছেন। আরব তার ঘোড়াটার মালিক, কিন্তু সে ঘোড়াটার স্রষ্টা না। ঘোড়াটা তার জন্য নিজের জীবন পর্যন্ত দিয়ে দিচ্ছে। ঘোড়ার বুদ্ধিমত্তা, চিন্তাশক্তি, আবেগ মানুষের চেয়ে অনেক কম ও সীমিত। সেটুকু চিন্তাশক্তি দিয়েই সে এত বেশি কৃতজ্ঞ যে তার জীবন সে দিয়ে দিচ্ছে মিনিবের জন্য। আর আরব শ্রোতা মানুষ হয়ে জন্মেছে, আল্লাহ্‌ তাকে সর্বোচ্চ বুদ্ধিমত্তা দান করেছেন, কিন্তু তাঁর স্রষ্টার প্রতি সে কতটাই না অকৃতজ্ঞ ! কি অসাধারন শক্তিশালী যুক্তি, তুলনা, দৃশ্য, আবেগ ও ঊপমা করেছেন আল্লাহ্‌। সুবহানআল্লাহ।।
আল্লাহ্‌ এই আয়াতে বলেছেন মানুষ হচ্ছে Kanood. এখানে একটা টান আছে, kan-o-o-d. এই টানকে আরবিতে বলা হয় "সিগাতুল মুবালাগা", যেটা মূলত প্রচন্ডতা বুঝায়। [যেমন- আর-রাহমা~ন= অকল্পনীয় দয়ালু, সীমাহীন দয়ালু, Un-Imaginably Merciful]
Kanood= Extremely Ungrateful. Ungrateful to all the favors of Allah. Someone who always complains and never appreciates the unlimited blessings of Allah.
Kanood শব্দটির আরো একটি মানে হচ্ছে - যে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখে, আলাদা করে রাখে, To separate. আরবের ঘোড়া জীবনের শেষ বিন্দু পর্যন্ত তার মনিবের পাশে ছিল। কিন্তু জগতের শ্রেষ্ঠ প্রানী মানুষ তার প্রভুর সাথে সেটা করেনা। মানুষ শুধু অকৃতজ্ঞই না, সে আরো একধাপ বেশি। সে খুব ভাল করেই জানে যে সে অকৃতজ্ঞ। তার অকৃতজ্ঞতা সম্পর্কে তার পূর্নমাত্রায় ধারনা আছে। আসুন আমরা আমাদের মর্ডান মুসলিমদের জীবনের উদাহরনগুলো দেখি। আমি সামান্য কয়েকটি পয়েন্ট দেখাব, এতেই আপনি ধারনা পেয়ে যাবেন।
মানুষ ভয়ঙ্কর রকম কমপ্লেক্স সাইকোলজিকাল ডিজাইনের একটি প্রানী। হেঁয়ালি করছি না একটুও । আমার নিজেকে আমি পুরোপুরি বুঝি না। আমার চিন্তা ভাবনা অনেকগুলোই আমি কন্ট্রোল করতে পারিনা। আমার ভিতরেই একজন ভয়ঙ্কর অপরাধী আছে, আমার ভিতরেই একজন ভাল কেউ আছে। কারন আমাকে আমি ডিজাইন করিনি। আমাকে আমার চেয়েও বেশি ভাল জানেন শুধুই আল্লাহ্‌। আল্লাহ্‌ আমাদের মধ্যে কৃতজ্ঞতা-অকৃতজ্ঞতা দুই-ই দিয়েছেন। এটা একটা পরীক্ষা। এটাই পৃথিবীতে আমাদের ক্লাস টেস্ট, যেটার রেজাল্ট আমরা পাব মরার পর। আমরা চোখ বুজে মরব। তারপর চোখ খুলব। সাথেসাথেই। অন্য জগতে। "মরা" কথাটা সঠিক না। মানুষ মরে না। মানুষ ইন্তেকাল করে। Antaqilu মানে এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় পরিবর্তন, To Transform.
আল্লাহ্‌ যে জিনিসগুলো আমাদের কাছ থেকে চেয়েছেন, আল্লাহর শপথ নিয়ে আমি বলছি, সেগুলো কঠিন হতে পারে, কিন্তু অসম্ভব না। ঈমান আনো, নামাজ পড়, ঠিকমতন কাপড়-বেশভূষা কর, রোজা রাখ, যাকাত দাও, সততা বজায় রাখ, ভাল ব্যবহার কর প্রত্যেকের সাথে, মা-বাবাকে দেখভাল কর, নিজের শরীর-মন-সত্তাকে পবিত্র রাখ, আল্লাহকে স্মরন কর, তাঁর দয়া ও করুনা চাও। ব্যস, এইতো। আল্লাহ্‌ আমাদেরকে তাঁর জন্য জীবন দিয়ে দিতে বলেননি।
আমরা নামাজ পড়িনা। দিনে ৫টা বার আমরা আল্লাহর সামনে দাড়াই পর্যন্ত না। আমি মুসলিমদের কথা বলছি ভাই, হিন্দু বৌদ্ধ খ্রীষ্টান অমুসলিম ভাইবোনদের কথা না। আমরা মুসলিম, আমরা দাড়ি রাখিনা। দাড়ি রাখা লিটারেলী একটা "অসম্ভব" হয়ে গেছে এখনকার সমাজে। দাড়ি রাখব? কি বলেন ভাই এগুলা? কেমনে কি?
আপনি মুসলিম। আপনি খুব ভাল করেই জানেন দাড়ি রাখতে হয় মুসলিমদের। আমি আপনাকে দলিল দিতে চাচ্ছি না, কারন আপনার ইস্যুটা দলিল না। আমি ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়া, রমজানে কুর'আন খতম করা মুসলিমের সাথে কথা বলেছি। তিনি ক্লিন-শেভড, বয়স তৃতীয় দশক। আমি তাকে দাড়ির ব্যাপারে বলেছি। তিনি বিনা দ্বিধায় জানিয়েছেন যে হ্যা, এটা অবশ্যই দরকার আছে। ঐ পর্যন্তই। আপনি যদি এরকমটাই করে থাকেন এখনো, তাহলে আপনার যুক্তিগুলো এরকম-
- আপনি ঠিক করেছেন আপনি দাড়ি রাখবেন না ।জীবনেও না। যে যাই বলুক। দুনিয়া উলটে যাক। ইম্পসিবল। যুবক বয়সে কেউ দাড়ি রাখে নাকি? যতসব ইসলামিস্ট কোথাকার !
- যারা দাড়ি রাখেনা তারা নরমাল মুসলিম। যারা রাখে তারা একটূ "বেশি" মুসলিম। অতটুকু বেশি না হলেও চলে।
- আপনার ধারনা আপনার এখনো বয়স হয়নি । আপনি ঠিক করেছেন ঠিক ৬০ বছর থেকে দাড়ি রাখবেন। কে আপনাকে ততদিন গ্যারান্টি দিচ্ছে ভাই? আপনি কি সেলফ-ডিলিউশনের স্বীকার নন? আপনি যেদিন থেকে সাবালক হয়েছেন সেদিন থেকে আপনি অ্যাডাল্ট। আপনার হিসাব হবে একজন অ্যাডাল্ট এর মতন। কাকে ফাকি দিচ্ছেন আপনি? নিজেকে? আল্লাহকে?
- আপনার এখন যতটুকু তাকওয়া আছে তাতে দাড়িটা ঠিক আসেনা। আরেকটু তাকওয়া হোক। তাকওয়া রাতারাতি গজিয়ে যাবেনা ভাই। আপনার কাজই আপনার তাকওয়া এনে দিবে। আপনি দাড়ি রাখবেন না, আচ্ছা ঠিক আছে, আপনাকে দাড়ি রাখতে হবে না। আপনি দাড়ি কাটা বরং বন্ধ করে দিন। দেখেন তাকওয়া আসে কিনা। দাড়ি কাটা নিয়ে কি কি কঠোর সাবধানবানী আছে দয়া করে পড়ে দেখুন।
- আপনি আসলে রাখতেই চান। কিন্তু লোকে কি বলবে? আপনার বাসায় তোলপাড় হয়ে যাবে। আপনার ডিভোর্স হয়ে যাবে। আপনি একজন চরম স্মার্ট থেকে গ্রাম্য ক্ষ্যাত হুজুরে পরিনত হবেন। সমাজের চোখে আপনি তাবলীগ, শিবির, হিযবুত তাহরি, আল-কায়দা, জঙ্গী, সন্ত্রাসী, এলিয়েন হয়ে যাবেন। এগুলো ভাবলেই আপনার বুক শুকিয়ে যায়, আপনি আবার একটা রেজর কিনে আনেন পরদিন। আপনি চিন্তা করুন আপনি আসলে কার দাস, আল্লাহর, নাকি সমাজের। আপনি "লোকে কি বলবে" সেটা নিয়ে লজ্জায় মরে যাচ্ছেন, আর আপনি আল্লাহকে গ্রাহ্যও করছেন না। কার কতটুকু ক্ষমতা আপনি কি ভুলে যাচ্ছেন? আপনি কার সামনে দাঁড়াবেন একদিন? কে বাচাবে আপনাকে সেদিন? কে আপনাকে কি বলল তাতে আপনার কি? আল্লাহ্‌ কি এখনো আপনাকে মাফ করে দিচ্ছেন না? আপনি কি বুঝেন না সেটা? যে আপনাকে হুজুর বলে সেটা তার মানসিক সমস্যা, আশ্চর্য ! আপনি তাকে করুনা করুন, তাঁর জন্য দোয়া করুন। আমি আপনাকে গ্যারান্টি দিচ্ছি, আপনি দাড়ি রাখেন, আপনার জীবন পালটে যাবে। আল্লাহ্‌ আপনাকে সরাসরি সাহায্য করবেন। কিভাবে করবেন আপনার কোন ধারনাও নাই। মনে রাখবেন- There are only two kind of people without beard, women and children !
- এসব কথা শুনতে আসলে আপনার ভাল লাগেনা । আপনি এমনিই না জেনে আর্টিকেলটা পড়া শুরু করেছিলেন, এখন আপনার চরম মেজাজ খারাপ । কতবড় সাহস ফালতু লোকজনের, আপনাকে উপদেশ দেয়? ভাই, আমি কেউ না আপনাকে উপদেশ দেওয়ার। আমার কোন যোগ্যতা নাই। ইসলাম পারফেক্ট, আমি না। আমি ইসলামকে রিপ্রেজেন্ট করি না। ইসলামকে যিনি রিপ্রেজেন্ট করেন তাঁর নাম মুহাম্মাদ(স), আপনি নিজেও জানেন। আপনি একটু চিন্তা করেন আরো। আপনি চাইলে একদিন আল্লাহকে দেখতে পারবেন। এটা কি আপনাকে শিহরিত করেনা? সামান্য কয়েকটা দাড়ির জন্য আপনি কেন রিস্ক নিবেন? যদি এটাও আপনাকে শিহরিত না করে, তাহলে আপনার জন্য আমার দুঃখের কোন সীমা নেই। আমি দু'আ করি আপনার জন্য।
- আপনি খুবই চালাক। দাড়ি রেখেছেন, কারন আপনার ঈমান আছে। কিন্তু ওদিকে যে চক্ষুলজ্জাও আছে। তাই আপনার দাড়িটা হচ্ছে ডেভিড বেকহ্যামের খোচাখোচা দাড়ি আর চাপদাড়ির মাঝামাঝি। কেউ যখন জিজ্ঞেস করে- কি মিয়া, দাড়ি কি স্টাইল নাকি সুন্নতি দাড়ি ? তখন আপনি তাড়াতাড়ি বলেন- "আরে না না কি যে বলেন না , জাস্ট স্টাইল। "
- এটাই আমার শেষ পয়েন্ট। এটাও আমাদের জন্মগত মুসলিম পুরুষদের জন্যই । গোড়ালির উপর প্যান্ট না পরা। এটার যুক্তিগুলোও হুবহু উপরের মতন। আপনি দেখুন কোনটা আপনার জীবনে উপস্থিত। কেন আপনি এমন করেন নিজেকেই নিজে জিজ্ঞেস করেন। আল্লাহ্‌ ছেলেদের বলেছেন গোড়ালির উপরে কাপড় পড়তে, আর মেয়েদেরকে বলেছেন গোড়ালি ঢেকে রাখতে। এমনই দিন পড়েছে, ছেলেদের প্যান্ট মাটিতে লুটায় আর মেয়েদের প্যান্ট দিন দিন ছোট হচ্ছেই। আমি মুসলিমদের কথা বলছি ভাই। আমরা প্যান্টটা দুইটা ভাজ দিতে শরমে মরে যাই, আর বুক ফুলিয়ে নাইকি আর অ্যাডিডাসের থ্রী কোয়ার্টার প্যান্ট পরে বলি- Just do it.
- আপনি কি আল্লাহর দাস হিসেবে নিজেকে মেনে নিয়েছেন? পুরোপুরি নাকি আংশিক? যদি উত্তর হ্যা হয়, তাহলে কোন সমস্যা হবার কথা না। যদি আপনার মনে হয়, এগুলো আপনার ভাল লাগে না, এগুলো আপনার ইচ্ছার বিরূদ্ধে, তাহলে আমি আপনাকে মনে করিয়ে দেই যে, দাসের কোন ইচ্ছে অনিচ্ছে থাকেনা, সে প্রভুর হুকুমে চলে। আপনি আল্লাহর সৃষ্টি। ঘোড়াও আল্লাহর সৃষ্টি। ঘোড়াকে দানাপানি দেওয়া ছাড়া আপনি বেশি কিছু করেন না। এর বিনিময়েই সে আপনার জন্য মারা যেতে প্রস্তুত। এবার আপনি চিন্তা করুন আল্লাহ্‌ আপনাকে কত অগনিত নিয়ামত দিয়েছেন, আর তার বিনিময়ে তিনি কত সামান্য জিনিস চেয়েছেন। কত সামান্য। আপনি কি কৃতজ্ঞ? নিজেক জিগেশ করুন। আমরা সবাই অকৃতজ্ঞ ভাই। আপনি, আমি, আমরা সবাই। আসেন আমরা চেষ্টা করি। আপনি কৃতজ্ঞতা বাড়ান, আপনি একবার না, একশবার দাড়ি রাখবেন।

আমরা মানুষরা কত অকৃতজ্ঞ এটা নিয়ে আপনি একটা জরিপ করেন। দেখেন কেমন রেজাল্ট পান। ১০ জন র‍্যান্ডম মুসলিম নিবেন আশেপাশে থেকে। দেখেন কে কোন প্যারামিটার এ পড়ে। এই ক্রাইটেরিয়া গুলোর পাশে নম্বর/পারসেন্ট বসাবেন।
- নামধারি মুসলিম। বিসমিল্লাহ আলহামদুলিল্লাহ বাদে প্র্যাকটিস লেভেল শূন্য= ___ %
- নামাজ পড়ে। শুধু জুম্মা=
- নামাজ পড়ে। টুকটাক। ১/২/৩ ওয়াক্ত। ইচ্ছামতন। =
- নামাজ পড়ে। ৫ ওয়াক্ত। ভালই কাজা করে। মাসজিদে যায়না। =
- নামাজ পড়ে। রেগুলার ৫ ওয়াক্ত। কাজা করে না। মাসজিদে মোটামুটি যায়। =
- সবই ঠিক আছে। দাড়ি নাই, প্যান্ট ও ঠিক নাই। =
- নামাজ ঠিক আছে সব। দাড়ি আছে, প্যান্ট ঠিক আছে। বয়স ৪০ এর উপর।=
- নামাজ ঠিক আছে সব। দাড়ি আছে, প্যান্ট ঠিক আছে। বয়স ৪০ এর নিচে। টীন এজার, তরুন, যুবক। =

এরপর আল্লাহ্‌ বলেছেন-
وَإِنَّهُ ۥ لِحُبِّ ٱلۡخَيۡرِ لَشَدِيدٌ (٨)
۞ أَفَلَا يَعۡلَمُ إِذَا بُعۡثِرَ مَا فِى ٱلۡقُبُورِ (٩)
وَحُصِّلَ مَا فِى ٱلصُّدُورِ (١٠)
إِنَّ رَبَّہُم بِہِمۡ يَوۡمَٮِٕذٍ۬ لَّخَبِيرُۢ (١١)
Wa Innahu lihubbil Khayri Lashadeed.
Afala ya'lamu itha bu'thira maa fil Quboor ?
Wa hussila maa fis-sudur.
Inaa Rabaahum bihim Yawma ithin lakhabeer.
"And no doubt his love of wealth is truly intense.
But does he not know that when the contents of the graves are scattered?
And whatever is in the chest, will be revealed?
Indeed, that day, their Lord is fully Knowledgeable with them. "
"কোন সন্দেহ নেই যে সম্পদের প্রতি তার লোভ ও ভালবাসা অত্যন্ত তীব্র ও প্রখর। কিন্তু সে কি জানে না যে, কবর থেকে সবকিছুকে বের করা হবে? আর হৃদয়ের মাঝে যা কিছু আছে, সেটাও বের করা হবে ? আর অবশ্যই সেদিন তাদের প্রভু তাদের সম্পর্কে সম্পূর্ন জ্ঞাত থাকবেন। "
আল্লাহ্‌ বলছেন, সম্পদের প্রতি মানুষের ভালবাসা [Hub= Love. ] অত্যন্ত তীব্র। এতই তীব্র যে, সে এটার প্রতি Shadeed ( Ashadda= দড়ি দিয়ে বাঁধা) . গাধার নাকের সামনে মূলোর মত আমাদের সবার সামনে একটা অদৃশ্য মূলো আছে। গাধা তো গাধাই, তাই সে মূলো পেয়েই খুশি। কিন্তু আমরা? সম্পদ, টাকা, আরো টাকা, বাড়ি-গাড়ি-ফ্ল্যাট-জমি, ক্যারিয়ার, বিদেশে সেটলমেন্ট, ভালো থাকা-খাওয়া-পরা-বিনোদন...এরকম অগনিত জিনিস নিয়ে আমাদের মূলো তৈরী। আর সেটার পিছে আমরা দৌড়াতেই থাকি। একদিন থামি। যেদিন আমরা কবরে যাই। এর আগে আমরা থামিনা।
আমাদেরকে কবর থেকে বের করা হবে একদিন, সেটাই আল্লাহ্‌ আমাদেরকে জিজ্ঞেস করছেন এরপর। কুর'আন এত শক্তিশালী যে বুকের মধ্যে ধাক্কা দেয়। আল্লাহ্‌ বলেছেন, সেদিন আমাদেরকে Bu'thira করে কবর থেকে বের করা হবে। আপনার টুলবক্সে কোন এক কোনায় একটা স্ক্রুড্রাইভার আছে, সেটা আপনার দরকার। কিন্তু সেটা অনেক ভিতরে, তাই আপনি টুলবক্স থেকে টেনে টেনে জিনিস বের করা শুরু করলেন, সেটাকে উপুড় করে ঝাঁকালেন। এটা হচ্ছে বা'সারা। আল্লাহ্‌ বলেছেন, আমরা যেন মনে রাখি আমাদেরকে এইভাবেই একদিন কবর থেকে বের করে তাঁর সামনে দাড় করানো হবে।
আগের সূরায় আল্লাহ্‌ বলেছিলেন, কেউ একটা অনু পরিমান কাজ করলেও সেটা সেদিন দেখানো হবে। এই সূরায় আল্লাহ্‌ আরো ডিটেইল বলে দিচ্ছেন। সেদিন আমাদের হৃদয়কে আল্লাহ্‌ Hussila করবেন। কোন কিছুর আবরন/ছাল ছাড়ানোকে হুসসিলা বলে। যেমন কলার ছিলকে ছাড়ান। সেদিন আমাদের হৃদয়ের যাবতীয় আবরন কে ছাড়িয়ে আমাদের প্রতিটি অকৃতজ্ঞতা দেখানো হবে। আর সেদিন আমাদের প্রত্যেকের ব্যাপারে এমন একটা বিষয়ও নেই যা সম্পর্কে আল্লাহ্‌ জ্ঞাত থাকবেন না।
একটা কুকুরের কথা শুনবেন? ক্যাপিটান একটা জার্মান শেফার্ড কুকুর। তার মালিক ম্যানুয়েল গুজম্যান ২০০৬ সালে মারা যায়। তারপরেই কুকুরটি বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়। এক সপ্তাহ পরে ম্যানুয়েল এর পরিবার তাঁর কবরে যেয়ে আবিষ্কার করে, কুকুরটি কবরের পাশে বসে কাঁদছে। ম্যানুয়েল এর স্ত্রী ভেরোনিকা জানান- "আমরা জানিনা সে কিভাবে সেখানে গেল, কারন আমরা তাকে কবরে নিয়ে যাইনি। এটা একটা রহস্য। " এখানেই শেষ না। প্রতি রবিবার, ম্যানুয়েলের পরিবার তার কবরে যেত। ঠিক টানা ৬ বছর কুকুরটি কবরের পাশেই থাকত। মাঝে মাঝে সে বাসায় যেত বা রাস্তায় হাটাহাটি করত, কিন্তু ঠিক ৬টা বাজার সাথে সাথেই সে এসে ম্যানুয়েলের কবরের ওপর শুয়ে পড়ত। ভেরনিকা জানান- " আমার ধারনা সে ম্যানুয়েলকে রাতে একা একা ছাড়তে চায়না।"
একটা উপমা দিয়ে শেষ করি। গভীর রাত। সবাই ঘুম। আপনি হেটে হেটে বাড়ির বাগানে গেলেন। আস্তাবলে আপনার প্রিয় ঘোড়াটা আছে, তাকে একবার দেখবেন। ঘোড়াটা শুয়ে ছিল। রাতে তার লাগাম খোলাই থাকে। আপনাকে দেখামাত্র সে উঠে দাড়ালো। মাটিতে কয়েকবার হালকা ক্ষুর ঠুকল, ফরর ফরর করে নাক দিয়ে আনন্দ প্রকাশের শব্দ করল। আপনি তার পাশে গিয়ে দাড়ালেন। ঘোড়াটি তার বিশাল মাথা আপনার গালে ঠেকাল। অবলা প্রানী, কথা বলতে পারেনা। তাও আপনি স্পষ্ট বুঝলেন সে আপনাকে বলছে- প্রিয় মালিক, প্রিয় বন্ধু। তুমি যতবারই আসবে, আমি তোমার জন্য উঠে দাড়াব। যত রাতেই তুমি আমার কাছে আসনা কেন, আমি ঠিকই তোমাকে পিঠে নিয়ে বের হব। আমরা দুইজনে ঘুরে বেড়াব মনের আনন্দে। তুমি যদি বনের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়, আমি তোমার জন্য জেগে থাকব। তুমি আমাকে ভালবাস।আমিও আমার সবটুকু দিয়ে আমি তোমাকে ভালবাসি। কখনোই তোমার পাশ ছেড়ে আমি যাবনা প্রিয় বন্ধু আমার । আমি একটা ঘোড়া, এর বেশি আমি তোমাকে আর কি-ই বা দিতে পারি। তুমি আমাকে ছেড়ে দিওনা কখনো।
আমাদের একজন প্রভু আছে। তিনি আমাদের বন্ধু। তিনি আমাদের মালিক। তিনি আমাদের ভালবাসেন। আমরা যেন তাঁর সামনে দাড়াই প্রতিদিন। আমরা যেন তাকে ভালবাসি। আমরা যেন ঘোড়ার কাছ থেকে, কুকুরের কাছ থেকে বিশ্বস্ততা শিখি। আমরা মানুষ। আমরা সবার সেরা। আমরা যেন সেটা বজায় রাখতে পারি।
" O Allah ! You're my Master and Lord. I have only one true friend and that is you only. I disobey you everyday, and yet you forgive me every second. O Allah, make me loyal as an Arabian Horse. Give me so much loyalty and Faithfulness so that I can happily give my small life for you. And then If you give me life, I can die for you again. And then again and again. Give me this much loyalty O Allah. And please forgive this sinful slave of Yours. If you forgive me, not a single atom will go wrong in Your Kingdom. If you punish me, Your Kingdom will not increase by a single atom. You don't need me O Allah. I do. Forgive my Disloyalty. "
এই ডকুমেন্টারিগুলো থেকে আপনি প্রাক-আরবের চিত্রগুলো পাবেন ইনশাআল্লাহ।
- https://www.youtube.com/watch?v=Bo9G72plWkA
- https://www.youtube.com/watch?v=N_nQFhMOTXQ
- http://www.sahih-bukhari.com/Pages/movies.php

আল্লাহ্‌ যেভাবে নিজের উপমা দিয়েছেন

আল্লাহ্‌ যেভাবে নিজের উপমা দিয়েছেন
পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক কে? এটার উত্তর দেওয়া আসলে খুব মুশকিল। প্রত্যেকটি পাঠকেরই আলাদা আলাদা সাহিত্যবোধ আছে, রুচি আছে। দুইটি বইয়ের কথা আমি জীবনে কোনদিনও ভুলব না। এরিখ মারিয়া রেমার্কের লেখা "থ্রী কমরেডস" আর "অল কোয়ায়েট অন দা ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট" . মজার ব্যাপার হচ্ছে বইদুটি আমি মূল জার্মান ভাষায় পড়িনি, আমি পড়েছি সেবা প্রকাশনীর অনুবাদ। যতবারই আমি পড়েছি, আমার চোখ থেকে পানি পড়েছে। আমার কাছে মনে হয়েছে আমি নিজের চোখে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ দেখতে পাচ্ছি। যুদ্ধ, বন্ধুত্ব, ভালবাসা, মানুষের জীবন নিয়ে এমন বই আমি জীবনে কখনো পড়িনি।
মানুষ পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত প্রানী তার একটা কারন হল সেই একমাত্র প্রানী যে তার জ্ঞান মস্তিষ্কের বাইরেও ধরে রাখতে পারে। সে তার মনের চিন্তাকে অক্ষর নামের একটা জিনিস দিয়ে কাগজে লিখে রাখতে পারে, সেটাকে বই বানিয়ে পড়তে পারে। একটা বই একটা জানালার মতন। লেখক তাঁর মস্তিষ্কের একটা জানালা খুলে আপনাকে তাঁর চিন্তাগুলো দেখতে দেন, লেখক তাঁর অনূভুতি চিন্তাগুলোকে আপনার মস্তিষ্কে ট্রান্সফার করে দেন। প্রত্যেকটি মানুষের আবেগ আলাদা আলাদা। যেই লেখকের আবেগ আপনার আবেগকে স্পর্শ করবে, আপনার ভিতরে নানারকম অনূভুতি সৃষ্টি করবে, আস্তে আস্তে সেই লেখক আপনার প্রিয় হতে থাকবেন। আপনার প্রিয় লেখককে হয়ত আপনি জীবনেও দেখেননি, কিন্তু তাঁর লেখা পড়লেই আপনার মনে হয় তিনি আপনার সাথে কথা বলছেন, তিনি আপনার একজন আপনজন। বইয়ের এই অসাধারন কারনগুলোর কারনেই তথ্যপ্রযুক্তির এই শীর্ষযুগেও এখনো মানুষ বই পড়ে, বই কিনে, বইয়ের পাতার ঘ্রান নেয়, বই পড়ে হাসে, কাঁদে।
সাড়ে ১৪০০ বছর আগে পৃথিবীতে একটা বই এসেছিল যেটা কোন মানব সাহিত্যিক রচনা করেনি। সেটা আসলে বই হিসেবে আসেনি, সেটা এসেছিল "কথা" হিসেবে। এই কথাগুলোকে মানুষ কাগজে লিখে রাখার পর যে বইটা তৈরী হয় সেটার নাম কুর'আন। এই বইয়ে আল্লাহ্‌ মানুষের সাথে কথা বলেছিলেন, তাঁর কথাগুলো উচ্চারন করতেন তাঁরই মানবদূত মুহাম্মাদ(স) . এই কথাগুলো এসেছিল মহাজগতের বাইরে থেকে, এটা ছিল স্রষ্টা ও মানুষের মধ্যে একটি অকল্পনীয় যোগাযোগ। মহাবিশ্বের বাইরে জীবনের অস্তিত্ব আছে কিনা এ নিয়ে মানুষের কৌতূহলের কোন শেষ নেই। মানুষ জানতে চায়-"এই গ্যালাক্সি বা এই মহাবিশ্বের বাইরেও কি জীবন আছে?" উত্তর হচ্ছে- হ্যা। যিনি এই মহাবিশ্ব বানিয়েছেন তিনি জীবিত, তিনি দেখেন, তিনি শোনেন, আর তিনি আমাদের সাথে কথাও বলেছেন। এই কথা হচ্ছে কুর'আন। আপনি শুধু এই জিনিশটা নিয়ে চিন্তা করুন কিছুক্ষন। কুর'আন কোন মানুষ, নাবি, দার্শনিক, কবি, সাহিত্যিক, ফেরেশতা...কারোর কথা না। এটা তাদের স্রষ্টার কথা। তাই পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রানী হিসেবে মানুষের প্রথম কাজ হচ্ছে জানার চেষ্টা করা স্রষ্টা তাঁকে কি মেসেজ দিয়েছেন, কেন দিয়েছেন।
কুর'আনের ক্ষমতাটা আমি আপনাকে একটা উদাহরণ দিয়ে বলি। মনে করেন, আজকে নাসা-র স্পেস স্টেশনে কয়েক আলোকবর্ষ দূরের একটা গ্রহ থেকে কিছু দূর্বোধ্য কোড এল। সেই কোড পড়ে বিজ্ঞানীদের মাথা খারাপ হয়ে গেল। এটা এসেছে একটি এলিয়েন জাতির কাছ থেকে, তারা জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে আমাদের চেয়ে ১ কোটি বছর এগিয়ে। তারা আমাদের সাথে যোগাযোগ করতে চায় ও আমাদেরকে তাদের অকল্পনীয় সব প্রযুক্তি শিখিয়ে দিতে চায়। সারা পৃথিবীতে হুলুস্থুল কান্ড শুরু হয়ে গেল সাথে সাথে। সৃষ্টির স্মরনকালের ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা হচ্ছে এটা। তখন কেমন লাগত আমাদের? সম্মানিত, বিনীত, উত্তেজিত? মহান কোন জাতি আমাদের সাথে কথা বলেছে বলে আনন্দিত , শিহরিত ?
এবার ফোকাসটা এলিয়েন এর উপর থেকে সরিয়ে নিয়ে আসুন মহাজগতের স্রষ্টার উপর। তিনি কোন এলিয়েন নন, তিনি আল্লাহ্‌, সকল প্রানের স্রষ্টা। একটু চেষ্টা করুন চিন্তা করতে যে এখন আপনার কেমন অনূভুতি হয়। এই অনূভুতির দরকার আছে। কারন এটাই একজন মুসলিমের অনূভুতি, এটাই হচ্ছে কুর'আন। এটা সরাসরি আল্লাহর কথা, যিনি আমাদের ডিজাইন করেছেন, যিনি Life , Time , Space নামের অকল্পনীয় জটিল জিনিসগুলো বানিয়েছেন। তিনি-ই কথা বলেছেন আমাদের সাথে। তিনি আমাদের মেসেজ পাঠিয়েছেন যাতে আমরা সেটা পড়ি, বুঝি, অনুধাবন করি। একজন মুসলিম ঠিক এরকমটাই মনে করে যখন সে কুর'আন পড়ে। সে আল্লাহর কথা শুনতে পায়। প্রত্যেকটি মুসলিম জানে তাঁর সাথে আল্লাহর একান্ত ব্যক্তিগত সম্পর্ক আছে, যে সম্পর্ক আমার জন্য ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব।
২৩ বছর ধরে পৃথিবীতে এমন একটা সময় এসেছিল যা পৃথিবী আর কোনদিন দেখবে না। ২৩ বছর ধরে স্রষ্টা পৃথিবীর সাথে স্বর্গের একটা জানালা খুলে দিয়েছিলেন। তিনি তাঁর কথাগুলো, চিন্তা ও আবেগগুলো পাঠিয়েছিলেন সম্মানিত স্বত্বা জীবরিল(আ) কে দিয়ে পৃথিবীর বুকে। মহান আল্লাহ্‌ তাঁর জ্ঞান অনুযায়ী তাঁর সময়মত তাঁর কথাগুলো পাঠিয়েছিলেন, যেই বাক্যটা যেখানে প্রয়োজন ঠিক সেখানেই তিনি দিয়েছেন, যে সূরাটা যেখানে থাকার কথা ঠিক তেখানেই আছে। কেমন ছিল সেই দিনগুলো যখন স্রষ্টা সরাসরি কথা বলতেন মানুষের সাথে ??? What amazing days those must have been when God spoke to man? Days of a direct connection between the Divine and man. The Qur'an is the link that still remains.
যে সময়ে কুর'আন নাযিল হয়, সে সময়ে আরবে লেখাপড়ার চল ছিল না। নাবি মুহাম্মদ(স)-ও ছিলেন নিরক্ষর। তাদের প্রধান সাহিত্য ছিল মুখে মুখে কবিতা রচনা। এগুলো সবই ঐতিহাসিক তথ্য। খুব অদ্ভূত একটা ব্যাপার হচ্ছে, আল্লাহ্‌ প্রথম যে কথাটি সেই নিরক্ষর সমাজে পাঠালেন সেটা ছিল-
" ইক্বরা বিসমি রাব্বী কাল্লাযী খ্বালাক"- পড় ! তোমার প্রভুর নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।

যে সমাজে পড়াশুনার চল নেই, সেখানে আল্লাহ প্রথম আদেশটি দিলেন পড়াশুনা করার জন্য। এরচেয়েও অদ্ভূত ব্যাপার হচ্ছে, রাসূল(স) পুরো কুর'আন শিখেছিলেন শুনে শুনে ! আল্লাহ্‌ তাঁকে বলতে পারতেন- "শুনো, তোমার প্রভুর নামে" . সেটা আল্লাহ্‌ করেননি। আল্লাহ্‌ বললেন- পড়। কেন?!
আল্লাহ্‌ চেয়েছেন আমরা পড়াশুনা করি, আমরা জ্ঞান আহরন করি। সত্যি সত্যিই মুসলিমরা তাই করলেন তারপর থেকে। আল্লাহর দেওয়া কথাগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে তারা এরপর কয়েকশ বছর ধরে শাসন করে ফেললেন পুরো পৃথিবী। আবিষ্কার করলেন ক্যামেরা, দাবা, প্রসাধনী, সেচ-কাজ, ইঞ্জিন, সার্জিকাল যন্ত্র, অ্যানেসথেসিয়া, ফাউন্টেন পেন, নাম্বারিং সিস্টেম, এলজেবরা, ত্রিকোনমিতি, কার্পেট, ইউনিভার্সিটি সিস্টেম, হাসপাতাল, কোমল পানীয়, প্লাস্টিক সার্জারী, ক্যালিগ্রাফী, আধুনিক রসায়ন( জাবির ইবন হাইয়ান), রবোটিক্স ( আল-জাযারি)...সহ অগনিত আবিষ্কার। জন্ম নিলেন শ্রেষ্ঠতম কিছু স্কলার। ইসলামের বানী ছড়িয়ে পড়ল পৃথিবীর আনাচে কানাচে। সেই স্বর্ণযুগ আর নেই এখন। মুসলিমরা এখন নিপীড়িত, শোষিত। কিন্তু আগুন থেমে গেলেও যেমন আগুনের উৎস কাঠকয়লা রয়ে যায়, তেমনি মুসলিমদের সাফল্যের উৎসটা এখনো আছে। সেই বইটাই। কুর'আন। অবিকৃত, প্রত্যেকটি শব্দ। অবিকৃত ছিল, এখনো আছে, সামনেও থাকবে।
কারন আল্লাহ্‌ বলেছিলেন-
" অবশ্যই, আমিই কুর'আন নাযিল করেছি; আর আমিই এটা সংরক্ষণ করব, কোন সন্দেহ নেই" [http://quran.com/15/9]
তিনি তাই করলেন। কিভাবে করলেন সবাই জানে। কাগজ-কলম কিচ্ছু লাগল না। তাঁর কথা মানুষ মুখস্থ করে ফেলল কথা হিসেবেই। একজন নয়, দুইজন নয়। কোটি কোটি মানুষ। একই সিরিয়ালে, একই উচ্চারনে পর্যন্ত ! এটা না গদ্য, না পদ্য। প্রচলিত আরবি গ্রামার না। কেমন জানি অদ্ভূত ছন্দ লাইনে লাইনে। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন বই আর একটিও কখনো আসেনি। This is what happens when the Creator of the Universe is the Author.
সূরা নূর ২৪ নম্বর সূরা। এই সূরার ৩৫ নম্বর আয়াতকে বলা হয় আয়াত আল নূর ( The Verse of Light). এখানে আল্লাহ্‌ তাঁর নিজের নূরকে একটা দৃশ্যের সাথে উপমা করেছেন। আমি চেষ্টা করেছি দৃশ্য এবং উপমা দুটোই ছবিসহ তুলে ধরার। আয়াতটাকে আমি ছোট ছোট অংশে ভাগ করে নিয়েছি ব্যখ্যা করার সুবিধার জন্য। মানুষ কল্পনা করতে পারে, মানুষ বাহ্যিক চোখ ছাড়াও মনের চোখ দিয়ে অনেক কিছু দেখতে পারে, বুঝতে পারে। এই আর্টিকেল টা পুরো উপলব্ধি করতে হলে আপনার মনের চোখগুলোও একটু ব্যবহার করতে হবে। এটা হচ্ছে আল্লাহর দেওয়া উপমা আর সাহিত্য। আপনি নিজেই বুঝবেন এটা কতটা শক্তিশালী সাহিত্য।
আয়াত আল-নূরঃ
[ اللَّهُ نُورُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ۚ مَثَلُ نُورِهِ كَمِشْكَاةٍ فِيهَا مِصْبَاحٌ ۖ الْمِصْبَاحُ فِي زُجَاجَةٍ ۖ الزُّجَاجَةُ كَأَنَّهَا كَوْكَبٌ دُرِّيٌّ يُوقَدُ مِن شَجَرَةٍ مُّبَارَكَةٍ زَيْتُونَةٍ لَّا شَرْقِيَّةٍ وَلَا غَرْبِيَّةٍ يَكَادُ زَيْتُهَا يُضِيءُ وَلَوْ لَمْ تَمْسَسْهُ نَارٌ ۚ نُّورٌ عَلَىٰ نُورٍ ۗ يَهْدِي اللَّهُ لِنُورِهِ مَن يَشَاءُ ۚ وَيَضْرِبُ اللَّهُ الْأَمْثَالَ لِلنَّاسِ ۗ وَاللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ ]
[ http://quran.com/24/35]


[১]
"আল্লাহু নুরুস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ্‌ "
Allah is the Light of the heavens and the earth
আল্লাহ্‌ হচ্ছেন স্বর্গ ও পৃথিবীর নূর/আলো।
আলো ছাড়া কোনকিছু দেখা যায় না। যখন কোন বস্তু থেকে আলো প্রতিফলিত হয়ে আমাদের রেটিনাতে পড়ে, তখন-ই আমরা সেটাকে দেখতে পাই। আলো হচ্ছে আমাদের "দেখার মাধ্যম" বা Means . আমাদের চোখে আলো না পড়লে আমরা কিছুই দেখতে পেতাম না। Perception of Vision= Light , দেখা= আলো। বাংলায় বলা হয় - " তার চোখের আলো/ জ্যোতি নিভে গেছে" - মানে সে অন্ধ হয়ে গেছে।
আল্লাহ্‌ এখানে বলছেন, আমরা যা কিছু দেখি, সব একমাত্র আল্লাহর কারনে। কারন তিনি হচ্ছেন "দেখার মাধ্যম" বা "নূর" . আমাদের চিন্তার জগত আর কল্পনার জগত পৃথিবী আর আকাশ আর মহাজগতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। আমরা এর বাইরে কিছু দেখতে, চিন্তা করতে, কল্পনা করতে পারি না। কারন আমরা মহাজগতেরই একটি অত্যন্ত ক্ষুদ্র অংশ। Heaven & Earth দিয়ে মানুষের ক্ষুদ্র সীমারেখা বুঝিয়ে দিয়েছেন আল্লাহ যে - এর চেয়ে বেশি আমাদের পক্ষে চিন্তা করা সম্ভব না।
ধরুন মাঝরাতে আপনার ঘুম ভেঙ্গে গেল। আপনি আবছা অন্ধকারে দেখলেন আপনার খাটের পাশে একটা ভয়ঙ্কর জন্তু বসে আছে। আতঙ্কে কাঁপতে কাঁপতে আপনি বেডসাইড ল্যাম্পটা জ্বালিয়ে হেসে ফেললেন। মেঝেতে আপনার কম্বলটা স্তূপ হয়ে পড়ে আছে। আপনি দেখেছেন, কিন্তু ভুল দেখেছেন। Your perception of light was wrong first. Then with real light, you understood the truth. প্রথমেও আপনি একটা কম্বল দেখেছেন, লাইট জ্বালিয়েও আপনি সেই একই জিনিস দেখেছেন। অথচ এই দুই দেখার মধ্যে ছিল আকাশ পাতাল পার্থক্য।
যে আল্লাহকে বিশ্বাস করে, সে জানে যে সবকিছুর মূলে আছেন আল্লাহ্‌; সব ক্ষমতার মালিক হচ্ছেন আল্লাহ্‌; আল্লাহ চেয়েছেন বলেই আমরা পারি। এই বিশ্বাস নিয়ে যখন সে সবকিছু দেখে, সে সত্যিকার জিনিসটা দেখতে পায়। এটা হচ্ছে আসল দেখা,এটা হচ্ছে সত্যিকারের আলো। আল্লাহর প্রতি তাঁর এই ঈমানই তাঁকে প্রকৃত সত্যটা দেখতে ও বুঝতে সাহায্য করে।
যে আল্লাহ-কে বিশ্বাস করেনা, সে যাই দেখে সেটা নিয়ে শুধুই যুক্তি দাড়া করানোর চেষ্টা করে। সে বিগ ব্যাং থিওরি নিয়ে লাফায়, ডারউইনের মতবাদ নিয়ে লাফায়, বিশ্বজগত যে এমনি একদিন "হঠাৎ" করে এসে গেছে এগুলো নিয়ে তর্ক করে। সে-ও পৃথিবীর সবকিছু দেখে আর সবার মতই, কিন্তু তার এই দেখা হচ্ছে মিথ্যা দেখা। কারন দেখার মাধ্যম হচ্ছেন আল্লাহ্‌, আর তার ভেতরে সেই আলোই নেই !
[২]
"মাসালু নূরিহি কামিশকাতিন ফীহা মিস্‌বাহ ; আল মিসবাহু ফী যুজাজা "
The Parallel of His light is like a niche within which is a lamp, the lamp is within glass
" তাঁর নূরের তুলনাটা যেন অনেকটা এরকম যে- দেয়ালের একটি খাঁজের ( niche) মধ্যে একটি ল্যাম্প ( প্রদীপ) আছে, প্রদীপটি আছে কাঁচের ভিতর।"
প্রথমে আল্লাহ্‌ এখানে বলে নিয়েছেন, "তাঁর নূরের তুলনাটা "অনেকটা" এরকম..." . কেন আল্লাহ্‌ "অনেকটা" বললেন? সত্যি কথা হচ্ছে, আমরা সসীম সৃষ্টি হিসেবে কখনোই আল্লাহকে পুরোপুরি বুঝতে পারবনা, এটা কখনো সম্ভব না। তাই আল্লাহ্‌ আমাদেরকে সসীম একটা তুলনা দিয়েছেন তাঁর নূরের, যাতে আমরা অন্তত সেটুকু বুঝতে পারি।
আল্লাহ্‌ বলেছেন, তাঁর নূরের উপমা হচ্ছে দেয়ালের মধ্যে একটি "মিশকাত" , মানে = Niche/Indent in the wall.
Niche কথাটার মানে জানতে হবে। এটা একটা পুরোন দিনের আর্কিটেকচার স্টাইল যখন ইলেকট্রিক বাতি আবিষ্কার হয়নি। দেয়ালের মধ্যে যদি কোন অর্ধগোলাকৃতি বা চৌকোনা খাঁজ থাকে সেটাকে Niche বলা হয়। এটার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে সেটার মধ্যে একটা মোমবাতি বা ল্যাম্প জ্বালিয়ে দিলে সেই আলোটা পুরো ঘরে ছড়িয়ে পড়ে। কিছু কিছু মাসজিদে এখনো এই Niche দেখা যায়। Niche কে বাংলায় খাঁজ/ কুলঙ্গি বলা হয়। পুরোন দিনের বাংলা বইয়ে পাবেন- কুলঙ্গিতে প্রদীপ জ্বলছে। বোঝার জন্য আমি একটা ছবি দিলাম।

তারপর আল্লাহ্‌ বলেছেন, সেই খাঁজ এ একটা "মিসবাহ" আছে। [ ফীহা মিসবাহ ]
মিসবাহ= ল্যাম্প।
মিসবাহ শব্দটা এসেছে "সুবহ" থেকে। সুবহ মানে সকাল ( সুবহে সাদিক) , আর Misbah= A Tool which gives light= Lamp.
সেই ল্যাম্পটা আছে একটা কাঁচের ভিতরে। [আল মিসবাহু ফী যুজাজা]
যুজাজা= স্বচ্ছ কাঁচ, Clear Glass.
[৩]
"আযযুজাজাতুকা আন্নাহা কাওকাবুন দুর্‌রি-উই ইয়ু কাদু মিন শাজারাতিম মুবারকাতিন যাইতুনা লা শারকিয়্যাতিন ওয়ালা গরবিয়্যাহ "
the glass as if it were a very bright shining star ; lit from [the oil of] a blessed olive tree, neither of the east nor of the west,
" কাঁচটা ঠিক যেন একটি অত্যন্ত চকচকে উজ্জ্বল নক্ষত্র, এবং ল্যাম্পটিকে জ্বালানো হয়েছে পবিত্র জলপাই গাছের তেল থেকে। এই গাছটা পূর্বের-ও নয়, পশ্চিমেরও নয়। "
আল্লাহ্‌ বলছেন, সেই ল্যাম্পের কাঁচটা হচ্ছে একটা অত্যন্ত চকচকে উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতন জ্বলজ্বলে। আরবিতে কাওকাবুন= An excessively shiny star. প্রশ্ন হচ্ছে, কাঁচের ল্যাম্প কিভাবে নক্ষত্র হয়?
আল্লাহ্‌ আমাদের জন্য একটা দৃশ্য তৈরী করে দিচ্ছেন এখানে। ল্যাম্পটার চারদিকে একটা কাঁচের আবরন আছে। ল্যাম্পটা যখন জ্বলে, তখন এর আলো পরিষ্কার কাঁচের উপর উজ্জ্বল কিছু প্রতিফলন তৈরী করে। এটাকে বলা হয় লেন্স ফ্লেয়ার ( Lens Flare). তখন ল্যাম্পটাকে মনে হয় একটা বড় নক্ষত্র। এই ছবিতে কয়েকটা লেন্স ফ্লেয়ার দেখান হল


এরপর আল্লাহ্‌ বলছেন, ল্যাম্পটাকে জ্বালানো হয়েছে একটা অত্যন্ত পবিত্র জলপাই গাছের তেল থেকে। যে তেল পূর্বেও পাওয়া যায়না, পশ্চিমেও পাওয়া যায়না। কোন গাছে যদি শুধু পূর্বদিক থেকে আলো পড়ে, তাহলে গাছের অর্ধেক অংশে বেশি আলো পড়ে, অন্য অংশে কম আলো পড়ে। পশ্চিমের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। এই গাছটা তেমন না। এই গাছটা এমন একটা জায়গার যেখানে কখনোই আলোর অভাব হয়না।
[৪]
"ইয়া কাদু যাইতুহা ইয়ুদি~~ উ ওয়ালাও লাম তামসাসহু নার "
whose oil would almost glow even if untouched by fire.
এই তেলটা এমন যে আগুনের সংস্পর্শ না পেলেও এটা প্রায় জ্বলে উঠতে চায়।
এতক্ষন আল্লাহ্‌ আমাদেরকে ল্যাম্পটার কথা বলেছেন। এবার আল্লাহ্‌ যে বিশেষ তেল দিয়ে ল্যাম্পটা জ্বলে সেটার বৈশিষ্ট্য বলছেন। এই তেলটা খুবই দাহ্যক্ষমতাসম্পন্ন, Highly flammable. দুইরকম তেল আছে। একরকম তেল হচ্ছে কেরোসিন। আপনি দেখবেন তেলের কুপিতে কেরোসিন তেল থাকে আর একটা ন্যাকড়ার সলতে থাকে। সলতেটা আস্তে আস্তে তেল শুষে শুষে পুড়তে থাকে।এগুলো হচ্ছে কম দাহ্য ক্ষমতার তেল। কিন্তু আধুনিক তেল যেমন পেট্রল, অকটেন এগুলো হচ্ছে অত্যন্ত দাহ্য ক্ষমতাসম্পন্ন। এই ধরনের তেলের আশেপাশে আগুন থাকলেও এই তেলগুলো জ্বলে উঠতে পারে। আল্লাহ্‌ আমাদেরকে বলছেন, সেই ল্যাম্পটার তেল হচ্ছে উচ্চ দাহ্য ক্ষমতাবিশিষ্ট, আগুন ছাড়াই এটা জ্বলে উঠতে চায়, আর আগুনের সংস্পর্শে আসলে তো কথাই নেই।
[৫]
" নূরুন আলা নূর "
Light upon light.
"নূরের উপর নূর"
এতক্ষন ধরে আল্লাহ্‌ ল্যাম্প এর বর্ননা দিলেন। সেটার কাঁচের বৈশিষ্ট্য বললেন, সেটার তেলের বৈশিষ্ট্য বললেন। সেই ল্যাম্পটা নিজে থেকেই জ্বলে উঠতে চায়। এবার সেটার উপর এসে পড়ল আরো অনেক আলো। এটার ব্যাখ্যা আপনি নিচে পাবেন।
[৬]
ইয়াহদি আল্লাহু লিনুরিহী মাইয়্যাশা~~ ঊ ; ওয়া ইয়াদরিবুল্লাহুল আমসালা লিন্নাস; ওয়াল্লাহু বিকুল্লি শাইয়িন আলীম।
Allah guides to His light whom He wills. And Allah presents examples for the people, and Allah is Knowing of all things.
"আল্লাহ তাঁর নূরের দিকে তাঁর যাকে ইচ্ছা, বা যে তাঁর কাছে চায়, পথ দেখিয়ে দেন। আর আল্লাহ মানুষের জন্য উপমা ( Parable) দেন, আল্লাহ সব ব্যাপারে সব কিছু জানেন।"
আল্লাহ্‌ যাকে ইচ্ছা তাঁর নূরের দিকে পথ দেখিয়ে দেন। এখানে একটা শব্দ আছে মাইয়্যাশা= Whoever wants + Whoever He wants. এটা একটা শর্ত। যে আল্লাহর কাছে তাঁর আলো চায় আল্লাহ তাকে অবশ্যই তা দেন। কিন্তু আগে আপনাকে চাইতে হবে। আগে আপনাকে আল্লাহর দিকে এক পা এগুতে হবে। বাকী ব্যবস্থা আল্লাহ্‌ অবশ্যই করে দিবেন। কিন্তু আপনি সেই এক পা টুকু না এগুলে আল্লাহ্‌ আপনাকে তাঁর নূরের পথ দেখাবেন না।
আয়াত আল নূর এই পর্যন্তই। প্রথমেই আল্লাহ্‌ বলে নিয়েছেন এটা হচ্ছে আল্লাহর নিজের নূরের অনেকটা কাছাকাছি একটা উপমা। আপনার বোঝার সুবিধার জন্য আমি উপরের কথাগুলোর আবার একটা ছোট সারমর্ম দিচ্ছি, তারপর আমি আসল ব্যাখ্যাটা দিয়ে দিচ্ছি।
সারমর্ম-
আল্লাহ্‌ হচ্ছেন সবকিছু দেখার মাধ্যম। তাঁর নূর হচ্ছে অনেকটা একটা খাঁজের মধ্যে রাখা একটা ল্যাম্পের মতন, যেটার চারদিকে কাঁচের আবরন আছে। কাঁচটা খুবই চকচকে উজ্জ্বল, এটার মধ্যে দিয়ে আলো প্রতিফলিত হলে ঠিক একটা নক্ষত্রের মতন দেখায়। এই ল্যাম্পটা যে পবিত্র জলপাই গাছের তেল দিয়ে জ্বলে, সেই গাছ পূর্ব পশ্চিম কোথাও পাওয়া যায়না। আর এই তেলটা এত বেশি দাহ্য যে আগুন না পেলেও এটা প্রায় জ্বলে উঠতে চায়। ল্যাম্পের আলোর উপর আরো অনেক আলো এসে পড়ল। যে আল্লাহর কাছে তাঁর নূর চায় , আর যাকে আল্লাহ্‌ ইচ্ছা করেন, তাকে তাঁর নূরের দিকে পথ দেখিয়ে দেন । তিনি সব ব্যাপারে সবকিছু জানেন।
মূল ব্যাখ্যাঃ
খাঁজ/Niche:
আমাদের সবার শরীরে একটা করে খাঁজ বা Niche আছে। এটা হচ্ছে আমাদের বুকের খাচা বা Rib-Cage. আপনি খেয়াল করলেই দেখবেন মানুষের বক্ষপিঞ্জর আর ছবির খাঁজটির মধ্যে অনেকটাই মিল আছে। আমি তুলনামূলক একটা ছবি দিয়ে দিলাম।

Lamp:
আল্লাহ্‌ ল্যাম্পের উপমা দিয়েছিলেন। বুকের ভিতর একটি ল্যাম্প আছে মানুষের, তা হল আমাদের হৃৎপিণ্ড ( HEART) .
কাঁচের আবরনঃ
আল্লাহ্‌ ল্যাম্পের বাইরে একটা কাঁচের কথা বলেছিলেন। জন্মের পর আমাদের হৃৎপিন্ডের চারপাশেও একটি স্বচ্ছ আবরন থাকে । এটার নাম হচ্ছে ফিতরাহ । ফিতরাহ হচ্ছে "আল্লাহর প্রতি মানুষের একটা সহজাত বিশ্বাস" . এটা শরীরের কোন অঙ্গ নয়, এটা একটা Abstract জিনিস। আদম(আ) কে সৃষ্টি করার পর আল্লাহ্‌ তাঁর কোমর থেকে আপনাকে আমাকে আমাদের সবাইকে বের করেছিলেন। এটা আল্লাহ্‌ সূরা আরাফ এ রেকর্ড করে রেখেছেন এভাবে-
"স্মরন কর, যখন তোমার রব বনী আদমের কোমর থেকে তাদের বংশধরদের বের করলেন , তারপর তাদের কাছ থেকে সাক্ষ্য নিলেন এই জিজ্ঞেস করে- আমি কি তোমাদের প্রভু নই? তারা বলল- হ্যা, আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি। যাতে কেয়ামতের দিন তোমরা বলতে না পারো যে, নিশ্চয়ই আমরা তো এ ব্যাপারে অনবহিত ছিলাম ( আমরা তো কিছুই জানতাম না) । " [http://quran.com/7/172-173]
প্রত্যেকটি মানুষের আত্মাতেই আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসের ছাপ জন্মগতভাবে এঁকে দেওয়া আছে। শেষ বিচারের দিন এ ব্যাপারে কেউ কোন অজুহাত দিতে পারবেনা। প্রত্যেকটি মানুষ জানে যে তার একজন স্রষ্টা আছে, তাকে একা ছেড়ে দিলে সে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস নিয়েই বড় হয়ে উঠবে। এটার নাম-ই হচ্ছে ফিতরাহ।
আমরা যখন জন্ম নিয়েছিলাম তখন এই কাঁচটি(ফিতরাহ) ছিল সম্পূর্ন পরিষ্কার, কারন প্রত্যেকটি শিশু নিষ্পাপ। আস্তে আস্তে বড়ো হতে হতে, পাপ করতে করতে আমাদের হৃৎপিন্ডের বাইরের এই কাঁচটায় ময়লা পড়তে থাকে। ময়লা পড়তে পড়তে কাঁচটা ঘোলা হয়ে যায়। কাঁচের ভেতর যে ল্যাম্পটা ( Heart) থাকে সেটার আলো আস্তে আস্তে নিবুনিবু হয়ে আসে, মলিন হয়ে আসে। সেই মলিন আলো তখন আর ময়লা কাঁচ ভেদ করে বাইরে আসতে পারেনা। আমরা আস্তে আস্তে আল্লাহর কাছ থেকে দূরে সরে যাই, পার্থিব জীবনের মোহ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যাই, আল্লাহকে ভুলে যাই। আল্লাহর কাছে যে একদিন সাক্ষ্য দিয়েছিলাম সেটা ভুলে যাই, আল্লাহর সামনে যে একদিন আবার দাঁড়াতে হবে সেটাও ভুলে যাই। অথবা ভুলে যাওয়ার ভান করি।
পবিত্র তেলঃ
আল্লাহ্‌ বলেছিলেন ল্যাম্পটা জ্বলতে একটা পবিত্র তেল লাগে।আমাদের হৃৎপিন্ডের ভেতর যে পবিত্র তেলটি আছে, এর নাম হচ্ছে আমাদের "রূহ" . সেটি পৃথিবীর কোন তেল নয়, পূর্ব পশ্চিম কোন প্রান্তেই এই তেল নেই, কারন এই তেলটি আসে একমাত্র সরাসরি আল্লাহর কাছ থেকে। আল্লাহর আদেশে ফেরেশতারা আমাদের মায়ের গর্ভে আমাদের প্রত্যেকের রূহ দিয়ে যান। রূহ এর কোন প্রতিশব্দ নেই। রূহ হচ্ছে রূহ। আত্মা, সত্বা, ব্যক্তিত্ব যাই বলা হোক না কেন কোনটিই রূহ এর প্রতিশব্দ নয়। রূহ হচ্ছে আমাদের অস্তিত্ব, যেটি প্রত্যেকটি মানুষের আলাদা আলাদা। পৃথিবীতে একই চেহারার বহু মানুষ আছে। কিন্তু প্রত্যেকটি মানুষের রূহ আলাদা আলাদা। এই "রূহ" হচ্ছে আমাদের আসল পরিচয়, এটার কারনেই আপনি "আপনার" মতন, আমি "আমার" মতন, আমরা প্রত্যেকেই আলাদা আলাদা স্বত্বা। মানুষের শরীর মরে যায়, কিন্তু রূহ কখনো মরে না। হৃৎপিন্ডের আলো জ্বালাতে রূহ নামের এই পবিত্র তেল লাগে। আমাদের অস্তিত্বকে আলোকিত করতে হলে তেল লাগে। রূহ হচ্ছে স্রষ্টার কাছ থেকে আসা সেই তেল। রূহ হচ্ছে আলোর তৈরী, A creature of light. আল্লাহ্‌ প্রথমেই বলেছিলেন তিনি হচ্ছেন পৃথিবী ও স্বর্গের আলো। আল্লাহর সাহায্য(Guidance) হচ্ছে নূর/আলো। কুর'আন হচ্ছে একটি আলো যা মানুষকে আলোকিত করে।
প্রত্যেকটি মানুষের রূহের ভিতরে আলোকিত হবার ক্ষমতা আল্লাহ্‌ জন্ম থেকেই দিয়ে দিয়েছেন। প্রত্যেকটি মানুষ স্রষ্টার দিকে ফিরে আসতে পারে যেকোন মূহুর্তে। এই Potential Light আল্লাহ্‌ আমাদের সবাইকে দিয়েছেন। এই আলোর ধর্মই হল সে জ্বলে উঠতে চায়, খালি প্রয়োজন আরেকটু আলো। যখন স্রষ্টার কাছ থেকে Guidance ( Islam, Qur'an) আসে এবং কোন মানুষ তা নিজের ভেতরে গ্রহন করে নিজেকে সংশোধন করার চেষ্টা করে, তখন তার নিজের মধ্যে আস্তে আস্তে পরিবর্তন আসতে থাকে। সে অনুভব করতে পারে যে তার ভেতরের এত বছরের জমে থাকা পাপ, ময়লা, অন্ধকার দূর হয়ে যাচ্ছে। সেখানে জায়গা করে নিচ্ছে স্রষ্টার দেখানো পথের আলো। এরপর আল্লাহ তাকে আরো পথ দেখান, আরো আলোর দিকে নিয়ে যান। আলোর উপর আরো আলো ফেলেন। আর এইজন্যেই আল্লাহ্‌ বলেছেন-
নূরুন আলা নূর- LIGHT UPON LIGHT !
মানুষ শুধুমাত্র জৈবিক একটি প্রানী নয়। আমাদের জৈবিক অংশের পাশাপাশি আমাদের একটি স্পিরিচুয়াল অংশ আছে, এটা প্রতিটি মানুষ জানে। আমাদের শরীর মাটির তৈরী তাই সেটার ক্ষুধা তৃষ্ণা ও জৈবিক চাহিদাগুলো আমরা মাটির পৃথিবী থেকেই মিটাই। কিন্তু আমাদের রূহ মাটির তৈরী না, আমাদের রূহ পবিত্র আলোর তৈরী। আমাদের রূহ এর-ও ক্ষুধা আছে, সেটা হচ্ছে নূর/আলো। শরীরকে না খেতে দিলে সে অপুষ্টিতে ভুগে। রূহকে তার প্রয়োজন না মিটালে সেও অপুষ্টিতে ভুগে। তখন তার জীবনে পার্থিব সব কিছু থাকলেও তাঁর মনে হবে , কি যেন একটা নেই, কিসের যেন একটা শূন্যতা, অতৃপ্তি। এটার নাম Spiritual Hunger. তখন মানুষ বলা শুরু করে- I feel so empty inside, I feel so hollow.
রূহের এই অতৃপ্তি ও শূন্যতা দূর করার জন্যই আমাদের সবার প্রয়োজন স্রষ্টার আলো। স্রষ্টার সেই আলো যখন আমাদের হৃদয়ের আলোর সাথে মিশে যায়, তখন আমাদের হৃদয় নক্ষত্রের আলোর মতন আলোকিত হয়। যখন দেয়ালের খাঁজের ভেতর ল্যাম্প ঠিকমতন জ্বলে, তখন আলোকিত হয় সারা ঘর। যখন রূহ এর আলো দিয়ে আমাদের অন্তর কে আমরা জাগিয়ে তুলতে পারি, আমাদের হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করতে পারি, তখন এর আলোয় আলোকিত হয় আমাদের জীবনের অন্ধকার অধ্যায়গুলো, দূর হয়ে যায় আমাদের জীবনের ভুলগুলো, আমরা আস্তে আস্তে স্রষ্টাকে আরো গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারি, আমরা তাঁর আরো কাছে যেতে পারি। আল্লাহ আমাদের প্রত্যেকের ভেতর একটা করে সফটওয়্যার দিয়ে দিয়েছেন, যেটা তাঁকে চিনে। যদি আমরা আল্লাহর কাছে সাহায্য চাই, তখন আল্লাহ্‌ আমাদেরকে তাঁর নূর দিয়ে সাহায্য করেন। তাঁর আলো এসে পড়ে আমাদের হৃদয়ের সফটওয়্যার এর উপর, আর তখনই সেটা আনলক হয়।
আল্লাহ্‌ বলেছিলেন ল্যাম্প এর বাইরে একটা পরিষ্কার কাঁচ আছে। ল্যাম্প থেকে কাঁচের মধ্য দিয়ে আলো বের হতে পারে বা ঢুকতে পারে। যদি কাঁচে ময়লা বা দাগ পড়ে তাহলে আলো যেতেও পারে না, ঢুকতেও পারেনা। প্রত্যেকটি পাপ, লোভ, হিংসা, অহংকার, পার্থিব মোহ, লালসা আমাদের হৃদয়ের কাঁচকে ঢেকে ফেলে ঠিক যেভাবে হারিকেন এর কাঁচে ময়লা জমলে ভিতরের আলো কমে আসতে থাকে। খারাপ কাজ করতে করতে, ধর্মকে অবহেলা করতে করতে একসময়ে আমাদের হৃদয়ের উপর এত বেশি পাপের আবরন জমে যায় যে তখন আমাদের ভিতরের আলো আস্তে আস্তে কমে আসতে থাকে আর বাইরে থেকে স্রষ্টার আলো আর কোনভাবেই আমাদের ভিতরে ঢুকতে পারেনা। আস্তে আস্তে আমরা পরিনত হয়ে যাই মানুষের খোলসবিশিষ্ট অন্তঃসারশূন্য একটি জৈবিক প্রাণীতে। আমাদের সবার চারপাশেই এমন অনেক মুসলিম আছে যাদের এই অবস্থা। তারা হয়ত শেষ নামাজ পড়েছেন ১০ বছর আগে। তাদেরকে ধর্মের কথা বললেও কোন লাভ হয় না, কুর'আন শুনলে তাদের কোন ভাবান্তর হয়না, একবারো তাদের পরকালের কথা মনে পড়েনা । তাদের ভেতরটা পার্থিব জিনিসের মোহে এত বেশি কলুষিত হয়ে গেছে যে এই ময়লা দূর না করলে স্রষ্টার আলো কখনোই তাদের ভেতরে যাবেনা।
একটা ল্যাম্পকে ব্যবহার না করে শুধু ফেলে রেখে দিলেও কিন্তু এর কাচে ময়লা পড়ে যায়। যত দিন যাবে, ময়লা তত পুরু হয়ে পড়তে থাকবে। মানুষেরও ঠিক একই জিনিশ হয়। আপনার চারপাশে অনেক মুসলিম আছেন, যারা খুব চমৎকার ধরনের মানুষ। খুবই ভাল আচার আচরন, খুবই ফ্রেন্ডলী, হাসিখুশি, কারোর ক্ষতি করেন না। কিন্তু তিনি নামাজ পড়েন না। তাঁর বক্তব্য হচ্ছে- " ভালমানুষ হয়ে থাকাটাই বড় ব্যাপার। ধর্ম যার যার ব্যাপার।" পাপ না করেও তিনি তাঁর হৃদয়কে ঢেকে ফেলেছেন স্রষ্টার প্রতি অবহেলা করে করে।
এজন্য আমাদেরকে সবসময় চেষ্টা করে যেতে হবে যাতে আমাদের হৃদয়ের কাঁচে ময়লা না জমে। আমরা যখন নামাজ পড়ি তখন স্রষ্টার আলো এসে আমাদের রূহের আলোর উপর পড়ে। কিন্তু বাস্তব সত্য হচ্ছে যে অনেক সময়ই আমরা নামাজ পড়ি রোবটের মতন যান্ত্রিকভাবে, আমরা কোন কিছু ফীল করিনা। কুর'আন শুনে আমাদের মনে কোন অনূভুতি আসেনা। এগুলো সবই প্রমান করে যে, নিশ্চয়ই আমাদের হৃদয়ের কাঁচে কোন ময়লা জমে আছে যার কারনে আমি স্রষ্টার আলো নিজের ভিতরে নিতে পারছি না। বেশিরভাগ সময়েই এটার কারন হচ্ছে পার্থিব কোন ব্যাপার। সেটা যতক্ষন আমরা মন থেকে সরাতে না পারব, আমাদের ময়লা দূর হবেনা।

যারা রিভার্ট করে ইসলামে আসেন, তারা সত্যিকার অর্থে আল্লাহর নূরকে বুঝতে পারেন। বহু মানুষ রিভার্ট হয় শুধুমাত্র কুর'আন পড়েই। কুর'আন পড়ে তাদের মনে হয় তাদের ভেতরে কি যেন একটা পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে, তাদের ভেতরটা ইসলামের আলো দিয়ে ভরে যাচ্ছে।
আল্লাহ এইভাবেই অসাধারন উপমা করেছেন, উদাহরন দিয়েছেন আমাদেরকে, যেন আমরা চিন্তা করতে পারি, কল্পনা করতে পারি। এরপর আপনি যখন একটি কাঁচের ল্যাম্প দেখবেন, আপনি আপনার নিজের কথা চিন্তা করবেন। এরপর আপনি যখন কোথাও একটি ময়লা কাঁচ দেখবেন, আপনি চিন্তা করবেন যে আপনার হৃদয়ের কাঁচে কি কি ময়লা জমে আছে, কিভাবে আপনি সেগুলো পরিষ্কার করতে পারেন, . ইসলাম এমন একটি ধর্ম যা মানুষকে প্রতিমূহুর্তে আল্লাহর কথা স্মরন করায়, প্রতিদিন আমাদের হৃদয়কে পরিস্কার করতে সাহায্য করে। আমাদের রূহগুলোকে জীবিত রাখে, আমাদেরকে জীবিত রাখে।
নূরুন আলা নূর- এই আলোর আয়াতটি আমার পুরো জীবন পরিবর্তন করে দিয়েছে। আমি নিজের চোখে দেখতে পেয়েছিলাম যে এই আয়াতটা আল্লাহ্‌ আমাকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন। আমার জীবনে বহু ভুল-ভ্রান্তি ছিল, এখনো আছে। ছোটবেলা থেকে আমি আর দশটা জন্মগত মুসলিমের মতন প্রথাগত উপায়ে বড় হয়েছিলাম। তারপর বড় হয়ে একটা সময়ে আমি নামধারী মুসলিমের মতন ইসলাম থেকে অনেক দূরে সরে গিয়েছিলাম। আমাকে বাসায় হুজুর দিয়ে কুর'আন রীডিং পড়তে শেখানো হয়েছিল, ব্যস ঐ পর্যন্তই ছিল আমার কুর'আন শিক্ষা। এরপর বহুবছর কেটে গেছে, আমি কুর'আন স্পর্শও করতাম না, কারন আমি কিছু বুঝতাম না। কিন্তু তারপরো মহান আল্লাহ্‌ আমাকে দয়া করেছেন। আমার কাছে প্রায়ই মনে হত আল্লাহ্‌ আমাদেরকে শুধু মুখস্থ করার জন্য আর দুলে দুলে সুর করে কিছুই না বুঝে তিলাওয়াত করার জন্য এই বইটা দেননি; কোন একটা বিশাল ঘাপলা আছে সমাজের প্রচলিত রীতিনীতিতে। আমি আল্লাহর কাছে দু'আ করেছিলাম একদিন এই বলে- O Allah ! I love you and your Book. I want to know the message of your Book. Please teach me your book. Please give me guidance and guide me to the straight Path "
এরপর কিভাবে আল্লাহ্‌ আমাকে পথ দেখিয়ে দিলেন তার কোন ধারনাও আমার নেই। আস্তে আস্তে আমি খুজে খুজে ভাল ভাল ইংরেজী অনুবাদ পেলাম। বুঝে কুর'আন পড়ে জীবনে প্রথমবারের মতন আমি বুঝতে পারলাম, আল্লাহর কথার চেয়ে শক্তিশালী কোন কথা হতে পারেনা, এরচেয়ে শ্রেষ্ঠ কোন সাহিত্য হতে পারেনা। এক সময়ে আমার মনে হল, আমি আসলে কুর'আন পড়ি না, কুর'আন আমাকে পড়ে। কুর'আন পড়ে আমার মনে হয়েছে আমার ভিতরের জমে থাকা ময়লাগুলো দূর হয়ে যাচ্ছে আল্লাহর কথা দিয়ে। আমি আল্লাহর কাছে যতটুকু সাহায্য চেয়েছিলাম আল্লাহ্‌ তারচেয়ে কোটিগুন বেশি আমাকে সাহায্য করেছেন। তারপর আমি আয়াত-আল-নূর পড়ে দেখি হুবহু আমার সমস্যাটাই আল্লাহ্‌ আমার জন্য ১৪০০ বছর আগে লিখে রেখেছেন। তাই যে সাহিত্যিক তাঁর কথা দিয়ে অলৌকিক কোন উপায়ে আমার জীবন পরিবর্তন করে দিয়েছেন, তিনি হচ্ছেন আল্লাহ্‌।
মহাজগতের স্রষ্টা যখন কাউকে তাঁর আলো দিয়ে সাহায্য করেন, এরচেয়ে সুন্দর আর কিছু হতে পারেনা। এরচেয়ে সুন্দর কোনকিছু আমার জীবনে এখনো পর্যন্ত ঘটেনি, ঘটার কথাও না।